একুশের বইমেলা : প্রাসঙ্গিক অভিব্যক্তি
হাশিম মিলন
অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ এখন বাংলাদেশের লেখক, পাঠক এবং প্রকাশকদের কাছে অতি সুপরিচিত একটি মেলা সন্দেহ নেই। ১৯৭৯ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বাংলা একাডেমী এ মেলা আয়োজন করে আসছে। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে যত কর্মযজ্ঞ, তার মধ্যে মাসব্যাপী এ বইমেলা স্বীয় বৈশিষ্ট্যে দীপ্ত। বইমেলাকে কেন্দ্র করে তাই লেখক-প্রকাশক-পাঠকদের আগ্রহের অন্ত নেই। বছরব্যাপী নানান আয়োজন বিশেষ করে নতুন নতুন বই প্রকাশের জন্যে যেমন প্রকাশকদের ব্যস্ততা বাড়তে থাকে, তেমনি নতুন বইয়ের গন্ধ নেয়ার জন্যে থাকে লেখক-পাঠকের ব্যাকুলতা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে গেল অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১০। বাংলা একাডেমীর ইতিহাসে সংযোজিত হলো আরও একটি সফল বইমেলা উপহার দেবার কৃতিত্ব।
বইমেলার সঙ্গে লেখক হিসেবে আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সূত্রপাত বেশ আগেই। ১৯৯৪ সালে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে মেলার সঙ্গে মিতালির শুরু। তারপর থেকে অব্যাহতভাবে এ মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ মিলেছে লেখক হিসেবে। এবারই প্রথম প্রকাশক হিসেবে মেলায় অংশ নিয়েছি। বাংলা একাডেমীর হিসাব মতে, মেলায় এবার ৫২২ ইউনিটের স্টল ছিল। আর প্রতিষ্ঠান ছিল ৩৭০টি। যদিও এর মধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ছিল যারা ঠিক বই প্রকাশের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। যেমন—কাগজের স্টল, কোনো কোনো এনজিও, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ইত্যাদি। সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসে একজন নতুন প্রকাশক হিসেবে অমর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল এবার। আর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অর্জিত যে সামান্য অভিজ্ঞতা, তা প্রকাশের দায় থেকেই এ লেখার অবতারণা।
মেলার পরিবেশ গত যে কোনো বইমেলার চেয়ে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি ছিল সন্দেহ নেই। মেলার পরিবেশকে ঠিকঠাক রাখার জন্যে বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ সারাক্ষণ যে নজরদারি করেছেন, তা প্রশংসনীয়। যদিও এবারে স্থান যথেষ্ট সঙ্কুচিত হয়েছে, তথাপি দর্শক-ক্রেতা ও পাঠকদের আনন্দের কোনো ঘাটতি ছিল না। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও প্রায়শই মেলা প্রাঙ্গণে দেখা গেছে বিশেষ একটি বিদেশি চকমকে মোড়কের বই বাজারজাত করার জন্যে বেশকিছু তরুণ বাইরে থেকে এসে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দর্শক-ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে। মেলায় অংশ না নেয়া এবং ‘বাঙালি জাতির ত্যাগ ও অঙ্গীকারের মেলা’ হিসেবে খ্যাত এই বইমেলায় প্রকাশ্যে বিদেশি বইয়ের বিপণন মেলার শৃঙ্খলাহানির শামিল বলে মনে করি।
কোনো কোনো স্টলে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেলেও অধিকাংশ স্টলের বিক্রি আশানুরূপ ছিল না বলেই মনে হয়েছে। এ কথা অনেককেই বলতে শোনা গেছে যে, মেলায় যে পরিমাণ দর্শক আসে তারা যদি প্রত্যেকে একটি করেও বই কিনতো তাহলে বিপুলসংখ্যক বই বিক্রি হতো। যদিও এবছর বইয়ের বিক্রি গত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বই বিক্রি হয়েছে ২০ কোটি টাকার। হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের প্রতি টিনএজ পাঠকদের অন্তহীন আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়েছে। এ আগ্রহ লেখক হুমায়ূন আহমেদকে তো বটেই, সংশ্লিষ্ট প্রকাশকদেরও অনুপ্রাণিত করবে অবশ্যই। নবীন-প্রবীণ অনেক লেখকের বই আসছে ফি বছর। হুমায়ুন আহমেদের একটা বই কিনলে পাঠকের উচিত অন্তত আর একটি অন্য কোনো লেখকের উপন্যাস কিংবা গল্পের কিংবা কবিতার বই কেনা। তাতে দু’ধরনের স্বাদ যেমন পাওয়া যাবে, পাওয়া যাবে সমসাময়িক লেখালেখির মান যাচাইয়ের সুযোগও। বই কেনা ও বই পড়ার অভ্যেস দুটোই তাই খুব জরুরি।
প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও ছিল এবার রেকর্ড পরিমাণ। ৩৩৫৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে এবার। গল্প, উপন্যাসকে ছাড়িয়ে গেছে কবিতার বই। ৮০৭টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে এবারের বইমেলায়। অথচ সে তুলনায় শিশু সাহিত্যের বই-এর সংখ্যা নগণ্য। মাত্র ১২৯টি। অনেক অভিভাবকই প্রিয় শিশুসন্তানকে সঙ্গে করে মেলায় এসেছেন তার উপযোগী একটি ভালো বই কেনার জন্যে। অনেকে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন মেলা প্রাঙ্গণ। মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কেবল শিশু-কিশোরদের বই নিয়ে এবার হাজির হয়েছিল মেলায়। তাদের অভিনন্দন। যারা ইতোমধ্যে সৃজনশীল প্রকাশক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন, তাদের বোধকরি প্রথম লক্ষ্য ছিল বড়দের প্রতি। দায়সারা গোছের কিছু শিশুতোষ বই কমবেশি সব স্টলেই ছিল। তবে হয় তা উচ্চ মূল্যের কারণে পাঠকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, নতুবা ভূত দোষে দুষ্ট। পুরো মেলা ঘুরে যে কোনো দর্শক-পাঠক নিশ্চয়ই একথা স্বীকার করবেন যে, ভূত নিয়ে শিশুদের জন্যে এত মাতামাতি এর আগে হয়েছে বলে মনে হয় না। ভূত বিষয়ে নানান রকম বিশ্লেষণ এবং বইয়ের নামকরণ শিশুদের ভূত-প্রীতি অথবা ভূত-ভীতি কোনটা বাড়িয়েছে সেটা হয়তো অভিভাবকরাই ভালো বলতে পারবেন। ভালো শিশুসাহিত্য রচনা যেমন কঠিন কাজ, তেমনি প্রকাশকদেরও আগামী প্রজন্মকে বইপাঠের আনন্দ দানের মাধ্যমে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়াটাও দায়িত্ব বৈকি। ভূত সম্পর্কে একটা প্রচলিত প্রবচন হচ্ছে ‘ভূত পেছন দিকে হাঁটে’, আমরা কেউই বোধকরি আমাদের সন্তানদের পেছনে হাঁটাতে চাইবো না। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভূত, ডিজিটাল ভূত, সাইবার ভূত, অদ্ভুত ভূত—সবকিছু নিয়েই ব্যাপক গবেষণা হয়েছে এবার। কোনো কোনো খ্যাতিমান লেখককে ভূত নিয়ে আগামী বইমেলায় লেখার আগ্রহ ব্যক্ত করতে শোনা গেছে। শিশুসাহিত্যের বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শিশুমনস্তত্ত্ব বুঝে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে শিশুসাহিত্য সৃষ্টি।
এবারের বইমেলায় সাজসজ্জার পরিকল্পনাটিও নতুন মাত্রা যোগ করেছে বৈকি। নজরুল মঞ্চে মোড়ক উন্মোচনের জন্যে দু’পাশে দু’টি সুদৃশ্য ব্যাকড্রপ স্থাপন এবং একটি স্ট্যান্ড, মেলায় অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানসমূহের অবস্থান ও নক্শা, বিচিত্র বর্ণের ফেস্টুন ইত্যাদি মেলার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। তবে মেলার শেষভাগে হঠাত্ বৃষ্টি ও ঝড়োহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক বইপত্র। তাছাড়া তাত্ক্ষণিকভাবে জমে যাওয়া পানি নিষ্কাশনের ত্বরিত ব্যবস্থা না থাকায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আশঙ্কায় মেলা সেদিনের মত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মেলার সময়সূচিতে মহিলা ও শিশুদের জন্যে একটা স্লট রাখা হয়েছিল। মাত্র একদিন কয়েক ঘণ্টার জন্যে। এরকম স্লট ভবিষ্যতে আরও বাড়ানো যেতে পারে। মেলার শেষভাগে যারা আসেন, তাদের অধিকাংশই বইয়ের প্রকৃত ক্রেতা বা পাঠক। সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মেলার সময়সূচি কিছুটা রদবদল করে বিকেল ৩টার পরিবর্তে সকাল ১০টা থেকে করা যেত। বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্যে মেলার কার্যক্রম বন্ধ রাখা হলে তা যাতে প্রকাশক ও পাঠকদের ক্ষতিগ্রস্ত না করে সেদিকেও বাংলা একাডেমী ভবিষ্যতে যত্নবান হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
সরকার ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত করার লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে কাজ করছে। উদ্দেশ্য সকল পর্যায়ে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা। এবারের বইমেলায় সরকারি-বেসরকারি বেতার ও টেলিভিশনে সরাসরি বইমেলার কার্যক্রম প্রচারিত হয়েছে। ওয়েবসাইটে প্রতিদিনের মেলায় আসা নতুন বইয়ের তালিকা সংযোজিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে ‘বইমেলা প্রতিদিন’ শীর্ষক বর্ণিল পত্রিকা। ইন্টারনেটের মাধ্যমে নতুন আসা বইয়ের খোঁজখবর অনায়াসেই নিতে পেরেছেন দেশের ও দেশের বাইরের পাঠকশ্রেণী। মেলায় আসার আগেই বই নির্বাচন করাটা অনেকের জন্যেই হয়ে গেছে সহজতর। নতুন বইয়ের খোঁজখবর ওয়েবসাইটে আপলোড করার জন্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে দেখা গেছে মেলায়। এটা বইয়ের প্রচার, প্রসার ও বিপণনে সহায়ক হবে বলে মনে করি। বড়পর্দায় মেলার একাধিক স্থানে বইয়ের সচিত্র বিজ্ঞাপন দেয়ার বিষয়টিও লক্ষ্যযোগ্য।
সুদৃশ্য স্টল সজ্জার জন্যে, সর্বোচ্চ সংখ্যক বই ক্রয়ের জন্যে, ভালো বই প্রকাশের জন্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কৃত করেছে সংশ্লিষ্টদের। এ ধরনের উদ্যোগ প্রকাশক ও পাঠক উভয় শ্রেণীকেই ভবিষ্যতে উত্সাহিত করবে সন্দেহ নেই। বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক বা প্রতিনিধি, তথ্য-প্রযুক্তি সেবার জন্যে এবং আরও বিশেষ বিশেষ কাজে উত্সাহ দেয়ার লক্ষ্যে এ ধরনের পুরস্কার প্রদানের বিষয়টি বইমেলার উত্কর্ষ অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
সব ছাপিয়ে লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের কাছে নির্মল আনন্দস্মৃতি এই অমর একুশে গ্রন্থমেলা। দেশের নানা প্রান্ত থেকে এ মেলায় প্রাণের টানে ছুটে আসে বইপ্রেমী লেখক-পাঠক-সংগঠক। গ্রন্থাগার তৈরির জন্যে ভালো বই খুঁজতে আসেন অনেকে। দেশের বাইরে থেকেও অনেক উত্সুক লেখক ও বইপ্রেমীদের আগমন ঘটে মেলায়। বাঙালি জাতির গৌরবময় ইতিহাস ও মননের প্রতীক এই বইমেলা সকলের জন্যে হয়ে উঠুক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার সূতিকাগার—এই প্রত্যাশা সকলের। বই হোক নিত্যসঙ্গী। ম
hashim.milon@gmail.com
বইমেলার সঙ্গে লেখক হিসেবে আমার প্রত্যক্ষ যোগাযোগের সূত্রপাত বেশ আগেই। ১৯৯৪ সালে আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে মেলার সঙ্গে মিতালির শুরু। তারপর থেকে অব্যাহতভাবে এ মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ মিলেছে লেখক হিসেবে। এবারই প্রথম প্রকাশক হিসেবে মেলায় অংশ নিয়েছি। বাংলা একাডেমীর হিসাব মতে, মেলায় এবার ৫২২ ইউনিটের স্টল ছিল। আর প্রতিষ্ঠান ছিল ৩৭০টি। যদিও এর মধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান ছিল যারা ঠিক বই প্রকাশের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। যেমন—কাগজের স্টল, কোনো কোনো এনজিও, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ইত্যাদি। সৃজনশীল সাহিত্য সৃষ্টির প্রয়াসে একজন নতুন প্রকাশক হিসেবে অমর একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল এবার। আর অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে অর্জিত যে সামান্য অভিজ্ঞতা, তা প্রকাশের দায় থেকেই এ লেখার অবতারণা।
মেলার পরিবেশ গত যে কোনো বইমেলার চেয়ে পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি ছিল সন্দেহ নেই। মেলার পরিবেশকে ঠিকঠাক রাখার জন্যে বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ সারাক্ষণ যে নজরদারি করেছেন, তা প্রশংসনীয়। যদিও এবারে স্থান যথেষ্ট সঙ্কুচিত হয়েছে, তথাপি দর্শক-ক্রেতা ও পাঠকদের আনন্দের কোনো ঘাটতি ছিল না। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও প্রায়শই মেলা প্রাঙ্গণে দেখা গেছে বিশেষ একটি বিদেশি চকমকে মোড়কের বই বাজারজাত করার জন্যে বেশকিছু তরুণ বাইরে থেকে এসে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দর্শক-ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে। মেলায় অংশ না নেয়া এবং ‘বাঙালি জাতির ত্যাগ ও অঙ্গীকারের মেলা’ হিসেবে খ্যাত এই বইমেলায় প্রকাশ্যে বিদেশি বইয়ের বিপণন মেলার শৃঙ্খলাহানির শামিল বলে মনে করি।
কোনো কোনো স্টলে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেলেও অধিকাংশ স্টলের বিক্রি আশানুরূপ ছিল না বলেই মনে হয়েছে। এ কথা অনেককেই বলতে শোনা গেছে যে, মেলায় যে পরিমাণ দর্শক আসে তারা যদি প্রত্যেকে একটি করেও বই কিনতো তাহলে বিপুলসংখ্যক বই বিক্রি হতো। যদিও এবছর বইয়ের বিক্রি গত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। বই বিক্রি হয়েছে ২০ কোটি টাকার। হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের প্রতি টিনএজ পাঠকদের অন্তহীন আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়েছে। এ আগ্রহ লেখক হুমায়ূন আহমেদকে তো বটেই, সংশ্লিষ্ট প্রকাশকদেরও অনুপ্রাণিত করবে অবশ্যই। নবীন-প্রবীণ অনেক লেখকের বই আসছে ফি বছর। হুমায়ুন আহমেদের একটা বই কিনলে পাঠকের উচিত অন্তত আর একটি অন্য কোনো লেখকের উপন্যাস কিংবা গল্পের কিংবা কবিতার বই কেনা। তাতে দু’ধরনের স্বাদ যেমন পাওয়া যাবে, পাওয়া যাবে সমসাময়িক লেখালেখির মান যাচাইয়ের সুযোগও। বই কেনা ও বই পড়ার অভ্যেস দুটোই তাই খুব জরুরি।
প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও ছিল এবার রেকর্ড পরিমাণ। ৩৩৫৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে এবার। গল্প, উপন্যাসকে ছাড়িয়ে গেছে কবিতার বই। ৮০৭টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে এবারের বইমেলায়। অথচ সে তুলনায় শিশু সাহিত্যের বই-এর সংখ্যা নগণ্য। মাত্র ১২৯টি। অনেক অভিভাবকই প্রিয় শিশুসন্তানকে সঙ্গে করে মেলায় এসেছেন তার উপযোগী একটি ভালো বই কেনার জন্যে। অনেকে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন মেলা প্রাঙ্গণ। মুষ্টিমেয় কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কেবল শিশু-কিশোরদের বই নিয়ে এবার হাজির হয়েছিল মেলায়। তাদের অভিনন্দন। যারা ইতোমধ্যে সৃজনশীল প্রকাশক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন, তাদের বোধকরি প্রথম লক্ষ্য ছিল বড়দের প্রতি। দায়সারা গোছের কিছু শিশুতোষ বই কমবেশি সব স্টলেই ছিল। তবে হয় তা উচ্চ মূল্যের কারণে পাঠকের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে, নতুবা ভূত দোষে দুষ্ট। পুরো মেলা ঘুরে যে কোনো দর্শক-পাঠক নিশ্চয়ই একথা স্বীকার করবেন যে, ভূত নিয়ে শিশুদের জন্যে এত মাতামাতি এর আগে হয়েছে বলে মনে হয় না। ভূত বিষয়ে নানান রকম বিশ্লেষণ এবং বইয়ের নামকরণ শিশুদের ভূত-প্রীতি অথবা ভূত-ভীতি কোনটা বাড়িয়েছে সেটা হয়তো অভিভাবকরাই ভালো বলতে পারবেন। ভালো শিশুসাহিত্য রচনা যেমন কঠিন কাজ, তেমনি প্রকাশকদেরও আগামী প্রজন্মকে বইপাঠের আনন্দ দানের মাধ্যমে সঠিক দিকনির্দেশনা দেয়াটাও দায়িত্ব বৈকি। ভূত সম্পর্কে একটা প্রচলিত প্রবচন হচ্ছে ‘ভূত পেছন দিকে হাঁটে’, আমরা কেউই বোধকরি আমাদের সন্তানদের পেছনে হাঁটাতে চাইবো না। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভূত, ডিজিটাল ভূত, সাইবার ভূত, অদ্ভুত ভূত—সবকিছু নিয়েই ব্যাপক গবেষণা হয়েছে এবার। কোনো কোনো খ্যাতিমান লেখককে ভূত নিয়ে আগামী বইমেলায় লেখার আগ্রহ ব্যক্ত করতে শোনা গেছে। শিশুসাহিত্যের বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন শিশুমনস্তত্ত্ব বুঝে সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে শিশুসাহিত্য সৃষ্টি।
এবারের বইমেলায় সাজসজ্জার পরিকল্পনাটিও নতুন মাত্রা যোগ করেছে বৈকি। নজরুল মঞ্চে মোড়ক উন্মোচনের জন্যে দু’পাশে দু’টি সুদৃশ্য ব্যাকড্রপ স্থাপন এবং একটি স্ট্যান্ড, মেলায় অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানসমূহের অবস্থান ও নক্শা, বিচিত্র বর্ণের ফেস্টুন ইত্যাদি মেলার সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। তবে মেলার শেষভাগে হঠাত্ বৃষ্টি ও ঝড়োহাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক বইপত্র। তাছাড়া তাত্ক্ষণিকভাবে জমে যাওয়া পানি নিষ্কাশনের ত্বরিত ব্যবস্থা না থাকায় বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আশঙ্কায় মেলা সেদিনের মত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। মেলার সময়সূচিতে মহিলা ও শিশুদের জন্যে একটা স্লট রাখা হয়েছিল। মাত্র একদিন কয়েক ঘণ্টার জন্যে। এরকম স্লট ভবিষ্যতে আরও বাড়ানো যেতে পারে। মেলার শেষভাগে যারা আসেন, তাদের অধিকাংশই বইয়ের প্রকৃত ক্রেতা বা পাঠক। সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মেলার সময়সূচি কিছুটা রদবদল করে বিকেল ৩টার পরিবর্তে সকাল ১০টা থেকে করা যেত। বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্যে মেলার কার্যক্রম বন্ধ রাখা হলে তা যাতে প্রকাশক ও পাঠকদের ক্ষতিগ্রস্ত না করে সেদিকেও বাংলা একাডেমী ভবিষ্যতে যত্নবান হবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।
সরকার ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত করার লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে কাজ করছে। উদ্দেশ্য সকল পর্যায়ে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা। এবারের বইমেলায় সরকারি-বেসরকারি বেতার ও টেলিভিশনে সরাসরি বইমেলার কার্যক্রম প্রচারিত হয়েছে। ওয়েবসাইটে প্রতিদিনের মেলায় আসা নতুন বইয়ের তালিকা সংযোজিত হয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে ‘বইমেলা প্রতিদিন’ শীর্ষক বর্ণিল পত্রিকা। ইন্টারনেটের মাধ্যমে নতুন আসা বইয়ের খোঁজখবর অনায়াসেই নিতে পেরেছেন দেশের ও দেশের বাইরের পাঠকশ্রেণী। মেলায় আসার আগেই বই নির্বাচন করাটা অনেকের জন্যেই হয়ে গেছে সহজতর। নতুন বইয়ের খোঁজখবর ওয়েবসাইটে আপলোড করার জন্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে আসতে দেখা গেছে মেলায়। এটা বইয়ের প্রচার, প্রসার ও বিপণনে সহায়ক হবে বলে মনে করি। বড়পর্দায় মেলার একাধিক স্থানে বইয়ের সচিত্র বিজ্ঞাপন দেয়ার বিষয়টিও লক্ষ্যযোগ্য।
সুদৃশ্য স্টল সজ্জার জন্যে, সর্বোচ্চ সংখ্যক বই ক্রয়ের জন্যে, ভালো বই প্রকাশের জন্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কৃত করেছে সংশ্লিষ্টদের। এ ধরনের উদ্যোগ প্রকাশক ও পাঠক উভয় শ্রেণীকেই ভবিষ্যতে উত্সাহিত করবে সন্দেহ নেই। বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক বা প্রতিনিধি, তথ্য-প্রযুক্তি সেবার জন্যে এবং আরও বিশেষ বিশেষ কাজে উত্সাহ দেয়ার লক্ষ্যে এ ধরনের পুরস্কার প্রদানের বিষয়টি বইমেলার উত্কর্ষ অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
সব ছাপিয়ে লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের কাছে নির্মল আনন্দস্মৃতি এই অমর একুশে গ্রন্থমেলা। দেশের নানা প্রান্ত থেকে এ মেলায় প্রাণের টানে ছুটে আসে বইপ্রেমী লেখক-পাঠক-সংগঠক। গ্রন্থাগার তৈরির জন্যে ভালো বই খুঁজতে আসেন অনেকে। দেশের বাইরে থেকেও অনেক উত্সুক লেখক ও বইপ্রেমীদের আগমন ঘটে মেলায়। বাঙালি জাতির গৌরবময় ইতিহাস ও মননের প্রতীক এই বইমেলা সকলের জন্যে হয়ে উঠুক বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার সূতিকাগার—এই প্রত্যাশা সকলের। বই হোক নিত্যসঙ্গী। ম
hashim.milon@gmail.com
-
সাহিত্য-সাময়িকী


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


