Amardesh
আজঃঢাকা, শনিবার ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১১ ফাল্গুন ১৪১৯, ১২ রবিউস সানি ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

আধুনিক বাংলা গান

মো হা ম্ম দ র ফি ক উ জ্জা মা ন
আধুনিক বাংলা গান। এই তিনটি শব্দকে প্রথমে পৃথকভাবে দেখা যাক। ‘আধুনিক’ শব্দটির অভিধানগত অর্থ—বর্তমানকালের, হালের, সাম্প্রতিক, অধুনাতন, নব্য ইত্যাদি। বাংলা শব্দটির অর্থ দেয়া হয়েছে— বঙ্গদেশ, বঙ্গভাষা, বঙ্গ ভাষায় লিখিত। ‘গান’-এর অর্থ বহুবিধ। তার মধ্যে এখানে গ্রহণযোগ্য হতে পারে যে গুলি তা হলো— গীত, সঙ্গীত, কণ্ঠসঙ্গীত, গীতি কবিতা। এর মধ্যে ‘গীত’ শব্দটি বিশেষ বিশেষ ধরনের গানের ক্ষেত্রে ব্যবহার প্রচলিত আছে যেমন— গাজীর গীত, বিয়ের গীত, শিবের গীত ইত্যাদি। আর সঙ্গীতের শাস্ত্র নির্ধারিত অর্থ- নৃত্য-বাদ্যগীত। তাছাড়া, বাদ্যযন্ত্রের সুর-লয় ধ্বনি ও সঙ্গীত, যেমন যন্ত্রসঙ্গীত। তাহলে ‘গান’ হিসেবে যে দু’টিকে আমরা গ্রহণ করতে পারি, তা হলো— কণ্ঠসঙ্গীত এবং গীতি কবিতা।
বাংলাকে এখানে বঙ্গভাষা হিসেবেই গণ্য করতে হবে। অর্থাত্ বাংলা ভাষার গ্রামীণ, শহুরে, আঞ্চলিক ইত্যাদি যে কোনো রূপেই যে গান গাওয়া হয় তাকেই বাংলা গান বলবো। শুধু গাওয়া নয়, যা রচিত হয় তাও। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ‘আধুনিক’ শব্দটিকে নিয়ে। অভিধানে এর যতগুলি অর্থ দেয়া আছে তার সবগুলিই বড় খণ্ড সময় নির্দেশক। বর্তমান কাল ভবিষ্যতে বিলীন হয়ে যাওয়া। তখন আসে এক অন্য বর্তমান। বর্তমানের সৃষ্টিও যদি ভবিষ্যতের আগমন মাত্রই বিলীন হয়ে যায়, তাহলে তা অতি অবশ্যই ক্ষণস্থায়ী। স্ফুলিঙ্গের মত জ্বলে উঠেই নিভে গেলে কালের বিচারে সে তো ছাই-আবর্জনা। গানের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি তেমন হলে, রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত সবই আবর্জনা হিসেবে বিসর্জিত হতো। তাই ‘আধুনিক’-এর অর্থ ‘বর্তমান কালের’ হিসেবে ধরলেও মনে করতে হবে এবং মেনে নিতে হবে যে গতকালের বর্তমান, আজকের বর্তমান এবং আগামীকাল যে বর্তমান জন্ম নেবে তা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। বিচ্ছিন্নভাবে স্বয়ম্ভু নয়। একটি ক্রম অগ্রযাত্রা।
বাংলা গানের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে একটির নাম আধুনিক বাংলা গান। লোকগীতি, লোক সঙ্গীত, পল্লীগীতির মতো ‘আধুনিক বাংলা গান’ এক শব্দ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে ভেঙে ভেঙে লিখলেও। যেমন নজরুল ইসলাম নামটি দু’টিভাবে বিভক্ত হলেও তা একটি নাম বা সেই দুই ভাগে বিভক্ত নামটি দিয়ে একজন ব্যক্তিকেই বোঝায়। জন্ম নিয়ে, আধুনিক বাংলা গান নাম ধারণ করার পর থেকেই তা কালের পর কাল ধরে বয়ে চলেছে। সময়ের অভিঘাতে, আধুনিকতার নানান সংজ্ঞায় যেমন রচনার ক্ষেত্রে গানের বিষয় এবং শব্দ ব্যবহারে, তেমনই সুরে এবং যন্ত্রানুষঙ্গের ব্যবহারেও পরিবর্তন এসেছে অনেক। তবে, পরিবর্তিত বা অপরিবর্তিত, যে রূপেই হোক না কেন, কোনো সৃষ্টি, তার কালোত্তীর্ণ হবার ক্ষমতা থাকলেই মাত্র, কালের পর কাল ধরে আদৃত হয় তা এ সত্যও মনে রাখতে হবে।
আধুনিক বাংলা গান, বাংলা গানের একটি নির্মিত ও নির্ণীত ধারা। একমাত্র লোকসঙ্গীত ছাড়া আর সব ধরনের গানই নির্মিত। এমনকি প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভূত হলেও কখনও না কখনও, কোনো না কোনো গুণীর হাতে তা ব্যাকরণবদ্ধ হয়েছে। যেমন এ উপমহাদেশের রাগসঙ্গীত বা শাস্ত্রীয় সঙ্গীত। আগেই শাস্ত্রের জন্ম হয়ে তার নিবন্ধিত পথে কোনো সঙ্গীতের উদ্ভব ঘটেনি। সঙ্গীতের শাস্ত্র কথার সে বিস্তৃত আলোচনা এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয় এবং তা করার মতো যথেষ্ট জ্ঞান-গম্যিও আমার নেই। আধুনিক বাংলা গানকে আমি নির্মিত ও নির্ণীত বলেছি। তার অর্থ এ নয় যে, নির্মাণ পদ্ধতি নির্ণয় করে তারপর এ গান রচিত বা গীত হওয়া শুরু হয়েছে। মূলত গান রাজদরবার থেকে বেরিয়ে এসে, সাধারণের রুচিকে তৃপ্ত করার পথে অগ্রসর হয়েছে যখন, তখন নানা বিচিত্র লঘুর রসের গানের আসরের কথা আমরা জানি। লোকমানস রঞ্জনের জন্য তার বেশকিছু ধারা হয়ে ওঠে অতি চপল এবং ক্ষেত্রবিশেষে অশালীন। কোনো বিদেশি শাসক যখন কোনো বিজিত দেশের বাসিন্দা হয়ে উঠতে চায় না, কেবল শোষণই থাকে তার উদ্দেশ্য, তখন সে দেশের বা অঞ্চলের সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতার দায় গ্রহণের কোনো আগ্রহ তার থাকে না; বরং প্রতিষ্ঠিত শিল্প-সংস্কৃতি বোধ ধ্বংস হলেই শোষণের সুবিধা হয়। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন আমলও তার থেকে ব্যতিক্রমী কিছু নয়।
মুঘল সাম্রাজ্যে যেসব সম্রাট, নবাব, রাজা সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, ব্রিটিশ শাসনের বেনিয়াবৃত্তিক শোষণের আঘাতে তারা ক্রমেই হীনবল ও সর্বস্বান্ত হয়ে যেমন ধন-জন, তেমনই সংস্কৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। ব্রিটিশ শাসন-শোষণের সহযোগী বেশকিছু দেশাত্মবোধহীন শ্রেণীর জন্ম হয় এ সময়। তাদের মধ্যে ছিল ঠিকাদার, ফটকবাজারি, মধ্যস্বত্বভোগী নানা নব্য পেশার ব্যক্তিরা। এদের কোনো ধারণা ছিল না সংস্কৃতি সম্পর্কে, কিন্তু বিত্তের আগমন ঘটায় বিনোদন লাভের অধিকার জন্মেছিল। এ নিম্নরুচির মানুষের পৃষ্ঠপোষকতায়, অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলা গানও খেউড়ের উত্সবে পরিণত হয়ে চলেছিল ক্রমে ক্রমে।
আমার এ বক্তব্যে এমন একটি ভুল বোঝার আশঙ্কা থাকে যে—আমি বোধহয় জনরুচির বিপক্ষে বলছি। ব্যাপারটি মোটেও তা নয়। জনরুচির দাসত্ব না করলেও, জনরুচির দিকে স্নেহ দৃষ্টি তো রাখতেই হবে। ভুললে চলবে না যে, যে ধ্রুপদকে আমরা একেবারেই রাজদরবারি শাস্ত্র নিবন্ধ বলে মনে করি, তাও এক সময় অঞ্চলবিশেষের লোকসঙ্গীত বা আঞ্চলিক গানই ছিল। আবার খেয়াল ওস্তাদ আমীর খসরুর সৃষ্টি বা সদারং অধারঙের দ্বারা রাজদরবারে প্রতিষ্ঠা লাভ করলেও এ খেয়ালকেও বিভিন্ন সময় বাউল, ভাটিয়ালিসহ বহু লোকজ সুরের ঋণ গ্রহণ করতে হয়েছে। আর লোকজ সুর তো লোকরুচিরই প্রতিবিম্ব। লোকরুচিনির্ভর হয়েই প্রবাহিত। প্রয়োজন যেটা তা হলো, প্রতিভাহীনতার হাতে পড়ে যেন উচ্ছৃঙ্খল হয়ে না ওঠে, তার জন্য একটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। আধুনিক বাংলা গানের ক্ষেত্রে এ কাজটিই করেছেন রবীন্দ্রনাথ।
আমার বিষয় আধুনিক বাংলা গান। এর স্থায়িত্বের প্রসঙ্গ আনতে গিয়ে নিবন্ধের শুরুর দিকে আমি রবীন্দ্র-নজরুল সঙ্গীতের কথা এনেছি। কারণ বাংলা গানের এক পৃথক ধারা হিসেবে আধুনিক বাংলা গান সাগরাভিসারী স্বতন্ত্র নদীর মর্যাদা লাভ করেছে এ প্রধান দুই কবির হাত ধরেই। এ ধারার নির্মাণ পর্যায়টি সাধিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের হাতে। বস্তুত আধুনিক বাংলা গান যেমন মুক্তি লাভ করেছে রবীন্দ্রনাথে—রবীন্দ্রনাথও তেমনি মুক্তি লাভ করেছেন আধুনিক বাংলা গানে এসে।
উল্লেখ্য, এ ধারাতেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতজীবন শুরু নয়। একেবারে শুরুতে তিনি উচ্চাঙ্গ (?) সঙ্গীতের খানদানী সুরকে আশ্রয় হিসেবে নিয়ে বাণী রচনা করেছেন একেবারে বাঁধা পথের নির্দেশে। তার সেজ দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়োজনেই মূলত তিনি সেসব গানের কবিতা রচনা করেন। এর পরের পর্যায়ে—ওই অতি বাঁধানো আবেষ্টন থেকে একটু মুক্তির অন্বেষণ করেছেন তিনি। কাঠামোটি ঠিক রেখে ভাবের বা অনুভবের ভিন্নতা সংযোজন করেছেন। ধরা যাক, বর্ষার যে রূপ ওস্তাদের বাঁধানো কাঠামোতে অতি সংযমে আবদ্ধ, রবীন্দ্র-আবেগ তাতে তৃপ্ত থাকতে পারেনি। নিজের প্রাণের আকুলতাকে ব্যক্ত করতে রাগ-রাগিণীর স্বরবিন্যাসে কিছু অদল-বদল ঘটিয়েছেন তিনি। এর পরবর্তী পর্যায়ে তার উত্তরণ আজ আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত হিসেবে যে বিশাল সৃষ্টি সম্ভার পাই, সে পর্বে। ভাবকে প্রকাশের জন্য কেবল সুরের আধিপত্য নয়, কথার অবশ্যম্ভাবী প্রয়োজন এবং উপযোগিতা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছে। রবীন্দ্রনাথেরই কথায়, ‘সুরের সঙ্গে কথার মিলন কেউ রোধ করতে পারবে না। ওরা পরস্পরকে চায়, সে চাওয়ার মধ্যে যে প্রবল শক্তি আছে, সে শক্তিতেই সৃষ্টির প্রবর্তনা’ (২৯ অক্টোবর ১৯৩৭-এ দীলিপ কুমার রায়কে লিখিত পত্র : গ্রন্থসঙ্গীত চিন্তা, পৃষ্ঠা ২৩৯, সংস্করণ ২৫ বৈশাখ, ১৩৯২ বিশ্বভারতী)। আধুনিক বাংলা গান সম্পর্কে এটাই প্রধান কথা।
রবীন্দ্রনাথ থেকে এ যাবত একেবারেই পল্লীসঙ্গীত এবং একেবারেই তথাকথিত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বাইরে বাংলা গানের যে ধারাটি বহমান, তাকেই আমি চিহ্নিত করতে চাই আধুনিক বাংলা গান হিসেবে। রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্পর্কে যারা ছুঁত্মার্গীয় স্বাতন্ত্র্য জ্বরে ভোগেন, তাদের প্রতি বিনম্র সালাম জানিয়েও বলব, আধুনিক শব্দটিকে রবীন্দ্রনাথ নিজেই তার গান সম্পর্কে ব্যবহার করেছেন। ২ জুন ১৯৩৬-এ ইন্দিরাদেবীকে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ, ‘আমার আধুনিক গানে রাগ-তালের উল্লেখ না থাকাতে আক্ষেপ করেছিস। সাবধানের বিনাশ নেই। ওস্তাদরা জানেন আমার গানে রূপের দোষ আছে, তার পরে যদি নামেরও ভুল হয়, তা হলে দাঁড়াব কোথায়?’ এ থেকে আমরা দু’টি বিষয় পাই তা হলো, রবীন্দ্রনাথের গান আধুনিক গান এবং সে আধুনিক গানকে তিনি ওস্তাদী গানের বাইরে নিয়ে এসেছেন।
আধুনিক বাংলা গানের শ্রেষ্ঠ স্রষ্টা হিসেবে অবিসংবাদিতভাবে যে দু’জনের কথা বলতে হয়, তারা হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলাম। দু’জনই কবি হিসেবে যেমন বড়, তেমনই সঙ্গীতজ্ঞ। রবীন্দ্রনাথের হাতেই মূলত এটি রূপ লাভ করেছে। কালোয়াতী খানদানী ঘরানার ‘চীজ’ তার অধিগত ছিল। আপন সৃষ্টির তাগিদে কাব্যকেও সুরের মর্যাদার সমঅংশীদার করার প্রয়োজনে কালোয়াতী থেকে বেরিয়ে এলেও তার কাঠামোটিকে তিনি বর্জন করেননি। শত শত বছরের পরীক্ষিত এ কাঠামো তার মতো চির আধুনিক মানুষের কাছেও শাশ্বত হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। আস্থায়ী (স্থায়ী), অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগের বিন্যাস তাই রবীন্দ্রনাথের প্রায় সব গানেই পরিলক্ষিত। কাজী নজরুল ইসলাম বিষয়বৈচিত্র্য, ভাববৈচিত্র্য, সুরবৈচিত্র্য ও শব্দ ব্যবহারের অকুণ্ঠা ইত্যাকার সব কিছুতেই রবীন্দ্রনাথের প্রায় বিপরীত। সময় বিচারে তিনি নব্য আধুনিকদের পুরোধা ব্যক্তিত্ব। কিন্তু তিনিও আধুনিক বাংলা গানের জন্য রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক নির্ধারিত কাঠামোকে অবিকৃত রেখেছেন।
এ শাশ্বত কাঠামোটি বিকৃত হয়েছে পরবর্তীকালে, কম প্রতিভাধর কবি ও সঙ্গীতজ্ঞের অক্ষমতায়। তাই এটাকে উত্তরণ হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে না। গানের কাঠামো থেকে সঞ্চারীর অপসারণ ঘটানোকে তাই যতই সহজীকরণের দোহাই দিয়ে হালাল করার চেষ্টা হোক না কেন, তা হালাল হয়নি, বড়জোর ‘মকরুহ’ হিসেবে গ্রাহ্য হতে পারে। অর্থাত্ অগত্যা বলে ধরে নিয়ে এর পুনরাবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। এখন আধুনিক বাংলা গান যেহেতু আর একক ব্যক্তিত্বনির্ভর সৃষ্টি নয়, তাই গানের কবিতা ও সুর রচয়িতা উভয়কেই এ বিষয়ে সচেতন প্রয়াসী হতে হবে।
সবচেয়ে বড় করে যে বিষয়টি স্মরণ রাখতেই হবে, তা হলো আধুনিক বাংলা গান যত আধুনিকই হোক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত বাংলা গানই। শুধু ভাষায় নয়, মেজাজে এবং চরিত্রেও। এ গানের বচন অন্তর থেকে আহরিত হবে এবং সুর কানের ভেতর দিয়ে মরমে পৌঁছতে হবে। এটা এ কোমল মাটি এবং শ্যামল প্রকৃতির দাবি। এ গানের জন্য ‘শ্যামল কোমল পরশ ছাড়া যে নেই কিছু প্রয়োজন।’ বাংলার কোনো গানই কোনো বিচারেই শরীরী কসরত (Physical) প্রদর্শনের গান নয়। চিত্কার-চেঁচানি বাংলার ঝগড়া-কাজিয়াতে চলে, গানে চলে না। এমনকি কবিগান-তর্জাগান যেখানে পরস্পর আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের যুক্তিতর্কের লড়াই থাকে, সেখানেও চিত্কার থাকে না। আমাদের এ দেশে দুঃখ-দারিদ্র্য, অভাব-অনটন আছে, সামাজিক স্থিতিশীলতাও বহু ক্ষেত্রে অনুপস্থিত, তারপরও মানসিক বিক্ষিপ্ততা-অস্থিরতার আস্ফাালন আমাদের গণচরিত্র নয়। এ কারণেই আমাদের গানেও তা অনাকাঙ্ক্ষিত।
আমাদের গানে দেহভঙ্গিমা আছে, দেহবিক্ষেপ নেই। আধুনিক বাংলা গানও এর ব্যতিক্রম নয়। আগেই বলেছি, আধুনিক বাংলা গানের রূপ নির্মিত ও নির্ণীত হয়েছে। এ নির্মাণ কোনো কাল্পনিক রূপে উদ্ভাবন নয়। সঙ্গীতের যে আবহ এবং যেসব উপাদান এ উপমহাদেশে বর্তমান ছিল, আধুনিক বাংলা গানের ভিত্তি মূলত তার ওপরই স্থাপিত, যা নির্মাণ করা হয়, তার একটি পরিকল্পিত শৈলী থাকে, যা কিছু উদ্ভিন্ন হয়, তা আপন পরিবেশ ও প্রাকৃতিক অবস্থা অনুযায়ী অনিয়ন্ত্রিতভাবেই বেড়ে ওঠে পরিণত হয়, যেমন আমাদের লোকসঙ্গীত। কিন্তু আধুনিক বাংলা গান তার কাঠামো, এমনকি সুরের বিন্যাসকে গ্রহণ করেছে রাগ সঙ্গীত থেকে অথচ সে দরবারী গান থেকে পৃথক হয়ে উঠেছে আলাপ-তাল-বিস্তার-রাগরূপ প্রকাশের যাবতীয় কালোয়াতী বর্জন করে। ‘বর্জন’ শব্দটি হয়তো কিছুটা রূঢ় হয়ে গেল। কারণ এসবের ব্যবহার একেবারেই যে সহ্য করা হয় না আধুনিক বাংলা গানে, তা নয়। তবে তা অবশ্যই পরিমিত মাত্রায়। বস্তুত এ পরিমিতি বোধের ওপরই আধুনিক বাংলা গানের ধারাটি প্রতিষ্ঠিত। পরিমিতি বোধটি পরিচ্ছন্ন এবং পরিপকস্ফ হলেই ক্রমাগত গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে কোনো কিছুকে সমৃদ্ধ করে তোলা যায়। আধুনিক বাংলা গানের ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করি সবকিছুকে দু’হাতে গ্রহণ করতে, আবার বর্জন করতেও। এ গান বাংলার আত্মপরিচয়ের নাড়ির টানেই গ্রহণ করেছে লোকসঙ্গীতকে। বর্জন করেছে তার উচ্ছাসের অসংযম। কীর্তনের ভাবকে গ্রহণ করেছে, বর্জন করেছে আখর।
কোনো নদীর জন্ম হওয়ার পর সে একক ধারাতেই সাগরে যায় না—যেতে পারে না। আশপাশের বিল-বাঁওড় এবং বৃষ্টির পানিকে গ্রহণ করে সে নিজেকে পুষ্ট করে—বেগবান করে। বর্ষায় তার রূপ যায় পাল্টে। তেমনই শাখা নদী সৃষ্টি করে তার ধারার কিছু অংশ মূল থেকে পৃথক করে দেয়। আবার পৃথক উত্পত্তিস্থল থেকে আসা কোনো ধারাকেও সে গ্রহণ করে। এখানেই সতর্কতার প্রশ্ন এসে যায়। কারণ যমুনা যেখানে এসে পদ্মার সঙ্গে মিশে পদ্মাতে হারিয়ে গেছে যমুনা নদীর পরিচয় সেখানেই শেষ হয়ে গেছে। আর পদ্মা যমুনাকে ধারণ করেও যত দূর স্বরূপে পদ্মা নামে প্রবাহিত হতে পেরেছে, তত দূরই সে পদ্মা নদী। মেঘনায় হারিয়ে যাওয়ার পর সে হয়তো মেঘনা নদীকে পুষ্ট করেছে, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারেনি।
নদ-নদীর এ সৃজন-বিলোপ হয়তো একেবারেই প্রকৃতির খেয়াল-খুশির খেলা। কারণ নদী উত্পন্ন হয়, নির্মিত হয় না। তাই তার পথ নির্ণয় করে দেয়া যায় না। কিন্তু আধুনিক বাংলা গানের ক্ষেত্রটি হুবহু নদীর মতো নয়। এ ধারার জন্য তাই নির্ণীত পদ্ধতিটি রক্ষা করা অপরিহার্য। এ ধারা নির্মিত হয়ে চলা শুরু করার পর বহু কিছুই এর সঙ্গে মিশ্রিত হয়েছে। একেবারে প্রথম লগ্নে রবীন্দ্রনাথ ও ডিএল রায়ের হাতে এ গানের সুরের ধারায় মিশ্রণ ঘটেছে পাশ্চাত্য সুর। কিন্তু এই দু’জনেরই, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা এবং মেধা এতই শক্তিশালী যে, পাশ্চাত্য সুরে প্রভাবিত, এমনকি আশ্রিত তার কোনো গানেই বাংলা গান হারিয়ে যায়নি। বিশ্বের বহু দেশের সুরই প্রবেশ করেছে আধুনিক বাংলা গানে। বিশেষত নজরুল ইসলামের সুরে মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা, এমনকি রাশিয়ার সঙ্গীতের প্রতিফলনও দেখা যায়। কিন্তু কোনো বিচারেই তার সেসব গান বাংলা গানের মেজাজ ও অনুভবকে ক্ষুণ্ন করেনি; বরং বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ করেছে আধুনিক বাংলা গানকে। এর প্রধান কারণ হলো নিজস্ব সঙ্গীত সম্পর্কে অনুপুঙ্খ এবং অনুবীক্ষিত জ্ঞান ছিল রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের। বিশ্বসঙ্গীত সম্পর্কেও তাদের ধারণা ছিল স্পষ্ট।
তিরিশের (১৯৩০-পরবর্তী) আধুনিক বাংলা কবিতায় পাশ্চাত্যের প্রভাব প্রবল হয়ে ওঠে কাব্যালঙ্কারের নতুন নতুন ব্যাখ্যায় ও ব্যবহারে এবং ভাষা ও শব্দ প্রয়োগে। শব্দস্থিত অর্থ নয়, শব্দের বিদ্যুন্ময় ইঙ্গিত হয়ে ওঠে কবিতায় প্রধান। কবিতা থেকে নির্বাসিত হতে থাকে সাধু ভাষা এবং তথাকথিত পদ্যোপযোগী কোমল শব্দরূপ। এর কিছু কিছু প্রভাব আধুনিক বাংলা গানেও পড়ে। আধুনিক কাব্যালঙ্কারের সবকিছু গানের কবিতায় আনা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সমীচীনও নয়। তবু উপমা-রূপক-চিত্রকল্পের ব্যবহার সীমিতভাবে আধুনিক বাংলা গানে প্রবেশ করে। যেটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বর্জিত হয়, তা হলো সাধ ুভাষা ও শব্দের পদ্যোপযোগী কোমল রূপ-মম-সম-তব-মোর-মোদের-দেখিনু-করিনু ইত্যাদি বহু শব্দ। গানের কথা অবশ্য শুরু থেকেই, আধুনিক বাংলা গানের ক্ষেত্রে, কথা মাত্র নয়, কবিতা। রবীন্দ্রনাথ প্রথম যুগে দরবারী-খানদানী-ঘরোয়ানা ‘চীজ’কে রক্ষা করে তাতে কথা সাজিয়েছেন। বলাবাহুল্য, তাতে তার কবিসত্তা তৃপ্ত হয়নি। এ পর্ব থেকে সম্পূর্ণ নিজ সৃষ্টিতে আসতে সময় ব্যয় হয়েছে অনেক। সে মধ্যবর্তী সময়ের কোনো কোনো ক্ষেত্রে কবিতার পূর্ণ মর্যাদা রক্ষা করাও হয়তো সম্ভব হয়নি। এ সম্পর্কে তিনি কৈফিয়তও দিয়েছেন বেশ কয়েকটি গানের উদাহরণ টেনে। তার একটি এমন, ‘‘...‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ-মধুর হাওয়া’—এ গানে গানই মুখ্য, কাব্য গৌণ। অতএব, তালকে সেলাম ঠুকে ছন্দকে পিছিয়ে থাকতে হলো। যদি বল পাঠকরা তো শ্রোতা নয়, তারা মাফ করবেন কেন। হয়তো করবে না—কবি জোড়হাত করে বলবেন, তাল দ্বারা ছন্দ রাখিলাম, ত্রুটি মার্জনা করিবেন।’’ দেখা যাচ্ছে সৃজন অহঙ্কার ধারণ করেও রবীন্দ্রনাথকে—এটা ‘ত্রুটি’ হিসেবে স্বীকার করতে হয়েছে এবং ‘মার্জনা’ চাইতে হয়েছে। আবার রবীন্দ্রনাথ বলেই কিন্তু এ উক্তি করা সম্ভব হয়েছে। ত্রুটি সম্পর্কে যার জ্ঞান নেই, সে তো বুঝতেই পারে না ত্রুটি কোথায়।
এ বিশেষ প্রসঙ্গ তুলে আনার কারণ একটাই—তা হলো বর্তমান সময়ের ছন্দ-অন্ধ রচয়িতাদের ইতর প্রাণীসুলভ রাশি রাশি অর্থহীন শব্দাবর্জনা প্রসবকে চিহ্নিত করা। অতি অক্ষম অকবি রচিত আধুনিক(?) কবিতা, যা আসলে কবিতাই হয়ে ওঠেনি—চটকদার এলোমেলোমির অর্থহীনতাই যার সম্বল, তার উদাহরণ টেনে গানের কবিতার ক্ষেত্রেও একদল অতি অক্ষম কথাবাজ একদিকে যেমন এলোমেলো অর্থহীন কথা রচনা করে চলেছে, তেমনি অক্ষমতার কারণে ছন্দ রক্ষা করতে না পেরে গানের কবিতায় ছন্দের প্রয়োজন নেই বলে প্রচার করছে। একটি কথা অবশ্য ঠিক, তা হলো—রাশি রাশি গুণী গীতিকবি যেমন কোনো যুগেই একসঙ্গে আসেনিন, তেমনি গুণী সুরস্রষ্টাও সব যুগেই হাতে গণনাযোগ্য অথচ বিশেষ করে আমাদের মতো নির্বিচার ভোক্তার দেশে পণ্যের চটকদার বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য মাধ্যমের প্রয়োজন প্রচুর। এতএব, ঝাঁকে ঝাঁকে গণমাধ্যম নামধারী সম্প্রচার কেন্দ্রের আবির্ভাব ঘটছে। বিজ্ঞাপন দেখানোর বা শোনানোর জন্য, অর্থাত্ মানুষকে আকৃষ্ট করতে প্রয়োজন বিনোদনের। ফলে নাটক এবং সঙ্গীত হয়ে উঠছে বিজ্ঞাপন প্রচারের ফাঁক ভরাটের উপকরণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সস্তা বিনোদনে ঠাসা। কারণ একদিকে যেমন গুণী, শিল্পমান রক্ষায় সমর্থ সৃজনশীল মানুষের অভাব, অন্যদিকে দায়বোধহীনতা এবং রুচিহীন বিজ্ঞাপনদাতাদের প্রভাব। এ অসংযমের নিয়ন্ত্রণের কথাই বলেছি এর আগে।
যে কোনো শিল্পমাধ্যমের মতোই আধুনিক বাংলা গানকেও নিজস্ব সমাজ ও সংস্কৃতি সচেতন হতে হবে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও যেমন ঐতিহ্য সংলগ্নতা আবশ্যক, গানের ক্ষেত্রেও তেমনই। প্রকৃত পক্ষে সংস্কৃতিই সমাজের দর্পণ। সমাজের অগ্রযাত্রা মিলিয়েই গঠিত হয় জাতীয় চরিত্র। সংস্কৃতির দর্পণে সে চরিত্র প্রতিফলিত না হয়ে তা যদি অন্য কোনো চরিত্র প্রতিফলিত করে, তখন সে সংস্কৃতি যেমন আমার সংস্কৃতি থাকে না, সঙ্গীতের ক্ষেত্রটিও সে দৃষ্টিতেই বিবেচ্য। আধুনিক বাংলা গান আরও একটু বেশি সচেতনতা দাবি করে। যেমন তার কাব্যে, তেমনই সুরে।
ইউরোপ-আমেরিকার সমাজচিত্র আমাদের সমাজচিত্রের অনুরূপ নয়। এমনকি ভারতের মুম্বাইয়ে সমাজচিত্রের কৃত্রিম জৌলুস, যা মূলত সর্বভারতীয় সমাজচিত্রের সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়, তাও আমাদের সমাজচিত্রকে প্রতিফলিত করে না কোনো ন্যূনতম বিচারেও। প্রকৃত সঙ্গীত শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষের অতি স্বল্পতার সুযোগে আমাদের সঙ্গীতাঙ্গনে একশ্রেণীর অনুকারীর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, সচেতনতার অভাবে যারা ওইসব অখাদ্য গিলে, বদহজমে ভোগে, তা সমাজ দেহে বমন করে চলেছে। গ্রহণ এবং আত্তীকরণের যোগ্যতার কথা রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের উদাহরণ দিয়ে আগেই বলেছি। কোন যোগ্যতায় তা করা সম্ভব, তাও জানিয়েছি। যদি কোনো ভয়ঙ্করী বিদ্যার পণ্ডিতের মনে হয় আধুনিক বাংলা গানে বহির্দেশীয় রক্তসঞ্চালনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, তবে তাকে প্রথম নিজের লোকসঙ্গীত, রাগসঙ্গীত এবং আধুনিক বাংলা গানের জন্মের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অনুপুঙ্খ জ্ঞান অর্জন করতে হবে। অতঃপর যে দেশের সঙ্গীত থেকে তিনি গ্রহণ করতে চান তার ধ্রুপদী (Classic) অবস্থা থেকে ক্রমবিবর্তনের ধারা সম্পর্কেও সম্যক জ্ঞান রাখতে হবে। তবেই জানতে পারবেন যে, যে রক্ত তারা সঞ্চালন করতে চান বাংলা গানের সঙ্গে তার কোষ মিলবে কি-না। দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমাদের দেশের এ ভয়ঙ্করী বিদ্যাধর বৈদ্যদের সবাই হাতুড়ে। এমনকি আমাদেরই লোকসঙ্গীতের সঙ্গে পাশ্চাত্য বাদ্য-বাজনা লাগিয়ে যারা একটি যৌগিক (fusion) পদার্থ বানাতে চান, তাদেরও ধারণা নেই লোকসঙ্গীতের মৌলিক উপাদান সম্পর্কে। ফলে লোকসঙ্গীত মরে যায় এবং বাদ্য-বাজনা বিকট চেহারা নিয়ে চেয়ে থাকে। আর এর ভোক্তারা হারায় মানসিক সুস্থতা।
আমি একেবারেই এ কথা বলছি না যে, পাশ্চাত্য বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করা যাবে না, বিশেষত আধুনিক বাংলা গানের ক্ষেত্রে। তবে তার সংযম রক্ষার সক্ষমতা নির্ভর করবে সঙ্গীত-জ্ঞানের ওপর। আধুনিক বাংলা গানে, গানের কবিতাটিও যেহেতু সমান গুরুত্বপূর্ণ, তাই তার সহজ শ্রবণসাধ্য হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না বাদ্যের অত্যাচারে। আবারও বলব, আধুনিক বাংলা গানও শেষ পর্যন্ত বাংলা গানই। প্রেমে-বিদ্রোহে, আনন্দে-বেদনায়, কৌতুকে-বৈদগ্ধ্যে, গৌরবে-গ্লানিতে, উচ্ছ্বাসে-ক্লান্তিতে, শান্তিতে-সংগ্রামে এ দেশের—এ স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের আত্মিক এবং আত্তীকৃত অনুভবের প্রকাশ ঘটাতে হবে। যেমন গানের কবিতায়, তেমনই সুরে। তবে সৃজনশীলতা যেহেতু সমষ্টির বিষয় নয়, ব্যক্তিপ্রতিভার বিষয়, তাই তার স্বাধীনতা তো থাকবেই। সে স্বাধীনতার মাত্রা স্বেচ্ছাচারিতায় পৌঁছলেই বিপদ। পূর্বকথিত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তাই আবারও চলে আসে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমাদের ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষাকে স্বমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলা গান যেন সে মর্যাদার দিকে শুধু সযত্ন নয়, সশ্রদ্ধ দৃষ্টি রেখে আগামীর পথ নির্মাণ করে।