Amardesh
আজঃ ঢাকা, সোমবার ২১ ডিসেম্বর ২০০৯, ৭ পৌষ ১৪১৬, ৩ মহররম ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ সময় : রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

ডিজিটাল বাংলাদেম : শুভঙ্করের ফাঁকি

গোলাম মোস্তফা
ইদানিং আমাদের চারপাশে অনেক কিছু ডিজিটাল হয়ে পড়ছে। এই যেমন ডিজিটাল টাইম, ডিজিটাল হেয়ারকাট, ডিজিটাল রাজনীতিসহ আরও অনেক কিছুর সঙ্গে ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে ডিজিটাল শব্দটির ব্যাবহার। জাতীয়ভাবেও নাকি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে বিস্তর কর্মপরিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়গুলোতে যোগ করা হবে আইটি সুবিধা। টেন্ডার বাক্স বা ব্যালট বাক্স নিয়ে থাকবে না টানা-হেঁচড়া। ফাঁকি দেয়া যাবে না কোনো ইউটিলিটি বিল বা রাজস্ব। সিকিউরিটি ক্যামেরাকে ফাঁকি দিয়ে হবে না কোনো অপরাধ। বাসায় বসেই সেরে ফেলতে পারা যাবে অফিসের মিটিং, দেশি-বিদেশি সব কেনাকাটা, বাচ্চার স্কুলের বেতন, ইন্সুরেন্সের কিস্তি, ব্যাংকিংসহ আরও অনেক কিছু।
কী এই ডিজিটাল বাংলাদেশ
ডিজিটাল বাংলাদেশ করতে গিয়ে সরকার ও অন্যান্য মহল, যারা বিভিন্ন ডিজিটাল পণ্য প্রদর্শনীর ফিতা কাটছেন বা হাততালি দিচ্ছেন; তারা কি জাতিকে বলতে পারবেন ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে আপনারা কী বোঝাতে চাচ্ছেন? নাকি জনগণকে সম্পৃক্ত না করেই আপনারা তা করে ফেলবেন? ডিজিটাল দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করার নামে যেভাবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পণ্যের বাজার বৃদ্ধির চেষ্টা চালানো হচ্ছে তার ভবিষ্যত্ কি? এম্বেডেড ইঞ্জিনিয়ারিং বা মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স টেকনোলজির উন্নয়নকে পাশ কাটিয়ে ডিজিটাল দেশ গঠনের যে পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়েছে তা একটা শুভঙ্করের ফাঁকি। আগামী প্রজন্ম এই নেতৃত্বকে কীভাবে মূল্যায়ন করে তা ভেবে দেখা জরুরি ।
সামনে বাড়বে ব্যবধান
ধরা যাক, ২০২১ সাল নাগাদ এমন হবে যে বিদেশি তথ্যপ্রযুক্তির পণ্য ও সেবাগুলো দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করবেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়ে গেছে বলবেন। একেকজনের পণ্য প্রতিষ্ঠা করার সময় অনেকে হয়তো লাভবানও হবেন। কিন্ু্তু ডিজিট কী তা-ই কখনও বুঝবেন না অথবা এই ডিজিটগুলো নিয়ে যারা খেলাধুলা করে তাদের কাছে নানাভাবে হয়ে থাকবেন জিম্মি। আবার এই ব্যবধান সামনে এত বড় হবে যে তখন আর শুরু করার জায়গাটাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ উচ্চ গতিশীল প্রযুক্তি উন্নয়নের ধারাবাহিকতা চোখের পলকে ম্লান করে দিচ্ছে তার পেছনের চলনরেখা। অতীতে আমরা অনেকবার দেখেছি গাদা গাদা অর্থ ব্যয় করে কেনা হয়েছে অত্যাধুনিক সব যন্ত্রপাতি, কখনও কখনও ৫ টাকার জিনিস ৫০ টাকায়; কিন্তু তা বাক্সবন্দিই থাকছে, পরের বছর আবার হচ্ছে টেন্ডার। আবার কখনওবা বাক্স খোলা হয়, ট্রেনিং হয়, পরে চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় তার সেবা গ্রহণ বা প্রদান ।
কোথায় গিয়ে দাড়াচ্ছি?
আমাদের কর্তাব্যক্তিরা কি বলতে পারেন সারা দেশে কবে নাগাদ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ পৌঁছে দেয়া যাবে? অথবা দেশ থেকে কবে দূর হবে নিরক্ষরতা, কবে বন্ধ হবে ফুটপাতে মানুষের রাত কাটানো, গ্যাস বা পানির অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে না চালু কল-কারখানা অথবা নতুন বিনিয়োগ সম্ভাবনা। উপরের সবকিছুর মতো হয়তো একদিন বলবেন, বিদ্যুত্ও আমাদের কিনে আনতে হবে। বলা হচ্ছে, বিদ্যুত্ সাশ্রয়ী বাতি ব্যবহার করুন। অথচ ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকায় নানা মোড়কে এই পণ্যটি কিন্তু আমাদের আমদানি করতে হয়। আমাদের দেশে ব্ল্যাক এবং কালার দুটো কার্টিজসহ একটি নতুন জেট প্রিন্টার পাওয়া যাচ্ছে ২৭০০ টাকায়। অথচ ওই ব্যাবহারকারীকে পরের বার দুটো কার্টিজ কিনতে দিতে হয় ২৬০০ টাকা। আরও ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, যার প্রিন্টার তারই কার্টিজ; যার মেশিন তারই রিঅ্যাজেন্ট বা কেমিক্যাল, যার সিস্টেম তারই কনজুমাব্যলস ব্যবহারেও আমরা বাধ্য হচ্ছি। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ তারা পণ্যের লাইফ টাইমও নিয়ন্ত্রণ করে দিচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াব তা পাঠকই অনুমান করবেন।
ডিজিটের মালিকানা গড়ে তুলুন
এতসবের পাশাপাশি অতিসত্বর এর সঙ্গে ওই ডিজিটের মালিকানা বাংলাদেশে গড়ে তুলুন। আমাদের অবকাঠামোর দিকে নজর দিন। নাহলে দেখা যাবে, ডিজিটাল বাংলাদেশ হওয়ার পর জীবনযাপনের পদে পদে আমরা আমাদের অর্থনীতির পুরো অংশ তাদের হাতে তুলে দিচ্ছি এবং হয়ে পড়ছি জাতি হিসেবে সংজ্ঞাহীন। পাঠক নিশ্চয় স্বীকার করবেন, তথ্যপ্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর কেউই তাদের দেশটাকে ডিজিটাল দেশ হিসেবে গড়তে বা ঘোষণা দিতে পারেনি। আমরা কিন্ু্তু দিয়েছি। এখন প্রশ্ন হলো আপনারা কীভাবে এটা করবেন তা কি বাস্তবতার নিরিখে তুলনা করে দেখেছেন?
টিকছেনা দেশীয় শিল্প
দেশীয় কোম্পানি ওয়ালটন এখন ফ্রিজ অ্যাসেম্বল ও বাজারজাত শুরু করেছে। হঠাত্ করে বাজারে পণ্যটির দামও কমেছে, পাশাপাশি হরেক রকম ও নামে তা পাওয়াও যাচ্ছে। এখন যদি সরকার পূর্ণাঙ্গ এই পণ্যটির আমদানি বন্ধে পর্যায়ক্রমিক ও গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে হয়তো তা সম্ভব হবে।
তাই অনুরোধ, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য বিদেশি নতুন পণ্যের ফিতা কাটার পাশাপাশি এটা একবার ভাবুন, কীভাবে একটি জেনারেটরের মতো পেনটিয়াম টু কম্পিউটারের চেয়ে পেনটিয়াম থ্রি বা ফোর আকৃতিগতভাবে বড় হচ্ছে না অথবা পেনড্রাইভের ক্যাপাসিটির বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আকার বা উত্পাদন খরচ কীভাবে কমে যাচ্ছে? অথবা আজকে একটা মডেল ধরিয়ে দিয়ে কীভাবে তার ৬ মাসের মধ্যে আরেকটা নতুন মডেল এসে পুরনোটা সরিয়ে ফেলছে অথবা কেমন করে আমাদের অনেক ছোট ছোট উত্পাদন শিল্প টিকে থাকতে পারেনি আমদানিকৃত চায়না পণ্যের পাশে।
তৈরি করুন এম্বেডেড এক্সপার্ট
দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ এমবেডেড্ এক্সপার্ট তৈরি করুন। ব্যাপক সম্ভাবনাময় ও জরুরি এই সেক্টরই পারে স্বল্প মেয়াদে অনেক কিছুর বাস্তবায়ন ঘটাতে, যা আপনারা স্বপ্ন দেখছেন তার চেয়েও অনেক বেশি।
এখানেই সব সমাধান
মিল কারখানার ম্যানুয়েল সিস্টেমগুলোকে কিছু দক্ষ এম্বেডেড্ এক্সপার্টই পারে রাতারাতি অটোমেশনে রূপান্তর করতে। মাইক্রো ইলেকট্রনিক্স বা এমবেডেড টেকনোলজির চর্চা ও দক্ষ জনশক্তিই পারে আমাদের সেই শিকড় থেকে মজবুত করে এগিয়ে নিতে। এক কথায় চারপাশকে ডিজিটাল করে দিতে। এরাই পারে আমাদের দরজা-জানালাগুলো সব রিমোট অপারেটেড করে দিতে। সব মানুষ কে কখন কোথায় কী অবস্থায় আছে; তা আপনার সামনের মনিটরে দেখিয়ে দিতে, আপনার সব লকার বা দরজাকে অ্যাকসেস কোড দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে দিতে, এই মুহূর্তে একটা টিভি চ্যানেল কতজন দর্শক দেখছেন তার হিসাব কষে দিতে, আপনার ছেলেমেয়ে কোন চ্যানেল দেখবে আর কোনটি দেখবে না তা নিয়ন্ত্রণ করতে অথবা একটা রোবট রেস্টুরেন্টে আপনাকে সার্ভিস দিচ্ছে এমন সবকিছু।
কী এই এমবেডেড্ ইঞ্জিনিয়ারিং
এই যে ধরুন- আপনার হাতের মোবাইল সেট, সন্তানের রিমোট কার বা ভিডিও গেম, বাসার টিভি সেট, ফোন, আইপড, ডিভিডি প্লেয়ার, ইন্টারকম, হোম থিয়েটার, ক্যামেরা, ওভেন, এসি, ওয়াশিং মেশিন, ওয়াটার পাম্প কনট্রোলার। অফিসে কম্পিউটার, মনিটর, ইউপিএস, অ্যানসারিং মেশিন, প্রিন্টার, স্ক্যানার, ফ্যাক্স, সিকিউরিটি অ্যালার্মস। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ক্যালকুলেটর, বারকোড রিডার, স্মার্ট কার্ড/ক্রেডিট কার্ড, এটিএম বুথ, ইসিআর। ইন্ডাস্ট্রিতে টাইমার, টেম্পারেচার কনট্রোলার, মোটর কনট্রোলার, কাউন্টার, ডিটেক্টর, ডাটালগার, বায়োমেডিকেল যন্ত্রপাতি, গাড়ি, জাহাজ, উড়োজাহাজ, সাবমেরিন, নভোযান, স্যাটেলাইটসহ আরও অনেক কিছু। এর কোনোটিই আমাদের নিজেদের পণ্য নয়, অন্যের বানানো এই জিনিসগুলো ভোগ বা ব্যবহার করতে আমাদের বিপুল অর্থ তুলে দিতে হয় তাদের হাতে। আর যারা আমাদের এসব পণ্য দিয়ে থাকে, অনেক ক্ষেত্রেই তারা আমাদের ফাঁকিও দিয়ে যাচ্ছে বা অধিক মূল্য হাতিয়ে নিচ্ছে। আমাদের মনে রাখা দরকার, কোনো একটা বৃহত্ অবকাঠামো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র একাধিক কাঠামোর (সিস্টেম)-র সমষ্টি মাত্র।
সবই হবে এম্বেডেড
ক্যাবল টিভি ব্যবসা নাকি মফস্বলের চেয়ে নগর বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সুবিধাজনক। কারণ অল্প তারে অনেক ব্যবহারকারীকে ম্যানেজ করা যায়। জনসংখ্যাবহুল এই দেশেও অনেক কিছু সুবিধাজনক। আর কিছুদিন পর অবশ্য এই তার টানাটানিও আর থাকবে না। তখন তারবিহীন সর্বত্র পৌঁছে যাবে কেবল টিভি সবসময়। কিন্তু সেক্ষেত্রেও আপনার সঙ্গে যেসব নতুন ডিভাইস যুক্ত হবে তা সবই এম্বেডেড্ ডেভেলপমেন্ট। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত ৬০০ মিলিয়ন লোকের ডিজিটাল আইডি কার্ড বানানোর কাজ হাতে নিয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের মতো। সেখানে আমাদের মোট জনসংখ্যাই ১৫০ মিলিয়ন। চীন ৩ বছরে একটা নদীর উপর ২৫ কিলোমিটার সেতু স্থাপন সম্পন্ন করেছে। অথচ আমাদের দেশে ৮-১০ কিলোমিটারের বড় নদী সেতু কোথাও প্রয়োজন হবে না।
ডাই অ্যান্ড মোল্ড মেকিং ইন্ডাস্ট্রি
আরেকটি গুরুত্বপুর্ণ খাত আমাদের দেশে সম্পূর্ণই অন্ধকারে রয়ে গেছে, তা হলো ‘ডাই অ্যান্ড মোল্ড মেকিং ইন্ডাস্ট্রি’। কোনো একটা পণ্যের বহিরাবরণ বা কেসিং ফিনিশিং ওই পণ্যের বাজারজাতে প্রধান হাতিয়ার। দেশে প্রযুক্তি ও শিল্পের উন্নয়ন ছাড়া বিশ্ব বাজারে নিজেদের তুলে ধরা এখন প্রায় অসম্ভব।
সর্বোপরি তথ্যপ্রযুক্তি খাত দিয়ে যেমন স্বল্প সময়ে জাতিকে উঁচু স্থানে তুলে ধরা সম্ভব, জাতীয় অর্থনীতিকে সবল করা সম্ভব, তেমনি সম্ভব বাংলাদেশীদের মেধাভিত্তিক অধিকার বিশ্ব বাজার থেকে ছিনিয়ে আনা। তাই এ খাত কী কী বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে তা সুনির্দিষ্ট করে তার শিকড় থেকে মজবুত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করার প্রয়োজন এখনই।
লেখক : চিফ কো-অডিনেটর
মাইক্রো ইলেক্ট্রনিক্স ল্যাবরেটরি
ই-মেইল : mostofa.melab@gmail.com


 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?