আজকের নারী
আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণার শততম বার্ষিকী আজ। নারীর অগ্রযাত্রায় এক মাইলফলক। জীবনের নানা চড়াই-উত্রাই পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তের নারী অনবরত চালিয়ে গেছে তার নিজস্ব লড়াই। সফলতার সিঁড়ি বেয়ে কেউ উঠে এসেছে শিখরে। কেউ এখনও সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নারী দিবস শুধু আনুষ্ঠানিক একটি দিবস নয়। বিশ্বের সব প্রান্তের নারীর এক কাতারে দাঁড়ানোর একটা উপলক্ষও বটে। বিশেষ এ দিনটিতে সবক্ষেত্রের, সব প্রেক্ষাপটের নারীর প্রতি রইল আমাদের সশ্রদ্ধ সালাম। নারীর ব্যক্তিগত বোধ, সচেতনতা, সম্ভাবনা নিয়ে বলেছেন এ সময়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে যাওয়া সফল নারীরা। সাক্ষাত্কার : নাহিদ আনজুম সিদ্দিকী
নারীর পথচলার দীর্ঘ ইতিহাস
উনবিংশ শতক থেকে শুরু হওয়া নারীর নিজস্ব চিন্তাভাবনার ফসল আজকের আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দীর্ঘদিনের অবদমিত অবস্থার টানাপড়েন কাটিয়ে ওঠে সেদিন নারী চেয়েছিল মুক্তি, তার জীবনের অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, মতামত প্রকাশের অধিকার। আজকের নারী দিবস একদিনের অর্জন নয়। ক্ষুদ্র পরিসর থেকে ছড়িয়ে পড়া এই বৈশ্বিক স্বীকৃতির পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক ইতিহাস। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এ বছর পালিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণার শততম বর্ষ। পেছন ফিরে দেখে আসা যাক নারীর সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস।
১৯০৮
নারীদের মধ্যে অস্থিরতা এবং সমালোচনা ও তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ সময়টা। নারী নির্যাতন, অসমতার চাপ সইতে সইতে এ সময়ই পরিবর্তনের পথে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে মতামত এবং সেই সূত্রে কার্যকর প্রচারণা। এ বছরই ১৫ হাজার নারী নিউইয়র্ক শহরের অভিমুখে কাজের সময় ঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি এবং ভোটাধিকারের দাবিতে অংশ নেয় পদযাত্রায়।
১৯০৯
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে সমাজতান্ত্রিক দল এক ডিক্লারেশনের মাধ্যমে পালন করে প্রথম জাতীয় নারী দিবস। ১৯১৩ সাল পর্যন্ত সে দেশের নারীরা ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ রোববার জাতীয় নারী দিবস পালন করতে থাকে।
১৯১০
কোপেনহেগেনে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে নারী অধিকার আন্দোলনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ও বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার অর্জনের প্রচেষ্টার সহযোগিতার তাগিদে একটি বিশেষ দিনকে আন্তর্জাতিকভাবে নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির উইম্যান অফিসের প্রধান লারা জেটকিন ৮ মার্চকে বিশ্বের সব নারীর অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে পালনের প্রস্তাব দেন। ১৭টি দেশের একশ’র বেশি নারী জেটকিনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানান, যার ফলে আজকের আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
১৯১১
কোপেনহেগেন সম্মেলনের ঘোষণা অনুযায়ী অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জাপান এবং সুইজারল্যান্ড প্রথমবারের মতো ১৯ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করে। ১০ লাখের বেশি নারী-পুরুষ ওইদিনের র্যালিতে অংশ নিয়ে নারীদের কাজ ও প্রশিক্ষণ, ভোট, সরকারি চাকরির অধিকার ও বৈষম্য নিরসনের পক্ষে দাবি তোলে। এর পরপরই ২৫ মার্চ নিউইয়র্কে ঘটে সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, যেখানে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায় ১৪০ জন কর্মী নারী, যাদের অধিকাংশই ছিল ইটালিয়ান ও ইহুদি। এ ঘটনার পর কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ও শ্রমিক আইন বিষয়ে টনক নড়ে সবার। এবছরই শুরু হয় ব্রেড অ্যান্ড রোজেস প্রচারণা।
১৯১৩-১৯১৪
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে রাশিয়ার নারীরা ১৯১৩ সালের ফেব্রুয়ারি শেষ রবিবার প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করে। ১৯১৪ সালে ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে নারীরা যুদ্ধবিরোধী র্যালিতে অংশ এবং নারী মুক্তির দাবিতে তাদের মত প্রকাশ করে।
১৯১৭
ফেব্রুয়ারির শেষ রবিবার রাশিয়ার নারীরা যুদ্ধে তাদের ২০ লাখ সৈনিকের নিহতের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ‘রুটি এবং শান্তি’—এই দাবিতে ধর্মঘট শুরু করে। রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও নারীরা এ আন্দোলন অব্যাহত রাখে এবং পরে জার তা মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং প্রাদেশিক সরকার নারীর ভোটাধিকার দিতে সম্মত হয়। গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনটি ছিল ৮ মার্চ।
১৯১৮-১৯৯৯
সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জন্ম হলেও এ দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত ও চিহ্নিত হয় নারীর অধিকার অর্জনের একটি বিশেষ দিন হিসেবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত ও অনুন্নত সব দেশের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে দিনটি অর্জন করে নিজস্ব শক্তি। জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর অধিকার এবং অংশগ্রহণ সমুন্নত ও সহযোগিতাপূর্ণ করতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করে আসছে। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী বছর। বিশ্বের সব দেশ ৮ মার্চ বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে নারীর অগ্রযাত্রাকে সম্মান জানাতে এগিয়ে আসে এবং নারীর সমতা প্রতিষ্ঠা ও জীবনের সব ক্ষেত্রে তা রক্ষার প্রয়োজনে পদক্ষেপ গ্রহণে অঙ্গীকার করে।
২০০০-২০০৭
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, বুলগেরিয়া, কাজাখস্তান, কিরজিগস্তান, মেসিডোনিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, তাজিকিস্তান, ইউক্রেন, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনামে ৮ মার্চ সরকারি ছুটির দিন। এদিনের ঐতিহ্য হিসেবে এসব দেশে নারীকে সম্মান প্রদর্শন করে পুরুষরা তাদের মা, স্ত্রী, বান্ধবী, সহকর্মীকে ফুল বা উপহার দিয়ে থাকে। অনেক দেশে মা দিবসের মতো ছেলেমেয়েরা ওইদিন মা অথবা নানি-দাদিকে উপহার দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
একবিংশ শতাব্দী মানুষের চিন্তাভাবনায় বিপ্লব ঘটিয়েছে এটা সত্যি। দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফসল হিসেবে নারী অর্জন করেছে কিছু রাষ্ট্রপদ ও অধিকার, ছুটে গেছে মহাকাশে, নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পেয়েছে সরকার পরিচালনার, বেড়েছে নারী শিক্ষার হার, অর্জন করে জীবন-যাপন বেছে নেয়ার অধিকার। তারপরও দুঃখজনক তথ্য হচ্ছে, এখনো পুরুষকর্মী তুলনায় তার মজুরি কম, ব্যবসা অথবা রাজনীতিতে এখনো সমতার সুযোগ নেই নারীদের। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে তারা এখনো অনেক পিছিয়ে বৈষম্যের পাশাপাশি বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা।
৮ মার্চ কেবল একটি অনুষ্ঠান সর্বস্ব দিন নয়। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নারীর অর্জনকে উদযাপন করার ইতিবাচক একটি উত্সব ৮ মার্চ। যেদিন বিশ্বের আনাচে-কানাচের সব নারী উপলব্ধি করতে পারে তাদের সবার হাত ধরা আছে একসঙ্গে। যেখানে নারী মানে একটি শক্তি। আর এভাবেই দিনের পর দিন শক্তিশালী অবস্থানে চলে এসেছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সেদিন নারীদের কাছে সমতার জন্য সংগ্রাম, শান্তি ও উন্নয়নেরই এক প্রতীক।
স্বাবলম্বিতার বিকল্প নেই
শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যান-ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক নারী তার প্রতিটি বিষয়ে সচেতন; কিন্তু আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে নারীকে মানুষ ভাবা হয় না, সমাজ নারীর উন্নয়নশীল কাজের স্বীকৃতি দেয় না। অধিকাংশ সময় পরিবার ও সমাজের বাধা মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে। তাই মেয়েরা তাদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড প্রকাশ করতে পারে না। নারী বা পুরুষের প্রথম পরিচয় হলো সে একজন মানুষ। কিন্তু আমাদের সমাজে মেয়ে বলেই করতে দেয়া হয় না অনেক কাজ। সামাজিক এই প্রথার পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বে নারীর অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নের দাবিতে পালিত দিবস সমাজ সচেতনতার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের দেশে মেয়েরা পিছিয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তাদের স্বল্পঋণ, প্রশিক্ষণ, ব্যবসায়িক উন্নয়নে সাহায্য, উন্মুক্ত বাজার, বাজারে প্রবেশে সহযোগিতার মাধ্যমে উত্পাদনশীল কাজকে উত্সাহিত করা যেতে পারে। নারীরা নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবার জন্য অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা প্রয়োজন। তাই নারী যদি তার সৃজনশীল মনকে পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে, তাহলে উপকৃত হবে নারী, পরিবার, সমাজ তথা দেশ।
সেলিমা আহমেদ
প্রেসিডেন্ট
বাংলাদেশ ওম্যান চেম্বার অব কমার্স
সফল হলে নয়, প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাতে হবে
নারী হলো পৃথিবীর জন্য একটি বিরাট শক্তি। কিন্তু এ শক্তির সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। আমরা যদি এ শক্তিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারতাম, তাহলে আমাদের পৃথিবীর অনেক সমস্যাই দূর হয়ে যেত। নারী হলো মানসিক শক্তির আধার। একজন মা। একজন পূর্ণমানবকে ধারণ করে নারী নিয়ে আসেন পৃথিবীতে এবং তিল তিল করে তার শিশুর বিকাশকে ধৈর্য ও দৃঢ়তা দিয়ে সংগঠিত করে। তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত নারী বিভিন্ন প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে সাহসিকতার সঙ্গে। তবে এ ক্ষেত্রে পরিবারের সহায়ক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পরিবারের সহযোগিতার অভাবে অনেক প্রতিভাই অঙ্কুরে ঝরে যায়। কোনো ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ নিয়ে কোনো মেয়ে যদি সফল হয়, সমাজ বা পরিবার তাতে হাতে তালি দেয়। কিন্তু প্রথম পর্যায়ে তারা তাকে সে ব্যাপারে নিরুত্সাহিত করে। সমাজের বিশেষ করে পরিবারের এই মানসিকতার পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত ইতিবাচক প্রচেষ্টাই হলো সুষ্ঠু সমাজ। তাই নারীর কাজের মূল্যায়ন আসতে হবে প্রথমে নিজের ভেতর থেকে, পরিবার থেকে এবং সর্বোপরি সমাজ থেকে।
কানিজ আলমাস খান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
পারসোনা
মানসিক সমর্থন নারীকে অনেক দূর এগিয়ে দেয়
নারী প্রথমেই একজন মানুষ। একটি ছেলে যা করতে পারছে, একটি মেয়েও তাই করতে পারে। একটি ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে। একটি মেয়েও তাই হতে পারছে। তাহলে নারী বা পুরুষকে আলাদাভাবে কেন উপস্থাপন করা হবে? আমাদের দেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশে নারী-পুরুষ সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। নারী তার বাধার পথ অতিক্রম করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। তাই আমি নারীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমাদের দেশে শিক্ষাবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মেয়েদের পেশা সচেতনতা। ফলে মেয়েরা যেমন বিভিন্ন পেশায় জড়িত হচ্ছে, তেমনি নানা ধরনের ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে তারা আগ্রহী হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। এসব ক্ষেত্রে আমাদের পরিবারের উচিত ছেলে বা মেয়ে হিসেবে বিবেচনা করে নয়, তাকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে সমান সুযোগ-সুবিধা দেয়া। পরিবার যদি মানুষ হিসেবে ছেলে বা মেয়েকে শক্ত মানসিক শক্তি জোগায়, উত্সাহ দেয়, তাহলে যে কেউই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তার প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে সমর্থ হবে। তাই সবচেয়ে আগে চাই, নিজের প্রতিভার বিকাশ উন্মোচনের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও চেষ্টা। আর পাশাপাশি প্রয়োজন পারিবারিক সহযোগিতা।
কণা রেজা
সিইও
পান সুপারি
সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে
একজন নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার মতো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী এখনও আমাদের সমাজে আসেনি। শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে ঠিকই; কিন্তু সমাজ এখনও মেয়েদের ঘরের মধ্যে রাখতে মত দেয়। মেয়েদের পেশা এখনও নির্ধারণ করে দেয় সমাজ। হয় শিক্ষক, নয়তো ডাক্তার। আবার কর্মক্ষেত্রে অথবা সংসারে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকে যাচ্ছে অরক্ষিত। একটি মেয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী হয়েও একপর্যায়ে এসে বিয়ে করে সংসারের চৌকাঠের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষিত দম্পতির ক্ষেত্রেও দেখা যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর মতামত মানা হয় না। নারীকে এ বিষয়ে আগে সচেতন হতে হবে। সন্তান লালন-পালন ইত্যাদি অজুহাত দিয়ে মেয়েদের পিছিয়ে রাখার প্রবণতা আমাদের সমাজে নতুন নয়। মা-বাবার উভয়ের ভালোবাসা ও যত্নে শিশুর বিকাশ পরিপূর্ণ হয়। আমার সন্তানকে সারা দিন সময় দিলেই তার বিকাশ সুন্দর হবে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। আমার সন্তান ও সংসারে সময় এবং পেশায় সাফল্য আনার জন্য সময় নির্ধারণ করতে হবে আমাকেই। তবে সংসারে নারী বা পুরুষ নয়, উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ফারহানা এ রহমান
সিইও
চেয়ারপারসন
ইউওয়াই সিস্টেম লিমিটেড
সময় এসেছে আত্মসচেতনতার
নারী হিসেবে জন্মে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি। তবে নারী মানে মেয়েমানুষ নয়। মানুষ। তাই আমি মনে করি না, নারীর জন্য আলাদা কোনো দিবস পালনের প্রয়োজনীয়তা আছে। তাহলে তো ভেবে নেয়া যায়, নারীর জন্য মাত্র এক দিন, ৮ মার্চ। পুরুষের জন্য বাকি ৩৬৪ দিন। আমরা নারী-পুরুষের সমান অধিকার দাবি করি। অথচ বিশেষ একটি দিনকে নারী দিবস হিসেবে পালন করি। ‘তুমি সুন্দর, তুমি অবলা’ এসব বলে নারীকে পিছিয়ে রাখার প্রবণতা আমাদের সমাজে নতুন নয়। এ ধরনের কথা বলে মূলত নারীর অস্থিমজ্জা ও মননশীলতায় গেঁথে দেয়া হয়েছে— নারী মানেই দুর্বল। সমাজ কখনোই ভাবে না নারী মানে শক্তি। নারীই পূর্ণাঙ্গ একজন মানুষকে নিজের ভেতর ধারণ করে নিয়ে আসে পৃথিবীতে। আর সৃষ্টিকর্তা এ ক্ষমতা শুধু নারীকেই দিয়েছেন। নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অধিকার—এসব কাগজে-কলমে অনেক হয়েছে। এখন সময় এসেছে আত্মসচেতনতার। নারী প্রথমে একজন মানুষ। আর তারপর তিনি একজন মা, যে পৃথিবীর প্রাণশক্তির ধারক এবং বাহক। নারীকে এমন সময় পার করে আসতে হয়েছে যখন তাকে ‘অন্দরের’ বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হতো না। তাকে বাধা পেতে হয়েছে জ্ঞান আহরণেও। বেগম রোকেয়া সেই পথ উন্মুক্ত করে দিয়ে গেছেন। নারী এখন তার শিক্ষা, যোগ্যতা, বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তার অবস্থান বের করে নিয়েছে। তাই নারী স্বাধীনতা, নারী দিবস, নারী অধিকার—এসব নিয়ে কথা না বাড়িয়ে শিক্ষা, জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে চিন্তার গভীরতা বাড়িয়ে মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে নারীর।
রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা
কণ্ঠশিল্পী ও লেখক
নারী মানসিক শক্তির আধার
'এরাব সব ধ মড়ড়ফ সড়ঃযবত্. ও'ষষ মরাব ুড়ঁ ধ মড়ড়ফ হধঃরড়হ'. চিরন্তন বাণীই বলে দেয়—শিক্ষিত, চিন্তাশীল একজন মা একটি সুন্দর জাতি উপহার দিতে পারে। আর তাই নারীকে মেয়ে মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে সবচেয়ে আগে। নারীশিক্ষার হার বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে তার বিশ্লেষণী ক্ষমতা। তাই নারী অন্যান্য পুরুষের মতোই চিন্তাশীল কাজে অংশ নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা রাখে। আজকের মেয়েরা অনেক বেশি মেধাসম্পন্ন প্রগতিশীল বিরূপ পরিবেশে খাপ-খাওয়ার মানসিকতাসম্পন্ন এবং সর্বোপরি দায়িত্বশীল। নারী সে কর্মজীবী হোক অথবা গৃহিণী, সর্বক্ষেত্রেই তাকে দিতে হয় সমান শ্রম। সাধারণত গৃহিণীর কাজের পরিমাপ অর্থ দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না বলে আমাদের সমাজ তার কাজকে কাজ হিসেবে বিবেচনা করে না। যে নারী সূর্য জেগে ওঠার আগে রান্নাঘরে ঢোকে সন্তানের ও পরিবারের অন্যদের খাদ্যের সংস্থান করতে, যে নারী সংসারের প্রতিটি খুঁটিনাটি প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের আগে মূল্য দেয়, আমাদের পুরুষশাসিত সমাজের অধিকাংশ পুরুষ শুধু তারা (নারীরা) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয় বলে তাদের এই পরিশ্রমের কোনো মূল্য তো দেয়ই না, সম্মানটুকুও দেখায় না। আমার মতে, নারী হলো মানসিক শক্তির আধার। শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সর্বক্ষেত্রে নারীর সচেতনতার বিচরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সে তার সুচিন্তিত সৃজনশীল কাজ দিয়ে এগিয়ে আসছে অথবা আসার চেষ্টা করছে। তবে অধিকাংশ সময়ই এসব ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে পরিবার অথবা সমাজ। আমাদের মনে রাখতে হবে, নারী এবং পুরুষ উভয়েই সমাজের সমান দুই অংশ। একজনকে পেছনে ফেলে অন্যজনের সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
চয়নিকা চৌধুরী
নাট্য নির্মাতা
জীবনের দায়বদ্ধতা নারী-পুরুষ উভয়েরই
প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নিতে প্রতিভাসম্পন্ন নারী আজ তার মেধায়-মননে, চিন্তাশীলতায় এবং শ্রমে কাজ করছে পুরুষের পাশাপাশি। এ ক্ষেত্রে আমি উদাহরণ হিসেবে সামনে আনতে চাই শ্রমজীবী নারীর চিত্র। গ্রামে-গঞ্জে বা শহরে যেসব শ্রমজীবী নারী তাদের শ
নারীর পথচলার দীর্ঘ ইতিহাস
উনবিংশ শতক থেকে শুরু হওয়া নারীর নিজস্ব চিন্তাভাবনার ফসল আজকের আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দীর্ঘদিনের অবদমিত অবস্থার টানাপড়েন কাটিয়ে ওঠে সেদিন নারী চেয়েছিল মুক্তি, তার জীবনের অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার, মতামত প্রকাশের অধিকার। আজকের নারী দিবস একদিনের অর্জন নয়। ক্ষুদ্র পরিসর থেকে ছড়িয়ে পড়া এই বৈশ্বিক স্বীকৃতির পেছনে রয়েছে ধারাবাহিক ইতিহাস। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এ বছর পালিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘোষণার শততম বর্ষ। পেছন ফিরে দেখে আসা যাক নারীর সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস।
১৯০৮
নারীদের মধ্যে অস্থিরতা এবং সমালোচনা ও তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ সময়টা। নারী নির্যাতন, অসমতার চাপ সইতে সইতে এ সময়ই পরিবর্তনের পথে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে মতামত এবং সেই সূত্রে কার্যকর প্রচারণা। এ বছরই ১৫ হাজার নারী নিউইয়র্ক শহরের অভিমুখে কাজের সময় ঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি এবং ভোটাধিকারের দাবিতে অংশ নেয় পদযাত্রায়।
১৯০৯
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে সমাজতান্ত্রিক দল এক ডিক্লারেশনের মাধ্যমে পালন করে প্রথম জাতীয় নারী দিবস। ১৯১৩ সাল পর্যন্ত সে দেশের নারীরা ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ রোববার জাতীয় নারী দিবস পালন করতে থাকে।
১৯১০
কোপেনহেগেনে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে নারী অধিকার আন্দোলনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ও বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার অর্জনের প্রচেষ্টার সহযোগিতার তাগিদে একটি বিশেষ দিনকে আন্তর্জাতিকভাবে নারী দিবস পালনের সিদ্ধান্ত হয়। জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির উইম্যান অফিসের প্রধান লারা জেটকিন ৮ মার্চকে বিশ্বের সব নারীর অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে পালনের প্রস্তাব দেন। ১৭টি দেশের একশ’র বেশি নারী জেটকিনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানান, যার ফলে আজকের আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
১৯১১
কোপেনহেগেন সম্মেলনের ঘোষণা অনুযায়ী অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, জাপান এবং সুইজারল্যান্ড প্রথমবারের মতো ১৯ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করে। ১০ লাখের বেশি নারী-পুরুষ ওইদিনের র্যালিতে অংশ নিয়ে নারীদের কাজ ও প্রশিক্ষণ, ভোট, সরকারি চাকরির অধিকার ও বৈষম্য নিরসনের পক্ষে দাবি তোলে। এর পরপরই ২৫ মার্চ নিউইয়র্কে ঘটে সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা, যেখানে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায় ১৪০ জন কর্মী নারী, যাদের অধিকাংশই ছিল ইটালিয়ান ও ইহুদি। এ ঘটনার পর কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ ও শ্রমিক আইন বিষয়ে টনক নড়ে সবার। এবছরই শুরু হয় ব্রেড অ্যান্ড রোজেস প্রচারণা।
১৯১৩-১৯১৪
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে রাশিয়ার নারীরা ১৯১৩ সালের ফেব্রুয়ারি শেষ রবিবার প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করে। ১৯১৪ সালে ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে নারীরা যুদ্ধবিরোধী র্যালিতে অংশ এবং নারী মুক্তির দাবিতে তাদের মত প্রকাশ করে।
১৯১৭
ফেব্রুয়ারির শেষ রবিবার রাশিয়ার নারীরা যুদ্ধে তাদের ২০ লাখ সৈনিকের নিহতের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ‘রুটি এবং শান্তি’—এই দাবিতে ধর্মঘট শুরু করে। রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতা সত্ত্বেও নারীরা এ আন্দোলন অব্যাহত রাখে এবং পরে জার তা মেনে নিতে বাধ্য হয় এবং প্রাদেশিক সরকার নারীর ভোটাধিকার দিতে সম্মত হয়। গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনটি ছিল ৮ মার্চ।
১৯১৮-১৯৯৯
সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে জন্ম হলেও এ দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত ও চিহ্নিত হয় নারীর অধিকার অর্জনের একটি বিশেষ দিন হিসেবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উন্নত ও অনুন্নত সব দেশের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে দিনটি অর্জন করে নিজস্ব শক্তি। জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় নারীর অধিকার এবং অংশগ্রহণ সমুন্নত ও সহযোগিতাপূর্ণ করতে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করে আসছে। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী বছর। বিশ্বের সব দেশ ৮ মার্চ বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে নারীর অগ্রযাত্রাকে সম্মান জানাতে এগিয়ে আসে এবং নারীর সমতা প্রতিষ্ঠা ও জীবনের সব ক্ষেত্রে তা রক্ষার প্রয়োজনে পদক্ষেপ গ্রহণে অঙ্গীকার করে।
২০০০-২০০৭
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, আজারবাইজান, বেলারুশ, বুলগেরিয়া, কাজাখস্তান, কিরজিগস্তান, মেসিডোনিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, তাজিকিস্তান, ইউক্রেন, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনামে ৮ মার্চ সরকারি ছুটির দিন। এদিনের ঐতিহ্য হিসেবে এসব দেশে নারীকে সম্মান প্রদর্শন করে পুরুষরা তাদের মা, স্ত্রী, বান্ধবী, সহকর্মীকে ফুল বা উপহার দিয়ে থাকে। অনেক দেশে মা দিবসের মতো ছেলেমেয়েরা ওইদিন মা অথবা নানি-দাদিকে উপহার দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়।
একবিংশ শতাব্দী মানুষের চিন্তাভাবনায় বিপ্লব ঘটিয়েছে এটা সত্যি। দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফসল হিসেবে নারী অর্জন করেছে কিছু রাষ্ট্রপদ ও অধিকার, ছুটে গেছে মহাকাশে, নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পেয়েছে সরকার পরিচালনার, বেড়েছে নারী শিক্ষার হার, অর্জন করে জীবন-যাপন বেছে নেয়ার অধিকার। তারপরও দুঃখজনক তথ্য হচ্ছে, এখনো পুরুষকর্মী তুলনায় তার মজুরি কম, ব্যবসা অথবা রাজনীতিতে এখনো সমতার সুযোগ নেই নারীদের। শিক্ষা, স্বাস্থ্যের বৈশ্বিক পরিসংখ্যানে তারা এখনো অনেক পিছিয়ে বৈষম্যের পাশাপাশি বেড়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা।
৮ মার্চ কেবল একটি অনুষ্ঠান সর্বস্ব দিন নয়। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও নারীর অর্জনকে উদযাপন করার ইতিবাচক একটি উত্সব ৮ মার্চ। যেদিন বিশ্বের আনাচে-কানাচের সব নারী উপলব্ধি করতে পারে তাদের সবার হাত ধরা আছে একসঙ্গে। যেখানে নারী মানে একটি শক্তি। আর এভাবেই দিনের পর দিন শক্তিশালী অবস্থানে চলে এসেছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সেদিন নারীদের কাছে সমতার জন্য সংগ্রাম, শান্তি ও উন্নয়নেরই এক প্রতীক।
স্বাবলম্বিতার বিকল্প নেই
শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তা-ভাবনা ও ধ্যান-ধারণায় পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক নারী তার প্রতিটি বিষয়ে সচেতন; কিন্তু আমাদের পুরুষশাসিত সমাজে নারীকে মানুষ ভাবা হয় না, সমাজ নারীর উন্নয়নশীল কাজের স্বীকৃতি দেয় না। অধিকাংশ সময় পরিবার ও সমাজের বাধা মেয়েদের এগিয়ে যাওয়ার পথ রুদ্ধ করে। তাই মেয়েরা তাদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড প্রকাশ করতে পারে না। নারী বা পুরুষের প্রথম পরিচয় হলো সে একজন মানুষ। কিন্তু আমাদের সমাজে মেয়ে বলেই করতে দেয়া হয় না অনেক কাজ। সামাজিক এই প্রথার পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের দেশসহ সারা বিশ্বে নারীর অধিকার ও নারীর ক্ষমতায়নের দাবিতে পালিত দিবস সমাজ সচেতনতার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের দেশে মেয়েরা পিছিয়ে আছে। এ ক্ষেত্রে নারী উদ্যোক্তাদের স্বল্পঋণ, প্রশিক্ষণ, ব্যবসায়িক উন্নয়নে সাহায্য, উন্মুক্ত বাজার, বাজারে প্রবেশে সহযোগিতার মাধ্যমে উত্পাদনশীল কাজকে উত্সাহিত করা যেতে পারে। নারীরা নিজেকে মানুষ হিসেবে ভাবার জন্য অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা প্রয়োজন। তাই নারী যদি তার সৃজনশীল মনকে পেশাগত দক্ষতার মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে, তাহলে উপকৃত হবে নারী, পরিবার, সমাজ তথা দেশ।
সেলিমা আহমেদ
প্রেসিডেন্ট
বাংলাদেশ ওম্যান চেম্বার অব কমার্স
সফল হলে নয়, প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাতে হবে
নারী হলো পৃথিবীর জন্য একটি বিরাট শক্তি। কিন্তু এ শক্তির সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। আমরা যদি এ শক্তিকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারতাম, তাহলে আমাদের পৃথিবীর অনেক সমস্যাই দূর হয়ে যেত। নারী হলো মানসিক শক্তির আধার। একজন মা। একজন পূর্ণমানবকে ধারণ করে নারী নিয়ে আসেন পৃথিবীতে এবং তিল তিল করে তার শিশুর বিকাশকে ধৈর্য ও দৃঢ়তা দিয়ে সংগঠিত করে। তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ ধাপ পর্যন্ত নারী বিভিন্ন প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে সাহসিকতার সঙ্গে। তবে এ ক্ষেত্রে পরিবারের সহায়ক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, পরিবারের সহযোগিতার অভাবে অনেক প্রতিভাই অঙ্কুরে ঝরে যায়। কোনো ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ নিয়ে কোনো মেয়ে যদি সফল হয়, সমাজ বা পরিবার তাতে হাতে তালি দেয়। কিন্তু প্রথম পর্যায়ে তারা তাকে সে ব্যাপারে নিরুত্সাহিত করে। সমাজের বিশেষ করে পরিবারের এই মানসিকতার পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। নারী-পুরুষ উভয়ের সম্মিলিত ইতিবাচক প্রচেষ্টাই হলো সুষ্ঠু সমাজ। তাই নারীর কাজের মূল্যায়ন আসতে হবে প্রথমে নিজের ভেতর থেকে, পরিবার থেকে এবং সর্বোপরি সমাজ থেকে।
কানিজ আলমাস খান
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
পারসোনা
মানসিক সমর্থন নারীকে অনেক দূর এগিয়ে দেয়
নারী প্রথমেই একজন মানুষ। একটি ছেলে যা করতে পারছে, একটি মেয়েও তাই করতে পারে। একটি ছেলে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হচ্ছে। একটি মেয়েও তাই হতে পারছে। তাহলে নারী বা পুরুষকে আলাদাভাবে কেন উপস্থাপন করা হবে? আমাদের দেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশে নারী-পুরুষ সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে। নারী তার বাধার পথ অতিক্রম করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। তাই আমি নারীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমাদের দেশে শিক্ষাবিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মেয়েদের পেশা সচেতনতা। ফলে মেয়েরা যেমন বিভিন্ন পেশায় জড়িত হচ্ছে, তেমনি নানা ধরনের ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে তারা আগ্রহী হচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। এসব ক্ষেত্রে আমাদের পরিবারের উচিত ছেলে বা মেয়ে হিসেবে বিবেচনা করে নয়, তাকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে সমান সুযোগ-সুবিধা দেয়া। পরিবার যদি মানুষ হিসেবে ছেলে বা মেয়েকে শক্ত মানসিক শক্তি জোগায়, উত্সাহ দেয়, তাহলে যে কেউই স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তার প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে সমর্থ হবে। তাই সবচেয়ে আগে চাই, নিজের প্রতিভার বিকাশ উন্মোচনের ঐকান্তিক ইচ্ছা ও চেষ্টা। আর পাশাপাশি প্রয়োজন পারিবারিক সহযোগিতা।
কণা রেজা
সিইও
পান সুপারি
সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে
একজন নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার মতো সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী এখনও আমাদের সমাজে আসেনি। শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে ঠিকই; কিন্তু সমাজ এখনও মেয়েদের ঘরের মধ্যে রাখতে মত দেয়। মেয়েদের পেশা এখনও নির্ধারণ করে দেয় সমাজ। হয় শিক্ষক, নয়তো ডাক্তার। আবার কর্মক্ষেত্রে অথবা সংসারে নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকে যাচ্ছে অরক্ষিত। একটি মেয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী হয়েও একপর্যায়ে এসে বিয়ে করে সংসারের চৌকাঠের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষিত দম্পতির ক্ষেত্রেও দেখা যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর মতামত মানা হয় না। নারীকে এ বিষয়ে আগে সচেতন হতে হবে। সন্তান লালন-পালন ইত্যাদি অজুহাত দিয়ে মেয়েদের পিছিয়ে রাখার প্রবণতা আমাদের সমাজে নতুন নয়। মা-বাবার উভয়ের ভালোবাসা ও যত্নে শিশুর বিকাশ পরিপূর্ণ হয়। আমার সন্তানকে সারা দিন সময় দিলেই তার বিকাশ সুন্দর হবে, এমনটা ভাবা ঠিক নয়। আমার সন্তান ও সংসারে সময় এবং পেশায় সাফল্য আনার জন্য সময় নির্ধারণ করতে হবে আমাকেই। তবে সংসারে নারী বা পুরুষ নয়, উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ফারহানা এ রহমান
সিইও
চেয়ারপারসন
ইউওয়াই সিস্টেম লিমিটেড
সময় এসেছে আত্মসচেতনতার
নারী হিসেবে জন্মে আমি নিজেকে গর্বিত মনে করি। তবে নারী মানে মেয়েমানুষ নয়। মানুষ। তাই আমি মনে করি না, নারীর জন্য আলাদা কোনো দিবস পালনের প্রয়োজনীয়তা আছে। তাহলে তো ভেবে নেয়া যায়, নারীর জন্য মাত্র এক দিন, ৮ মার্চ। পুরুষের জন্য বাকি ৩৬৪ দিন। আমরা নারী-পুরুষের সমান অধিকার দাবি করি। অথচ বিশেষ একটি দিনকে নারী দিবস হিসেবে পালন করি। ‘তুমি সুন্দর, তুমি অবলা’ এসব বলে নারীকে পিছিয়ে রাখার প্রবণতা আমাদের সমাজে নতুন নয়। এ ধরনের কথা বলে মূলত নারীর অস্থিমজ্জা ও মননশীলতায় গেঁথে দেয়া হয়েছে— নারী মানেই দুর্বল। সমাজ কখনোই ভাবে না নারী মানে শক্তি। নারীই পূর্ণাঙ্গ একজন মানুষকে নিজের ভেতর ধারণ করে নিয়ে আসে পৃথিবীতে। আর সৃষ্টিকর্তা এ ক্ষমতা শুধু নারীকেই দিয়েছেন। নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর অধিকার—এসব কাগজে-কলমে অনেক হয়েছে। এখন সময় এসেছে আত্মসচেতনতার। নারী প্রথমে একজন মানুষ। আর তারপর তিনি একজন মা, যে পৃথিবীর প্রাণশক্তির ধারক এবং বাহক। নারীকে এমন সময় পার করে আসতে হয়েছে যখন তাকে ‘অন্দরের’ বাইরে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হতো না। তাকে বাধা পেতে হয়েছে জ্ঞান আহরণেও। বেগম রোকেয়া সেই পথ উন্মুক্ত করে দিয়ে গেছেন। নারী এখন তার শিক্ষা, যোগ্যতা, বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে তার অবস্থান বের করে নিয়েছে। তাই নারী স্বাধীনতা, নারী দিবস, নারী অধিকার—এসব নিয়ে কথা না বাড়িয়ে শিক্ষা, জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে চিন্তার গভীরতা বাড়িয়ে মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে নারীর।
রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা
কণ্ঠশিল্পী ও লেখক
নারী মানসিক শক্তির আধার
'এরাব সব ধ মড়ড়ফ সড়ঃযবত্. ও'ষষ মরাব ুড়ঁ ধ মড়ড়ফ হধঃরড়হ'. চিরন্তন বাণীই বলে দেয়—শিক্ষিত, চিন্তাশীল একজন মা একটি সুন্দর জাতি উপহার দিতে পারে। আর তাই নারীকে মেয়ে মানুষ হিসেবে ভাবতে হবে সবচেয়ে আগে। নারীশিক্ষার হার বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে তার বিশ্লেষণী ক্ষমতা। তাই নারী অন্যান্য পুরুষের মতোই চিন্তাশীল কাজে অংশ নিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা রাখে। আজকের মেয়েরা অনেক বেশি মেধাসম্পন্ন প্রগতিশীল বিরূপ পরিবেশে খাপ-খাওয়ার মানসিকতাসম্পন্ন এবং সর্বোপরি দায়িত্বশীল। নারী সে কর্মজীবী হোক অথবা গৃহিণী, সর্বক্ষেত্রেই তাকে দিতে হয় সমান শ্রম। সাধারণত গৃহিণীর কাজের পরিমাপ অর্থ দিয়ে মূল্যায়ন করা যায় না বলে আমাদের সমাজ তার কাজকে কাজ হিসেবে বিবেচনা করে না। যে নারী সূর্য জেগে ওঠার আগে রান্নাঘরে ঢোকে সন্তানের ও পরিবারের অন্যদের খাদ্যের সংস্থান করতে, যে নারী সংসারের প্রতিটি খুঁটিনাটি প্রয়োজনকে নিজের প্রয়োজনের আগে মূল্য দেয়, আমাদের পুরুষশাসিত সমাজের অধিকাংশ পুরুষ শুধু তারা (নারীরা) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয় বলে তাদের এই পরিশ্রমের কোনো মূল্য তো দেয়ই না, সম্মানটুকুও দেখায় না। আমার মতে, নারী হলো মানসিক শক্তির আধার। শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সর্বক্ষেত্রে নারীর সচেতনতার বিচরণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে সে তার সুচিন্তিত সৃজনশীল কাজ দিয়ে এগিয়ে আসছে অথবা আসার চেষ্টা করছে। তবে অধিকাংশ সময়ই এসব ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে পরিবার অথবা সমাজ। আমাদের মনে রাখতে হবে, নারী এবং পুরুষ উভয়েই সমাজের সমান দুই অংশ। একজনকে পেছনে ফেলে অন্যজনের সামনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
চয়নিকা চৌধুরী
নাট্য নির্মাতা
জীবনের দায়বদ্ধতা নারী-পুরুষ উভয়েরই
প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নিতে প্রতিভাসম্পন্ন নারী আজ তার মেধায়-মননে, চিন্তাশীলতায় এবং শ্রমে কাজ করছে পুরুষের পাশাপাশি। এ ক্ষেত্রে আমি উদাহরণ হিসেবে সামনে আনতে চাই শ্রমজীবী নারীর চিত্র। গ্রামে-গঞ্জে বা শহরে যেসব শ্রমজীবী নারী তাদের শ


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


