শচীন যেখানে প্রথম
মোয়াজ্জেম হোসেন রাসেল
ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্বিশতক রানের ইনিংস দেখাটা যেন অনেক দিনেরই অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা কবে শেষ হবে, এই ক’দিন আগেও কেউ বলতে পারত না। কিন্তু শচীন যেন সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দিলেন। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সফরকারী দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে একদিবসীয় ক্রিকেটে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে পাক্কা ২০০ রানের ইনিংস খেলে বুড়িয়ে গেলেও ক্রিকেটটা যে এখনও একজন তরুণের মতোই উপভোগ করছেন সেটা জানিয়ে দিলেন। তাই কিছুদিন আগেও মনে হতো এই বুঝি ওয়ানডে ক্রিকেটে দ্বিশতক করে ফেলবেন ব্যাটসম্যানরা। আর এ কথাটি আবারও নতুন করে প্রমাণের প্রাণপণ চেষ্টা করলেন তিনি, কিন্তু সর্বোচ্চ রানের ইনিংস খেলার পর আর এগুতে পারলেন না। তিনি চার্লস কভেন্ট্রি, বিশ্ব ক্রিকেটে খর্ব শক্তির দল জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যান। সদ্য শেষ হওয়া বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে ওয়ানডে সিরিজের চতুর্থ ম্যাচটির কথা অন্য সবাই ভুলে গেলেও চার্লস কভেন্ট্রি কখনোই ভুলে যেতে চাইবেন না। তিন বছর পর ওয়ানডে দলে ফেরার পর তার কাছ থেকে কেউ এতটা মহাকাব্যিক ইনিংস প্রত্যাশা করেনি। স্বাগতিক জিম্বাবুয়ে যে অনেকটা পণ করেই নেমেছিল মাঠে সেটার প্রমাণ টানা দ্বিতীয়বারের মতো তিন শতাধিক রানের দলীয় সংগ্রহ। নিজের ক্যারিয়ারের পঞ্চদশ ওয়ানডে ম্যাচ খেলতে নেমেই ওয়ানডে ক্রিকেটে সবচেয়ে দ্বিতীয় বড় ইনিংসটি খেললেন এই ব্যাটসম্যান। তার অপরাজিত ১৯৪ রানের কল্যাণে ৩১২ রানের লড়াই করার মতো পুঁজি পায় তারা। যদিও ম্যাচটা জেতা সম্ভব হয়নি বাংলাদেশী তামিম ইকবালের ১৫৪ রানের ইনিংসের কারণে। যারা সেদিন টিভি সেটের সামনে বসে খেলা দেখেছেন তাদের বেশিরভাগ অংশ বিশেষত যারা পাকিস্তানকে সমর্থন দেন তাদের বুকের হৃত্কম্পনটা কিছুটা হলেও বেড়ে গিয়েছিল। কারণ এক যুগের বেশি সময় আগে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের সাঈদ আনোয়ার ১৯৪ রান করে আউট হয়ে গিয়েছিলেন। এবার কভেন্ট্রি আউট না হয়ে পাক্কা ১৯৪ রান করে অপরাজিত থাকলেন। আর প্রতিপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশের নামটি লেখা রইল ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ইনিংস খেলা প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। তবে ম্যাচটা জিততে না পারায় তার কষ্টের যেন কোনো শেষ নেই। বিশ্ব ক্রিকেটে এর আগেও বেশ কবার ব্যাটসম্যানদের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ সংগ্রহ দুশ’র কোটা ছুবে ছুবে বলে ছুঁতে পারেনি। যেমনভাবে আজ থেকে ১৩ বছর আগে পারেননি সাঈদ আনোয়ার। তার জন্য ছবিটা আঁকা হয়েই গিয়েছিল। একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির ছবি কোনটা হবে তা নিয়ে যেমন ছিল সংশয়, তেমনি ছিল দ্বিধাদ্বন্দ্বের ব্যাপার। ১৯৪-এ দাঁড়িয়ে, মাদ্রাজে ছক্কা মেরে কাজটি পুরো করতে চেয়েছিলেন সাঈদ আনোয়ার। বাউন্ডারি লাইনের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ফিল্ডিং দক্ষতার জন্য খ্যাত নন, এমন একজন উড়ন্ত বলটি লুফে নিয়েই ঘটিয়ে দিলেন যত বিপত্তি। সেই যে আটকে গেল ৫০ ওভার ক্রিকেটে ডাবল সেঞ্চুরির সম্ভাবনা, আর তার মুক্তি ঘটেনি ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। সাঈদ আনোয়ার ডাবল সেঞ্চুরি করতে না পারলেও সীমিত ওভারের ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্কোরের ঘরে নতুন একটি অংক অবশ্যই বসিয়েছিলেন, ভিভিয়ান রিচার্ডসের ১৯০-কে একঘর নামিয়ে দিয়ে। তিনি এখন টেস্ট ম্যাচ শুধু নয়, ওডিআই ম্যাচ শুধু নয়, ক্রিকেটের সব ম্যাচ থেকেই বিদায় নিয়েছেন এবং অপার্থিব উত্কর্ষের জন্য ভীষণ রকম মন ঢেলে বসে আছেন। তবে কি সাঈদ আনোয়ার রয়েছেন, নাহ্ তিনিও ক্রিকেট মাঠ থেকে এখন অনেক বেশি দূরে অবস্থান করছেন। যার ক্যাচ সাঈদ আনোয়ারের রেকর্ডের বাড় ২০০ পর্যন্ত বাড়তে দেয়নি, তিনিও খেলেছেন ১৮৩ রানের একটি চমত্কার ইনিংস এবং ২২টি ওডিআই সেঞ্চুরির মালিকানা। একদা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। শচীনের ঠিক পরের জায়গাটিই ছিল তার। ভারতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৮৩ রান, যা শচীনের ১৮৬ ও ২০০’র পর। নিয়ে তিনিও এখন অবসর যাপন করছেন— তিনি সৌরভ চণ্ডিদাস গাঙ্গুলী। সাঈদ আনোয়ারের রেকর্ডটিকে নিঃশ্বাসের ভাপে-তাপে ভাজা ভাজা যারা করেছেন, তারা সবাই আরেকটি কাজও করেছেন। ওডিআই ক্রিকেটে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির বাতিঘর নিজে দেখা ও অন্যকে দেখানো। কাজটি জয়সুরিয়া করেছেন, হেডেন করেছেন, টেন্ডুলকার করেছেন, করেছেন ভারতের দুগ্ধপুষ্ট দিল্লিবালক বীরেন্দর শেবাগ আর সবার শেষে করেছেন জিম্বাবুয়ের অখ্যাত এক ক্রিকেটার চার্লস কভেন্ট্রি। বিষয়টি নিয়ে অন্যদের যেমন-তেমন, শেবাগের ব্যাপারে প্রশ্ন আসবে এবং তার ব্যাপারে বিস্ময়ের তোড়ে জোরে অনেকেই চোখ উল্টাবে। উল্টে বলবে তিনি কখন আবার এতবড় কাজের কাছাকাছি গেলেন! আমরা তখন কোথায় ছিলাম! আমরা আমাদের জায়গায় থেকে দেখেছি, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ভারতের খেলা সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজের ম্যাচে বৃষ্টির হানায় দু’বার ছেদপড়া ইনিংসে এই লোকটি ৭৪ বল খেলে ১২৫ রানে অপরাজিত ছিলেন। অনেক কম ওভারে সেঞ্চুরি ছুঁয়েছেন। সোয়াশ’ রানের ভেতর চার মেরেছেন চৌদ্দটি, ছক্কা ছয়টি। মাত্র ২৩.৩ ওভারে তোলা ২০১ রানের ভেতর অংশই ১২৫ রানের, ৫০ ওভার খেলা হলে অথবা প্রথমবার ছেদপড়ার সময় সেদিনের জন্য নির্ধারিত ৪৭ ওভারও যদি খেলা হতো, শেবাগ কোথায় গিয়ে দাঁড়াতেন এবং কাকে কেমন করে ছাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন তা আমাদের অংক কষে বোঝাতে হবে কেন! ১১ মার্চ শেবাগকে দিয়ে হয়তো নিজেদের মনের জ্বালাটা কিছুটা হলেও মেটাতে পারত ভারত। কারণ তাদের বিপক্ষেই ১৯৯৭ সালে তাদের মাটিতেই ১৯৪ রানের ইনিংস খেলেছিল পাকিস্তানের ব্যাটসম্যান সাঈদ আনোয়ার।
করেই দেখি না অপেক্ষা না হয়। তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিটির মালিক এখন শচীন টেন্ডুলকার নামক রেকর্ড বয়। বুড়িয়ে গেছেন কিংবা ফুরিয়ে গেছেন এসব কথার উত্তর যে কত দ্রুত দিতে পারেন তিনি সেটা আবারও দেখা গেল। পুরো ৫০ ওভার খেলে পাক্কা ২০০ রান করে নিজেকে নিয়ে গেলেন অনন্য এক উচ্চতায়।
করেই দেখি না অপেক্ষা না হয়। তবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিটির মালিক এখন শচীন টেন্ডুলকার নামক রেকর্ড বয়। বুড়িয়ে গেছেন কিংবা ফুরিয়ে গেছেন এসব কথার উত্তর যে কত দ্রুত দিতে পারেন তিনি সেটা আবারও দেখা গেল। পুরো ৫০ ওভার খেলে পাক্কা ২০০ রান করে নিজেকে নিয়ে গেলেন অনন্য এক উচ্চতায়।


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


