নতুন করেই শুরু ওদের
আসিফ শাহরিয়ার কল্লোল
প্রিমিয়ার ক্রিকেট লীগে নতুন অনেক খেলোয়াড়ের সঙ্গে পুরনো অনেকেই ভালো খেলছে। তাদের মধ্যে আইসিএল ফেরতদের মধ্যে ভালো খেলেছেন শাহরিয়ার নাফিস, আফতাব আহমেদ, অলক কাপালি, তাপস বৈশ্য, মোহাম্মদ শরিফ। তাদের মধ্যে অলক, আফতাব, শাহরিয়ার ও ধীমান জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজের জন্য ঘোষিত ২৬ জনের দলে রয়েছেন। নির্বাচকরা তাদের দলে ডেকে নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণ করেছেন। ক্রিকেটভক্তরা এখন অপেক্ষা করছে কবে শাহিরয়ার নাফিস আর আফতাব আহমেদরা দলে ফিরে আসবে। তারা বিসিবি’র সব সিদ্বান্তকে মেনে নিয়েই সামনে এগোচ্ছেন। বাংলাদেশ তথা বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য শান্তির বার্তার বিপরীতে মাথায় চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছিল ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লীগ (আইসিএল)। সেখানে অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তারপর অনেক নাটকের পর আবার বিদ্রোহী লীগের নামে চালু হওয়া এই টুর্নামেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সবার মধ্যে এক ধরনের প্রশান্তি চলে আসে। বাংলাদেশেও অলক কাপালি, আফতাব আহমেদ, শাহরিয়ার নাফিসের জাতীয় দলে ফেরার পথ সুগম হয়। বাংলাদেশ জাতীয় দল যখন সমমানের কোনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলে তখন বেশ ক’জন ব্যাটসম্যানকে নিয়ে তাদের চিন্তা থাকে। আফতাব আহমেদ যতদিন ছিলেন ততদিন তাকে নিয়েই বেশি করে চিন্তাটা করা হতো। গত ৪ ডিসেম্বর মোহামেডানের বিপক্ষে মাঠে নামার আগে আবাহনীর টিম ম্যানেজমেন্ট কি একবারও চিন্তা করেনি আফতাবকে নিয়ে। আর যদি না করে থাকে তাহলে যে তা ছিল কত বড় ভুল সেটা ম্যাচ চলাকালীন টের পাওয়া গেছে হাড়ে হাড়ে। আইসিএল নামক নিষিদ্ধ ক্রিকেট খেলতে গিয়ে এমনিতে নিজের সোনালি ভবিষ্যেক অনেকটাই ধ্বংস করে দিচ্ছিলেন। এবার তা শুধরে নেয়ার সুযোগ এলে সেটা পুরোপুরিই কাজে লাগালেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। সেদিন নিজ দল ও প্রতিপক্ষের আশরাফুল, সাকিব, রনি তালুকদার, নাদিফ চৌধুরীরা সবাই বড় স্কোরের আশা জাগিয়েছিলেন। আশা জাগিয়েও কেউ হাফ সেঞ্চুরি কিংবা সেঞ্চুরির দেখা পাননি। কিন্তু আইসিএল ফেরত আফতাব হতাশ করেননি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাবলীল ব্যাট করে তুলে নিয়েছেন সেঞ্চুরি। এই ড্যাশিং ব্যাটসম্যানের অপরাজিত ১০৭ রানে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আবাহনীকে ৬ উইকেটে হারিয়ে শিরোপা জয়ের পথে এক ধাপ এগিয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান। মোহামেডান-আবাহনী ম্যাচ মানেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা আর উত্তেজনায় ঠাসা। কিন্তু গত ৪ ডিসেম্বর ছুটির দিনেও মিরপুরে প্রিমিয়ার ক্রিকেটের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটিকে একপেশে লড়াইয়ে পরিণত করেন আফতাব। আফতাবের আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে ১৬.৫ ওভার বা ১০১ বল হাতে রেখেই লীগে টানা দশম জয় তুলে নেয় মতিঝিলপাড়ার দলটি। ১০৭ রানের ইনিংস খেলে আফতাব দলকে শুধু জয়ই উপহার দেননি, জাতীয় দলে ফেরার পথও মসৃণ করেছেন। জাতীয় দলের নির্বাচক নাঈমুর রহমান দুর্জয় জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্তির কথা সরাসরি না বললেও ইনিংসটির কথা বলতে ভুল করেননি, ‘আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ আমার দেখা স্থানীয় ক্রিকেটারদের সেরা ইনিংস।’ নিজের ইনিংস সম্পর্কে আফতাব বলেন, ‘আমি ব্যাট করতে নামার সময়ই সিদ্ধান্ত নিই, উইকেটে টিকে থেকে ব্যাটিং করার। যদি উইকেটে টিকে থাকতে পারি, তাহলে কেউই আমাকে আউট করতে পারবে না।’ মোহামেডানের এই ড্যাশিং ব্যাটসম্যান নিজের ওপর আস্থা রেখে ব্যাট করে শেষ পর্যন্ত তিন অঙ্কের ম্যাজিক ইনিংস খেলেই মাঠ ছাড়েন। প্রতিপক্ষের ছুড়ে দেয়া ১৯২ রান তাড়া করতে নেমে ৭০ রানে ৩ উইকেট খুইয়ে চাপের মধ্যে পড়েছিল মোহামেডান। কিন্তু চতুর্থ উইকেট জুটিতে রিয়াদকে নিয়ে আফতাব ৯৭ রান যোগ করে দলের জয় সহজ করে দেন। ইনিংসে যে সূচনা এনে দেন সে সূচনার সমাপ্তি টানেন আফতাব ১০০ বলে ১৫ বাউন্ডারি ও ২ ছক্কায় ১০৭ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে। এর মধ্যে ১ ছয় ও ৩ চারে ২১ রান তুলে নেন শিবলুর ওভারে। তাই আফতাবের এমন ইনিংসের পর শিরোপা জয়ের স্বপ্নটা দেখতেই পারে মোহামেডানের অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট—‘আমরা শুরু থেকেই এভাবে খেলতে চেয়েছি। আর আবাহনীর বিপক্ষে আফতাব যা করে দেখাল তাতে করে সে এখন দেশকে অনেক কিছুই দেয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।’ আর আফতাব বললেন, ‘আমার কাজ রান করে যাওয়া, সেটা করে যাচ্ছি। এখন নির্বাচকরা যদি প্রয়োজন মনে করেন তাহলে দলে নিতে পারেন। আমার যেভাবে খেলার প্রয়োজন হয় ঠিক সেভাবেই খেলে যাচ্ছি।’ তাই যারা আইসিএলে খেলেছেন তারা এখন এটাকে ডেড ইস্যু বলেই মনে করে। আবাহনীর হয়ে খেলতে নামার আগে আইসিএল নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সময়ই পাকিস্তানের অলরাউন্ডার আবদুল রাজ্জাক বললেন, আইসিএলে যারা খেলতে গিয়েছিল, সবারটা না বললেও আমি নিজেরটা বলব, এটা ছিল চরম এক ভুল কাজ। এখন নতুন করে ফিরে আবার সেই সময়কে ভুলে যেতে চাই। যেমনভাবে স্বীকার করেছিলেন এক সময় বাংলাদেশ জাতীয় দলের সহ-অধিনায়ক শাহরিয়ার নাফিস। বাংলাদেশের ক্রিকেটে তারকা ক্রিকেটারের তকমাটা বেশ আগে থেকেই লাগানো বাঁহাতি ওপেনার শাহরিয়ার নাফিসের। ২০০৫ সালে ন্যাটওয়েস্ট সিরিজে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচসেরা ৭০, তার পরের বছর টেস্ট ক্রিকেটে ফতুল্লাতে সেই অজিদের বিপক্ষে ১৩৮ রানের চমত্কার ইনিংস ছাড়া জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিনটি সেঞ্চুরি নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বিদ্রোহী লীগে খেলতেই যেন গিয়েছিলেন ক্রিকেট কর্মকর্তাদের সঙ্গে অভিমান করতে। এখন ফিরে এসে নিজেকে প্রমাণের লড়াইয়ে ব্যস্ত এই বাঁহাতি। এবারের প্রিমিয়ার ক্রিকেট লীগের প্রথম সেঞ্চুরিটিও এসেছে তার ব্যাট থেকে। পারটেক্সের বিপক্ষে তৃতীয় রাউন্ডের ম্যাচে তার ১০৩ রানের ওপর ভর করে ২৬৬ রানের বড় পুঁজি সংগ্রহ করে গাজী ট্যাঙ্ক। এর আগে সিসিএসের বিপক্ষে ম্যাচজয়ী ৬৫ রানের ইনিংস খেলেন নাফিস। এখন পর্যন্ত লীগের আলোচিত মোহামেডানের বিপক্ষেও ৭০ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলেন বাঁহাতি এই ওপেনার। সর্বশেষ ভিক্টোরিয়ার বিপক্ষে ৩৭ রান করলেও ম্যাচটা হেরে সুপার লীগের আশা শেষ হয়ে যায় তাদের। তাই ৩১ ডিসেম্বরের কুলিং পিরিয়ড শেষে তাকে জাতীয় দলের জন্য বিবেচনা না করার কোনো উপায় নেই। কোচ সিডন্স সুযোগ পাওয়া এই চারজনকে নিয়ে ঈদের আগে কিন্তু একটা সেশনও কাটিয়েছেন।


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


