Amardesh
আজঃ ঢাকা, বুধবার ১০ মার্চ ২০১০, ২৬ ফাল্গুন ১৪১৬, ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ১.৩০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 কার্টুন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

একুশের বইমেলা : চাই ঢাকার বাইরেও

আইউব সৈয়দ
শেষ হলো প্রাণের মেলা—বাংলা একাডেমীতে মাসব্যাপী অমর একুশের বইমেলা। বই জাতির মননের প্রতীক। জ্ঞান, অনুভূতি, সুস্থতা, বোধ ও বিবেককে জাগ্রত করতে গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক। অন্যদিকে নাগরিক জীবনে সুফলও বয়ে নিয়ে আসে গ্রন্থ। মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘিরে জাতীয় পর্যায়ে যত কর্মকাণ্ড চলে, তার মধ্যে একুশের এ বইমেলা হয়ে উঠছে আমাদের অন্যতম ও ঐতিহ্যবাহী এক সাংস্কৃতিক উত্সব। আমাদের শেকড়ের অনুসন্ধানী হতে যেমন প্রেরণা জুগিয়ে চলে, তেমনি একুশের চেতনাকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। আর এ কারণে একুশের চেতনার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে এবং জাতির মননের প্রতীক হিসেবে পরিচিত বাংলা একাডেমীর আয়োজনে যে একুশের গ্রন্থমেলা। এই আয়োজন জাতির মেধা, মনন ও সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে তাত্পর্যপূর্ণ ঘটনাও বটে। বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে আয়োজিত মাসব্যাপী মেলায় প্রতিবারের মতো এবারও দেশের লেখক, পাঠক, প্রকাশক ও সংস্কৃতি প্রিয় মানুষের এক মহামিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল। শুরু থেকেই সবার মুখরিত উপস্থিতিতে মেলা ছিল প্রাণবন্ত। দেশের সব সংবাদপত্র ও বিভিন্ন টিভি চ্যানেল প্রতিদিন মেলাকে কেন্দ্র করে রিপোর্ট প্রচারের কারণে এবার এ মেলার আবহ দেশের সীমা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। কেবল বই নিয়ে সীমিত ছিল না, লেখক-পাঠকের ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগাযোগের স্থানও পরিণত ছিল। এমনকি বিদেশ থেকেও প্রবাসী বাঙালিদের অনেকে মেলায় এসেছেন বই কিনতে, চেনাজানা মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক আরও মাধুর্য মণ্ডিত করতে।
এবারের সীমিত আকারের মেলায় লোক সমাগম যেমন বেড়েছে তেমনি বিক্রিও বেড়েছে। পত্রিকার তথ্যানুযায়ী বিক্রির ক্ষেত্রে ২৫ ভাগ কমিশন দিয়ে প্রায় ২০ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। বইয়ের বৈচিত্র্য কম থাকা সত্ত্বেও মেলায় এবার বেরিয়েছে রেকর্ড সংখ্যক নতুন বই ৩ হাজার ৩৫৪টি। একজন লেখক হিসেবে বলব, গেল বারের সব মেলা থেকে এবারের মেলা ছিল যথেষ্ট গোছানো ও পরিচ্ছন্ন। তবে শেষ সপ্তাহে কালবৈশাখীর কারণে মেলায় অংশগ্রহণকারী অনেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মেলায় বিষয়ভিত্তিক প্রবন্ধ, ইতিহাস-ঐতিহ্য, অর্থনীতি, ভ্রমণকাহিনী, উপন্যাসসহ শিশুদের ছড়া ও ভূতের গল্প—এমন বইয়ের পাঠক যথেষ্ট ছিল।
এবারের বইমেলাতে বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ সুদূর চট্টগ্রাম থেকে আসা একটি প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দিয়েছে। আমি সে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বসার সুবাদে উপলব্ধি করতে পারলাম যে, ধীরে ধীরে একটি সচেতন পাঠক সমাজ যেন গড়ে উঠছে। এই প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু চট্টগ্রামের ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ক, স্থানীয় কবি-ছড়াকারদের কবিতা/ছড়ার বই প্রকাশ করে সুধী পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমার বিশ্বাস, আগামী বইমেলায় অঞ্চলভিত্তিক কিছু প্যাভিলিয়ন থাকলে (যেমন চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও রংপুর) মেলার সৌন্দর্য যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি বিভিন্ন অঞ্চলের লেখকদের মধ্যে সংযোগ ও মতবিনিময়ের সুযোগও সৃষ্টি হবে।
আরেকটি কথা। একুশের বইমেলা শুধু ঢাকাতেই হবে কেন?
বাংলা একাডেমী বিভাগীয় প্রশাসনের সহায়তায় প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে যদি সাত দিনব্যাপী একটি মেলা আয়োজন করতে পারে, তাহলে মফস্বলে বসে সত্যিকারের গ্রন্থ পিপাসুরা নতুন বইয়ের আস্বাদ গ্রহণ করতে পারেন। এক্ষেত্রে সরকার, বাংলা একাডেমীর পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আমার দৃঢ়বিশ্বাস। তাছাড়া বইমেলার আয়োজনের সঙ্গে এর প্রচার দিকে গুরুত্ব দিলেই মেলাগুলো জনপ্রিয় হবে বলে ধারণা করছি। বই অন্য দশটা পণ্য থেকে যেমন আলাদা, তেমনি বইয়ের সঙ্গে জীবনের যোগ অত্যন্ত গভীর। আর বইমেলা যেন পণ্যের বাজারে পরিণত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। এ ধরনের কাজ করা গেলেই সত্যিকারের দিন বদল করা সম্ভব। নতুন বইয়ের সংখ্যা বাড়লেই মেধা-মনন চর্চা কিংবা সৃজনশীল সাহিত্যের মানোন্নয়নের বিষয়টি নিশ্চিত করে না। নানা বিষয়ের মননশীল ও গবেষণামূলক বইয়ের অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জনপ্রিয় ধারার বইগুলোর মান সম্পর্কে সচেতন পাঠকমাত্রই জানেন।
একুশের বইমেলা ঘিরে নতুন বই, পাঠক, প্রকাশক, লেখক সবই বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে জাতির মেধা-মনন চর্চার দুর্ভিক্ষও। দেশের বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত বিদগ্ধ ব্যক্তিরা গবেষণামূলক কাজে আজকাল আর তেমন উত্সাহিত হন না। কেননা, তাদের উত্সাহ দেয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা-সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর যত বই প্রকাশিত হয়, তার সিংহভাগ এখন প্রকাশিত হচ্ছে একুশের বইমলাকে কেন্দ্র করে। প্রকাশনা পেশা হিসেবে গণ্য হওয়া সত্ত্বেও দেশের প্রকাশনা ব্যবসায় পেশাদারিত্বের শৃঙ্খলা ও দক্ষতা গড়ে উঠছে না।
জনসমাগম ও বই বিক্রি বইমেলার সাফল্য হলেও জাতির জন্য সন্তুষ্টির কারণ হতে পারে না। বাস্তবে অমর একুশের বইমেলা যদি দেশের প্রকাশনাকে মেলানির্ভর করে রাখে কিংবা মানসম্পন্ন বইয়ের প্রকাশ ও বিক্রিতে উত্সাহিত করার বদলে নিম্নমানের সস্তা ধরনের বাণিজ্যকেই উত্সাহিত করতে থাকে, তবে বাঙালির প্রাণের এই মেলা জাতির অগ্রগতিকে ইতিবাচক প্রেরণা জোগাবে কতটুকু?
কপি এডিটর কর্তৃক ছাড়পত্রবিহীন বই প্রকাশের ক্ষেত্রে একুশের বইমেলা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারছে কতখানি? কিংবা মেধা ও মননের দারিদ্র্যের দায়ভার সামগ্রিকভাবে তাদের উপরে বর্তায়? এসব প্রশ্নের সদুত্তর খোঁজা অত্যন্ত জরুরি মনে করছি।


 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?