ভ্রমণ : শান্তির মোহনা জেনেভা
সাইফ ইসলাম দিলাল
জেনেভা থেকে ফিরে
ব্রিটিশ ফোক সিঙ্গার লরা মারলিং তাঁর বিখ্যাত গান ‘মাই মেনিক অ্যান্ড আই’-এ জেনেভা বন্দনা করেছেন। কারণ এ গানের শিল্পী জেনেভায়ই যেন তার মৃত্যু হয়, এই কামনা করেছেন। সম্প্রতি এ কামনার সারবত্তা খুঁজে পেলাম বিশ্বের এ আকর্ষণীয় কসমোপলিটান নগরীতে এসে। এটাও উপলব্ধিতে এলো লাতিন নোবেল জয়ী সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মারকেজ কেন তাঁর বিখ্যাত ‘স্ট্রেঞ্জ পিলগ্রিমস’ গ্রন্থে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট মেট্রোপলিটন নগরীর এতটা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।
১৮৬৩ সালে মহামতি হেনরি ডুন্যান্ট সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আন্তর্জাতিক রেডক্রস প্রতিষ্ঠার আগে নগরটির আন্তর্জাতিক আবেদন তেমন ছিল না। কিন্তু মাত্র একশো বছরের ব্যবধানে ইউরোপের বরফঢাকা আল্পস ও জুরা পর্বতমালা ঘেরা নয়নাভিরাম এ সুইস শহর আন্তর্জাতিক নগরীর মর্যাদা অতিক্রম করে এখন গ্লোবাল নগরীর মর্যাদা ভোগ করছে। ভাবা যায়, মাত্র ৬.১২ বর্গমাইল আয়তনের এ নগরীতে দুই শতাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর রয়েছে!
সম্প্রতি জেনেভায় অনুষ্ঠিত ডব্লিউটিও সম্মেলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া থেকে আমরা দশ সাংবাদিক সেখানে গিয়েছিলাম। ঈদের দিন রাতে আমরা কাতার এয়ারওয়েজে যাত্রা করি। বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ও বেসরকারি সংস্থার কয়েকজন প্রতিনিধি এ সম্মেলনে যোগ দেন। ডব্লিউটিওর মোট ১৫৩টি সদস্য দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধি দল এ সম্মেলনে অংশ নেয়। এ উপলক্ষে গোটা জেনেভা শহর যেন লোকে-লোকারণ্য হয়ে ওঠে। হোটেল রেস্টুরেন্টে ভিড় লেগে যায়। যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকে হোটেল সিট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। জেনেভাস্থ বাংলাদেশ মিশন কর্মকর্তাদের ই-মেইল, ফোন করেও হোটেলের সিট মেলানো সম্ভব হয়নি। এমনিতে সব সময় জেনেভায় নানার রকম সম্মেলন লেগে থাকে। ডব্লিউটিও সম্মেলন উপলক্ষে ভিড় যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশী প্রবাসী খুঁজতে থাকি। কিন্তু বিধি বাম। জানা গেল, বাসস্থান ব্যয়বহুল হওয়ায় জেনেভায় কাজ করলেও সবাই থাকে শহরের বাইরে। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল ইউএন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের সন্ধান। টাঙ্গাইলের এই ভদ্রলোক সপরিবারে প্রায় বিশ বছর ধরে জেনেভা প্রবাসী। জেনেভায় গিয়ে জানা গেল, হোটেল না পাওয়ার তালিকায় আরও দুই সাংবাদিকও আছেন। ভাগ্যের জোরে শেষ পর্যন্ত আমাদের অন্য সাংবাদিকরা যে হোটেলে উঠেছেন, সেই হোটেল ড্রিকে একটা রুম পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত এই এক রুমেই তিনজন উঠে পড়ি। জনকণ্ঠের কাওসার রহমান, ইনকিলাবের সালাহউদ্দিন বাবুল এবং আমি এক রুমেই চারদিন থেকেছি। একই হোটেলে ছিলাম প্রথম আলোর শওকত হোসেন মাসুম, এটিএন বাংলার সানাউল হক দোলন, চ্যানেল ওয়ানের সাইফুল হাসান, এনটিভির মিরাজ আহমদ চৌধুরী এবং ক্যামেরাম্যান হুমায়ুন কবির। এছাড়াও বিজিএমইএ পরিচালক তুশাকা গ্রুপের চেয়ারম্যান আরশাদ জামাল দিপুও একই হোটেলে ছিলেন। ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের তামিম, জার্মান রেডিও দয়েসে ভেলের ঝুমা এবং বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ব্যবসায়ী নেতা ও সরকারি প্রতিনিধিরা ছিলেন অন্য হোটেলে। ৩০ নভেম্বর সূচিত এ সম্মেলন শেষ হয় ২ ডিসেম্বর। সম্মেলনের ফাঁকে ফাঁকে ছোট শহর জেনেভা ঘুরে দেখা। বিশেষ করে জেনেভাস্থ জাতিসংঘ কার্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখান সেখানকার কর্মকর্তা বাংলাদেশের আবুল কালাম আজাদ ভাই। জেনেভার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন শেষে ৩ ডিসম্বের আমরা কয়েকজন ফ্রান্সে চলে যাই। অন্যদল যায় ডেনমার্ক ও ব্রাসেলসে।
জেনেভার সব কিছুই যেন ছবির মত সাজানো গোছানো। কোথাও সামান্যতমও ছন্দপতন নেই। সারি সারি বিল্ডিং। একই রাস্তায় নির্ধারিত লেন ধরে চলছে ট্রাম, বাস, সাইকেল, প্রাইভেট কার। একসঙ্গে চললেও কোন গাড়ির এক মিনিটও সময় নষ্ট হচ্ছে না। কোন গাড়ি বা ট্রাম সিগন্যালে কতক্ষণ দাঁড়াবে, সেটাও নির্ধারিত। এখানকার মানুষদের মধ্যে উচ্ছলতা বা টেনশন নেই। এই নিয়মাতান্ত্রিক শহর সম্পর্কে প্রবাসী বাংলাদেশী গাড়ি চালক আলাউদ্দিনের বক্তব্য: সরকার বা প্রশাসনের ব্যক্তিরা চাইলে সব কিছুই নিয়মাতান্ত্রিক করা সম্ভব। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন-বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা আইন মানে না বলেই এখানে সব কিছুতেই বিশৃংখলা লেগে আছে। জানা যায়, সুইজারল্যান্ডে এক হাজার ছয়’শ পঞ্চাশ জন বাংলাদেশী রয়েছেন। জেনেভা শহরে রয়েছেন প্রায় দুই’শ জন। যাদের মধ্যে ছোট একটা গ্রুপ ব্যবসায়ী। এরা সাধারণত নব্বই দশকে এ দেশে আসেন। বেশিরভাগই রেস্টুরেন্ট বয় বা বেসরকারী অফিসে চাকরি করেন।
ইউরোপের আন্তর্জাতিক রোন নদীর তীর ঘেঁষে জেনেভা হ্রদের ঠিক দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে বিশ্বের এ গুরুত্বপূর্ণ নগরী অবস্থিত। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল সেন্টার ইনডেক্স মতে, এটি বিশ্বের সপ্তম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নগরী। কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নগরী হিসেবে পরিচিত জেনেভায় যুদ্ধবন্দিদের মানবাধিকার রক্ষায় ১৯৪৯ সালে ঐতিহাসিক জেনেভা কনভেনশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এ কারণে এটি শান্তির রাজধানী নামেও পরিচিত।
জেনেভা এক সময় সীমান্ত শহর নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীন রোমান নথিপত্রেও এ শহরটির নাম পাওয়া যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে লীগ অব নেশন্সের সদর দফতর হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর সাগরপৃষ্ঠ থেকে ১২২৫ ফুট উঁচুতে অবস্থিত জেনেভা শহর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর কাড়ে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই বেশক’টি আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদর দফতর হওয়ার সুবাদে নগরীটি পর্যটন ও ব্যবসায়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে।
শীতকালে তুষার-ঝড় স্বাভাবিক ব্যাপার হলেও জেনেভার আবহাওয়া সাধারণত সহনীয় পর্যায়েই থাকে। এখানে-সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে শত শত জাদুঘর ও আর্ট গ্যালারি। ২০০৮ সালের আদমশুমারি মতে, জেনেভার লোকসংখ্যা মাত্র এক লাখ ৮৬ হাজার ৮২৫ জন। এখানকার ৫৪ শতাংশ অধিবাসীর রয়েছে বিদেশি পাসপোর্ট। এখানে জার্মান ও ফরাসি ভাষার দাপট বেশি।
জেটি ইন্টারন্যাশনাল, মেডিটারিনিয়ান শিপিং কোম্পানি, সিরোনো, সিটা, সোসাইটি জেনারেল দ্য সার্ভিলেন্স আরএসটি মাইক্রোইলেকট্রনিক্সের মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানি আর ক্যাটারপিলার, ডুপন্ট, টেইক টু ইন্টারেকটিভ, ইলেকট্রনিক্স আর্টস, ইনভিসটা, প্রক্টার ও গ্যাম্বল অ্যান্ড সান মাইক্রোসিস্টেমের মতো বহুজাতিক কোম্পানির সদর দফতর এ ছোট্ট নগরীর বুকে ঠাঁই পেয়েছে। ২০০৯ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, বিশ্বের চতুর্থ ব্যয়বহুল নগরী হচ্ছে জেনেভো।
জাতিসংঘের নানা এজেন্সি ছাড়াও এখানে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (ডব্লিউটিও), ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) ও রেডক্রস এবং রেডক্রিসেন্টের মতো আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠনের সদর দফতরও অবস্থিত।
জেনেভা প্রসঙ্গ উঠলেই স্বাভাবিকভাবে সুইজারল্যান্ড প্রসঙ্গ আসে। কারণ শান্তির প্রতিভূ হিসেবে পরিচিত সুইজারল্যান্ড বিশ্বাস করে সব জাতির সহাবস্থানে। মানবাধিকারে অগাধ বিশ্বাস ইউরোপের এ নিরপেক্ষ দেশটির। পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব যাতে না পড়ে, সেজন্য সুইসরা ভীষণ সতর্ক। তারা দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গড়তে চায়। মানবিকতার পাশাপাশি নিরপেক্ষতা বজায় রাখতেও তারা সব সময় সচেষ্ট।
ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী তারা বহির্বিশ্বের কোথাও অস্ত্র ব্যবহার বা হামলার ক্ষেত্রে অংশ নিতে চায় না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের দুঃসময়ে তারা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
সুইজারল্যান্ড ১৯৬০ সালে ইউরোপিয়ান ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হয়। ১৯৬৩ সালে ইউরোপিয়ান কাউন্সিলে যুক্ত হয়। ১৯৭৫ সালে তারা ইউরোপিয়ান নিরাপত্তা ও সহযোগিতাবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সদস্য পদ লাভ করে। তারা ইউরোপিয়ান অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন কমিশনের সদস্য। অর্থনৈতিক ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন সংস্থার সদস্য দেশটি।
এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা তিন স্তরে বিভক্ত—প্রথম মাধ্যমিক স্তর বাধ্যতামূলক। এটা শেষ করতে লাগে ৯ বছর। দ্বিতীয় মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। স্কুল শেষে ৬০ শতাংশ তরুণ-তরুণী শিক্ষানবিস হিসেবে চার বছরের জন্য কাজ করতে যান। যারা উচ্চশিক্ষা নিতে চান, সরকার তাদের উত্সাহিত করে। সব শিক্ষাই সরকারি। গবেষণার ক্ষেত্রে জিডিপির বড় অংশ ব্যয় করে তারা। দুই-তৃতীয়াংশ সুইস গবেষণা ফান্ড আসে বেসরকারি খাত থেকে।
গণতন্ত্রী সুইজারল্যান্ডে ১৯৪৮ সালে সুইস কনফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আওতায় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় তিনটি রাজনৈতিক স্তর রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ২৬টি অঞ্চল বা জেলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি পূর্ণাঙ্গ এবং ৬টি অর্ধ অঞ্চল। অঞ্চল এলাকা রয়েছে ২৭০০টি।
ভোটাররা সরাসরি সংসদে পাস হওয়া আইনের বিরুদ্ধে রেফারেন্ডাম—হ্যাঁ, না ভোট দিতে পারেন। এক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে, ওই আইনের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৫০ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর নিয়ে ১০০ দিনের মধ্যে জমা দিতে হবে। যাতে গোটা দেশব্যাপী ভোট হয়। দুই স্তরবিশিষ্ট সংসদের একটি হলো জাতীয় পরিষদ, অন্যটি হচ্ছে সিনেট। জাতীয় পরিষদের সদস্য সংখ্যা ২০০। সিনেটে প্রতিটি অঞ্চল থেকে দু’জন করে এবং অর্ধ-অঞ্চল থেকে একজন করে সদস্য নির্বাচিত হন।
সরকার সাত সদস্যবিশিষ্ট ফেডারেশন পরিষদ দ্বারা গঠিত এবং দুই স্তরবিশিষ্ট সংসদ কর্তৃক যৌথভাবে শাসিত হয়।
সুইস অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সেবা খাত। মোট শ্রমশক্তির ৭২.৬ শতাংশ নিয়োজিত রয়েছে সেবা খাতে। ২৩.৬ শতাংশ শিল্পে এবং ৩.৮ শতাংশ কৃষিতে। সেবাখাতের মধ্যে আছে বীমা, ব্যাংক, পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্য। সুইস অর্থনীতিতে বড় মাপের ভূমিকা রাখে ক্ষুদ্র কুটির শিল্প। এগুলোর ৯৯% রেজিস্টার্ড এবং এখানে উত্পাদিত পণ্য রফতানি করা হয়। এর মধ্যে রাসায়নিক দ্রব্য, মেশিনারি, ঘড়ি, জুয়েলারি পণ্য অন্যতম। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশটির প্রধান মুদ্রা সুইস ফ্রাংক।
এখানে মূলত চার ধরনের ভাষা ব্যবহৃত হয়। প্রধান ভাষা জার্মান। ৬৩ শতাংশ লোক জার্মান ব্যবহার করে। ফরাসি ২০.৪, ইটালিয়ান ৬.৫, রোমান .৫০ শতাংশ।
৪১ হাজার ২৮৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশ সুইজারল্যান্ডে মোট জনসংখ্যা ৭.৪ মিলিয়ন বা ৭৪ লাখ। এর মধ্যে ১.৬ মিলিয়ন বা ১৬ লাখ মানুষ বিদেশি। ১৯৭২ সাল থেকে এখানে জন্মহার মৃত্যু হারের চেয়ে বেশি নয়। বরং বৃদ্ধের সংখ্যা বেশি। মেয়েদের গড় আয়ু ৮৪ আর ছেলেদের ৭৯ বছর। এখানে ৪২ শতাংশ লোক রোমান ক্যাথলিক। ৩৫ শতাংশ প্রোটেস্টান্ট, ৮ শতাংশ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। সুইজারল্যান্ডে প্রত্যেক পরিবারের রেডিও, টেলিভিশন ছাড়াও ৫ মিলিয়ন গাড়ি আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের মালিক এই দেশটির জনগণ।
পশ্চিম ইউরোপে সুইজারল্যান্ড অবস্থিত। উত্তর দিকে জার্মানি। পূর্বে অস্ট্রিয়া ও লিথুয়ানিয়া, দক্ষিণে ইতালি, পশ্চিমে ফ্রান্স। তবে জেনেভাই সুইসদের প্রাণ। তাদের যাবতীয় গর্ব আর ঐতিহ্য এ নগরীকে ঘিরে আবর্তিত হয়।
নোবেল জয়ী সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ড বলতেন, I don’t like Switzerland; it has produced nothing but theologians and waiters. আমার বিশ্বাস, সুইজারল্যান্ডের বর্তমান অর্থনৈতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড দেখলে তিনি হয়তো তাঁর মত পাল্টাতেন।
পুনশ্চ: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সপ্তম মন্ত্রী পর্যায়ের এ সম্মেলনে আট বছর যাবত্ ধনী-গরিবের স্বার্থের দ্বন্দ্বে আটকে যাওয়া বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। কোনো সিদ্ধান্ত না হলেও ১৫৩টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা নির্ধারিত তিন মিনিট সময়ে নিজেদের দাবি দাওয়া তুলে ধরেন। বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে এলডিসি বহির্ভূত দেশের তুলনায় আরও বেশি অগ্রাধিকার সুবিধা চাইলেন। সম্মেলনে ডব্লিউটিও মহাপরিচালক প্যাসকেল লামি উদ্বোধনী বক্তৃতায় চীনা প্রবাদ জং জি চেং চেং ব্যবহার করলেন, যার বাংলা হচ্ছে একতাই শান্তি। ৩০ নভেম্বর স্থানীয় সময় বেলা তিনটায় বাংলাদেশ সময় রাত নয়টায় ডব্লিউটিও সম্মেলন শুরু হয়। শেষ হয় ২ ডিসেম্বর।
ব্রিটিশ ফোক সিঙ্গার লরা মারলিং তাঁর বিখ্যাত গান ‘মাই মেনিক অ্যান্ড আই’-এ জেনেভা বন্দনা করেছেন। কারণ এ গানের শিল্পী জেনেভায়ই যেন তার মৃত্যু হয়, এই কামনা করেছেন। সম্প্রতি এ কামনার সারবত্তা খুঁজে পেলাম বিশ্বের এ আকর্ষণীয় কসমোপলিটান নগরীতে এসে। এটাও উপলব্ধিতে এলো লাতিন নোবেল জয়ী সাহিত্যিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মারকেজ কেন তাঁর বিখ্যাত ‘স্ট্রেঞ্জ পিলগ্রিমস’ গ্রন্থে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট মেট্রোপলিটন নগরীর এতটা উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন।
১৮৬৩ সালে মহামতি হেনরি ডুন্যান্ট সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আন্তর্জাতিক রেডক্রস প্রতিষ্ঠার আগে নগরটির আন্তর্জাতিক আবেদন তেমন ছিল না। কিন্তু মাত্র একশো বছরের ব্যবধানে ইউরোপের বরফঢাকা আল্পস ও জুরা পর্বতমালা ঘেরা নয়নাভিরাম এ সুইস শহর আন্তর্জাতিক নগরীর মর্যাদা অতিক্রম করে এখন গ্লোবাল নগরীর মর্যাদা ভোগ করছে। ভাবা যায়, মাত্র ৬.১২ বর্গমাইল আয়তনের এ নগরীতে দুই শতাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সদর দফতর রয়েছে!
সম্প্রতি জেনেভায় অনুষ্ঠিত ডব্লিউটিও সম্মেলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া থেকে আমরা দশ সাংবাদিক সেখানে গিয়েছিলাম। ঈদের দিন রাতে আমরা কাতার এয়ারওয়েজে যাত্রা করি। বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ও বেসরকারি সংস্থার কয়েকজন প্রতিনিধি এ সম্মেলনে যোগ দেন। ডব্লিউটিওর মোট ১৫৩টি সদস্য দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিনিধি দল এ সম্মেলনে অংশ নেয়। এ উপলক্ষে গোটা জেনেভা শহর যেন লোকে-লোকারণ্য হয়ে ওঠে। হোটেল রেস্টুরেন্টে ভিড় লেগে যায়। যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকে হোটেল সিট খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। জেনেভাস্থ বাংলাদেশ মিশন কর্মকর্তাদের ই-মেইল, ফোন করেও হোটেলের সিট মেলানো সম্ভব হয়নি। এমনিতে সব সময় জেনেভায় নানার রকম সম্মেলন লেগে থাকে। ডব্লিউটিও সম্মেলন উপলক্ষে ভিড় যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশী প্রবাসী খুঁজতে থাকি। কিন্তু বিধি বাম। জানা গেল, বাসস্থান ব্যয়বহুল হওয়ায় জেনেভায় কাজ করলেও সবাই থাকে শহরের বাইরে। শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল ইউএন কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদের সন্ধান। টাঙ্গাইলের এই ভদ্রলোক সপরিবারে প্রায় বিশ বছর ধরে জেনেভা প্রবাসী। জেনেভায় গিয়ে জানা গেল, হোটেল না পাওয়ার তালিকায় আরও দুই সাংবাদিকও আছেন। ভাগ্যের জোরে শেষ পর্যন্ত আমাদের অন্য সাংবাদিকরা যে হোটেলে উঠেছেন, সেই হোটেল ড্রিকে একটা রুম পাওয়া যায়। শেষ পর্যন্ত এই এক রুমেই তিনজন উঠে পড়ি। জনকণ্ঠের কাওসার রহমান, ইনকিলাবের সালাহউদ্দিন বাবুল এবং আমি এক রুমেই চারদিন থেকেছি। একই হোটেলে ছিলাম প্রথম আলোর শওকত হোসেন মাসুম, এটিএন বাংলার সানাউল হক দোলন, চ্যানেল ওয়ানের সাইফুল হাসান, এনটিভির মিরাজ আহমদ চৌধুরী এবং ক্যামেরাম্যান হুমায়ুন কবির। এছাড়াও বিজিএমইএ পরিচালক তুশাকা গ্রুপের চেয়ারম্যান আরশাদ জামাল দিপুও একই হোটেলে ছিলেন। ইংরেজি দৈনিক নিউ এজের তামিম, জার্মান রেডিও দয়েসে ভেলের ঝুমা এবং বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ব্যবসায়ী নেতা ও সরকারি প্রতিনিধিরা ছিলেন অন্য হোটেলে। ৩০ নভেম্বর সূচিত এ সম্মেলন শেষ হয় ২ ডিসেম্বর। সম্মেলনের ফাঁকে ফাঁকে ছোট শহর জেনেভা ঘুরে দেখা। বিশেষ করে জেনেভাস্থ জাতিসংঘ কার্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ঘুরে দেখান সেখানকার কর্মকর্তা বাংলাদেশের আবুল কালাম আজাদ ভাই। জেনেভার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন শেষে ৩ ডিসম্বের আমরা কয়েকজন ফ্রান্সে চলে যাই। অন্যদল যায় ডেনমার্ক ও ব্রাসেলসে।
জেনেভার সব কিছুই যেন ছবির মত সাজানো গোছানো। কোথাও সামান্যতমও ছন্দপতন নেই। সারি সারি বিল্ডিং। একই রাস্তায় নির্ধারিত লেন ধরে চলছে ট্রাম, বাস, সাইকেল, প্রাইভেট কার। একসঙ্গে চললেও কোন গাড়ির এক মিনিটও সময় নষ্ট হচ্ছে না। কোন গাড়ি বা ট্রাম সিগন্যালে কতক্ষণ দাঁড়াবে, সেটাও নির্ধারিত। এখানকার মানুষদের মধ্যে উচ্ছলতা বা টেনশন নেই। এই নিয়মাতান্ত্রিক শহর সম্পর্কে প্রবাসী বাংলাদেশী গাড়ি চালক আলাউদ্দিনের বক্তব্য: সরকার বা প্রশাসনের ব্যক্তিরা চাইলে সব কিছুই নিয়মাতান্ত্রিক করা সম্ভব। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন-বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা আইন মানে না বলেই এখানে সব কিছুতেই বিশৃংখলা লেগে আছে। জানা যায়, সুইজারল্যান্ডে এক হাজার ছয়’শ পঞ্চাশ জন বাংলাদেশী রয়েছেন। জেনেভা শহরে রয়েছেন প্রায় দুই’শ জন। যাদের মধ্যে ছোট একটা গ্রুপ ব্যবসায়ী। এরা সাধারণত নব্বই দশকে এ দেশে আসেন। বেশিরভাগই রেস্টুরেন্ট বয় বা বেসরকারী অফিসে চাকরি করেন।
ইউরোপের আন্তর্জাতিক রোন নদীর তীর ঘেঁষে জেনেভা হ্রদের ঠিক দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে বিশ্বের এ গুরুত্বপূর্ণ নগরী অবস্থিত। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল সেন্টার ইনডেক্স মতে, এটি বিশ্বের সপ্তম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নগরী। কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নগরী হিসেবে পরিচিত জেনেভায় যুদ্ধবন্দিদের মানবাধিকার রক্ষায় ১৯৪৯ সালে ঐতিহাসিক জেনেভা কনভেনশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এ কারণে এটি শান্তির রাজধানী নামেও পরিচিত।
জেনেভা এক সময় সীমান্ত শহর নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীন রোমান নথিপত্রেও এ শহরটির নাম পাওয়া যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে লীগ অব নেশন্সের সদর দফতর হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর সাগরপৃষ্ঠ থেকে ১২২৫ ফুট উঁচুতে অবস্থিত জেনেভা শহর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর কাড়ে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরই বেশক’টি আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদর দফতর হওয়ার সুবাদে নগরীটি পর্যটন ও ব্যবসায়ের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে উঠতে থাকে।
শীতকালে তুষার-ঝড় স্বাভাবিক ব্যাপার হলেও জেনেভার আবহাওয়া সাধারণত সহনীয় পর্যায়েই থাকে। এখানে-সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে শত শত জাদুঘর ও আর্ট গ্যালারি। ২০০৮ সালের আদমশুমারি মতে, জেনেভার লোকসংখ্যা মাত্র এক লাখ ৮৬ হাজার ৮২৫ জন। এখানকার ৫৪ শতাংশ অধিবাসীর রয়েছে বিদেশি পাসপোর্ট। এখানে জার্মান ও ফরাসি ভাষার দাপট বেশি।
জেটি ইন্টারন্যাশনাল, মেডিটারিনিয়ান শিপিং কোম্পানি, সিরোনো, সিটা, সোসাইটি জেনারেল দ্য সার্ভিলেন্স আরএসটি মাইক্রোইলেকট্রনিক্সের মতো আন্তর্জাতিক কোম্পানি আর ক্যাটারপিলার, ডুপন্ট, টেইক টু ইন্টারেকটিভ, ইলেকট্রনিক্স আর্টস, ইনভিসটা, প্রক্টার ও গ্যাম্বল অ্যান্ড সান মাইক্রোসিস্টেমের মতো বহুজাতিক কোম্পানির সদর দফতর এ ছোট্ট নগরীর বুকে ঠাঁই পেয়েছে। ২০০৯ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, বিশ্বের চতুর্থ ব্যয়বহুল নগরী হচ্ছে জেনেভো।
জাতিসংঘের নানা এজেন্সি ছাড়াও এখানে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (ডব্লিউটিও), ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) ও রেডক্রস এবং রেডক্রিসেন্টের মতো আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংগঠনের সদর দফতরও অবস্থিত।
জেনেভা প্রসঙ্গ উঠলেই স্বাভাবিকভাবে সুইজারল্যান্ড প্রসঙ্গ আসে। কারণ শান্তির প্রতিভূ হিসেবে পরিচিত সুইজারল্যান্ড বিশ্বাস করে সব জাতির সহাবস্থানে। মানবাধিকারে অগাধ বিশ্বাস ইউরোপের এ নিরপেক্ষ দেশটির। পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব যাতে না পড়ে, সেজন্য সুইসরা ভীষণ সতর্ক। তারা দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব গড়তে চায়। মানবিকতার পাশাপাশি নিরপেক্ষতা বজায় রাখতেও তারা সব সময় সচেষ্ট।
ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী তারা বহির্বিশ্বের কোথাও অস্ত্র ব্যবহার বা হামলার ক্ষেত্রে অংশ নিতে চায় না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের দুঃসময়ে তারা সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
সুইজারল্যান্ড ১৯৬০ সালে ইউরোপিয়ান ফ্রি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হয়। ১৯৬৩ সালে ইউরোপিয়ান কাউন্সিলে যুক্ত হয়। ১৯৭৫ সালে তারা ইউরোপিয়ান নিরাপত্তা ও সহযোগিতাবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের সদস্য পদ লাভ করে। তারা ইউরোপিয়ান অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন কমিশনের সদস্য। অর্থনৈতিক ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন সংস্থার সদস্য দেশটি।
এখানকার শিক্ষাব্যবস্থা তিন স্তরে বিভক্ত—প্রথম মাধ্যমিক স্তর বাধ্যতামূলক। এটা শেষ করতে লাগে ৯ বছর। দ্বিতীয় মাধ্যমিক স্তরে কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। স্কুল শেষে ৬০ শতাংশ তরুণ-তরুণী শিক্ষানবিস হিসেবে চার বছরের জন্য কাজ করতে যান। যারা উচ্চশিক্ষা নিতে চান, সরকার তাদের উত্সাহিত করে। সব শিক্ষাই সরকারি। গবেষণার ক্ষেত্রে জিডিপির বড় অংশ ব্যয় করে তারা। দুই-তৃতীয়াংশ সুইস গবেষণা ফান্ড আসে বেসরকারি খাত থেকে।
গণতন্ত্রী সুইজারল্যান্ডে ১৯৪৮ সালে সুইস কনফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আওতায় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় তিনটি রাজনৈতিক স্তর রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ২৬টি অঞ্চল বা জেলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি পূর্ণাঙ্গ এবং ৬টি অর্ধ অঞ্চল। অঞ্চল এলাকা রয়েছে ২৭০০টি।
ভোটাররা সরাসরি সংসদে পাস হওয়া আইনের বিরুদ্ধে রেফারেন্ডাম—হ্যাঁ, না ভোট দিতে পারেন। এক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে, ওই আইনের বিরুদ্ধে কমপক্ষে ৫০ হাজার ভোটারের স্বাক্ষর নিয়ে ১০০ দিনের মধ্যে জমা দিতে হবে। যাতে গোটা দেশব্যাপী ভোট হয়। দুই স্তরবিশিষ্ট সংসদের একটি হলো জাতীয় পরিষদ, অন্যটি হচ্ছে সিনেট। জাতীয় পরিষদের সদস্য সংখ্যা ২০০। সিনেটে প্রতিটি অঞ্চল থেকে দু’জন করে এবং অর্ধ-অঞ্চল থেকে একজন করে সদস্য নির্বাচিত হন।
সরকার সাত সদস্যবিশিষ্ট ফেডারেশন পরিষদ দ্বারা গঠিত এবং দুই স্তরবিশিষ্ট সংসদ কর্তৃক যৌথভাবে শাসিত হয়।
সুইস অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি সেবা খাত। মোট শ্রমশক্তির ৭২.৬ শতাংশ নিয়োজিত রয়েছে সেবা খাতে। ২৩.৬ শতাংশ শিল্পে এবং ৩.৮ শতাংশ কৃষিতে। সেবাখাতের মধ্যে আছে বীমা, ব্যাংক, পর্যটন ও ব্যবসা-বাণিজ্য। সুইস অর্থনীতিতে বড় মাপের ভূমিকা রাখে ক্ষুদ্র কুটির শিল্প। এগুলোর ৯৯% রেজিস্টার্ড এবং এখানে উত্পাদিত পণ্য রফতানি করা হয়। এর মধ্যে রাসায়নিক দ্রব্য, মেশিনারি, ঘড়ি, জুয়েলারি পণ্য অন্যতম। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশটির প্রধান মুদ্রা সুইস ফ্রাংক।
এখানে মূলত চার ধরনের ভাষা ব্যবহৃত হয়। প্রধান ভাষা জার্মান। ৬৩ শতাংশ লোক জার্মান ব্যবহার করে। ফরাসি ২০.৪, ইটালিয়ান ৬.৫, রোমান .৫০ শতাংশ।
৪১ হাজার ২৮৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশ সুইজারল্যান্ডে মোট জনসংখ্যা ৭.৪ মিলিয়ন বা ৭৪ লাখ। এর মধ্যে ১.৬ মিলিয়ন বা ১৬ লাখ মানুষ বিদেশি। ১৯৭২ সাল থেকে এখানে জন্মহার মৃত্যু হারের চেয়ে বেশি নয়। বরং বৃদ্ধের সংখ্যা বেশি। মেয়েদের গড় আয়ু ৮৪ আর ছেলেদের ৭৯ বছর। এখানে ৪২ শতাংশ লোক রোমান ক্যাথলিক। ৩৫ শতাংশ প্রোটেস্টান্ট, ৮ শতাংশ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। সুইজারল্যান্ডে প্রত্যেক পরিবারের রেডিও, টেলিভিশন ছাড়াও ৫ মিলিয়ন গাড়ি আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের মালিক এই দেশটির জনগণ।
পশ্চিম ইউরোপে সুইজারল্যান্ড অবস্থিত। উত্তর দিকে জার্মানি। পূর্বে অস্ট্রিয়া ও লিথুয়ানিয়া, দক্ষিণে ইতালি, পশ্চিমে ফ্রান্স। তবে জেনেভাই সুইসদের প্রাণ। তাদের যাবতীয় গর্ব আর ঐতিহ্য এ নগরীকে ঘিরে আবর্তিত হয়।
নোবেল জয়ী সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ড বলতেন, I don’t like Switzerland; it has produced nothing but theologians and waiters. আমার বিশ্বাস, সুইজারল্যান্ডের বর্তমান অর্থনৈতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড দেখলে তিনি হয়তো তাঁর মত পাল্টাতেন।
পুনশ্চ: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সপ্তম মন্ত্রী পর্যায়ের এ সম্মেলনে আট বছর যাবত্ ধনী-গরিবের স্বার্থের দ্বন্দ্বে আটকে যাওয়া বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। কোনো সিদ্ধান্ত না হলেও ১৫৩টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা নির্ধারিত তিন মিনিট সময়ে নিজেদের দাবি দাওয়া তুলে ধরেন। বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে এলডিসি বহির্ভূত দেশের তুলনায় আরও বেশি অগ্রাধিকার সুবিধা চাইলেন। সম্মেলনে ডব্লিউটিও মহাপরিচালক প্যাসকেল লামি উদ্বোধনী বক্তৃতায় চীনা প্রবাদ জং জি চেং চেং ব্যবহার করলেন, যার বাংলা হচ্ছে একতাই শান্তি। ৩০ নভেম্বর স্থানীয় সময় বেলা তিনটায় বাংলাদেশ সময় রাত নয়টায় ডব্লিউটিও সম্মেলন শুরু হয়। শেষ হয় ২ ডিসেম্বর।


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


