Amardesh
আজঃ ঢাকা, রোববার ২৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ১৩ পৌষ ১৪১৬, ৭ মহররম ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার এখনও স্বপ্ন

হারুন-অর-রশিদ
১৯৭০ সালে উচ্চতর শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে দেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু আবাসিক হলেও নিজ কক্ষের বাইরে পড়ালেখার সুযোগ নিতান্তই কম। বিভিন্ন বিভাগে সেমিনার থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে একমাত্র গ্রন্থাগার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। সেটিও আজ বই, আসন ও লোকবল সংকটসহ নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার ৩৯ বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাগার ভবন তৈরি হয়নি। এছাড়া গ্রন্থাগারের মূল চালিকা শক্তি বই ক্রয় দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ বলে জানা গেছে।
১৯৭০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-বেরুনী হল সংলগ্ন একতলা ভবনের একটি কক্ষে গ্রন্থাগারের কাজ শুরু হয়। পরে শিক্ষার্থী ও গবেষকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রন্থাগারের স্বতন্ত্র ভবন নির্মাণের জন্য ১৯৭৯ সালের ৩০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রন্থাগার ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হলেও এখনও পরিপূর্ণ রূপ লাভ করেনি। ১৯৭৯ সালে ত্রিতল বিশিষ্ট গ্রন্থাগার ভবনটি ১ লাখ বর্গফুট আয়তনে নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয় কিন্তু তৈরি করা হয় মাত্র ৫৫ হাজার বর্গফুটে। বিগত ২৯ বছরেও বাকি ৪৫ হাজার বর্গফুট নির্মাণ করা হয়নি। বরং ২০০৭ সালে গ্রন্থাগারটির নিচতলার একটি বড় অংশ সাইবার সেন্টারের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে গ্রন্থাগারটির উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রমাণ মেলেনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এদের অধিকাংশই গ্রামের দরিদ্র কৃষক ও মধ্যবিত্ত নিম্ন আয়ের পরিবারেরর সন্তান। বই কেনার মতো যথেষ্ট সামর্থ্য না থাকাই কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার তাদের একমাত্র ভরসাস্থল। কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল ও বইবিহীন এ গ্রন্থাগার শিক্ষার্থীদের সেবা দেয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। বর্তমানে গ্রন্থাগারটি পরিচালনার জন্য ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক মেসবাহ-উস-সালেহীন-এর তত্ত্বাবধানে ১৩ জন কর্মকর্তা ও ৩৬ জন কর্মচারী নিয়োজিত আছে। এত কমসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে কখনোই ১০ হাজার শিক্ষার্থীর যথার্থ সেবা দেয়া সম্ভব নয়। শিক্ষার্থীরা জানান, গ্রন্থাগারের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যথেষ্ট আন্তরিক কিন্তু জনবলের অভাব শুধু আন্তরিকতা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
গ্রন্থাগারের কাগজে-কলমে বই, জার্নাল ও রেফারেন্স বইসহ মোট ১ লাখের বেশি বই রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, বেশির ভাগ বই পাওয়া যায় না। দীর্ঘ ৩৯ বছর পেরিয়ে আসা সত্ত্বেও গ্রন্থাগারটিতে এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণ গ্রন্থ এবং উপকরণ সংযোজন করা হয়নি বলে দাবি করেছেন অনেকেই। গ্রন্থাগারের প্রাচীন আমলের জটিল ক্যাটালগ শনাক্তকরণের রহস্য দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে অনেক শিক্ষার্থী ভেদ করতে পারেন আবার অনেকেই নিরাশ হয়ে ফিরে আসেন। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ক্যাটালগ পাওয়া গেলেও পাওয়া যায় না কাঙ্ক্ষিত বইটি। বেশির ভাগ প্রয়োজনীয় বইয়ের ক্যাটালগ থাকলেও বইটি গ্রন্থাগারে অনুপস্থিত। যদিও বর্তমানে ইংরেজি বইয়ের জন্য কম্পিউটার ক্যাটালগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ওই বইটি গ্রন্থাগারে একটিমাত্র কপি ছিল, যা কোনো শিক্ষক নিয়ে আর ফেরত দেননি। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ কনফাইন্ড কপি বই যেগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীরা ইস্যু করতে পারে না সে বইগুলো শিক্ষকের আত্মীয়-স্বজন ও শিক্ষকের প্রিয়ভাজন শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কার্ড ব্যবহার করে উঠিয়ে পরীক্ষা শেষ না পর্যন্ত আর জমা দেয় না। নিয়মানুসারে শিক্ষার্থীরা ১ কপি থাকা বই ইস্যু করতে পারে না এবং ইস্যুকৃত বই ১৫ দিনের মধ্যে ফেরত দিতে হয়, ফেরত না দিলে জরিমানা আদায় করা হয়। কিন্তু শিক্ষকদের কার্ডে ইস্যু করা বইয়ের ক্ষেত্রে একই নিয়ম থাকলেও তা মানা হয় না। গ্রন্থাগারের আরেকটি প্রকট সমস্যা হচ্ছে বসার জায়গার অভাব। ফলে ক্রমাগত ভোগান্তির শিকার হয়ে শিক্ষার্থীরা গ্রন্থাগার বিমুখ হয়ে পড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য দ্বিতীয় তলায় মাত্র ১৫০টি বসার আসন রয়েছে। হিসাব করে দেখা যায়, প্রতি ৬৬ জন শিক্ষার্থীর জন্য ১টি করে আসন বরাদ্দ। গ্রন্থাগারে সকাল ৮টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত এবং বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৮টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীর প্রচণ্ড ভিড় থাকায় খালি জায়গা পাওয়া যায় না। তিনতলা বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের নিচতলায় রয়েছে বুক সেলফ ও ক্যাটালগ অংশ। তৃতীয় তলার পূর্বদিকে রয়েছে গ্রন্থাগারের অফিস, দক্ষিণ দিকে রয়েছে এমফিল ও পিএইচডি গবেষকদের জন্য আলাদা ১০টি কক্ষ। কক্ষগুলো কারও না কারও নামে বরাদ্দ থাকলেও তা অধিকাংশ সময় ফাঁকা থাকে। সেখানে ও তার আশপাশে রাখা বইপত্রের ওপর ময়লার স্তূপ জমা হয়ে রয়েছে।
এছাড়া গ্রন্থাগারেরর বেশির ভাগ বই অনেক পুরনো। ছেঁড়া-কাটা বইগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠা ও ছবিগুলো নেই। বই সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না প্রশাসন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক বই আছে, যেগুলোর প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠা ছেঁড়া। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মুনির চৌধুরীর মীর মনসা, মীর মশাররফ হোসেনের সাহিত্যকর্ম ও সমাজ চিন্তা, অদ্বৈত মল্লবর্মণের রচনাসমগ্র, কালিদাসের মেঘদুত (বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদ), A Dictionary of Indian history বইগুলোর বিভিন্ন অংশ ছেঁড়া-কাটা পওয়া যায়। এছাড়া আরও প্রায় কয়েক হাজার বই পুরনো ও ছেঁড়া হওয়ায় ছাত্রছাত্রীদের বিভ্রান্তির শিকার হতে হয়। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজেট পাস করা হলেও বই কেনার জন্য কোনো আলাদা বরাদ্দ দেয়া হয় না বলে জানা গেছে। এ বছর গ্রন্থাগারের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য সংখ্যক বই কেনা হয়েছে। তাছাড়া কতিপয় দুষ্কৃতকারী শিক্ষার্থীর কারণে গ্রন্থাগারের পরিবেশ আরও অসহনীয় হয়ে উঠেছে। অনেক শিক্ষার্থী সকালে এসে বই উঠিয়ে টেবিলে রেখে যায়, যেন ওই বই কেউ না পড়তে পারে। আবার অনেকে টেবিলের ওপর খাতাপত্র রেখে পরের দিনের জন্য আসন দখল করে রাখে। কিছু কিছু শিক্ষার্থী বইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটে নিয়ে বই ফেরত দেয়। পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে বই ফেরত দেয়ার সময় দেখে নেয়া সম্ভব হয় না বলে তারা এ সুযোগ গ্রহণ করে। গ্রন্থাগারের দিকে সংশ্লিষ্টরা সুদৃষ্টি দিলেই এর অনেক সমস্যা সহজেই সমাধান করা সম্ভব বলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করেন। এছাড়া সুষ্ঠু পরিকল্পনার আলোকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার পরিচালনা করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষার পরিবেশ আরও সমৃদ্ধ হবে।


 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?