কথাশিল্পী আবু রুশ্দ্ স্মরণে : কিছু স্মৃতি, কিছু কথা
মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্
প্রখ্যাত কথাশিল্পী ও শিক্ষাবিদ আবু রুশ্দ্ মতিনউদ্দিনের ইন্তেকালে আমি গভীরভাবে শোকাহত। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বিশিষ্ট এই কথাশিল্পী তাঁর দীর্ঘ জীবনব্যাপী সাহিত্য সাধনার মাধ্যমে আমাদের কথাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত করে ৯১ বছর বয়সে এই পৃথিবী থেকে চির অন্তর্ধান করেছেন। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন তাঁর সৃষ্ট সমৃদ্ধ সাহিত্যসম্ভার এবং কর্মজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান। পেশায় শিক্ষাবিদ এবং সরকারি চাকরিজীবী হলেও তিনি ছিলেন মূলত কথাশিল্পী এবং সাহিত্যে নিবেদিতপ্রাণ একজন অসামান্য ব্যক্তিত্ব। আবু রুশ্দ্ মতিনউদ্দিন তাঁর পুরো নাম হলেও তিনি সাহিত্য ক্ষেত্রে এবং সংস্কৃতি মহলে আবু রুশ্দ্ নামেই সর্বাধিক পরিচিত ও খ্যাত। তিনি রেখে গেছেন কয়েকটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। তাঁর ‘গল্পসমগ্র’, ‘উপন্যাসসমগ্র’ এবং অন্যান্য গল্প উপন্যাসের বই পাঠ করলে একজন প্রতিভাধর শক্তিমান ও দক্ষ কথাশিল্পীরই পরিচয় পাওয়া যাবে।
আবু রুশ্দ্ মতিনউদ্দিন ছিলেন ঢাকা কলেজে আমার শিক্ষক। ১৯৫০ সালে ঢাকা কলেজে আইএ ক্লাসে অধ্যয়নকালে তিনি ছিলেন আমাদের ইংরেজির শিক্ষক। আমার সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন এ-কালের প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সঙ্গীত বিশারদ মরহুম ওয়াহিদুল হক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ আহসানুল হক, লেখক ও সাংবাদিক শফিক রেহমান, ড. কবিরউদ্দিন আহমদ, লেখক ও শিক্ষাবিদ ড. মুজাফফর আহমদ, মরহুম দাউদ খান মজলিশ, মরহুম আবিদ হোসেন প্রমুখ।
শুধু একজন কথাশিল্পী হিসেবেই নন, একজন শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। তিনি আমাদের যেভাবে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য নিবেদিত চিত্তে পড়াতেন ও শিক্ষা দিতেন, তার তুলনা পাওয়া সহজ নয়। ব্যক্তি আবু রুশ্দ্ ছিলেন অত্যন্ত সুপুরুষ, পোশাকে-আশাকে ধোপদুরস্ত এবং ব্যবহারে অত্যন্ত অমায়িক। এক কথায় বলা যায়, তিনি সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তিত্ব। উচ্চশিক্ষিত পরিবারের সন্তান আবু রুশেদ্র পারিবারিক পরিবেশে সাহিত্য-সংস্কৃতিরও ব্যাপক চর্চা ছিল। তিনি উত্তরাধিকার সূত্রেও সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার নেশা পেয়েছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, তাঁর মেজো ভাই রশীদ করিম একজন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক এবং তিনি কথাসাহিত্যে বিশিষ্ট অবদানের জন্য ‘আদমজী সাহিত্য’ পুরস্কার, বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক এবং আরো অন্যান্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
শ্রদ্ধেয় আবু রুশ্দ্ মতিনউদ্দিন অর্থাত্ লেখক আবু রুশ্দ্ হিসেবে পরিচিত এই প্রখ্যাত কথাশিল্পী ব্রিটিশ শাসনামলে তথা বিভাগপূর্বকালে ১৯৪০ এর দশকেই সাহিত্যচর্চায় আত্মনিবেদিত হন এবং অল্পকালের মধ্যেই একজন কথাশিল্পী তথা ছোট গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসেবেও পরিচিতি ও খ্যাতি লাভ করেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘রাজধানীতে ঝড়’, ‘এলোমেলো’ (নামটি হয়তো সঠিক নাও হতে পারে) এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বহু ছোটগল্প তাঁকে খ্যাতিমান করে তোলে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, তাঁর সমসাময়িক কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, মবিন উদ্দিন আহমদ এবং আরো অনেকে বাংলা কথাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছেন। আমাদের কথাসাহিত্য যে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার মূলে এঁদের এবং তাঁদের পূর্বসূরিদের অবদান অসামান্য। কথাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এঁদের প্রায় সবাই বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক এবং আরো বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। শ্রদ্ধেয় আবু রুশ্দ্ও লাভ করেছেন সম্মান ও মর্যাদা। তিনি ষাটের দশকেই কথাসাহিত্যে বিশিষ্ট অবদানের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কারে ভূষিত হন। যতদূর মনে পড়ে তিনি একুশে পদকসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, শ্রদ্ধেয় আবু রুশেদর মতন একজন শক্তিশালী কথাশিল্পী দীর্ঘকাল অসুস্থ থাকায় আমরা তাঁর অবদানের কথা প্রায় বিস্মৃত হতে চলেছি। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি যে তাঁর দীর্ঘ আত্মজীবনী গ্রন্থাকারে লিখে গেছেন, সে কথা অনেকেরই জানা নেই। এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।
আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আবু রুশ্দ্ মতিনউদ্দিন ছিলেন একজন নিভৃতচারী এবং প্রচারবিমুখ লেখক। তিনি লেখক হিসেবে নিজের আত্মপ্রচারের জন্য কোনো চেষ্টা তদবির করতেন না, এমনকি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের কাছে গিয়ে ধরনা দিতেন না। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি, আবু রুশ্দ্ মতিনউদ্দিন নিজের লেখা নিয়ে সাধারণত কোনো পত্রপত্রিকা অফিসে যেতেন না, সভা সমিতিতেও খুব কম যোগদান করতেন। এটা ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং আত্মমর্যাদাবোধের প্রতীক। কবি আবদুল কাদির সম্পাদিত ‘মাহে নও’ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে আমার চাকরিকালে তাঁর লেখা ছোটগল্প ও অন্যান্য লেখা প্রকাশের সুযোগ আমার হয়েছে। যতদূর মনে পড়ে, সে সময়ে ‘মাহে নও’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ‘বব’ নামক একটি ছোটগল্প সুধীমহলে অভিনন্দিত এবং ব্যাপক প্রশংসিত হয়। পাকিস্তান আমলে প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের সেরা গল্প’ শীর্ষক গ্রন্থেও আবু রুশেদ্র ছোটগল্প অন্তর্ভুক্ত হয়। আরো উল্লেখযোগ্য যে, সে আমলে ইংরেজিতে ‘পাকিস্তানের সেরা গল্পের’ একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। ওই সংকলনেও আবু রুশেদ্র গল্পও অন্তর্ভুক্ত হয় বলে মনে পড়ে। সেকালে প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিক সৈয়দ আলী আহসান সম্পাদিত দুই খণ্ডে প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলনেও আবু রুশেদ্র ছোটগল্প স্থান পায় বলে মনে পড়ে। প্রখ্যাত সাংবাদিক সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও আবদুল গাফফার চৌধুরী সম্পাদিত দুই খণ্ডবিশিষ্ট ছোটগল্প সংকলনেও আবু রুশেদ্র ছোট গল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে মনে পড়ে।
এই কথাগুলো বললাম এ কারণে যে, মনে প্রশ্ন জাগছে এমন একজন কথাশিল্পী যিনি প্রায় ৭০ বছরব্যাপী সাহিত্য সাধনা করেছেন, তাঁকে আমরা তাঁর জীবদ্দশায় এবং মুত্যুর পর যোগ্য সম্মান দিয়েছি কী? কথাশিল্পী আবু রুশেদ্র বিপুল সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন আমার এ রচনার উদ্দেশ্য নয় এবং সেটা সম্ভবও নয়। তবে সংক্ষেপে এটুকু কথা বলব, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ কথাশিল্পী এবং ছোটগল্পকার। আমার ধারণা, তিনি উপন্যাসের চেয়ে ছোটগল্পই লিখেছেন বেশি। তাঁর রচিত ছোটগল্প সংকলন ‘ছোটগল্প সমগ্র’ ও ‘উপন্যাসসমগ্র’ পাঠ করলে আমার বিশ্বাস তাঁর সৃষ্টি ক্ষমতার সঙ্গে পাঠক-সমালোচক সুধীমহল ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবেন। তিনি যে দক্ষতার সঙ্গে ছোটগল্প রচনায় সক্ষম এবং উপন্যাস রচনায়ও দক্ষতার অধিকারী তার পরিচয় মিলবে। কথায় বলে ‘ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটকের পদ্ম সমাজের পঙ্কেই ফোটে’। আকাশ-কুসুম নিয়ে কবিতা লেখা চলে, নিছক কল্পনানির্ভর করেও কবিতা লেখা সম্ভব; কিন্তু গল্প-উপন্যাস-নাটক লিখতে হলে শুধু কল্পনা নির্ভর হলে চলে না, বাস্তব সমাজনির্ভরও হতে হয়, সমাজ পরিবেশ থেকে এমনকি পরিবার থেকেও কাহিনী, চরিত্র আহরণ করতে হয়, গল্প-উপন্যাসের পরিণতিও ঘটাতে হয় বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে। শ্রদ্ধেয় কথাশিল্পী আবু রুশ্দ্ তার কথাসাহিত্য রচনায় এই সত্য বিস্মৃত হননি। তিনি সমাজের ফটোগ্রাফিক রূপায়ণ এবং বাস্তব চরিত্রের ও কাহিনীর হুবহু অনুকরণ করেননি। কিন্তু নিজের সাহিত্যবোধ, সমাজ সচেতনতা এবং শিল্প চেতনা দিয়ে চেনা কাহিনী ও চরিত্রকেই অনন্যরূপে তুলে ধরেছেন।
কবিতা বলি, উপন্যাস বলি, ছোটগল্প বলি, নাটক বলি, সাহিত্যের যে কোনো বিষয়ের কথা বলি না কেন, তার সবই ফুটিয়ে তুলতে হয় ভাষার সাহায্যে। কথাশিল্পী আবু রুশ্দ্ ছিলেন একজন ভাষাশিল্পী এবং কবি মনের অধিকারী ব্যক্তিসত্তা। তাঁর রচনার ভাষা হয়েছে সহজ, সুন্দর, সাবলীল এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কবিত্বময় ও মনোহর। তিনি ছোট ছোট বাক্যে এবং সযত্ন প্রয়োগে তাঁর গল্প-উপন্যাসের ভাষাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। এখানে সামান্য উদ্ধৃতি দিচ্ছি। ‘সারওয়ার শিল্পী। সেদিন বেড়াতে বেড়াতে তার মনে হলো, কার যেন সুন্দর স্নিগ্ধ দুটো চোখ সে দেখতে পেয়েছে। চোখ দুটোর চাউনি বড়ো মধুর—তুলনা হয় না তার কমনীয়তার। সারওয়ার ছবি আঁকবে; কিন্তু চোখ দুটোর সঙ্গে কী রকম দেহ আঁকলে মানানসই হতে পারে? সে ভাবতে লাগল। কামরায় বসে নিবিষ্টমনে কত দিন সারওয়ার তার কল্পনাকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে; রকম রকম রঙ মিশিয়ে নতুন ভঙ্গিতে রেখা টেনে। মন তার খুশি হয়নি। কিসের যেন খুঁত রয়ে গেল। শেষে শিল্পীর একাগ্র নিষ্ঠার জয় হলো। সদ্য সমাপ্ত চিত্রের দিকে অপলক-মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে ভাবতে লাগল—রূপকথার রাজকন্যার মতো এই মানস-সুন্দরী যদি এক দিন তার এই ক্ষুদ্র গ্রহে এসে দেখা দেয়, তা হলে...! সারওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকে।’ (আস্গারীর প্রেম/বুলবুল মাঘ, ১৩৪৩)
কথাশিল্পী আবু রুশ্দ্ কোনোদিন কবিতা লিখেছেন কিনা কিংবা তাঁর কবিতা পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে কিনা, তা আমার জানা নেই। তবে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য যে, তিনি আধুনিক বাংলা কবিতা সম্পর্কে বিভাগ পূর্বকালেই ‘মাসিক সওগাত’ পত্রিকায় এবং ‘মাসিক মোহাম্মদী’তে তিনি কবিতা সম্পর্কে আলোচনা লিখেছেন এবং মুসলমান কবিদের বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছেন। ‘মাসিক সওগাতে’ প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধটির নাম ‘আধুনিক কবিতা ও মুসলিম কবিগণ (২৩-শ বর্ষ ভাদ্র, ১৩৪৮)। এ থেকেই বোঝা যায় আবু রুশেদ্র মনে একজন কবিসত্তার অধিবাস ছিল। সে জন্যই তিনি কবিতার মূল্যায়নে ব্রতী হয়েছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, তিনি শুধু কবিতার মূল্যায়নই করেননি, বাংলা কবিতার অনুবাদও করেছেন ইংরেজি ভাষায়। বাউল সম্রাট লালন ফকিরের গানের যে অনুবাদ করেছেন সে গ্রন্থটির নাম 'ঝড়হমং ড়ভ খধষধহ'.
শ্রদ্ধেয় আবু রুশেদ্র মতো একজন শক্তিশালী কথাশিল্পীর রচনার মূল্যায়ন ভবিষ্যতের সাহিত্যিক ও গবেষকরা করবেন, এ বিশ্বাস আমি রাখি। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে আমার বক্তব্য এখানেই শেষ করছি। আমি বর্তমানে শারীরিকভাবে অসুস্থ। নিজে লিখতে অক্ষম। আমার বক্তব্যে কোনোরূপ ভুলত্রুটি ঘটে থাকলে সুধী পাঠক-সমালোচক ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এটাই প্রত্যাশা।ম
শ্রুতি লিখন : আরিফ-উল-ইসলাম
আবু রুশ্দ্ মতিনউদ্দিন ছিলেন ঢাকা কলেজে আমার শিক্ষক। ১৯৫০ সালে ঢাকা কলেজে আইএ ক্লাসে অধ্যয়নকালে তিনি ছিলেন আমাদের ইংরেজির শিক্ষক। আমার সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন এ-কালের প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সঙ্গীত বিশারদ মরহুম ওয়াহিদুল হক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ আহসানুল হক, লেখক ও সাংবাদিক শফিক রেহমান, ড. কবিরউদ্দিন আহমদ, লেখক ও শিক্ষাবিদ ড. মুজাফফর আহমদ, মরহুম দাউদ খান মজলিশ, মরহুম আবিদ হোসেন প্রমুখ।
শুধু একজন কথাশিল্পী হিসেবেই নন, একজন শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। তিনি আমাদের যেভাবে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য নিবেদিত চিত্তে পড়াতেন ও শিক্ষা দিতেন, তার তুলনা পাওয়া সহজ নয়। ব্যক্তি আবু রুশ্দ্ ছিলেন অত্যন্ত সুপুরুষ, পোশাকে-আশাকে ধোপদুরস্ত এবং ব্যবহারে অত্যন্ত অমায়িক। এক কথায় বলা যায়, তিনি সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তিত্ব। উচ্চশিক্ষিত পরিবারের সন্তান আবু রুশেদ্র পারিবারিক পরিবেশে সাহিত্য-সংস্কৃতিরও ব্যাপক চর্চা ছিল। তিনি উত্তরাধিকার সূত্রেও সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার নেশা পেয়েছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, তাঁর মেজো ভাই রশীদ করিম একজন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক এবং তিনি কথাসাহিত্যে বিশিষ্ট অবদানের জন্য ‘আদমজী সাহিত্য’ পুরস্কার, বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক এবং আরো অন্যান্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
শ্রদ্ধেয় আবু রুশ্দ্ মতিনউদ্দিন অর্থাত্ লেখক আবু রুশ্দ্ হিসেবে পরিচিত এই প্রখ্যাত কথাশিল্পী ব্রিটিশ শাসনামলে তথা বিভাগপূর্বকালে ১৯৪০ এর দশকেই সাহিত্যচর্চায় আত্মনিবেদিত হন এবং অল্পকালের মধ্যেই একজন কথাশিল্পী তথা ছোট গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসেবেও পরিচিতি ও খ্যাতি লাভ করেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত তাঁর উপন্যাস ‘রাজধানীতে ঝড়’, ‘এলোমেলো’ (নামটি হয়তো সঠিক নাও হতে পারে) এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত বহু ছোটগল্প তাঁকে খ্যাতিমান করে তোলে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, তাঁর সমসাময়িক কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে শওকত ওসমান, সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, শামসুদ্দীন আবুল কালাম, মবিন উদ্দিন আহমদ এবং আরো অনেকে বাংলা কথাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছেন। আমাদের কথাসাহিত্য যে আজকের পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার মূলে এঁদের এবং তাঁদের পূর্বসূরিদের অবদান অসামান্য। কথাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য এঁদের প্রায় সবাই বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক এবং আরো বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। শ্রদ্ধেয় আবু রুশ্দ্ও লাভ করেছেন সম্মান ও মর্যাদা। তিনি ষাটের দশকেই কথাসাহিত্যে বিশিষ্ট অবদানের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কারে ভূষিত হন। যতদূর মনে পড়ে তিনি একুশে পদকসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, শ্রদ্ধেয় আবু রুশেদর মতন একজন শক্তিশালী কথাশিল্পী দীর্ঘকাল অসুস্থ থাকায় আমরা তাঁর অবদানের কথা প্রায় বিস্মৃত হতে চলেছি। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়ও তিনি যে তাঁর দীর্ঘ আত্মজীবনী গ্রন্থাকারে লিখে গেছেন, সে কথা অনেকেরই জানা নেই। এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়।
আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আবু রুশ্দ্ মতিনউদ্দিন ছিলেন একজন নিভৃতচারী এবং প্রচারবিমুখ লেখক। তিনি লেখক হিসেবে নিজের আত্মপ্রচারের জন্য কোনো চেষ্টা তদবির করতেন না, এমনকি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের কাছে গিয়ে ধরনা দিতেন না। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি, আবু রুশ্দ্ মতিনউদ্দিন নিজের লেখা নিয়ে সাধারণত কোনো পত্রপত্রিকা অফিসে যেতেন না, সভা সমিতিতেও খুব কম যোগদান করতেন। এটা ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং আত্মমর্যাদাবোধের প্রতীক। কবি আবদুল কাদির সম্পাদিত ‘মাহে নও’ পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে আমার চাকরিকালে তাঁর লেখা ছোটগল্প ও অন্যান্য লেখা প্রকাশের সুযোগ আমার হয়েছে। যতদূর মনে পড়ে, সে সময়ে ‘মাহে নও’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ‘বব’ নামক একটি ছোটগল্প সুধীমহলে অভিনন্দিত এবং ব্যাপক প্রশংসিত হয়। পাকিস্তান আমলে প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের সেরা গল্প’ শীর্ষক গ্রন্থেও আবু রুশেদ্র ছোটগল্প অন্তর্ভুক্ত হয়। আরো উল্লেখযোগ্য যে, সে আমলে ইংরেজিতে ‘পাকিস্তানের সেরা গল্পের’ একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। ওই সংকলনেও আবু রুশেদ্র গল্পও অন্তর্ভুক্ত হয় বলে মনে পড়ে। সেকালে প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিক সৈয়দ আলী আহসান সম্পাদিত দুই খণ্ডে প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলনেও আবু রুশেদ্র ছোটগল্প স্থান পায় বলে মনে পড়ে। প্রখ্যাত সাংবাদিক সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও আবদুল গাফফার চৌধুরী সম্পাদিত দুই খণ্ডবিশিষ্ট ছোটগল্প সংকলনেও আবু রুশেদ্র ছোট গল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে মনে পড়ে।
এই কথাগুলো বললাম এ কারণে যে, মনে প্রশ্ন জাগছে এমন একজন কথাশিল্পী যিনি প্রায় ৭০ বছরব্যাপী সাহিত্য সাধনা করেছেন, তাঁকে আমরা তাঁর জীবদ্দশায় এবং মুত্যুর পর যোগ্য সম্মান দিয়েছি কী? কথাশিল্পী আবু রুশেদ্র বিপুল সাহিত্যকর্মের মূল্যায়ন আমার এ রচনার উদ্দেশ্য নয় এবং সেটা সম্ভবও নয়। তবে সংক্ষেপে এটুকু কথা বলব, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ কথাশিল্পী এবং ছোটগল্পকার। আমার ধারণা, তিনি উপন্যাসের চেয়ে ছোটগল্পই লিখেছেন বেশি। তাঁর রচিত ছোটগল্প সংকলন ‘ছোটগল্প সমগ্র’ ও ‘উপন্যাসসমগ্র’ পাঠ করলে আমার বিশ্বাস তাঁর সৃষ্টি ক্ষমতার সঙ্গে পাঠক-সমালোচক সুধীমহল ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হবেন। তিনি যে দক্ষতার সঙ্গে ছোটগল্প রচনায় সক্ষম এবং উপন্যাস রচনায়ও দক্ষতার অধিকারী তার পরিচয় মিলবে। কথায় বলে ‘ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটকের পদ্ম সমাজের পঙ্কেই ফোটে’। আকাশ-কুসুম নিয়ে কবিতা লেখা চলে, নিছক কল্পনানির্ভর করেও কবিতা লেখা সম্ভব; কিন্তু গল্প-উপন্যাস-নাটক লিখতে হলে শুধু কল্পনা নির্ভর হলে চলে না, বাস্তব সমাজনির্ভরও হতে হয়, সমাজ পরিবেশ থেকে এমনকি পরিবার থেকেও কাহিনী, চরিত্র আহরণ করতে হয়, গল্প-উপন্যাসের পরিণতিও ঘটাতে হয় বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে। শ্রদ্ধেয় কথাশিল্পী আবু রুশ্দ্ তার কথাসাহিত্য রচনায় এই সত্য বিস্মৃত হননি। তিনি সমাজের ফটোগ্রাফিক রূপায়ণ এবং বাস্তব চরিত্রের ও কাহিনীর হুবহু অনুকরণ করেননি। কিন্তু নিজের সাহিত্যবোধ, সমাজ সচেতনতা এবং শিল্প চেতনা দিয়ে চেনা কাহিনী ও চরিত্রকেই অনন্যরূপে তুলে ধরেছেন।
কবিতা বলি, উপন্যাস বলি, ছোটগল্প বলি, নাটক বলি, সাহিত্যের যে কোনো বিষয়ের কথা বলি না কেন, তার সবই ফুটিয়ে তুলতে হয় ভাষার সাহায্যে। কথাশিল্পী আবু রুশ্দ্ ছিলেন একজন ভাষাশিল্পী এবং কবি মনের অধিকারী ব্যক্তিসত্তা। তাঁর রচনার ভাষা হয়েছে সহজ, সুন্দর, সাবলীল এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কবিত্বময় ও মনোহর। তিনি ছোট ছোট বাক্যে এবং সযত্ন প্রয়োগে তাঁর গল্প-উপন্যাসের ভাষাকে আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। এখানে সামান্য উদ্ধৃতি দিচ্ছি। ‘সারওয়ার শিল্পী। সেদিন বেড়াতে বেড়াতে তার মনে হলো, কার যেন সুন্দর স্নিগ্ধ দুটো চোখ সে দেখতে পেয়েছে। চোখ দুটোর চাউনি বড়ো মধুর—তুলনা হয় না তার কমনীয়তার। সারওয়ার ছবি আঁকবে; কিন্তু চোখ দুটোর সঙ্গে কী রকম দেহ আঁকলে মানানসই হতে পারে? সে ভাবতে লাগল। কামরায় বসে নিবিষ্টমনে কত দিন সারওয়ার তার কল্পনাকে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে; রকম রকম রঙ মিশিয়ে নতুন ভঙ্গিতে রেখা টেনে। মন তার খুশি হয়নি। কিসের যেন খুঁত রয়ে গেল। শেষে শিল্পীর একাগ্র নিষ্ঠার জয় হলো। সদ্য সমাপ্ত চিত্রের দিকে অপলক-মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে ভাবতে লাগল—রূপকথার রাজকন্যার মতো এই মানস-সুন্দরী যদি এক দিন তার এই ক্ষুদ্র গ্রহে এসে দেখা দেয়, তা হলে...! সারওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে থাকে।’ (আস্গারীর প্রেম/বুলবুল মাঘ, ১৩৪৩)
কথাশিল্পী আবু রুশ্দ্ কোনোদিন কবিতা লিখেছেন কিনা কিংবা তাঁর কবিতা পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়েছে কিনা, তা আমার জানা নেই। তবে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখযোগ্য যে, তিনি আধুনিক বাংলা কবিতা সম্পর্কে বিভাগ পূর্বকালেই ‘মাসিক সওগাত’ পত্রিকায় এবং ‘মাসিক মোহাম্মদী’তে তিনি কবিতা সম্পর্কে আলোচনা লিখেছেন এবং মুসলমান কবিদের বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছেন। ‘মাসিক সওগাতে’ প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধটির নাম ‘আধুনিক কবিতা ও মুসলিম কবিগণ (২৩-শ বর্ষ ভাদ্র, ১৩৪৮)। এ থেকেই বোঝা যায় আবু রুশেদ্র মনে একজন কবিসত্তার অধিবাস ছিল। সে জন্যই তিনি কবিতার মূল্যায়নে ব্রতী হয়েছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, তিনি শুধু কবিতার মূল্যায়নই করেননি, বাংলা কবিতার অনুবাদও করেছেন ইংরেজি ভাষায়। বাউল সম্রাট লালন ফকিরের গানের যে অনুবাদ করেছেন সে গ্রন্থটির নাম 'ঝড়হমং ড়ভ খধষধহ'.
শ্রদ্ধেয় আবু রুশেদ্র মতো একজন শক্তিশালী কথাশিল্পীর রচনার মূল্যায়ন ভবিষ্যতের সাহিত্যিক ও গবেষকরা করবেন, এ বিশ্বাস আমি রাখি। তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এবং তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে আমার বক্তব্য এখানেই শেষ করছি। আমি বর্তমানে শারীরিকভাবে অসুস্থ। নিজে লিখতে অক্ষম। আমার বক্তব্যে কোনোরূপ ভুলত্রুটি ঘটে থাকলে সুধী পাঠক-সমালোচক ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন এটাই প্রত্যাশা।ম
শ্রুতি লিখন : আরিফ-উল-ইসলাম
-
সাহিত্য-সাময়িকী


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


