নদী
মূল : (মালয়ালম) ও.ভি. ভিজায়ন, অনুবাদ : আহমদ বুলবুল ইসলাম
ও.ভি. ভিজায়ন (জুলাই ০২, ১৯৩০, মার্চ ৩০, ২০০৫)
মালয়ালম ভাষার এক আধুনিক, উত্তর আধুনিক, অসাধারণ লেখক ও রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট, শুধু ভারতীয় লেখক হিসেবে নয় বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য নাম ও. ভি. ভিজায়ন। তাঁর প্রথম উপন্যাস 'কযধংধশশরহঃব ওঃরযধংধস' (দ্য লিজেন্ডস অব খাজাক) মালয়ালম সাহিত্যে একটি মাইলস্টোন, বিশ্ব সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। ছ’টি উপন্যাস, ন’টি ছোট গল্পের সংগ্রহ এবং ন’টি প্রবন্ধ সঙ্কলন, স্মৃতিকথা ও অন্যান্য মিলিয়ে পরিমাণে খুব বেশি নয় তাঁর লেখা। কিন্তু এক একটি লেখা অনবদ্য শিল্প সৌকর্যে মণ্ডিত। তাঁর সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ডের মধ্যে ভারতীয় সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার উল্লেখযোগ্য এবং ভারত সরকারের পদ্মভূষণ, পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। ভারতের সবচেয়ে বড় সাহিত্য পুরস্কার ‘জ্ঞানপীঠ’ তাঁকে দেয়া হয়নি, হয়তো রাজনৈতিক কারণেই। ইন্ডিয়ান পেঙ্গুইন তাঁর রচনাবলীর ইংরেজি কালেকশন বের করেছে। বক্ষ্যমাণ গল্পটি তাঁর 'ঞযব জরাবত্' গল্পের ইংরেজি ভার্সন থেকে অনূদিত।
—আঃ বুঃ ইঃ
পরমেশ্বরনের প্রতিদিনের স্নান ছিল যেন বিশদ এক আচার-অনুষ্ঠান। নিজেকে ঘষামাজা এবং ধোয়া-মোছার পর সে জলে কাটাত দীর্ঘক্ষণ, অগভীর জলে বালির উপর বসে থাকত সে। ছোট্ট মেয়েটি, নাঙ্গেমা কুট্টি যে যথারীতি কাছাকাছি স্নান করত, যে প্রায়ই তাকে জিজ্ঞেস করত, ‘কাকা পরমেশ্বরন, তুমি কি এখনো স্নান শেষ করনি?’
‘এক অর্থে শেষ করেছি, অন্য অর্থে করিনি।’
‘ওটা একটা ধাঁ. . . ধা।’
পরমেশ্বরন স্মিত হাসত যখন সে এমনিভাবে তাকে খোঁচা দিত। কোনো কোনোদিন সে নদীর উেসর দিকে মুখ করে বসত এবং অন্য অনেকদিন নদীর স্রোতের ভাটির দিকে তাকিয়ে থাকত। দুষ্ট মেয়েটি তাও লক্ষ্য করেছিল এবং একদিন সে এর কারণ জানতে চাইল।
‘ধৈর্য ধর মামণি,’ পরমেশ্বরন বলল, ‘তুমি বুঝতে পারবে যখন তুমি বড় হবে।’
‘কত বড়?’
‘যখন তুমি তোমার ঠাকুমার মত বড় হবে।’
‘সে তো অনেক দিনের ব্যাপার। তুমি কি তার আগে আমাকে বলতে পার না?’
‘তোমাকে বলব, যদি তুমি অতখানিই অধৈর্য হও,’ পরমেশ্বরন বলল।
‘এটা হল এই যে, আমাদের সবাইকে একদিন নদীর জলে ভেসে যেতে হবে।’
‘আমিও?’
‘কেউ এড়াতে পারে না।’
‘আমি ভেসে যেতে চাই না।’
পরমেশ্বরন নদীর প্রবাহকে লক্ষ্য করল, সচেতন হল, জলের ইন্দ্রিয়াসক্ত মৃদু তরঙ্গ তার শরীরের চারদিকে বয়ে যেতে লাগল।
‘কেন, তুমি ভেসে যেতে চাও না?’ সে তাকে জিজ্ঞেস করল।
‘আমি ভয় পাই যে।’
‘সে হচ্ছে একটি শিশুর ভয়। তুমি যখন বড় হবে, কিছুতেই তুমি ভয় পাবে না।’
নাঙ্গেমা কুট্টি তার স্নান শেষ করল এবং কাপড় পাল্টাল। ঐদিন পরমেশ্বরন নদীর দিকে মুখ করে বসেছিল।
‘ওটা আমাকে মনে করিয়ে দিল’, নাঙ্গেমা কুট্টি তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি আমাকে বলনি, কেন তুমি নির্দিষ্ট দিকে মুখ করে থাক।’
অনিচ্ছার সঙ্গে পরমেশ্বরন বলল, ‘আমি তোমাকে বলেছিলাম যে আমরা সবাই একদিন ভেসে যাব। তাই যদি হয়, আমাদের উচিত নদীর সম্বন্ধে সব কিছু জানা, কোথায় এর সৃষ্টি আর কোথায়ই বা এ বয়ে যায়।’
‘তুমি কি খুঁজে পেয়েছো, কাকা?’
‘একটু একটু করে, চলমান প্রতিদিনের সঙ্গে সঙ্গে।’
‘কোনোদিন সম্পূর্ণ সত্যিটা জানতে পারবে?’
পরমেশ্বরন তার নিজের দিকে তাকিয়ে থাকল দীর্ঘক্ষণ, শেষে বলল, ‘কোনো এক ভাল সময়ে।’
‘তুমি একটা ক্ষ্যাপা, কাকা!’
খিল খিল করে হাসতে হাসতে নাঙ্গেমা কুট্টি জল থেকে উঠে চলে গেল।
অনেক বছর পর। নাঙ্গেমা কুট্টির ভিন গাঁয়ে বিয়ে হয়ে গেল, এবং পরমেশ্বরনের নদী সম্বন্ধে কথা বলার কেউ রইল না। এটা একদিক দিয়ে ভালই হল। পরমেশ্বরন ভাবল, ‘এই সব সম্পর্কগুলো এই মহান প্রবাহকে বাধা দেয়।’
এখন পরমেশ্বরনের উেসর দিকে তাকানো বন্ধ হয়ে গেল। ‘আমি উত্স সম্বন্ধে সবই জানলাম’, সে নিজেকে বলল, ‘বাকী রইল সমুদ্রকে জানার।’
একদিন একজন অপ্রত্যাশিত স্নানার্থী এল কৃষ্ণানন-ভেদিয়ান, পার্শ্ববর্তী গাঁয়ের এক গ্রাম্য চিকিত্সক।
‘আমি এখানে তোমাকে কমই দেখেছি জলে নামতে, ও ভেদিয়ান?’
‘আমি একজন রোগী দেখতে যাচ্ছি,’ কৃষ্ণানন ভেদিয়ান বলল।
‘নদীটি দেখে একটা ডুব দেবার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না।’
‘এতে তোমার মঙ্গল হবে।’
চিকিত্সক স্নান শেষ করল।
‘বিদায়, পরমেশ্বরন দাদা’, সে বলল। ‘নিজের দিকে খেয়াল রেখো।’
তার ফিরতি পথে, দু’ঘণ্টা পরে, কৃষ্ণানন-ভেদিয়ান তখনও পরমেশ্বরনকে জলে বসে থাকতে দেখল।
‘তুমি কি করছো?’ চিকিত্সক জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি তোমার স্নান এখনো শেষ করনি?’
পরমেশ্বরন তার শুভার্থীর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল। চিকিত্সকটি আরও বলল, ‘তুমি আর তরুণ নও। অত্যধিক এই স্নানে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে।’
কৃষ্ণানন-ভেদিয়ান আবার তার যাত্রা শুরু করল। পরমেশ্বরন জলে বসেই থাকল। বিগত বছরগুলোর মধ্যে এই প্রথম সে অনুভব করল, তার পদযুগল হয়ে উঠল নির্ভার, যেন নদী পুরানো কঠিন আস্তরণসমূহ ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নদী যখন বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল পুরানো জঞ্জাল, এক শিরশিরে অনুভূতি জেগে উঠল হাত-পায়ের অন্তিম বিন্দু ছুঁয়ে এবং অনুগামী হয়ে বয়ে চলল তাদের যাত্রাপথে। দ্রুতই সে অনুভব করল নদীর মোহনা। সে অনুভব করল যে তার পদযুগল নিয়ে দূর কোন সমুদ্রে বসে আছে।
এটা ছিল মধ্যাহ্ন এবং নদীতে কোনো স্নানার্থী ছিল না। পরমেশ্বরনের নিজেকে মনে হল ভারমুক্ত। তার চারদিকে জল হয়ে উঠল রোমাঞ্চকর, সংবেদনশীল। তারা ধুয়ে নিয়ে গেল তার ভেতরের সব ক্লেদ, ধৈর্যসহকারে প্রতি পাকে পাকে। যখন তার পায়ের ডিম ও ঊরুদ্বয় খোসার মতো খুলে গেল, তার সমুদ্রের জ্ঞান হয়ে উঠল গভীর, এক ইন্দ্রিয়াসক্ত ক্লান্তি তাকে গ্রাস করল যখন সে অনুভব করল নদীর ক্রিয়া তার হাত ও কাঁধ ছুঁল এবং তার গলার দিকে এগিয়ে গেল। যখন সকল খুলে যাওয়া স্থূল পদার্থসমূহ ভেসে গেল, সে অনুভব করতে শুরু করল নদীর স্রোত তার নিগূঢ় মেরুদণ্ডে। আনন্দ ফুলের মতো জেগে উঠল মস্তিষ্কে অগণন পাপড়ির এক জলপদ্মের মতো।
পরমেশ্বরন এখন নদীর জলে ভাসন্ত একটি জলপদ্ম। কতদিন ধরে সে অপেক্ষা করে আছে এই প্রস্ফুটনের। পাপড়ির এই দীপ্তিতে, ফুলের এই নিষ্কলুষ জ্ঞান, পরমেশ্বরন দেখল ফুলটি নিজেই মিলিয়ে গেল। নদী হয়ে উঠল অভিজ্ঞতা, হয়ে উঠল অভিজ্ঞান এবং আলো। যখন শেষ পাপড়িটি মিলিয়ে গেল, পরমেশ্বরন জানল সম্পূর্ণ নদীটিকে এবং সে হেসে উঠল পাহাড় থেকে সমুদ্র অবধি।
মালয়ালম ভাষার এক আধুনিক, উত্তর আধুনিক, অসাধারণ লেখক ও রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট, শুধু ভারতীয় লেখক হিসেবে নয় বিশ্ব সাহিত্যের অঙ্গনে একটি উল্লেখযোগ্য নাম ও. ভি. ভিজায়ন। তাঁর প্রথম উপন্যাস 'কযধংধশশরহঃব ওঃরযধংধস' (দ্য লিজেন্ডস অব খাজাক) মালয়ালম সাহিত্যে একটি মাইলস্টোন, বিশ্ব সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। ছ’টি উপন্যাস, ন’টি ছোট গল্পের সংগ্রহ এবং ন’টি প্রবন্ধ সঙ্কলন, স্মৃতিকথা ও অন্যান্য মিলিয়ে পরিমাণে খুব বেশি নয় তাঁর লেখা। কিন্তু এক একটি লেখা অনবদ্য শিল্প সৌকর্যে মণ্ডিত। তাঁর সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন অ্যাওয়ার্ডের মধ্যে ভারতীয় সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার উল্লেখযোগ্য এবং ভারত সরকারের পদ্মভূষণ, পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। ভারতের সবচেয়ে বড় সাহিত্য পুরস্কার ‘জ্ঞানপীঠ’ তাঁকে দেয়া হয়নি, হয়তো রাজনৈতিক কারণেই। ইন্ডিয়ান পেঙ্গুইন তাঁর রচনাবলীর ইংরেজি কালেকশন বের করেছে। বক্ষ্যমাণ গল্পটি তাঁর 'ঞযব জরাবত্' গল্পের ইংরেজি ভার্সন থেকে অনূদিত।
—আঃ বুঃ ইঃ
পরমেশ্বরনের প্রতিদিনের স্নান ছিল যেন বিশদ এক আচার-অনুষ্ঠান। নিজেকে ঘষামাজা এবং ধোয়া-মোছার পর সে জলে কাটাত দীর্ঘক্ষণ, অগভীর জলে বালির উপর বসে থাকত সে। ছোট্ট মেয়েটি, নাঙ্গেমা কুট্টি যে যথারীতি কাছাকাছি স্নান করত, যে প্রায়ই তাকে জিজ্ঞেস করত, ‘কাকা পরমেশ্বরন, তুমি কি এখনো স্নান শেষ করনি?’
‘এক অর্থে শেষ করেছি, অন্য অর্থে করিনি।’
‘ওটা একটা ধাঁ. . . ধা।’
পরমেশ্বরন স্মিত হাসত যখন সে এমনিভাবে তাকে খোঁচা দিত। কোনো কোনোদিন সে নদীর উেসর দিকে মুখ করে বসত এবং অন্য অনেকদিন নদীর স্রোতের ভাটির দিকে তাকিয়ে থাকত। দুষ্ট মেয়েটি তাও লক্ষ্য করেছিল এবং একদিন সে এর কারণ জানতে চাইল।
‘ধৈর্য ধর মামণি,’ পরমেশ্বরন বলল, ‘তুমি বুঝতে পারবে যখন তুমি বড় হবে।’
‘কত বড়?’
‘যখন তুমি তোমার ঠাকুমার মত বড় হবে।’
‘সে তো অনেক দিনের ব্যাপার। তুমি কি তার আগে আমাকে বলতে পার না?’
‘তোমাকে বলব, যদি তুমি অতখানিই অধৈর্য হও,’ পরমেশ্বরন বলল।
‘এটা হল এই যে, আমাদের সবাইকে একদিন নদীর জলে ভেসে যেতে হবে।’
‘আমিও?’
‘কেউ এড়াতে পারে না।’
‘আমি ভেসে যেতে চাই না।’
পরমেশ্বরন নদীর প্রবাহকে লক্ষ্য করল, সচেতন হল, জলের ইন্দ্রিয়াসক্ত মৃদু তরঙ্গ তার শরীরের চারদিকে বয়ে যেতে লাগল।
‘কেন, তুমি ভেসে যেতে চাও না?’ সে তাকে জিজ্ঞেস করল।
‘আমি ভয় পাই যে।’
‘সে হচ্ছে একটি শিশুর ভয়। তুমি যখন বড় হবে, কিছুতেই তুমি ভয় পাবে না।’
নাঙ্গেমা কুট্টি তার স্নান শেষ করল এবং কাপড় পাল্টাল। ঐদিন পরমেশ্বরন নদীর দিকে মুখ করে বসেছিল।
‘ওটা আমাকে মনে করিয়ে দিল’, নাঙ্গেমা কুট্টি তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি আমাকে বলনি, কেন তুমি নির্দিষ্ট দিকে মুখ করে থাক।’
অনিচ্ছার সঙ্গে পরমেশ্বরন বলল, ‘আমি তোমাকে বলেছিলাম যে আমরা সবাই একদিন ভেসে যাব। তাই যদি হয়, আমাদের উচিত নদীর সম্বন্ধে সব কিছু জানা, কোথায় এর সৃষ্টি আর কোথায়ই বা এ বয়ে যায়।’
‘তুমি কি খুঁজে পেয়েছো, কাকা?’
‘একটু একটু করে, চলমান প্রতিদিনের সঙ্গে সঙ্গে।’
‘কোনোদিন সম্পূর্ণ সত্যিটা জানতে পারবে?’
পরমেশ্বরন তার নিজের দিকে তাকিয়ে থাকল দীর্ঘক্ষণ, শেষে বলল, ‘কোনো এক ভাল সময়ে।’
‘তুমি একটা ক্ষ্যাপা, কাকা!’
খিল খিল করে হাসতে হাসতে নাঙ্গেমা কুট্টি জল থেকে উঠে চলে গেল।
অনেক বছর পর। নাঙ্গেমা কুট্টির ভিন গাঁয়ে বিয়ে হয়ে গেল, এবং পরমেশ্বরনের নদী সম্বন্ধে কথা বলার কেউ রইল না। এটা একদিক দিয়ে ভালই হল। পরমেশ্বরন ভাবল, ‘এই সব সম্পর্কগুলো এই মহান প্রবাহকে বাধা দেয়।’
এখন পরমেশ্বরনের উেসর দিকে তাকানো বন্ধ হয়ে গেল। ‘আমি উত্স সম্বন্ধে সবই জানলাম’, সে নিজেকে বলল, ‘বাকী রইল সমুদ্রকে জানার।’
একদিন একজন অপ্রত্যাশিত স্নানার্থী এল কৃষ্ণানন-ভেদিয়ান, পার্শ্ববর্তী গাঁয়ের এক গ্রাম্য চিকিত্সক।
‘আমি এখানে তোমাকে কমই দেখেছি জলে নামতে, ও ভেদিয়ান?’
‘আমি একজন রোগী দেখতে যাচ্ছি,’ কৃষ্ণানন ভেদিয়ান বলল।
‘নদীটি দেখে একটা ডুব দেবার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না।’
‘এতে তোমার মঙ্গল হবে।’
চিকিত্সক স্নান শেষ করল।
‘বিদায়, পরমেশ্বরন দাদা’, সে বলল। ‘নিজের দিকে খেয়াল রেখো।’
তার ফিরতি পথে, দু’ঘণ্টা পরে, কৃষ্ণানন-ভেদিয়ান তখনও পরমেশ্বরনকে জলে বসে থাকতে দেখল।
‘তুমি কি করছো?’ চিকিত্সক জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি তোমার স্নান এখনো শেষ করনি?’
পরমেশ্বরন তার শুভার্থীর দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল। চিকিত্সকটি আরও বলল, ‘তুমি আর তরুণ নও। অত্যধিক এই স্নানে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে।’
কৃষ্ণানন-ভেদিয়ান আবার তার যাত্রা শুরু করল। পরমেশ্বরন জলে বসেই থাকল। বিগত বছরগুলোর মধ্যে এই প্রথম সে অনুভব করল, তার পদযুগল হয়ে উঠল নির্ভার, যেন নদী পুরানো কঠিন আস্তরণসমূহ ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নদী যখন বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল পুরানো জঞ্জাল, এক শিরশিরে অনুভূতি জেগে উঠল হাত-পায়ের অন্তিম বিন্দু ছুঁয়ে এবং অনুগামী হয়ে বয়ে চলল তাদের যাত্রাপথে। দ্রুতই সে অনুভব করল নদীর মোহনা। সে অনুভব করল যে তার পদযুগল নিয়ে দূর কোন সমুদ্রে বসে আছে।
এটা ছিল মধ্যাহ্ন এবং নদীতে কোনো স্নানার্থী ছিল না। পরমেশ্বরনের নিজেকে মনে হল ভারমুক্ত। তার চারদিকে জল হয়ে উঠল রোমাঞ্চকর, সংবেদনশীল। তারা ধুয়ে নিয়ে গেল তার ভেতরের সব ক্লেদ, ধৈর্যসহকারে প্রতি পাকে পাকে। যখন তার পায়ের ডিম ও ঊরুদ্বয় খোসার মতো খুলে গেল, তার সমুদ্রের জ্ঞান হয়ে উঠল গভীর, এক ইন্দ্রিয়াসক্ত ক্লান্তি তাকে গ্রাস করল যখন সে অনুভব করল নদীর ক্রিয়া তার হাত ও কাঁধ ছুঁল এবং তার গলার দিকে এগিয়ে গেল। যখন সকল খুলে যাওয়া স্থূল পদার্থসমূহ ভেসে গেল, সে অনুভব করতে শুরু করল নদীর স্রোত তার নিগূঢ় মেরুদণ্ডে। আনন্দ ফুলের মতো জেগে উঠল মস্তিষ্কে অগণন পাপড়ির এক জলপদ্মের মতো।
পরমেশ্বরন এখন নদীর জলে ভাসন্ত একটি জলপদ্ম। কতদিন ধরে সে অপেক্ষা করে আছে এই প্রস্ফুটনের। পাপড়ির এই দীপ্তিতে, ফুলের এই নিষ্কলুষ জ্ঞান, পরমেশ্বরন দেখল ফুলটি নিজেই মিলিয়ে গেল। নদী হয়ে উঠল অভিজ্ঞতা, হয়ে উঠল অভিজ্ঞান এবং আলো। যখন শেষ পাপড়িটি মিলিয়ে গেল, পরমেশ্বরন জানল সম্পূর্ণ নদীটিকে এবং সে হেসে উঠল পাহাড় থেকে সমুদ্র অবধি।
-
সাহিত্য-সাময়িকী


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


