অল্প স্বল্প গল্প : সন্ত্রস্ত জনপদে
সাযযাদ কাদির
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তির পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলাম ১৯৬৬ সালে। এক বছর পর আবারও প্রথম হয়েছিলাম বার্ষিক পরীক্ষায়। দ্বিতীয় হয়েছিল খোরশেদ আনোয়ার। তৃতীয় সেকেন্দ্রা আখতার। খোরশেদ বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে ছিল আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন। কয়েক বছর আগে সে অবসর নিয়েছে পাবনা’র এডওয়ার্ড কলেজ থেকে, বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে। শিক্ষক হিসেবে তো বটেই, এছাড়াও সে বিশেষ খ্যাতি পেয়েছে বেতার-টিভি’র গীতিকার হিসেবে। সেকেন্দ্রা আখতার প্রথম বর্ষের ‘প্রতিভা প্রদর্শনী’ অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে চমত্কৃত করেছিল আমাদের। তার ছোট বোন শাহীন আখতার (পরে শাহীন সামাদ) তো দেশবরেণ্য শিল্পী। তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সেই ’৬৯-’৭০ সালেই।
এক ক্লাশে পড়লেও বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে সেকেন্দ্রা’র সঙ্গে কখনও কোনও কথা হয় নি আমার, খোরশেদেরও হয় নি। তাঁরা দু’জন অবশ্য দীর্ঘ দিন ধরে বাস করছে রাজশাহী শহরেই। শেষ পর্যন্ত, গত ১৩ই ফেবরুয়ারি সন্ধ্যায়, একত্র হলাম আমরা তিন জন (সেই প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়) রাজশাহী উপশহর সেকটর ২-এ সেকেন্দ্রা’র বাড়িতে। ছাত্রজীবনের ‘আপনি-আপনি’ দিয়ে শুরু হলেও ‘তুমি-তুমি’তে পৌঁছতে দেরি হয় না খুব। একথা-সেকথার পর সেকেন্দ্রাকে জিগ্যেস করি, আমাকে কখনও তুমি দেখেছো কিনা। সে জানায়, তার মনে আছে আমি খুব রোগা ছিলাম আর খুব সিগারেট খেতাম।
রোগা বলতে হালকা পাতলা। রোগ কিছু ছিল না তখন, এখন আছে যেমন। তাই আমাকে রোগা বলা যায় সেই ১৯৯৩ সাল থেকে, যখন আমার হৃদ্যন্ত্র আক্রান্ত হয় প্রথম।
রাজশাহী গিয়েছি এর আগেও কয়েকবার। কিন্তু হুট করে গিয়ে হুট করে আসায় কোনও কিছু দেখা হয় নি তেমন করে। এবার গবেষক-বন্ধু আনারুল হক আনা, সাংবাদিক আহসান হাবীব অপু ও মহিনুল হাসান জনি’র সৌজন্যে দেখা হলো কিছু-কিছু। নানচিং রেস্তরাঁয় খেলাম সিছুয়ান-থাই সুপ, বিদ্যুত্ হোটেলে পুরি ও মাছ-ভাত, চিলি’স-এ নান-কাবাব, সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে চা... আরও কত কি। এই খেতে-খেতে দেখতে-দেখতে খেয়াল করলাম... এ শহরে এক ধরনের ফিটফাট পরিচ্ছন্নতা আছে। ফারমেসি থেকে সেলুন পর্যন্ত প্রায় সব জায়গাতে কাজ করেন চলন বলনে মার্জিত সব মানুষ। তাঁদের বয়স চল্লিশের কম-বেশি। তাঁরা পোশাকে-আশাকে পরিপাটি, চেহারায়-ভঙ্গিতে বিচক্ষণ।
আনা নিয়ে যান নিউ মারকেটের সব্জিবাজারে। সেখানে আজাহার ভাইয়ের হোটেলে সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে ঘনঘোর আড্ডা। দেখা পাই কবি ওয়ালী কিরণ, আসাদুজ্জামান খোকন, সিরাজুদ্দৌলাহ বাহার ও শামীম হোসেনের।
সাহিত্যের ছোটকাগজ “ক্রম”-এর সম্পাদক ওয়ালী কিরণের জন্ম ১৯৫৮-তে। পড়েছেন ইংরেজি সাহিত্যে, এখন এক ব্যাঙ্কের ব্যবস্থাপক। গত ফেবরুয়ারিতে বেরিয়েছে তাঁর দু’টি কবিতার বই (“অদৃশ্য পুরোহিত” ও “জলপাখিদের প্রত্নগভীরতা”)। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চিরুনি অভিযানে সন্ত্রস্ত ১৩ই ফেবরুয়ারির রাজশাহী শহরে তাঁর কোনও-কোনও কবিতা যেন বিশেষ ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে ওঠে:
বলো তো দেখি অনুপ, শান্তিবাদী হে বন্ধু আমার
যখন একবার রক্ত ঝরা শুরু হয়
যখন বহু মানুষের রক্ত ঝরতে থাকে অবিরত
তখন কি সাত তাড়াতাড়ি শান্তি ফিরে আসে?
কেননা ঝরে যাওয়া রক্তের ফোঁটাগুলো
আর কখনও ফিরে যেতে পারে না পুরনো আধারে।... (‘রক্তপাতের ব্যাকরণ’, “অদৃশ্য পুরোহিত”)
আসাদুজ্জামানের খোকনের জন্ম ১৯৬০ সালে। তাঁর প্রথম কবিতার বই “অতল জলের ঝিনুক” বেরিয়েছে ২০০৫ সালে। দ্বিতীয় কবিতার বই “জমা রাখি জন্মান্তর” বেরিয়েছে ২০০৮ সালে। গত বছর বেরিয়েছে “দরজা খোলো মেঘ”। সন্ত্রাস উচ্চকিত হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতায়:
... রক্তের বর্ণমালা দিয়ে মানুষের ইতিহাস লিখতে-লিখতে অবশেষে
ছোট এই সবুজ দেশে আমি এসে দাঁড়াবো কোথায়?
বধ্যভূমি, তুমি বলো...
এখানে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে নদী, দাঁড়িয়েছে অরণ্য
আমরা কেউ যুদ্ধ চাই না, এমনকি পদকও
আমরা সবাই শান্তি চাই সবুজ এ পৃথিবীর জন্য...
(‘পদক ও প্রার্থনা’, “দরজা খোলো মেঘ”)
সিরাজুদ্দৌলাহ বাহারের জন্ম ১৯৬৪ সালে। তাঁর প্রথম কবিতার বই “ও হাওয়া ও আদম” বেরিয়েছে ১৯৮৭ সালে। এরপর বেরিয়েছে “খুকু আর ফেব্রুয়ারি” (১৯৮৯), “যমুনায় ভোর আসে” (২০০১)... আর গত বছরের একুশের বইমেলায় বেরিয়েছে “কেউ একজন বলছে তোমাকে”। তাঁর কবিতায়ও সন্ত্রস্ত জীবনের ছবি:
... বাইরে বর্ষণভীত সন্ত্রস্ত মানুষেরা
উদভ্রান্ত শরণার্থী দল
শূন্য ও সমতল পরিত্যাগ করে
গর্ভের মতো পুনঃ
নিরাপদ গুহায় লুকায়।... (‘গর্ভকাল’, “কেউ একজন বলছে তোমাকে”)
কবি শামীম হোসেন সাহিত্যের ছোটকাগজ “নদী”র সম্পাদক, তাঁর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান “নদীপ্রকাশ”। উল্লিখিত চারটি কবিতার বইয়েরই প্রকাশক তিনি। এর আগের বার রাজশাহীতে আমাকে তিনি দিয়েছিলেন সেই ছোটকাগজ আর তাঁর ছড়ার বই “এক তুড়ি ছয় বুড়ি”। এবার দিলেন না কিছু। একটু দূরে থাকলেন চুপ হয়ে।
আড্ডাতে পঞ্চাশ-ষাটের কবি ও কবিতা নিয়ে কথা হলো কিছু, বেশি কথা হলো শামসুর রাহমানকে নিয়ে। তাঁর প্রসঙ্গ এলো কবিতা কম লেখা বেশি লেখার আলোচনায়। কথা হলো তাঁর ‘সংবেদনশীলতা’ নিয়েও। সে আলোচনার অনেক বিষয়ে অমিলের চেয়ে মিলই হলো বেশি। আনারুল হক আনা বললেন, আপনার কথা সত্য, কিন্তু একমত হতে পারি না... মেনে নিতে পারি না!
আজাহার ভাইয়ের হোটেলে শেষ আড্ডা ওই সেদিনই। পরদিন ভেঙে ফেলা হয় হোটেলটি। সেখানে “দারুচিনি” নামে নতুন এক সুপারমারকেট নির্মাণ করবে রাজশাহী সিটি করপোরেশন।
তবে রাজশাহীতে যত বার গিয়েছি, ততবারই আনারুল হক আনা তাগিদ দিয়ে আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন “হেরিটেজ: বাংলাদেশের ইতিহাসের আরকাইভস”-এ। কিন্তু অনেক কৌতূহল ও আগ্রহ থাকলেও সময় ও সুযোগ করে উঠতে পারি নি একবারও। এবার সময়, বলতে গেলে, এক প্রকার কেড়েই নিলেন আনা। নিয়ে গেলেন ৪৫৬-ক কাজলা’য়, অকট্রয় মোড় থেকে পুব দিকে। “হেরিটেজ”-এর প্রাণপুরুষ ড. মো. মাহবুবর রহমান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর তিনি। তাঁরই উদ্যোগ, আয়োজন, অর্থায়নে নিজস্ব ভূমি ও ভবনে গড়ে উঠেছে এই গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণাগার। এ এক অসাধারণ কীর্তি। দেশের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উপকরণ সংগ্রহ করা হচ্ছে এখানে, পাশাপাশি নির্দিষ্ট বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে ঐতিহাসিক ও গবেষকদের। ২০০২ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ পর্যন্ত সংগ্রহ করা হয়েছে ঝালকাঠি ও খাগড়াছড়ি বাদে সকল জেলা সম্পর্কে গ্রন্থ, স্মরণিকা, বার্ষিকী; ১৭২০ শিরোনামের কয়েক হাজার সাময়িকী; সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি বিষয়ে প্রায় ১৫০০টি পোসটার; রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক প্রভৃতি বিষয়ে প্রায় ১৫০০টি লিফলেট; কয়েক হাজার স্মরণিকা; স্কুল, কলেজ, মাদরাসা’র স্মরণিকা ও বার্ষিকী কয়েক শ’; আদিবাসী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বইপত্র; ১৯৯৮ থেকে দৈনিক সংবাদ ও সাপ্তাহিক একতা; প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ‘ভ্যানগার্ড’; দৈনিক পত্রিকাগুলোর বিশেষ সংখ্যা; ৫০টি বিষয়ে পেপার ক্লিপিং; ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বর্তমান সময়ের মুদ্রা। এছাড়া “স্থানীয় ইতিহাস” নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত।
বিকাল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে হেরিটেজ। সেদিন যেতে একটু দেরিই হয় আমাদের। তবুও সেখানে গিয়ে কর্মরত পাই অধ্যাপক এম কায়সারউজ্জামানকে, সর্টার আবুল হাশেমকে। ইউসুফ, তোফায়েল, নিজাম ও সেলিম নামের চারজনকে। জানতে পারি হেরিটেজ-এর কর্মী সবাই স্বপ্রণোদিত। ড. মো. মাহবুবর রহমানের বন্ধুবান্ধব, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা, বিভিন্ন জেলার হেরিটেজ-বন্ধুবর্গ এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক। কেউ কোনও সম্মানী-পারিশ্রমিক নেন না, তবে ড. রহমান জোর করেই কিছু-কিছু দেন কাউকে-কাউকে।
হেরিটেজ-এর সংগ্রহ ও সংরক্ষণ দেখে পরিচয় পাই সংশ্লিষ্টদের মেধা ও শ্রমের। সত্যিই অভিভূত হওয়ার মতো এক উদ্যোগ-আয়োজন। পুরনো সাময়িকী দেখতে-দেখতে মনে পড়ে আমার হারিয়ে যাওয়া শ’-শ’ লেখার কথা। এ পর্যন্ত হাবিজাবি যা লিখেছি তার ৭০% ভাগ নিখোঁজ হয়ে আছে নানা পত্রপত্রিকায়। মনে হলো... সে সবের অন্তত ৭০% পাবো এখানেই!
এক ক্লাশে পড়লেও বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনে সেকেন্দ্রা’র সঙ্গে কখনও কোনও কথা হয় নি আমার, খোরশেদেরও হয় নি। তাঁরা দু’জন অবশ্য দীর্ঘ দিন ধরে বাস করছে রাজশাহী শহরেই। শেষ পর্যন্ত, গত ১৩ই ফেবরুয়ারি সন্ধ্যায়, একত্র হলাম আমরা তিন জন (সেই প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়) রাজশাহী উপশহর সেকটর ২-এ সেকেন্দ্রা’র বাড়িতে। ছাত্রজীবনের ‘আপনি-আপনি’ দিয়ে শুরু হলেও ‘তুমি-তুমি’তে পৌঁছতে দেরি হয় না খুব। একথা-সেকথার পর সেকেন্দ্রাকে জিগ্যেস করি, আমাকে কখনও তুমি দেখেছো কিনা। সে জানায়, তার মনে আছে আমি খুব রোগা ছিলাম আর খুব সিগারেট খেতাম।
রোগা বলতে হালকা পাতলা। রোগ কিছু ছিল না তখন, এখন আছে যেমন। তাই আমাকে রোগা বলা যায় সেই ১৯৯৩ সাল থেকে, যখন আমার হৃদ্যন্ত্র আক্রান্ত হয় প্রথম।
রাজশাহী গিয়েছি এর আগেও কয়েকবার। কিন্তু হুট করে গিয়ে হুট করে আসায় কোনও কিছু দেখা হয় নি তেমন করে। এবার গবেষক-বন্ধু আনারুল হক আনা, সাংবাদিক আহসান হাবীব অপু ও মহিনুল হাসান জনি’র সৌজন্যে দেখা হলো কিছু-কিছু। নানচিং রেস্তরাঁয় খেলাম সিছুয়ান-থাই সুপ, বিদ্যুত্ হোটেলে পুরি ও মাছ-ভাত, চিলি’স-এ নান-কাবাব, সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে চা... আরও কত কি। এই খেতে-খেতে দেখতে-দেখতে খেয়াল করলাম... এ শহরে এক ধরনের ফিটফাট পরিচ্ছন্নতা আছে। ফারমেসি থেকে সেলুন পর্যন্ত প্রায় সব জায়গাতে কাজ করেন চলন বলনে মার্জিত সব মানুষ। তাঁদের বয়স চল্লিশের কম-বেশি। তাঁরা পোশাকে-আশাকে পরিপাটি, চেহারায়-ভঙ্গিতে বিচক্ষণ।
আনা নিয়ে যান নিউ মারকেটের সব্জিবাজারে। সেখানে আজাহার ভাইয়ের হোটেলে সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে ঘনঘোর আড্ডা। দেখা পাই কবি ওয়ালী কিরণ, আসাদুজ্জামান খোকন, সিরাজুদ্দৌলাহ বাহার ও শামীম হোসেনের।
সাহিত্যের ছোটকাগজ “ক্রম”-এর সম্পাদক ওয়ালী কিরণের জন্ম ১৯৫৮-তে। পড়েছেন ইংরেজি সাহিত্যে, এখন এক ব্যাঙ্কের ব্যবস্থাপক। গত ফেবরুয়ারিতে বেরিয়েছে তাঁর দু’টি কবিতার বই (“অদৃশ্য পুরোহিত” ও “জলপাখিদের প্রত্নগভীরতা”)। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চিরুনি অভিযানে সন্ত্রস্ত ১৩ই ফেবরুয়ারির রাজশাহী শহরে তাঁর কোনও-কোনও কবিতা যেন বিশেষ ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়ে ওঠে:
বলো তো দেখি অনুপ, শান্তিবাদী হে বন্ধু আমার
যখন একবার রক্ত ঝরা শুরু হয়
যখন বহু মানুষের রক্ত ঝরতে থাকে অবিরত
তখন কি সাত তাড়াতাড়ি শান্তি ফিরে আসে?
কেননা ঝরে যাওয়া রক্তের ফোঁটাগুলো
আর কখনও ফিরে যেতে পারে না পুরনো আধারে।... (‘রক্তপাতের ব্যাকরণ’, “অদৃশ্য পুরোহিত”)
আসাদুজ্জামানের খোকনের জন্ম ১৯৬০ সালে। তাঁর প্রথম কবিতার বই “অতল জলের ঝিনুক” বেরিয়েছে ২০০৫ সালে। দ্বিতীয় কবিতার বই “জমা রাখি জন্মান্তর” বেরিয়েছে ২০০৮ সালে। গত বছর বেরিয়েছে “দরজা খোলো মেঘ”। সন্ত্রাস উচ্চকিত হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতায়:
... রক্তের বর্ণমালা দিয়ে মানুষের ইতিহাস লিখতে-লিখতে অবশেষে
ছোট এই সবুজ দেশে আমি এসে দাঁড়াবো কোথায়?
বধ্যভূমি, তুমি বলো...
এখানে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে নদী, দাঁড়িয়েছে অরণ্য
আমরা কেউ যুদ্ধ চাই না, এমনকি পদকও
আমরা সবাই শান্তি চাই সবুজ এ পৃথিবীর জন্য...
(‘পদক ও প্রার্থনা’, “দরজা খোলো মেঘ”)
সিরাজুদ্দৌলাহ বাহারের জন্ম ১৯৬৪ সালে। তাঁর প্রথম কবিতার বই “ও হাওয়া ও আদম” বেরিয়েছে ১৯৮৭ সালে। এরপর বেরিয়েছে “খুকু আর ফেব্রুয়ারি” (১৯৮৯), “যমুনায় ভোর আসে” (২০০১)... আর গত বছরের একুশের বইমেলায় বেরিয়েছে “কেউ একজন বলছে তোমাকে”। তাঁর কবিতায়ও সন্ত্রস্ত জীবনের ছবি:
... বাইরে বর্ষণভীত সন্ত্রস্ত মানুষেরা
উদভ্রান্ত শরণার্থী দল
শূন্য ও সমতল পরিত্যাগ করে
গর্ভের মতো পুনঃ
নিরাপদ গুহায় লুকায়।... (‘গর্ভকাল’, “কেউ একজন বলছে তোমাকে”)
কবি শামীম হোসেন সাহিত্যের ছোটকাগজ “নদী”র সম্পাদক, তাঁর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান “নদীপ্রকাশ”। উল্লিখিত চারটি কবিতার বইয়েরই প্রকাশক তিনি। এর আগের বার রাজশাহীতে আমাকে তিনি দিয়েছিলেন সেই ছোটকাগজ আর তাঁর ছড়ার বই “এক তুড়ি ছয় বুড়ি”। এবার দিলেন না কিছু। একটু দূরে থাকলেন চুপ হয়ে।
আড্ডাতে পঞ্চাশ-ষাটের কবি ও কবিতা নিয়ে কথা হলো কিছু, বেশি কথা হলো শামসুর রাহমানকে নিয়ে। তাঁর প্রসঙ্গ এলো কবিতা কম লেখা বেশি লেখার আলোচনায়। কথা হলো তাঁর ‘সংবেদনশীলতা’ নিয়েও। সে আলোচনার অনেক বিষয়ে অমিলের চেয়ে মিলই হলো বেশি। আনারুল হক আনা বললেন, আপনার কথা সত্য, কিন্তু একমত হতে পারি না... মেনে নিতে পারি না!
আজাহার ভাইয়ের হোটেলে শেষ আড্ডা ওই সেদিনই। পরদিন ভেঙে ফেলা হয় হোটেলটি। সেখানে “দারুচিনি” নামে নতুন এক সুপারমারকেট নির্মাণ করবে রাজশাহী সিটি করপোরেশন।
তবে রাজশাহীতে যত বার গিয়েছি, ততবারই আনারুল হক আনা তাগিদ দিয়ে আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন “হেরিটেজ: বাংলাদেশের ইতিহাসের আরকাইভস”-এ। কিন্তু অনেক কৌতূহল ও আগ্রহ থাকলেও সময় ও সুযোগ করে উঠতে পারি নি একবারও। এবার সময়, বলতে গেলে, এক প্রকার কেড়েই নিলেন আনা। নিয়ে গেলেন ৪৫৬-ক কাজলা’য়, অকট্রয় মোড় থেকে পুব দিকে। “হেরিটেজ”-এর প্রাণপুরুষ ড. মো. মাহবুবর রহমান। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রফেসর তিনি। তাঁরই উদ্যোগ, আয়োজন, অর্থায়নে নিজস্ব ভূমি ও ভবনে গড়ে উঠেছে এই গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণাগার। এ এক অসাধারণ কীর্তি। দেশের অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উপকরণ সংগ্রহ করা হচ্ছে এখানে, পাশাপাশি নির্দিষ্ট বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করা হচ্ছে ঐতিহাসিক ও গবেষকদের। ২০০২ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এ পর্যন্ত সংগ্রহ করা হয়েছে ঝালকাঠি ও খাগড়াছড়ি বাদে সকল জেলা সম্পর্কে গ্রন্থ, স্মরণিকা, বার্ষিকী; ১৭২০ শিরোনামের কয়েক হাজার সাময়িকী; সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক, রাজনৈতিক প্রভৃতি বিষয়ে প্রায় ১৫০০টি পোসটার; রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক প্রভৃতি বিষয়ে প্রায় ১৫০০টি লিফলেট; কয়েক হাজার স্মরণিকা; স্কুল, কলেজ, মাদরাসা’র স্মরণিকা ও বার্ষিকী কয়েক শ’; আদিবাসী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বইপত্র; ১৯৯৮ থেকে দৈনিক সংবাদ ও সাপ্তাহিক একতা; প্রতিষ্ঠার সময় থেকে ‘ভ্যানগার্ড’; দৈনিক পত্রিকাগুলোর বিশেষ সংখ্যা; ৫০টি বিষয়ে পেপার ক্লিপিং; ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বর্তমান সময়ের মুদ্রা। এছাড়া “স্থানীয় ইতিহাস” নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত।
বিকাল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে হেরিটেজ। সেদিন যেতে একটু দেরিই হয় আমাদের। তবুও সেখানে গিয়ে কর্মরত পাই অধ্যাপক এম কায়সারউজ্জামানকে, সর্টার আবুল হাশেমকে। ইউসুফ, তোফায়েল, নিজাম ও সেলিম নামের চারজনকে। জানতে পারি হেরিটেজ-এর কর্মী সবাই স্বপ্রণোদিত। ড. মো. মাহবুবর রহমানের বন্ধুবান্ধব, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা, বিভিন্ন জেলার হেরিটেজ-বন্ধুবর্গ এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক। কেউ কোনও সম্মানী-পারিশ্রমিক নেন না, তবে ড. রহমান জোর করেই কিছু-কিছু দেন কাউকে-কাউকে।
হেরিটেজ-এর সংগ্রহ ও সংরক্ষণ দেখে পরিচয় পাই সংশ্লিষ্টদের মেধা ও শ্রমের। সত্যিই অভিভূত হওয়ার মতো এক উদ্যোগ-আয়োজন। পুরনো সাময়িকী দেখতে-দেখতে মনে পড়ে আমার হারিয়ে যাওয়া শ’-শ’ লেখার কথা। এ পর্যন্ত হাবিজাবি যা লিখেছি তার ৭০% ভাগ নিখোঁজ হয়ে আছে নানা পত্রপত্রিকায়। মনে হলো... সে সবের অন্তত ৭০% পাবো এখানেই!
-
সাহিত্য-সাময়িকী


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


