শিক্ষা সফরে কক্সবাজার
জান্নাতুল সাদিয়া
বনভোজন বা শিক্ষা সফর যাই বলি না কেন এই দুইয়ের উদ্দেশ্য যেন একটাই। প্রতিদিনের নিয়মতান্ত্রিক ক্লাস, খাওয়া, পড়া বাদ দিয়ে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যাওয়া। হোক না সেটা বাড়াবাড়ি, একদিনই তো। শিক্ষা জীবনের যত দুঃখ, কষ্ট, হতাশা আর না পাওয়ার জ্বালা সবকিছু একটা দিনের জন্য সাগরের জলে বিসর্জন দিয়ে এলাম আমরা সবাই। সাধারণত এ ধরনের শিক্ষা সফরের আয়োজন হয় শীতকালে। কিন্তু আমরা সপ্তম সেমিস্টারের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিংয়ে থাকায় শীতকালে এ আয়োজন সম্ভব হয়নি। আমরা যারা চট্টগ্রাম মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ‘কম্পিউটার টেকনোলজি’ বিভাগের ৮ম পর্বের শিক্ষার্থী, তাদের জন্য এটাই শেষ সফর। তাই আমাদের আনন্দ, আগ্রহ কোনোটারই কমতি ছিল না। অবশেষে আমাদের সাথী হলেন শিক্ষকদের মধ্যে আনোয়ার হোসেন, নূরুল হক ভূঁইয়া ও শাহনূর আমিন স্যার। এছাড়া অফিস কর্মী কালাম ভাই ও ক্রাফট ইন্সট্রাক্টর আরেফীন ভাই। তাই সব আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে আমরা ১৩ মে যাত্রা করলাম পর্যটন নগরী কক্সবাজারের উদ্দেশে। সকালে উত্তর হালিশহরের ক্যাম্পাস থেকে গাড়ি রওনা হলো। আর পথে পথে দূরের শিক্ষার্থীদের তুলে নেয়া হচ্ছে গাড়ি থামিয়ে। মাইকে গান বাজছে অবিরাম. তারপরও সেটাই যেন ভালো লাগছিল। এত গরমেও কারও মাঝে বিরক্তির ছাপ নেই। গাড়ি আগ্রাবাদে পৌঁছলে শুরু হয় গানের তালে নাচ। আমরা বিদায়ী ছাত্রীরা গাইলাম ‘দুঃখটাকে দিলাম ছুটি’, ‘ও...বন্ধু তোকে মিস করছি ভীষণ’, ‘আজ দুঃখ ভোলার দিন’সহ বেশ কিছু গান। ২য় পর্বের ছাত্রী সানজিদা তামান্নুরের নাচের তালে আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম কিছুক্ষণ। ৮ম পর্বের সমবেত সঙ্গীতে যোগ দিল ৬ষ্ঠ পর্বের পিয়াল বড়ুয়া ও শর্মি বড়ুয়া। ভূঁইয়া স্যারের সঙ্গে ভাবী ও তার দুই ছেলেমেয়ে ছিল। ভাবীকে উত্সর্গ করে স্যারও গাইলেন একটা গান। চকরিয়া, ডুলাহাজরায় অবস্থিত সাফারি পার্কটি ঘণ্টাব্যাপী ঘুরেও আমরা শেষ করতে পারলাম না। পার্কটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে বন্য প্রাণীগুলো একেবারে নিজেদের মতো করে বাস করতে পারে। তাই নির্দিষ্ট জায়গায় অনেক প্রাণীকে লতাপাতার ভিড়ে দেখতে পাইনি। একটা প্রাণী থেকে অন্যটার দূরত্ব প্রচুর। পার্কে দেখলাম বিশাল হাতি, উল্টালেজী বানর, তারকা কচ্ছপ, হরিণ, সাদা ময়ূর, কুমিরসহ আরও অনেক দুর্লভ ও বিলুপ্তপ্রায় নানা প্রাণী। সাফারি পার্কের অভ্যন্তরে অবস্থিত জাদুঘরটি দেখার মতো। এখানে প্রাণী বিভাগে নানা ধরনের মাছ, প্রাণী এমনভাবে প্রদর্শন করা হয়েছে মনে হচ্ছে একেবারেই জ্যান্ত। তবে জাদুঘরের ভেতর আলোর স্বল্পতা থাকায় খুব একটা উপভোগ করতে পারিনি এসব দুর্লভ বস্তু। তাছাড়া পাকের্র তুলনায় জাদুঘরটি খুব ছোট মনে হলো আমার কাছে। তাছাড়া জাদুঘরটিকে আরও বেশি আকর্ষণীয় করে তোলা যেত বলে আমার মনে হলো। আমি আর আমার খুব কাছের বান্ধবী বেলী মিলেই এ পিকনিকের আয়োজন করেছিলাম। তাই আমাদের উপরই ম্যানেজমেন্টের সব দায়িত্ব বর্তাল। সাফারি পার্কে ঢোকার সময় সবার আগে আমি আর সবার পেছনে বেলীকে থাকার নির্দেশ দিলেন আনোয়ার স্যার। দায়িত্বের চাপে পড়ে আমরা খুব একটা ঘোরাঘুরি করতে না পারলেও অন্যের আনন্দে বেশ আনন্দিত হয়েছি। এবার আমাদের যাত্রা হিমছড়ি। পথিমধ্যে খাওয়ারের আয়োজন ছিল। সাফারি পার্কে এতক্ষণ হাঁটার পরও হিমছড়ির ঝর্ণা দেখার আকুলতা দেখে স্যাররা কিছুটা অবাকই হলেন। টিভি অনুষ্ঠান কিংবা সিনেমায় এ ঝরনাটাকে যতখানি বড় মনে হয় আসলে ততটা নয়। গ্রীষ্মকাল তাই হয়ত পানির পরিমাণ কমে যেতে পারে। ঝরনার অবারিত ধারায় সবাই কাঁক গোসল মানে আধগোসল করলাম। পানি ছিটাছিটি আর ফটোসেশন তো আছেই। এবার যাত্রা হিমছড়ির পিকনিক স্পটে। শুরুতেই একটা সাইনবোর্ডে লেখা আছে—শিশুদের নিরাপদে নিয়ে যেতে আর হৃদরোগীদের উপরে না ওঠার পরামর্শ। পড়েই একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তারপরও দেখা চাই কী আছে উপরে। সবার আগে আমি। পিঁপড়ে যেমন করে দল বেঁধে সারি করে চলে তেমনি আমরাও সিঁড়ি ভেঙে উঠেই চলেছি। সম্ভবত দশ তলার মতো উচ্চতায় আমরা সিঁড়ি ভেঙে উঠলাম। একটা খোলা ছাদ চারপাশে রেলিং দিয়ে ঘেরা। এখান থেকে খুব ভালো করে সমুদ্রটা দেখা যায়। সিঁড়ি ভেঙ্গে নামতে নামতে আমাদের পা অবশ হওয়ার উপক্রম। বহু কষ্টে গাড়িতে চড়লাম। এবার লাঞ্চ সেরে সরাসরি যেতে হবে কক্সবাজার সি-বিচে। এমন সময় বিচে গিয়ে পৌঁছলাম তখন ভাটা শুরু হয়ে গেছে। স্যার বারবার সাবধান করে দিচ্ছিলেন আর বিভিন্ন পয়েন্টে বড় বড় সাইনবোর্ডে সতর্ক বাণী জানান দিচ্ছে ভাটার সময় পানিতে না নামতে। বাড়িতে আম্মু বারবার বারণ করেছে পানিতে না নামতে, যেহেতু সাঁতার জানি না। তারপরও সাগরের নীল জলরাশির আবেদন কী ফেলা যায়। দলবেঁধে আমরা সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লাম মহানন্দে। তীরে বসে ভাবছিলাম এমন করে যদি জীবনের প্রতিটি দিন কেটে যেত! সূর্যাস্ত দেখে ফেরার কথা থাকলেও স্যারের পীড়াপীড়িতে সূর্যাস্তের অনেক আগেই রওনা হতে হলো। ফেরার পথে সবাই ক্লান্ত শ্রান্ত। গাড়িতে পিনপতন নীরবতা। কিন্তু এভাবে কী বসে থাকা যায়? তাছাড়া এবার আমাদের শেষ বনভোজন। আমার মতো আরও অনেকেরই শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটতে যাচ্ছে আর চার মাস পর, এটা ভাবতেই চোখ দুটো ছলছল হয়ে উঠল। যেন সকালের সব আলো রাতের কালো আঁধারের মাঝে হারিয়ে গেল। বাচ্চাদের মতো ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেললাম। তারপরও বন্ধুদের মাঝে কি আর মন খারাপ করে রাখা যায়? ওরাই তো আমার মন ভালোর দাবাই। তাই সব কষ্টকে কিছুক্ষণের জন্য দূরে ঠেলে আবারও মনটাকে রিফ্রেশ করে নিলাম। নাচলাম পুরোটা পথ। গাইলাম নতুন উদ্যমে।


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


