Amardesh
আজঃ ঢাকা, রোববার ২০ ডিসেম্বর ২০০৯, ৬ পৌষ ১৪১৬, ২ মহররম ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

কবি ছান্দসিক : আবদুল কাদির স্মরণে

মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্
কবি আবদুল কাদির
জন্ম : ১ জুন ১৯০৬
মৃত্যু : ১৯ ডিসেম্বর ১৯৮৪
প্রখ্যাত ছান্দসিক কবি আবদুল কাদির সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছেন তাঁর স্নেহধন্য কবি মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ। বর্তমানে তিনি গুরুতর অসুস্থ। তার স্মৃতিচারণার শ্রুতিলিখন এখানে—
কবি আবদুল কাদিরের অবদান সম্পর্কে প্রশ্ন করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি হয়তো শুনেছেন আমি গত আগস্ট মাস থেকে ব্রেন স্ট্রোকে এবং ক্ষীণদৃষ্টি রোগে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ অবস্থায় রয়েছি।
আমি গত ৪ মাস ধরে কিছু পড়তে এবং লিখতে পারছি না। আমার স্মৃতিশক্তিও প্রায় বিলুপ্তির পথে। এমতাবস্থায় বাংলা সাহিত্যে কবি আবদুল কাদিরের অবদান সম্পর্কে বিস্তারিত বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী।
কবি আবদুল কাদির বাংলা সাহিত্যের অন্যতম খ্যাতিমান কবি। তিনি ছান্দসিক কবি হিসেবেই সর্বাধিক পরিচিত। তিনি শুধু কবি নন, একাধারে শক্তিমান সাহিত্য সমালোচক, প্রাবন্ধিক এবং নজরুল গবেষক। তাঁকে নজরুল বিশেষজ্ঞ বলাই যথার্থ। কবি আবদুল কাদির একজন সাংবাদিক এবং সাময়িক পত্রের সম্পাদক হিসেবেও খ্যাতিমান।
প্রথমেই বলতে হয়, সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিচরণ করলেও কবি হিসেবেই তিনি সর্বাধিক খ্যাতিমান। কেননা মরহুম কবি আবদুল কাদির তিরিশের দশক থেকেই কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং তাঁর মৃত্যুর দীর্ঘকাল পরেও অদ্যাবধি কবি হিসেবে খ্যাতিমান। কবি শব্দটি তাঁর নামের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। ছান্দসিক কবি হিসেবেও তাঁর বিশেষ পরিচিতি ও খ্যাতি রয়েছে। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ আমলে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দিলরুবা’ই তাঁকে কবি খ্যাতি এবং প্রতিষ্ঠা এনে দেয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘দিলরুবা’ প্রকাশের পর ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, মোহিতলাল মজুমদার, জসীমউদ্দীন, কাজী আবদুল ওদুদ প্রমুখ কবি-সাহিত্যিক আবদুল কাদিরের ‘দিলরুবা’র অন্তর্গত কবিতাগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং ‘দিলরুবা’ যে তাঁকে বাংলা কাব্যে স্থায়ী আসন দেবে, তেমন কথাও বলেন।
রবীন্দ্র ও নজরুল উত্তর যুগে তথা তিরিশের দশকের শক্তিমান কবি আবদুল কাদির সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকদের অভিমত সত্য বলে প্রমাণিত হয়।
কবিতা ছাড়াও বাংলা প্রবন্ধ ও সমালোচনা সাহিত্যে এবং বাংলা কবিতার ছন্দের আলোচনায় তাঁর দক্ষতা সাহিত্য মহলে স্বীকৃত। তিনি শুধু ছান্দসিক কবিই ছিলেন না, বাংলা কবিতার ছন্দ বিষয়েও রয়েছে তাঁর বহু প্রবন্ধ এবং ছন্দ বিষয়ে তাঁর অসাধারণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ গ্রন্থ ‘ছন্দসমীক্ষণ’। এই গ্রন্থে বাংলা কবিতার ছন্দ বিষয়ে তিনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম আলোচনা এবং বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন। একজন ছান্দসিক কবি হিসেবে তিনি বিরাট অবদান রেখেছেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে উল্লেখ করতে হয়, বাংলা গবেষণা সাহিত্যে ও সম্পাদনা কর্মে আবদুল কাদিরের অন্যতম স্মরণীয় অবদান হচ্ছে অনন্য সাধারণ সম্পাদনা কয়েক খণ্ডে প্রকাশিত নজরুল রচনাবলী।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কবি আবদুল কাদির শুধু নজরুল রচনাবলীই নয়, বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নেতা প্রাবন্ধিক (মরহুম) ‘আবুল হুসেন রচনাবলী’, ‘রোকেয়া রচনাবলী’সহ পরলোকগত বহু খ্যাতিমান লেখকের রচনাবলী দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদনা করেছেন। আরো উল্লেখ্য, বিভাগ পূর্বকালে তথা ব্রিটিশ আমলে কলকাতায় অবস্থানকালে আবদুল কাদির সম্পাদিত ‘কাব্যমালঞ্চ’, ‘মুসলিম সাহিত্যের সেরা গল্প’, ‘বহ্নিবীণা’ প্রভৃতি সংকলন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ‘কাব্যমালঞ্চ’ সংকলনের ভূমিকা (বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস) অসাধারণ পাণ্ডিত্যপূর্ণ রচনা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
নজরুলের স্নেহধন্য এবং নজরুল সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষক ও সমালোচক আবদুল কাদির সম্পাদিত এবং বাংলা একাডেমী প্রকাশিত ‘নজরুল রচনাবলী’ তিনি যে দক্ষতার সঙ্গে সম্পাদনা করে গেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। তাঁর মৃত্যুর পর বিভিন্ন সময়ে নজরুল রচনাবলীর নতুন সংস্করণ (নতুন সম্পাদনা পরিষদের সম্পাদনায়) প্রকাশিত হলেও কবি আবদুল কাদিরই নজরুল রচনাবলীর মূল সম্পাদক। সবিনয়ে উল্লেখ করছি যে, ১৯৯৩ ও ২০০৯ সালে প্রকাশিত নজরুল রচনাবলীর নতুন সংস্করণের সম্পাদনা পরিষদের অন্যতম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি, নজরুল সাহিত্যের আলোচনা এবং নজরুল গবেষণার ক্ষেত্রেও আমার যে সামান্য ভূমিকা— তার মূল প্রেরণার উত্স ছিলেন কবি আবদুল কাদির।
ঐ সময়ই ‘মাহে নও’ অফিস থেকে অর্থাত্ কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকারের ঢাকাস্থ তথ্য অধিদফতর (৬নং পুরানা পল্টন) থেকে ‘নজরুল পরিচিতি’ (বেতার কথিকা সংকলন) শীর্ষক নজরুলবিষয়ক একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন কবি আবদুল কাদির।
নজরুলবিষয়ক আমার প্রথম গ্রন্থ ‘নজরুল ইসলাম ও আধুনিক বাংলা কবিতা’ শীর্ষক গ্রন্থটি শ্রদ্ধেয় আবদুল কাদিরের প্রেরণায়ই রচিত এবং তাঁর সম্পাদিত ‘মাহে নও’ (অধুনালুপ্ত) পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত গ্রন্থটি আবদুল কাদিরের নামে উত্সর্গীকৃত।
উল্লেখ্য যে, আবদুল কাদিরের সম্পাদনায় ‘মাহে নও’ প্রকাশকালে আমি ছিলাম এই পত্রিকার সহসম্পাদক।
আজ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি শ্রদ্ধেয় কবি আবদুল কাদির ছিলেন আমার কবিতা চর্চা ও সাহিত্য সাধনার অন্যতম প্রেরণার উত্স। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, মরহুম আবদুল কাদির ছিলেন আমারই এলাকার বাসিন্দা একজন খ্যাতনামা কবি। তাঁর গ্রামের বাড়ি আশুগঞ্জের নিকটবর্তী আড়াইসিধা নামক গ্রামে। আমার গ্রামের বাড়ি সেই গ্রামের দুই-আড়াই মাইলের মধ্যে অবস্থিত। তাঁর সঙ্গে আমার আত্মীয়তার সম্পর্কও রয়েছে। কৈশোরকাল থেকেই তাঁর কবি খ্যাতি আমাকে কবিতা রচনায় উদ্বুদ্ধ করে। যদিও সেখানে তাঁকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তিনি কলকাতায় থাকতেন এবং সাহিত্য সাধনা, সাংবাদিকতা ও শিক্ষকতা করতেন। তবে আমাদের হাই স্কুলের বিভিন্ন শ্রেণীর পাঠ্য বইয়ে তাঁর কবিতা অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেসব কবিতা এবং তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দিলরুবা’ পাঠ করে আমি কবিতা রচনায় বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হই। শ্রদ্ধেয় আবদুল কাদিরের সঙ্গে আমার প্রথম ব্যক্তিগত পরিচয় ঘটে ৫০-এর দশকে ঢাকা কলেজে আমার আইএ পড়ার সময়। সেকালে তিনি ছিলেন মাসিক ‘মাহে নও’ পত্রিকার সম্পাদক। তাঁর সম্পাদিত ‘মাহে নও’ ছিল একটি অত্যন্ত উন্নতমানের মাসিক পত্রিকা। তত্কালীন কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকারের পত্রিকা হলেও এই উন্নতমানের পত্রিকায় নবীন-প্রবীণ লেখকরা লিখতেন।
তত্কালীন ‘মাহে নও’-এর সম্পাদক ছিলেন আবদুল কাদির, সহকারী সম্পাদক ছিলেন খ্যাতিমান কবি তালিম হোসেন এবং আমি ছিলাম সহসম্পাদক। দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে পারি, আবদুল কাদির ছিলেন একজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ সম্পাদক এবং তিনি নবীন-প্রবীণ সব শ্রেণীর লেখকদের রচনাই প্রকাশের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন এবং যত্নবান। প্রতিটি রচনাই প্রকাশের আগে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তেন এবং প্রয়োজনে সংশোধন, সংস্কার এবং পরিমার্জন করতেন। এই সূক্ষ্মদর্শী সম্পাদক এবং সাহিত্য সমালোচককে ফাঁকি দেয়া সহজ ছিল না। তিনি সব সময় উন্নতমানের ও সৃজনধর্মী রচনা প্রকাশের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতেন। প্রবন্ধ রচনা, নজরুল গবেষণা, সাহিত্য সমালোচনা ও সম্পাদনার ক্ষেত্রে আমার যেটুকু অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান, তাঁর বৃহত্তর অংশই আবদুল কাদিরের কাছ থেকে পাওয়া প্রেরণা ও অভিজ্ঞতার ফল।
সবিনয়ে উল্লেখ করছি, কবিতা ও প্রবন্ধ ইত্যাদি এবং বিশেষ করে সেকালের তরুণ লোকদের বিভিন্ন ধরনের রচনা সম্পাদনার দায়িত্ব আবদুল কাদির আমার উপরই অর্পণ করতেন। প্রেস থেকে পত্রিকা প্রকাশনার ব্যাপারেও আমাকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হতো। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, (সাবেক) পাকিস্তান আমলেই ‘মাহে নও’ পত্রিকায় বিশেষ ‘নজরুল সংখ্যা’ ও ‘ইকবাল সংখ্যা’ প্রকাশিত হতো।
নজরুল জীবন ও সাহিত্য বিষয়ে বহুসংখ্যক প্রবন্ধের রচয়িতা আবদুল কাদিরের ‘নজরুল প্রতিভার স্বরূপ’ শীর্ষক বৃহত্ কলেবর গ্রন্থটি ‘নজরুল ইনস্টিটিউট’ থেকে প্রকাশিত হয় আশির দশকে। সে সময়ে আমি ছিলাম নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক। উল্লেখ্য, আবদুল কাদিরের গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন প্রখ্যাত নজরুল গবেষক মরহুম শাহাবুদ্দীন আহমদ।
আগেই বলেছি, আবদুল কাদির একজন প্রখ্যাত কবি এবং ছান্দসিক কবি হিসেবেও রয়েছে তাঁর বিশেষ খ্যাতি। একজন ছান্দসিক কবি হিসেবে তিনি তাঁর কবিতায় যেমন ছন্দ নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন, তেমনি ছন্দ বিষয়ে লিখেছেন বহু নিবন্ধ এবং ‘ছন্দ সমীক্ষণ’ নামে অনন্য সাধারণ গ্রন্থ। প্রখ্যাত ছন্দবিজ্ঞানী প্রবোধ চন্দ্র সেনেরও বিশেষ প্রশংসা লাভ করেছেন তিনি। একজন ছান্দসিক কবি ও ছন্দশাস্ত্রবিদ হিসেবে এখানেই তাঁর সাফল্য।
কবি আবদুল কাদিরের মতো ছন্দ নিপুণ কবি ও ছন্দ-বিজ্ঞানীর কোনো ব্যর্থতা উল্লেখ করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কথা সবিনয়ে উল্লেখ করছি। দীর্ঘকাল ধরে তাঁর রচিত কবিতা পাঠ করে আমার মনে হয়েছে, শ্রদ্ধেয় আবদুল কাদির একজন অসাধারণ ছন্দনিপুণ কবি। তিনি অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্ত ইত্যাদি সবধরনের ছন্দেই কবিতা লিখেছেন এবং ছন্দ ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। কিন্তু তিনি ছন্দ নিয়ে তাঁর কবিতায় তেমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেননি বলেই আমার মনে হয়েছে। হয়তো আমার এ অভিমতের সঙ্গে অন্যেরা একমত নাও হতে পারেন। আমি কবি আবদুল কাদিরের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
আমার এই মৌখিক বক্তব্যে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটে থাকলে আশা করি তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হবে।
শ্রুতি লিখন : আরিফ-উল ইসলাম


 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?