Amardesh
আজঃ ঢাকা, রোববার ২০ ডিসেম্বর ২০০৯, ৬ পৌষ ১৪১৬, ২ মহররম ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

বিভ্রম

জাফর তালুকদার
রবিন হাত কচলে বলল, ‘স্যার, এখন তাহলে আমরা কী করব?’ মঈন নৌকার ছইয়ের ভেতর আধশোয়া হয়ে একখানা বইয়ের পৃষ্ঠা ওল্টাচ্ছিলেন। অর্থনীতির ওপর এই বইটা নতুন এসেছে হাতে। একই বিষয়ের ওপর তার নিজেরও কিছু প্রকাশনা আছে। এর ভেতর একটার নতুন সংস্করণ আটকে আছে মুক্তিযুদ্ধের কারণে। এখন একটু গুছিয়েগাছিয়ে হাত দিতে হবে বইটায়। কিন্তু চারদিকের যা অবস্থা, তাতে করে কবে যে এদিকে মন দিতে পারবেন সেটাই বড় দুশ্চিন্তা। হাতের বইটা বন্ধ করে তিনি প্রশ্রয়ের চোখে তাকালেন প্রিয় ছাত্রের দিকে, ‘তুমি এতো উতলা হলে কেন রবি? যুদ্ধের মাঠ থেকে সবে তো ঘরে ফিরে এলে। চারদিকে তছনছ অবস্থা। একটু সময় তো দেবে...।’
রবিন জিভ কেটে বলল, ‘না, না স্যার, আমি নিজের জন্যে কিছু বলছি না। এই যে এতো অস্ত্র বাইরে ছড়িয়ে আছে। কেউ কারো কথা শুনছে না।’
‘শুনবে, অবশ্যই শুনতে হবে।’ তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মঈন একটু কড়া ধাঁচের মানুষ। তার মুখে সব সময় একটা কাঠিন্য লেগে থাকে। অর্থনীতির দাপুটে শিক্ষক। কলেজের টেটিয়া ছাত্ররাও সমঝে চলে তাকে। একটু অনিয়ম হলে স্কুলের মতো দাঁড় করিয়ে রাখেন বেঞ্চের ওপর।
রবিনের অবশ্য সে দুর্ভাগ্য হয়নি। অর্থনীতি ব্যাপারটা তার মাথায় একটু ভালো খেলে। এই সুবাদে স্যারের কাছে ছিল অবাধ যাতায়াত। বহু বিষয় নিয়ে তর্ক জমে উঠত তাদের। ছাত্রের কঠিন মন্তব্যেও ক্ষুব্ধ হতেন না কখনও। বরং একটু প্রশ্রয়ের গলায় বলতেন, ‘দ্যাখো রবি, মানুষের কল্যাণে যদি কোনো নীতি কাজে না আসে, তাহলে পুরোটাই হবে মিছে বাগাড়ম্বর। বিশ্ব আজ ভাগ হয়ে গেছে ধনী-গরিবের দুটো বলয়ে। এই বৈষম্যের সীমারেখা ঘুচিয়ে আনতে হলে ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে হবে। কিন্তু অর্থনীতি বাদ দিয়ে বিশ্ব আজ যুদ্ধনীতি নিয়ে যেভাবে মেতে উঠেছে, তাতে এই ক্ষয় থেকে সহজে পরিত্রাণ মিলবে বলে মনে হয় না।’
রবিন গলায় হতাশা টেনে বলল, ‘তাহলে এই অপকর্ম দেখে যাওয়া ছাড়া আর কোনো করণীয় নেই আমাদের?’
‘তা হবে কেন, শত প্রতিকূলতার মধ্যে এই লড়াইটা মানুষ চালিয়ে যাচ্ছে।’
‘আপনি কী এ ব্যাপারে আশাবাদী?’
‘অবশ্যই। আমি নিরাশ নই। এই তো এখানেও সেই পরিবর্তনের আওয়াজ উঠেছে। দেশের মুক্তি না ঘটলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা আসে না। এখন সময় এসেছে সেই দিন বদলের। আমি প্রস্তুত।’
ততদিনে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
রবিন সংবাদটা পেয়েছিল একটু দেরিতে। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সে যখন অসহায়ভাবে এদিক-ওদিক ঘুরছে, হঠাত্ দেখা হয়ে গেল বন্ধু মোহিতের সঙ্গে। স্যার বশিরহাটে একটা ক্যাম্পে আছেন জেনে সঙ্গে সঙ্গে রওনা হলো দেখা করতে। গাঁয়ের ভেতর দিকে সরে একটা পোড়ো বাড়িতে গড়ে উঠেছে এই ক্যাম্পটা। কোনো এক কালে এটা ছিল জমিদারদের বাগানবাড়ি। সামনে বেশ বড়সড় পুকুর। ভাঙাচোরা ঘাট। পুকুরে ফুটে আছে অসংখ্য লাল পদ্ম। বাড়ির সীমানা দেয়াল ধসে গেছে। পলেস্তারা খসা বাড়িটার বেশিরভাগ দরজা-জানালা উধাও। স্যাঁতলা ছাদের কার্নিশে লকলকিয়ে উঠেছে নাদুসনুদুস অশ্বত্থ-শিশুর জঙ্গল। শান্ত নির্জন বাড়িটার চারদিকে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য গাছ। বকুল, বেল, কদম, আম, লিচু, জারুল, অর্জুন কত কী চেনা-অচেনা গাছের বাহার। ফুল আর লতাপাতার নিরীহ-গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। একটা ঘুঘু ডাকছে করুণ গলায়। দুটো ফিঙে করবি ডালে বসে খুনসুটি করতে করতে উড়ে গেল পুকুরের দিকে। দেয়ালের ওপাশ থেকে একটা বাঘা-কুকুর এসে গম্ভীর মুখ করে তাকাল নতুন আগন্তুকের দিকে। রবিন দ্রুত সুরকি বিছানো রাস্তাটা ধরে সোজা চলে এল গেটের কাছে। সেখানে এসএমজি গলায় ঝুলিয়ে পাহারা দিচ্ছে একজন রাগি রাগি লোক। অনেক জেরার পর অনুমতি মিলল ভেতরে যাবার। স্যার বৈঠক করছিলেন একদল মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে। ডাক আসতে দেরি হলো। যখন অনুমতি পেল, স্যার উঠে এসে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘আরে রবি, কী ব্যাপার, তুমি এখানে?’
‘স্যার, আমি মুক্তিযুদ্ধে যেতে চাই। আপনার খবর পেয়ে এলাম।’
‘বেশ করেছ। তা তোমার চেহারা এমন হয়েছে কেন? হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নাও। পরে কথা বলা যাবে।’
এটা মূলত একটা অস্থায়ী রিক্রুট ক্যাম্প। সেই সঙ্গে কিছু স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা। একজন হাবিলদার, ডাক্তার, নার্স, বাবুর্চি, হেলপার ও গার্ড মিলে জনদশেক মানুষের আস্তানা। তবে নতুন মুক্তিযোদ্ধা আর রোগী এলে এই সংখ্যাটা বেড়ে যায়। তখন একটু হিমশিম খেতে হয় সবাইকে।
রাতে স্যার অনেক সময় ধরে রবিনের কথা শুনলেন। শুনে দু’মুহূর্ত কী ভেবে বললেন, ‘যতটুকু বুঝতে পারছি তুমি এখনও পুরোপুরি সুস্থ নও। এই শরীর নিয়ে কী করে যুদ্ধে যাবে? বরং এক কাজ করো। তুমি এই ক্যাম্পেই থেকে যাও। আমাকে অ্যাসিস্ট করবে। এটাও তো মুক্তিযুদ্ধের অংশ, কী বল, তাই না?’
‘তাহলে তো খুব ভালো হয় স্যার। আপনার কাছাকাছি থাকা আমার জন্য ভাগ্যের ব্যাপার।’
‘বেশ থাকো তাহলে। তবে তুমি যদি একান্তই যুদ্ধে যেতে চাও, আমার আপত্তি নেই। দুয়ার খোলা থাকল...।’
সেটা ছিল এক ভিন্নরকম অভিজ্ঞতা। প্রচুর কাজ ছিল সেখানে। নতুন নতুন ছেলে এসে অনবরত জড়ো হতো বিভিন্ন জায়গা থেকে। তাদের গ্রুপ করে নানা দলে যুক্ত করা কম ঝুঁকির কাজ নয়। আহত আর রোগীদের আনাগোনা তো ছিলই। বড় কেসগুলো প্রাথমিক চিকিত্সা দিয়ে পাঠানো হতো সদর হাসপাতালে। নেহায়েত ছোটখাটোগুলো চিকিত্সা নিয়ে ছাড়া পেত এখান থেকে। দলে দলে লোকের খাবারের জোগান দেয়াও কম হুজ্জতের নয়। বলতে গেলে এসব সামলাতে ঘাড় তুলে তাকানোর সময় ছিল না।
অথচ স্যার কী করে এতটা সামাল দিতেন, সেটা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হতো না। ভোর পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত তিনি মেতে থাকতেন নানা কাজ নিয়ে। সব দিকে তার কড়া নজর। তবে নতুন ছেলেদের নিয়ে তাকে একটু সময় দিতে হত বেশি। পাকুড়তলায় বসে ওদের তাত্ত্বিক ক্লাস নিতেন স্যার। এটা টনিকের মতো কাজ করত মুক্তিযোদ্ধাদের মনে।
মাঝে মাঝে গভীর রাতে দেখা যেত স্যার নির্ঘুম পায়চারি করছেন বারান্দায়। পরিবার-পরিজনকে তোপের মুখে ফেলে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিলেন এই বয়স্ক অধ্যাপক। ফেলে আসা তার ছোট্ট শহরটিতে এখন মিলিটারি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। বিবিসি আর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাদের নানা অপতত্পরতার খবর পাওয়া যেত। তবে এই উত্কণ্ঠার কথা কখনও মুখে প্রকাশ করতেন না। একটা নির্লিপ্ত কাঠিন্যের মুখোশ সব সময় মুখে এঁটে রাখতেন বলে সহজ হতে পারতেন না কারো সামনে।
রবিন বোধ হয় কিছুটা ভাগ্যবান ছিল সেদিক থেকে। নানা কথার ফাঁকে অজান্তেই বেরিয়ে যেত দু’একটা সুখ-দুঃখের কথা। তবে এর বেশিরভাগই ছিল স্বপ্নমোড়া উচ্চারণ। যুদ্ধ থেকে ফিরে গিয়ে কীভাবে দেশটাকে সাজাবেন। কীভাবে লাঘব করবেন সাধারণ মানুষের দুঃখ। এর একটা ছক সদা ঘুরপাক খেত তার মাথায়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে সুযোগটা তৈরি হয়েছে, এটা কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না। তাই এই যুদ্ধটা শেষ করে ঝাঁপিয়ে পড়তে চান আরেক যুদ্ধে। যে করে হোক, পুরনো কাঠামোটাকে ঢেলে সাজাতে হবে। এটা না পারলে এত বড় অর্জনটাই মিথ্যা হয়ে যাবে।
রবিন অবশ্য এত সহজে আশ্বস্ত হতে পারত না। কিছুটা উদ্বেগ ফুটে উঠত তার কণ্ঠে, ‘স্যার, আমরা কী আদৌ স্বাধীন হতে পারব?’
‘কেন, এ কথা মনে হবার কারণ?’
জানি না কেন, তবে মাঝে মাঝে খুব হতাশ হয়ে যাই আমাদের কিছু লোকের আচরণ দেখে।’
‘এদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। বলতে গেলে পুরো দেশের মানুষ একাট্টা হয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়ছে। রক্ত দিচ্ছে। এর কী কোনো মূল্য নেই? তবে যে কোনো বড় অর্জনের জন্য সময় দরকার। এ নিয়ে হতাশ হলে চলবে কেন?’ স্যার এক দমে কথাটা বলে বড় করে নিঃশ্বাস নিলেন।
এই স্বপ্নবাজ মানুষটি পাশে ছিল বলে কখনও হতাশায় নুয়ে পড়েনি রবিন। যখনই মন খারাপ হয়েছে, তার কাছে গিয়ে বসেছে। আলাপচারিতায় মগ্ন থেকেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বিপুল সাহস নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নিত্যনতুন কাজে।
তবে সে এমনিতে কিছুটা দুর্বল প্রকৃতির। বরাবর সাহসটা একটু কম বলে তুচ্ছ কারণে দিশাহারা হয়ে যেত। যে কারণে এখানে এসে অবাধ মনটা উতলা হয়ে আছে বাড়ির জন্য। মাকে ছেড়ে এতদিন থাকেনি কোথাও। কলেজ হোস্টেল থেকে হুটহাট চলে যেত বাড়িতে। তার অশক্ত শরীরে হোস্টেলের খাবার খুব একটা মুখে রুচত না। তাছাড়া, পেট নিয়ে ভুগত বলে নানারকম টিটকারি দিত বন্ধুরা। সেও কম টেটিয়া ছিল না। প্রায়ই বন্ধুদের ঘাড় ভেঙে রাজভোগ নয়ত লেডিকিনি সাবড়ে দিত রেল রোডের বিখ্যাত দেশের ডাক মিষ্টান্ন ভাণ্ডার থেকে। ট্রেন লাইন ঘেঁষে ছিল তাদের দোতলা হোস্টেল। সামনে একফালি মাঠ। মাঠের সীমানা লাগোয়া ছোট্ট রেলস্টেশন। আটটা বিশের ট্রেন থেকে টুকটুক করে নেমে আসত শ্যামলাপনা একটা মেয়ে। থুতনির কাছে ছোট্ট কাটা দাগ। দীর্ঘ চুল আর বড় বড় দুটি শান্ত চোখের মেয়েটি লাল সুড়কি রাস্তা ধরে এগিয়ে যেত কলেজের দিকে। কলেজের সামনের সারিবদ্ধ পাম গাছগুলো তার এই মন্থর আগমনে মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাত প্রতিদিন।
এই মেয়েটির সঙ্গে একই ক্লাসে পড়লেও তাদের মধ্যে কথা হয়নি কখনও। হয়তো কিছুই বলার ছিল না বলে কথা হয়নি। তবে আলতো চোখ চেয়ে আকাশের লোভ সংবরণ করতে পারত না কিছুতেই। সেও কী একটু চোখ চেয়ে দেখত না তাকে। নাহলে হঠাত্ হঠাত্ কেন চোখে চোখ পড়ে যাবে অজান্তে। সেই দুটো শান্ত চোখে কোনো গভীর ছায়া কী উঁকি দেয়নি কখনও? সেই উত্তর কখনও না মিললেও নিজের ভেতরে যে একটা নীরব ভাংচুর ঘটেছে, এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। না হলে আটটা বিশের ট্রেনের হুইসেল বাজলেই কেন অমন করে মোচড় দিয়ে উঠত বুকের ভেতরটা। কী জানি পুরোটাই হয়ত ভ্রমের কুহক। পরে যখন শুনল ওই মেয়েটার সঙ্গে দীর্ঘ গভীর ভালোবাসা আছে একটা ছেলের, তখন কী গভীর কষ্টের দামামা চৌচির করে দেয়নি তাকে। জীবনের প্রথম ভালোবাসা এভাবে ট্রেনের দুটি চাকার তলায় বিদীর্ণ হয়ে হারিযে গেল চিরদিনের মতো।
সেই শান্ত নিরীহ চোখ দুটো কেন জানি বার বার উঁকি দিচ্ছে। ফিসফিসিয়ে কানের কাছে বলছে—আমি এসেছি, আমি এসেছি।
একদিন খুব ভোরে একটা গ্রুপের সঙ্গে হাজির হলো সেই প্রেমিক ছেলেটি। উদভ্রান্ত উস্কো খুস্কো চেহারা। চোখ বসে গেছে। তোবড়ানো মুখখানা দেখে প্রথমে কিছুটা ভ্রম হলেও ঠিক চিনতে পারল জয়িতার প্রেমিকটিকে। মেরুন পাঞ্চাবি পরা এই লম্বা ফর্সা ছেলেটিকে সে বহুদিন দেখেছে বাদাম চিবোতে চিবোতে রেলস্টেশন পর্যন্ত গিয়ে জয়িতাকে ট্রেনে তুলে দিতে। ওদের ধীর মোহময় হাঁটার ভঙি, হাতের নাড়াচাড়া, বাঁধভাঙা হাসির গমক পুরোটাই ফ্রেমবন্দি হয়ে ভেসে আছে চোখের সামনে। রবিন সামান্য এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল, ‘কী ব্যাপার, আপনি এখানে?’
সে এমন চমকে উঠে পেছন ফিরে তাকাল যেন কোনো আততায়ী তার পিঠে আমূল বসিয়ে দিয়েছে তীক্ষষ্ট ছুরির ফলা—‘ও আপনি!’
‘চিনতে পেরেছেন তাহলে?’
‘চিনব না কেন, জয়িতা অনেক বলেছে আপনার কথা।’
‘জয়িতা আমার কথা বলেছে!’ এবার একটু বিস্মিত না হয়ে পারল না রবিন। কিন্তু মুখে সেটা অনুবাদ না করে মৃদু হাসির রেখা তুলে আনল ঠোঁটে, ‘তাই বুঝি, তা কেমন আছে জয়িতা?’
যাকে উদ্দেশ করে প্রশ্নটি ছোঁড়া হলো, সেই মানুষটি মুহূর্তে নিভে গেল দপ্ করে। দমকা বাতাসে তার লম্বা চুল দোল খাচ্ছিল কপালে। নিষ্প্রভ দুটো চোখ পানা পুকুরের মতো নিথর, আলোহীন, ভয়ঙ্কর বেদনার নীলে ভাসতে ভাসতে সহসা সিগন্যাল বাতির মতো জ্বলে দপ্ করে, ‘জয়িতা নেই। ওকে ধরে নিয়ে গেছে।’
সেই ‘নেই’ হবার যন্ত্রণা সারা রাত তাকে পোড়ালেও কল্পনায় ভেসে থাকা দুটো মায়াবি চোখ হাজার কমল হয়ে ফুটল বেদনার সরোবরে। বহুদিন পর হৃদয়-ছেঁড়া হুইসেল দিয়ে ফিরে এল আটটা বিশের ট্রেন। তড়িঘড়ি বিছানা ছেড়ে স্যান্ডেল ঘষটাতে ঘষটাতে বারান্দায় এসে দেখল ট্রেন চলে গেছে। পুকুর পাড়টা ভয়ঙ্কর ফাঁকা। লাল সুরকির পথটুকু বড় বিষণ্ন। বুকচাপা হাহাকার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিথর গাছগুলো। তুমি নেই বলে একটা কৃষ্ণচূড়াও ফোটেনি। বাগান থেকে উধাও হয়ে গেছে সব গোলাপ। সব শালিক ফিরে গেছে মন খারাপ করে। শুধু তুমি নেই বলে জয়িতা...।
দেখতে দেখতে নৌকাটা চলে এল বহুদূর। আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠেছে আশপাশের গ্রামগুলো। ঝকঝকে রোদে গাছপালার ওপর থেকে খসে পড়েছে সুনিবিড় কুয়াশার ওড়না। ভিজে ধানের শীষে আলো হয়ে জ্বলছে সোনা রোদের ঝিলিক। এক ঝাঁক বক খলবলিয়ে উড়ে যাচ্ছে নদীর ওপার। যেন ওখানে আজ ভোজ হবে খুব—এমন ফুর্তিতে ভাসছে তাদের মসৃণ ডানার গতি।
মঈন যে বইটা পড়ছিলেন, সেটায় ডুবে আছেন তখনও। নৌকাযাত্রাটা বেশ লাগছিল তার। যুদ্ধের মাঠ থেকে ফিরে এই প্রথম যাচ্ছেন নিজের এলাকায়। এভাবে হুট করে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না মোটেই। শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। একটু জ্বর জ্বর ভাব চলছে। মাথাটাও ভার হয়ে আছে বেশ। তবুও পর পর কয়েকটা খবর তাকে একটু উতলা করে তুলল। তার এলাকার কিছু মুক্তিযোদ্ধা সর্বহারা ব্যানারে চাঁদাফাঁদা তুলছে। প্রায়ই রক্তারক্তি ঘটাচ্ছে নিজেদের ভেতর। ছেলেদের এই বিচ্যুতি দেখে তিনি মর্মাহত। আজ যাচ্ছেন ওদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে। ফয়সালা না হলে অবশ্য কঠোর হবেন তিনি। তা যতই নির্মম হোক...। ফ্লাক্স থেকে চা ঢেলে দীর্ঘ চুমুক দিলেন কাপে। একটু আয়েশি ভঙ্গিতে চা-টা শেষ করে চোখে কৌতূহল টেনে বললেন, ‘কী ভাবছ রবি?’
‘কই না তো।’ গভীর ধ্যানের ভেতর থেকে হঠাত্ যেন জেগে উঠেছে এমন চমকে লাজুক চোখে তাকাল স্যারের দিকে।
‘জানো রবি, আজ কেন জানি মনটা ভাল্লাগছে না। এভাবে না এলেই হতো। তোমাকেও কষ্ট দিলাম খামোখা।’ কথাটা বলে স্যার মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘না, না, স্যার, তা হবে কেন? আপনাকে সঙ্গ দিতে পারাটাও বড় ব্যাপার। আপনার শরীর দুর্বল বলে হয়তো খারাপ লাগছে। ওখানে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আফটার অল নিজের এলাকা...।’
‘সেটা ঠিক আছে। তবে দুঃখ কী জানো, দেশটা সবে স্বাধীন হলো, অথচ এর ভেতরই ছেলেগুলো ভুল পথে নামল। কারো কথা শুনছে না। জোতদারের গলা কেটে কী দেশে সমাজবাদ কায়েম করা যাবে? কুয়োতে বাস করে কী সমুদ্রের গর্জন শোনা যায়। সমুদ্রের স্বাদ পেতে হলে সমুদ্রের কাছে যেতে হবে, ক্ষুদ্র নালার কাছে নয়...।’ কথা শেষ করে তিনি ক্লান্তির হাই তুললেন। যেন এইটুকু বলতে গিয়ে তার দম ফুরিয়ে আসছে। এরকম ক্লান্ত বিষাদিত কখনও দেখা যায়নি তাকে।
বড় বাঁকটা ঘুরতেই মঈন উত্সুক চোখে তাকালেন ছইয়ের বাইরে। গাছপালার ফাঁকফোকর থেকে মাদ্রাসা হাটের জামে মসজিদের গম্বুজটা ভেসে উঠল। আর একটু এগোলেই দেখা গেল কাচারি মোড়ের ঝাউ গাছ, বাজার, ভাঙা মঠ, ধানের কল, বেড়িবাঁধ, বড়বাড়ির নোনাধরা চিলেকোঠা—এভাবে পুরো গ্রামটাই ধীরে ধীরে চলে আসে চোখের সীমানায়। অবশেষে মাঝিঘাটে এসে নৌকাখানা ভিড়ল। তীরের কাছে একটা লোক উঁকিঝুঁকি দিয়ে চলে গেল দ্রুত। মঈন রীতিমত উত্তেজিত। এতদিন পর গ্রামে ফিরেছেন। যদিও শহরই তার বর্তমান ঠিকানা। কিন্তু এই গ্রামই তার আদি জন্মস্থান। ছেলেবেলার কত হারানো স্মৃতি জড়িয়ে আছে এর ধুলো-কাদায়, ঘাসে-মাঠে, নদী-নালা, খাল-বিল-পুকুর, জায়-জঙ্গল আর হাটে-ঘাটের পরতে পরতে। মানুষের স্নেহ-ভালোবাসায় গড়ে উঠেছে যে বন্ধনের নিবিড় ভিত—আজ সেই মুক্ত মাটিতে ফিরে এসেছেন প্রাণের অফুরন্ত টানে।
মঈন দীর্ঘ শরীরটা টেনে উঠে দাঁড়ালেন, হাসলেন, চোখের ইঙ্গিতে নামার তাড়া দিলেন রবিনকে, তারপর নৌকা থেকে বসে পা স্পর্শ করেছেন মাটিতে, অমনি কোত্থেকে একটা গুলি উড়ে এসে তার বুকটা এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় করে চলে গেল চোখের পলকে।
রবিন ছুটে আসার আগেই তিনি কাত হয়ে পড়ে গেলেন আপন মায়ের পানিকাদার আঁচলে। তার বুক থেকে গল গল রক্তধারা নেমে মিশে গেল নোনাপানির স্রোতে।
‘সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান’—এমত একটা ক্ষীণ স্লোগান দ্রুত হাওয়ায় ছড়িয়ে মিইয়ে গেল আস্তে আস্তে।


 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?