Amardesh
আজঃ ঢাকা, বুধবার ১০ মার্চ ২০১০, ২৬ ফাল্গুন ১৪১৬, ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩১     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ১.৩০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 কার্টুন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

একুশের বইমেলা : সাফল্য ও ব্যর্থতা

হা সা ন হা ফি জ / আ রি ফ - উ ল - ই স লা ম
নতুন বইয়ের সুগন্ধ ছড়িয়ে শেষ হলো অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বইয়ের মেলা প্রাণের মেলা ভেঙে গেছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিজড়ানো প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণ গোটা ফেব্রুয়ারি মাসজুড়েই ছিল সরগরম। অগণিত ক্রেতা-পাঠকের ভিড়ে প্রাণচঞ্চল ছিল একুশের বইমেলা। লেখক-পাঠক-প্রকাশক সবাই এই মেলার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকেন বছরভর। বাংলাদেশের সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে এই মেলা। সৃষ্টিশীল বইয়ের ৯০ শতাংশেরও বেশি বের হয় একুশের বইমেলায়। এই একটি মাসেই বই বিক্রিও হয় সবচেয়ে বেশি।
মোট ২৮ দিন স্থায়ী একুশের বইমেলায় এবার নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে এক হাজার ৩৫৪টি। গত বছর এই সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৭৪১। বলা হচ্ছে, এবার বই বিক্রি হয়েছে ২০ কোটি টাকার মতো। নতুন বইয়ের প্রকৃত সংখ্যা, বিক্রির প্রকৃত অর্থমূল্যের পরিমাণ একটু এদিক-ওদিক হয়তো হতে পারে। কিন্তু বইমেলার বিপুল জনপ্রিয়তা, প্রচুর নতুন বইয়ের প্রকাশনা এবং খুবই ভালো বিক্রির ব্যাপারে কোনো সংশয় নেই।
মেলার অব্যবহিত পরে এর সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ানের প্রশ্নটি ওঠে। কতদূর সফল হলো এবারের বইমেলা? ব্যর্থতাগুলো কি কি? ভবিষ্যতে মেলা আয়োজনে কোন কোন উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন? এন্তার বই যে বেরুলো, তার মধ্যে গুণগত মানসম্মত বইয়ের সংখ্যা কেন এত অল্প? বইমেলার উন্নয়নে, এর মান বাড়ানোর জন্য কী কী করা আবশ্যক? আমার দেশ সাহিত্য সাময়িকী বিভাগের পক্ষ থেকে আমরা এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম। নবীন-প্রবীণ কয়েকজন প্রকাশক সদ্য সমাপ্ত একুশের বইমেলা সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও প্রস্তাবনা আমাদের খোলামেলা জানিয়েছেন। তাদের সঙ্গে আলাপচারিতার ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন।

বইয়ের মান যাচাই করা জরুরি :
ফরিদ আহমেদ
সময় প্রকাশন
সময় প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী ফরিদ আহমেদ বললেন, এবারের মেলায় অভিনব সফলতা বলতে তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু দেখছি না। মেলার শেষ দিনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ক্রেতা-পাঠকেরা যেভাবে এসেছেন, ভিড়ভাট্টা ডিঙিয়ে পছন্দের বই কিনেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং উত্সাহব্যঞ্জক। মেলার সাফল্য যা আছে, তার সবটুকু কৃতিত্বই আমি এই ক্রেতা-পাঠকদের দিতে চাই।
এবারের একুশের বইমেলার প্রধান ব্যর্থতা হলো : পুরো পথঘাট ছিল বেদখলে। এসব জবরদখলের ব্যাপকতা মেলার গাম্ভীর্য, সৌন্দর্য, পরিবেশ— সবকিছুই ক্ষুণ্ন করেছে। রাস্তায় বাংলা একাডেমী কর্তৃক বরাদ্দকৃত কিছু স্টল এবং হকারদের সর্বগ্রাসী পসরা এই পথ বন্ধ করে রেখেছিল পুরো মাসব্যাপী। টিএসসি মোড় থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত পুরোটা রাস্তা ছিল বেদখল। কেউ কেউ এসব বিশৃঙ্খলা ও অনাচারে যারপরনাই বিরক্ত হয়েছেন। শান্তি, স্বস্তিতে হাঁটা-চলার জো ছিল না। ব্যাপারটা ছিল খুবই অশোভন। রাস্তায় অরুচিকর জিনিসপত্রও বেচাকেনা হয়েছে। এসবের ওপর উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমীর কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না।
বইমেলার পরিসর বাড়ানোর কথা সবাই বলছেন। মূল অংশ বাংলা একাডেমীর ভেতরে রেখেই পরিসর বাড়ানো সম্ভব। আমার মতে, মেলার চৌহদ্দি একাডেমীর দেয়ালের বাইরে নেয়া ঠিক হবে না। তাহলে এর চারিত্র্য বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একাডেমীর ঠিক পাশের জায়গা যেখানে পরমাণু শক্তি কেন্দ্রের অফিস ছিল, সেই জায়গা বাংলা একাডেমীর সঙ্গে একীভূত করে নিয়ে নেয়া যায়। এই দাবিটা অনেক পুরনো।
একুশের বইমেলাকে দুটি জোনে বিভক্ত করা দরকার। একাংশে থাকবে সম্পূর্ণ পেশাদার প্রকাশকদের জন্য নির্দিষ্ট। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বইপত্র থাকবে এখানে। অপর জোনে বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠনকে বরাদ্দ দেয়া হবে। এই অংশ হবে পুরোপুরি অবাণিজ্যিক।
এখন ২০টি বই থাকলেই প্রকাশক হিসেবে গণ্য করা হয়। শুধু ২০টি বই থাকলেই হবে না, সেগুলো প্রকৃত অর্থেই মানসম্পন্ন কিনা, সম্পাদিত কিনা, তা যাচাই করে দেখতে হবে। ক’জন লেখকের সঙ্গে চুক্তি আছে, রয়্যালিটি দেয়ার পদ্ধতি কী, সেসব স্পষ্ট জানাতে হবে। এসব নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করলেই দেখা যাবে, এক/দেড়শ’র বেশি প্রকাশক নেই। প্রকাশকের সংখ্যা কমলে, যথেষ্ট স্পেসও বেরিয়ে আসবে। মেলার স্টলের অবস্থান সম্পর্কে কয়েক স্থানে ইলেকট্রনিক বোর্ড স্থাপন করে মানচিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা দরকার। সামনের রাস্তা (কাজী নজরুল এভিনিউ) পুরোপুরি উন্মুক্ত রাখতে হবে। মেলা চলাকালীন ওই রাস্তা দিয়ে কোনো যান চলাচল করবে না। কোনো স্থাপনা বা হকার বসানো চলবে না। অগ্নিকাণ্ড, ঝড়-বৃষ্টি মোকাবিলার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা রাখতে হবে। নতুন বই বিষয়ে বাংলা একাডেমীর এমন সফটওয়্যার থাকতে হবে, যা দিয়ে সহজেই বই নতুন না পুনর্মুদ্রণ সেই তথ্য সহজেই বের করা সম্ভব হবে।
সময় থেকে এবার নতুন বই বেরিয়েছে ৬০টি। তাদের চলতি বইয়ের সংখ্যা ৮০০।

মেলার স্থায়ী কাঠামো চাই : মজিবর রহমান খোকা
বিদ্যাপ্রকাশ
একুশের বইমেলা কি সব সময় বাংলা একাডেমীতেই হবে, নাকি এর জায়গা বদল করা হবে? এ প্রশ্নের মীমাংসা হওয়া উচিত সর্বাগ্রে। যদি বাংলা একাডেমীতেই করতে হয়, তবে এর স্থায়ী একটা কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। সেই কাজটা করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। এমনটাই মনে করেন বিদ্যাপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মজিবর রহমান খোকা।
তিনি আমার দেশকে বলেন, সাফল্য ও ব্যর্থতার বিষয়টি আসলে আপেক্ষিক। প্রকাশকরা যেটাকে সাফল্য বলেন, একাডেমী হয়তো সেটাকে ব্যর্থতা বলবে। দুই পক্ষের মধ্যে একটা সমন্বয়ের অভাব রয়েছে গোড়া থেকেই। সেই অভাবটা দূর হচ্ছে না কিছুতেই। মজিবর রহমান খোকার প্রশ্ন : একুশের বইমেলার ভেন্যু হিসেবে বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গণ কী স্থায়ী না অস্থায়ী, সে বিষয়টি এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। মেলা সূচনার পর এতগুলো বছর পার হয়ে গেল, এ প্রশ্নের মীমাংসা আজ অব্দি হলো না। এ সমস্যার একটা নিষ্পত্তি হওয়া দরকার সবার আগে। এ কাজ আরও অনেক আগেই করে ফেলা উচিত ছিল। নিশ্চিত হতে না পারলে এ মেলার উন্নয়ন ঘটবে কীভাবে?
তিনি বলেন, একুশের বইমেলার স্থান নিয়ে এখনও মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, মেলা সরিয়ে নিতে হবে। আবার কারও কারও মত, মেলা কোনোমতেই এখান থেকে সরানো চলবে না। মেলা যদি এখানেই রাখতে হয়, তাহলে সেই মতো প্ল্যান নিয়ে এগোতে হবে। বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে স্থায়ী একটা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। সেই কাঠামোতে শুধু বইমেলাই নয়, বছরভর অন্যবিধ মেলারও আয়োজন করা সম্ভব হবে। স্থায়ী কাঠামো মানে চারতলা পাঁচতলা একাধিক ভবন করা যায়। সেখানে লিফট, এসকেলেটরের ব্যবস্থা থাকবে। অন্তত শ’চারেক প্রকাশক যেন একযোগে অংশ নিতে পারেন, সেই মোতাবেক পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। এ প্রকল্পে বিদেশী সহায়তা (আর্থিক, কারিগরি উভয়ই) নেয়া যেতে পারে। এ ভেন্যু অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করা প্রয়োজন। মোটকথা, আগামী ৫০ বছর, একশ’ বছরের চাহিদা, প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে পরিকল্পনা করতে হবে।
এই প্ল্যান বাস্তবায়নে চার-পাঁচ বছর সময়ে লাগতে পারে। এই অন্তর্বতী সময়কালের জন্যও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা দরকার। ফেব্রুয়ারির আগ মুহূর্তে নয়, আগে থেকেই এসব ঠিকঠাক করতে হবে। একাডেমী প্রাঙ্গণের ভূমি সমতল করতে হবে। ভূমি কোথাও উঁচু কোথাও নিচু থাকায় নানা ধরনের অসুবিধে হচ্ছে।
অভিজ্ঞ প্রকাশক মজিবর রহমান খোকা আরও বলেন, মেলার প্রতিদিনকার সময়সীমা করতে হবে সকাল দশটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত। তাতে ক্রেতা-পাঠকরা স্বস্তিতে বই কিনতে পারবেন। এর ফলে ইচ্ছেমত দেখেশুনে বই কেনার সুযোগ বাড়বে । এখন যে সময়সীমা, তাতে ভিড়ভাট্টা লেগেই থাকে সব সময়। বই দেখে, বেছে সিদ্ধান্ত নেয়ার অবকাশ বলতে গেলে মেলেই না। ভিড়ের প্রচণ্ডতা দেখে অনেকে বিরক্ত হন, ভিড়াক্রান্ত বইমেলার ধারে-কাছেও ঘেঁষতে চান না অনেকে।
আপনারা মেলায় প্রকাশিত বইয়ের মান সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। এ প্রশ্নের জবাবে বলব : আমাদের নিজেদের বইয়ের মান, লেখার মান ঠিক আছে। তবে সামগ্রিক বিচারের কথা যদি বলেন, তাহলে বলব, পুরোপুরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি আমার পক্ষে। যেটুকু সম্ভব হয়েছে, তার প্রেক্ষিতে বলতে পারি, অনেকের লেখালেখির চর্চা নেই, তারা টাকার জোরে বই বের করে ফেলছেন, এমনটা দেখা যাচ্ছে। এতে অবশ্য বাধা দেয়ারও কিছু নেই। পাঠকই শেষ বিচারক। যার লেখা পাঠকের ভালো লাগবে, তার বই ভালো চলবে। তবে মিডিয়ার একটা সাপোর্ট দরকার ভালো বইয়ের কাটতি বৃদ্ধির ব্যাপারে। এই বইটা ভালো, কেন ভালো—এসব বিষয় যদি মিডিয়া তুলে ধরে, তাহলে ক্রেতা-পাঠকদের জন্যে ভালো হয়। তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কোন বইটি কিনবেন, কেনইবা কিনবেন। বইমেলার ঠাসা ভিড়ে ঠেলাঠেলি করে সবার পক্ষে ধীরে-সুস্থে পছন্দের বইটি কেনা সম্ভবপর নয়।
বিদ্যাপ্রকাশ থেকে এবারের মেলায় নতুন বই বেরিয়েছে ৩৪টি। এই প্রকাশনা সংস্থা থেকে এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।

নতুন লেখকদের উত্সাহিত করতে হবে : আহমেদ মাহমুদুল হক
মাওলা ব্রাদার্স
মাওলা ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী আহমেদ মাহমুদুল হক বলেন, অমর একুশে বইমেলা লেখক-প্রকাশক-পাঠকদের মিলনমেলা, আমাদের প্রাণের মেলা। আমি মনে করি, বইমেলার পুরোটাই প্রাপ্তি ও অর্জন। তাই বইমেলার ‘সাফল্য ও ব্যর্থতা’—এই নিরিখে বিচার্য বিষয় নয়। ১৯৭২ সালে ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্রথম বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। সেটা ছিল আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ। সেই বইমেলায় মুক্তধারা, স্টুডেন্ট ওয়েজ, নওরোজ কিতাবিস্তান, খান ব্রাদার্স এন্ড কোম্পানী, আমাদের প্রতিষ্ঠান ও একটি বিদেশী দূতাবাস অংশগ্রহণ করে। সেই থেকে বইমেলা শুরু। তারপর ১৯৭৯ সাল থেকে বাংলা একাডেমীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে বইমেলা শুরু হয় এবং নাম ধারণ করে অমর একুশে বইমেলা, যা আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। প্রতিবারের মতো এ বইমেলায় প্রচুর পাঠক, দর্শক ও ক্রেতার সমাগম হয়েছে এবং নতুন বইও প্রকাশিত হয়েছে প্রচুর। যদিও বাংলা একাডেমীর বর্তমান চত্বরে এত বড় মেলা পরিচালনা করা সত্যিই দুরূহ, তাতে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকতে পারে।
তিনি জানান, ধীরগতিতে হলেও আমাদের সৃজনশীল ও মননশীল প্রকাশনা শিল্পের প্রবৃদ্ধি ঘটছে। প্রকাশক ও প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাংলা একাডেমীর বর্তমান চত্বরে প্রকাশকদের পক্ষে বই প্রদর্শন করা এবং পাঠক ও ক্রেতাদের পক্ষে স্বচ্ছন্দে নিজেদের প্রয়োজনীয় ও পছন্দের বই সংগ্রহ করা এক কঠিন ব্যাপার। তাই আমাদের প্রস্তাব হচ্ছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে ঘিরে সরকারের যে ‘সংস্কৃতি বলয়’ করার পরিকল্পনা রয়েছে, তা একাডেমীকে দেয়া যেতে পারে, (কেননা পরমাণু শক্তি কমিশন অন্যত্র স্থানান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়াধীন আছে।) তাতে বর্তমানের স্থান সংকুলানের সমস্যার সমাধান হতে পারে।
আহমেদ মাহমুদুল হক বলেন, এই মেলায় প্রবীণ-নবীন লেখকদের প্রায় ৩৫০০ নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। তবে, প্রকাশিত বইয়ের মান নিয়ে কথা উঠেছে। আমি মনে করি, লেখকদের বিশেষ করে নবীন লেখকদের মান নিয়ে প্রশ্ন না করে, বরং তাদের লেখায় যদি কোনো ভুল-ত্রুটি থেকে থাকে, তা ধরিয়ে দিয়ে লেখার ব্যাপারে উত্সাহ জোগাতে হবে, কেননা এরাই আগামী দিনের লেখক।
পাশাপাশি আমি আমার সহযোগী প্রকাশকদের বিশেষ করে নতুন প্রকাশকদের বই প্রকাশের ব্যাপারে আরও পেশাদারিত্বের পরিচয় দেয়ার আহ্বান জানাব। বিশেষ করে পাণ্ডুলিপি নির্বাচন ও তার নিজের লগ্নীকৃত পুঁজি ফেরত আনার ব্যাপারে নিশ্চয়তার প্রশ্নে বলছি এ কথা। নতুন প্রকাশক যদি প্রথমেই তার পুঁজি হারিয়ে ফেলেন, তাহলে নতুন প্রকাশকরা যে উদ্যম ও উত্সাহ নিয়ে প্রকাশনা শিল্পে এসেছিলেন, তার দ্বিগুণ নিরুত্সাহিত হয়ে ফিরে যাবেন। তাতে এ শিল্পে নতুনদের আগমন ঘটবে না।
মাওলা ব্রাদার্স এবার বের করেছে ৬০টি নতুন বই। এই সংস্থা থেকে এ যাবত্ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা এগারোশ’।


শুধু প্রকৃত প্রকাশকদেরই স্টল দিতে হবে : মনিরুল হক
অনন্যা
অনন্যা’র স্বত্বাধিকারী মনিরুল হকের মন্তব্য : কোনো ধরনের অঘটন ছাড়াই এবারের একুশের বইমেলা সম্পন্ন হয়েছে, এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য। শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু পরিবেশে মেলা যে হতে পেরেছে, সেটা বেশ স্বস্তির কথা। একদিনের ঝড়-শিলাবৃষ্টিতে বইমেলার ছন্দপতন ঘটেছিল। ক্রেতা-পাঠকরা বিড়ম্বিত হয়েছেন, প্রকাশক-বিক্রেতারা ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছেন। তবে সেটা তো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা। এর উপরে কোনো মানুষের হাত নেই।
ব্যর্থতার কথা যদি জানতে চান, তাহলে বলব যে, উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমী যে নিয়মনীতি করে, তা নিজেরাই মানে না। সে কারণে প্রতি বছরই বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। নিয়মকানুন তারা করে ঠিকই, কিন্তু তা রক্ষা করতে পারে না। মেলা প্রাঙ্গণের বাইরেও স্টল ছিল। এটা সামগ্রিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক যতই বলুন না কেন, কোনো রাজনৈতিক চাপ তার ওপর ছিল না, সে কথা আমি বিশ্বাস করি না। রাজনৈতিক ও অন্যান্য চাপ না থাকলে রাস্তায় এত স্টল হলো কেন, কীভাবে?
মনিরুল হক ভবিষ্যতে একুশের বইমেলার উন্নয়ন ও উত্কর্ষ অর্জনে কতিপয় প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেছেন। আমার দেশকে তিনি বলেন, যারা প্রকৃত প্রকাশক, মেলার স্টল শুধু তাদের জন্যই বরাদ্দ করতে হবে। প্রকাশিত বইয়ের মান দেখে যেন এটা করা হয়। মেলার স্থান বাড়ানোর ব্যাপারে এখন থেকেই চিন্তাভাবনা করতে হবে। উদ্যোগ-পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে। বাংলা একাডেমী মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত প্রতিষ্ঠান। এটি আমাদের আবেগের জায়গা, ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান। এই জায়গায় মেলার মূল কেন্দ্র রেখে পরিসর বাড়াতে হবে। জায়গা কীভাবে বাড়ানো যায়, সে ব্যাপারে এখনই উদ্যোগ না নিলে আগামী বছরও সঙ্কট হবে। সমস্যা যে তিমিরে ছিল, থেকে যাবে সেই তিমিরেই। সেটা কিছুতেই কাম্য নয়।
আমরা প্রকাশক হিসেবে চাই বড়সড় স্টল। চাই প্যাভিলিয়ন। ক্রেতা-পাঠক যেন স্বচ্ছন্দে নির্বিঘ্নে ঘুরেফিরে মনের মতো বই কিনতে পারেন, সেই পরিবেশ। এসব নিশ্চিত করার জন্য আরও বেশি জায়গা লাগবে। একাডেমী সংলগ্ন পরমাণু শক্তি কেন্দ্র অফিস চত্বরটা পেলে জায়গা অনেকখানি বাড়ে। রাস্তায় কোনোমতেই কোনো স্টল থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। রাস্তার স্টলের কারণে ঠিকমত হাঁটাচলা করতে পারেন না মেলায় আসা বিপুলসংখ্যক মানুষ।
মনিরুল হক বলেন, আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে মেলায় টিকিট পদ্ধতি প্রবর্তনের পক্ষপাতী। কিন্তু একুশের বইমেলার সঙ্গে যেহেতু ভাষা, আবেগ-অনুভূতির প্রশ্ন জড়িত, সেজন্য বৃহত্তর বিবেচনায় টিকিট চালু না করাই ভালো।
তিনি বলেন, শুনতে পাচ্ছি এবার সাড়ে তিন হাজার নতুন বই বেরিয়েছে। আমি তো চাই এ সংখ্যা আগামী বছর পাঁচ হাজারে উন্নীত হোক। যত বেশি বই বেরুবে, তত ভালো। যেসব বই গুণগত মানের বিচারে সুবিধাজনক নয়, সেগুলো পাঠকরাই প্রত্যাখ্যান করবেন। প্রকাশক হিসেবে আমরা এই বিচার করতে পারি না। এটাও ঠিক যে, একজন নতুন লেখক শুরুতেই তার জীবনের সেরা লেখাটি লিখে ফেলতে সক্ষম হন না। দু’চারজন ব্যতিক্রম অবশ্যই আছেন। তাদের কথা স্বতন্ত্র। নতুন বইয়ের মধ্যে যেগুলো ভালো, সেগুলোই পাঠকদের আকৃষ্ট করবে। ভালো লেখাই টিকে থাকবে শেষ পর্যন্ত। অখাদ্য আবর্জনা কোনোভাবেই স্থায়িত্ব পেতে পারে না।
অনন্যা থেকে এবারের একুশের বইমেলায় নতুন বই বেরিয়েছে ১১০টি। অনন্যা প্রকাশিত বাজার চলতি বইয়ের সংখ্যা এক হাজারেরও বেশি।


 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?