Amardesh
আজঃ ঢাকা, বুধবার ১০ মার্চ ২০১০, ২৬ ফাল্গুন ১৪১৬, ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ১.৩০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 কার্টুন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

বে ড়া নো : হাছন রাজার দেশে

মোঃ ফখরুল আলম
হাওর-বাঁওড়ের দেশ সুনামগঞ্জ। হাওর প্রকৃতির রাজ্যের এক মন মাতানো রূপ। এ রূপ কোনো পর্যটকের হৃদয়ে স্পন্দন জাগালেও এতে অনগ্রসর হাওরবাসীর ক্ষুধা নিবারণ হয়। এসবের মধ্যে রয়েছে শত বছরের স্মৃতিবিজড়িত হাছন রাজার মিউজিয়াম, তার বাড়ি-ঘর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
বাংলাদেশের একপ্রান্তে হাছন রাজা অন্যপ্রান্তে লালন শাহ্ আমাদের লোকসাহিত্যের সীমানা নির্ধারক হিসেবে পরিচিত। হাছন রাজার সুনামগঞ্জ সারাদেশের জন্য এক আকর্ষণ ও অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে। হাছন রাজা আজ শুধু সুনামগঞ্জের গর্ব নন; সারাদেশের গর্ব হাছন রাজা। প্রতিদিন দেশ-বিদেশ থেকে ছুটে আসা শত শত ভক্ত, কবি, সাহিত্যিকসহ সুশীল সমাজ এবং সর্বোপরি দর্শনার্থী পর্যটকরা সুনামগঞ্জে এসে ভিড় জমাচ্ছেন। তাদের বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে আসেন হাছন রাজাকে ঘিরে অতীতের স্মৃতিবিজড়িত চিহ্নগুলোকে অবলম্বন করে তাকে জানতে।
এরই মধ্যে হাছন রাজা স্মরণে দৃষ্টিনন্দিত ও শৈল্পিক একটি জাদুঘর সিলেট শহরের জিন্দাবাজার এলাকায় ‘মিউজিয়াম অব রাজা’স’ নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাছন রাজার কর্মজীবনের স্মৃতিবিজড়িত জিনিসপত্র ও পরিবারের সম্পদের বিশদ জানার জন্যই গড়ে উঠেছে এ মিউজিয়ামটি। এ মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে হাছন রাজার ব্যবহৃত চেয়ার, তার স্ত্রীর ব্যবহার্য সোনার তৈরি জরি ও রুপার জরির পোশাক। তার ব্যবহৃত হিসাবের খাতা, ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত খান বাহাদুর মেডেল, দেওয়ান তাছাওর রাজা কর্তৃক সংগৃহীত হাছন রাজার গানের পাণ্ডুলিপি। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে ভারতের বিভিন্ন মন্ত্রীকে দেয়া একলিমুর রাজা চৌধুরীর ছেলে দেওয়ান তালেবুর রাজার লেখা চিঠি এবং তার ব্যবহৃত ঘড়ি, কলম, আংটি, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং দেওয়ান তাওয়াবুর রাজা চৌধুরীর ব্যবহৃত ছুরিসহ হাছন রাজার বংশতালিকা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে। ২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রকাশিত হাছন রাজার প্রতিকৃতি সংবলিত ডাকটিকেট। বাউল শিল্পীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র যেমন—একতারা, হাতবায়া, করতাল, ঢোল, বাঁশি ইত্যাদি। ২০০১ সালে সারাদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বাংলা ছায়াছবি ‘হাছন রাজা’য় ব্যবহৃত তার দুটি পোশাক ও পাগড়ি জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে।
জাদুঘরের সামনের বারান্দায় ছোট্ট স্যুভেনির শপ রয়েছে। স্যুভেনিরে আছে জাদুঘরের লোগো (প্রতীক)-এর ছাপ দেওয়া টি-শার্ট, গেঞ্জি, টুপি, সিরামিকের মগ, মিউজিয়াম অব রাজা’স এর তথ্য সংবলিত বই, গানের ক্যাসেট, গানের বই, সিডি। আছে বাংলা ছায়াছবি ‘হাছন রাজা’র সিডি। সিলেটের প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজার এলাকার ‘রাজানীড়’ বাড়িটিতে গড়ে উঠেছে এ মিউজিয়াম। এর পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে হাছন রাজা পরিবারের শিক্ষানুরাগী দেওয়ান তালেবুর রাজা ট্রাস্ট।
সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে বছরে সব সময়ই পানি থাকে। দিগন্ত বিস্তৃত রাশি রাশি পানি। মাঝে মাঝে সেসব গ্রাম দেখা যায়। দূর থেকে মনে হয় পানির মধ্যে ভেসে আছে গ্রামগুলো। স্বচ্ছ রুপালি পানির ওপর ভর করে চলছে ছোট ছোট নৌকা। বর্ষাকালে হেঁটে এ গ্রাম থেকে সে গ্রামে যাওয়ার জো নেই। নৌকাই তখন এখানকার একমাত্র মাধ্যম। জ্যোত্স্না রাতে রাতভর নৌকায় স্থানীয় লোকজনকে মাছ ধরতে দেখা যায়। তাদের কণ্ঠে হাছন রাজার গান ‘নেশা লাগিলো রে, বাঁকা দু’নয়নে নেশা’, ‘কান্দে হাছন রাজার মন ময়না’ ইত্যাদি।
হাছন রাজার পুরো নাম দেওয়ান হাছন রাজা চৌধুরী। সুনামগঞ্জের লক্ষ্মণশ্রী হাছন রাজার জন্মভূমি। শৈশবের রঙিন স্মৃতিবিজড়িত দিনগুলো আনন্দের সঙ্গে এখানে কাটিয়েছেন। তার বাবার নাম দেওয়ান আলী রাজা চৌধুরী, মা মোছা. হরমত জাহান বেগম। মায়ের বাড়ি নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী। বাবার বাড়ি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার রামপাশা গ্রামে। দেওয়ান হাছন রাজা ছিলেন এক সময়কার জমিদার। তার জমিদারীর এলাকা ছিল সিলেট ও সুনামগঞ্জের উল্লেখযোগ্য এলাকা। ১৮৭১ সালে ১৭ বছর বয়সে তিনি জমিদারী দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ভ্রমণপিপাসুদের একজন ছিলেন হাছন রাজা। ভ্রমণ, গান রচনা, ঘোড়দৌড়, নৌকা দৌড়, কোড়াপাখি ও হাতি পালন ছিল তার শখের অংশবিশেষ। হাছন রাজার পাঁচ স্ত্রী আজিজা বানু, আলহাজ সাজিদা বানু, জোবেদা খাতুন, বোরজান বিবি ও লবজান বিবি। তার চার ছেলে ও চার মেয়ে ছিল। ছেলেরা হলো খান বাহাদুর দেওয়ান গনিউর রাজা চৌধুরী, দেওয়ান হাসিনুর রাজা চৌধুরী, খান বাহাদুর দেওয়ান ও একলিমুর রাজা চৌধুরী। তিনি ছিলেন কাব্যবিশারদ। চার মেয়েদের মধ্যে রওশন হুসেইন বানু, রওশন হাছান বানু, আলী হুসেইন বানু ও রওশন আক্তার বানু। হাছন রাজার জন্ম ২১ ডিসেম্বর ১৮৫৪ সালে (৭ পৌষ ১২৬১ বাংলা) এবং তার মৃত্যু তারিখ ৬ ডিসেম্বর ১৯২২ (২২ অগ্রহায়ণ ১৩২৯ বাংলা)। হাছন রাজার জন্ম দিন উপলক্ষে প্রতি বছর ৭ পৌষ সুনামগঞ্জে তার ভক্ত শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে এক মিলনমেলা বসে।
পর্যটক আকর্ষণ বৃদ্ধিকল্পে সুনামগঞ্জে হাছন রাজার স্মৃতি স্বাক্ষরবহ একটি শহর হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এটিকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জর অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সামাজিক উন্নয়নের দাবি রাখে। হাছন রাজার ভক্তরা জানান, সুনামগঞ্জের প্রবেশদ্বারে ‘হাছন তোরণ’কে আরও আকর্ষণীয় করা, হাছন উদ্যান বা পার্ক স্থাপন করা, সুরমা নদীতে ভাসমান জেটি/পিয়ার নির্মাণ করা। এছাড়াও সরকারি উদ্যোগে সুনামগঞ্জে হাছন একাডেমি স্থাপনে আরও বৃহত্তর ও বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণে সবার সহযোগিতা এবং প্রচারণা চালানো দরকার। হাছন রাজার বাড়ির প্রাঙ্গণে একটি বড় মিউজিয়াম স্থাপনও দাবি রাখে। তার বাড়িতে আউল-বাউল ও সাধকদের প্রেরণা জোগাশে একটি লোকগীতি প্রাঙ্গণ গড়ে তোলা হয়।


 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?