Amardesh
আজঃ ঢাকা, রোববার ২০ ডিসেম্বর ২০০৯, ৬ পৌষ ১৪১৬, ২ মহররম ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

একাত্তরের কণ্ঠযোদ্ধা

আহমদ বাসির
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক অনিবার্য অধ্যায়। অস্ত্র হাতে যোদ্ধারা যখন ময়দানে যুদ্ধরত, স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পীরা তখন কণ্ঠের অস্ত্র দিয়ে, গণসঙ্গীত গেয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে সেই যোদ্ধাদের। ৩৮তম বিজয় বার্ষিকীর এদিনে সেই কণ্ঠযোদ্ধাদের কয়েকজন কথা বলেছেন আমার দেশ-এর প্রতিনিধির সঙ্গে। তারা জানিয়েছেন তাদের আনন্দ-বেদনা, ক্ষোভ, অপ্রাপ্তি, প্রাপ্তি ও প্রত্যাশার কথা।
শাহীন সামাদ
স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী হিসেবে কোনো অতৃপ্তি বা অপ্রাপ্তির ক্ষোভ নেই শিল্পী শাহীন সামাদের। তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী হিসেবে সরকারিভাবে না হোক, সাধারণ মানুষের কাছে কিংবা বেসরকারিভাবে অনেক অনেক ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছি। তবে কিছুদিন আগে পর্যন্ত যে একটা শূন্যতা অনুভব করতাম, সেটা এখন কেটে গেছে। আমরা চেয়েছিলাম, সেই গানগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে দিতে। সে জন্য গত বছর আমরা ‘রূপান্তরের গান’ বের করেছিলাম। এবার দেখছি টিভিতে নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা গানগুলো গাইছে। যদিও এটা করতে ৩৮ বছর লেগে গেল, তবুও ভালো লাগছে এই ভেবে যে, এখন তো হচ্ছে।
আমার আরেকটি ইচ্ছা আছে স্বাধীন বাংলা বেতারের সেই গানগুলো নিয়ে। আমরা যারা আছি, তারা যদি শিক্ষক হিসেবে টিভি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গানগুলো নতুনদের শেখাতে পারি, তাহলে খুবই ভালো হয়। ফেরদৌসী আপা যেভাবে শেখাতেন সেভাবে। তাহলে গানগুলো যে যেখানে আছে, সেখানে টিভির সামনে বসে শিখে নিতে পারবে। এ ব্যাপারে আমি দুটি টিভি চ্যানেলকে প্রস্তাব দিয়েছি। স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী, কলা-কুশলীদের সম্পর্কে শাহীন সামাদ বলেন, ‘মুষ্টিমেয় শিল্পী ছাড়া কেউই সে রকম সম্মান-মর্যাদা পাননি। বিষয়টি সরকারের লক্ষ্য করা উচিত। স্বাধীন বাংলা বেতারের পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’র আছে বড় অবদান। এ সংস্থার শিল্পী ছিলেন যারা, তাদেরও সেভাবে সম্মানিত করা উচিত এবং শিল্পী সংস্থার গানগুলোও নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে ওঠে আসা উচিত।
শাহীন সামাদ আরও বলেন, তরুণ প্রজন্ম সম্পর্কে আমি পুরোপুরি আশাবাদী। গত ইলেকশনের পর আমার ধারণা বদলে গেছে। আমার মনে হচ্ছে তরুণদের মধ্যে সংগ্রামের চেতনা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে।

এমএ মান্নান
স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী এমএ মান্নানের মনে অনেক ক্ষোভ। তিনি বলেন, আমরা যারা স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী ছিলাম, তারাও তো সবাই মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে থাকতাম, বেতারে গিয়ে গান করে আসতাম। স্বাধীনতার ৩৮ বছর পরও আমাদের কোনো আশা-প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আমাদের নিয়ে কিছুই হয়নি। সরকার আমাদের জন্য কিছু না করুক, আমাদের কিছু না দিক, একদিন অন্তত ডেকে নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথাও বলতে পারত। এই ৩৮ বছরে আমার মনে পড়ে না কোনো সরকার আমাদের জন্য কিছু করেছে।
এমএ মান্নান বলেন, স্বাধীন বাংলা বেতারে আমাদের শিল্পী, কলা-কুশলী, যন্ত্রীর সংখ্যা কম নয়, কিন্তু সব সময়ই দেখছি মুষ্টিমেয় কয়েকজন শিল্পীকে নিয়ে অনুষ্ঠান করা হয়। এবারও বিটিভিতে মাত্র ৫/৬ জন শিল্পীকে নিয়ে অনুষ্ঠান করা হলো। অথচ সবাইকে একত্রিত করে এ অনুষ্ঠান হতে পারত। তাহলে অন্তত আমরা যারা বেঁচে আছি, তারা একদিনের জন্যও একত্রিত হতে পারতাম। বিটিভি এটা ইচ্ছা করলেই করতে পারে, কিন্তু তাদের কাছেও আমাদের এ প্রত্যাশা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের দেশাত্মবোধ প্রসঙ্গে এমএ মান্নান বলেন, দেশাত্মবোধ তো সবার মধ্যেই আছে। কিন্তু একাত্তরে আমরা ঠিক যেরকমভাবে দেশাত্মবোধের পরিচয় দিয়েছি এখন সেরকম পাওয়া যাবে না। তাছাড়া দেশাত্মবোধক গান, মানুষ-সমাজ-জাতি নিয়ে চিন্তা করার মতো গানও এখন অনেক কম হচ্ছে। তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী হিসেবে যে ক্ষোভ আর কষ্ট আছে, সেটা নিয়েই দুনিয়া থেকে চলে যেতে হবে। এ ক্ষোভ আর কষ্ট দূর হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও দেখছি না।

বিপুল ভট্টাচার্য
শিল্পী বিপুল ভট্টাচার্য বলেন, আসলে আমার চাওয়ার কিছু নেই, পাওয়ারও কিছু নেই। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম। বুঝে হোক না বুঝে হোক, একটা চেতনা তো কাজ করেছিল। সেই চেতনা থেকে আমরা স্বাধীন বাংলা বেতারে জাগরণের গান গেয়েছি। প্রতিরোধের গান গেয়েছি। এটা করেছিলাম দেশের প্রতি কর্তব্য বোধ, মাটির টানেই। এখন জাতি যদি মনে করে স্বাধীনতার পেছনে আমাদেরও কিছু না কিছু অবদান ছিল, তাহলে সে অবদানের স্বীকৃতি জাতীয়ভাবে দেবে আর যদি মনে করা হয় যে, কোনো অবদান আমাদের ছিল না, তাহলে স্বীকৃতি বা মূল্যায়ন করবে না। তারা যাই করুক না কেন, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছি সেটাই অনেক।
ব্যক্তিগতভাবে এরকম অভিমত প্রকাশ করলেও স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী, যন্ত্রী, কলা-কুশলী কারও ব্যাপারে কোনো সরকারই কিছু করেনি বলে তিনি জানান। তিনি বলেন, কেউ আমাদের নিয়ে একসঙ্গে বসে এককাপ চাও খায়নি—এটা ধ্রুব সত্য। কেউ খোঁজখবরও নেয়নি। আমরা তো কারও কাছে গাড়ি-বাড়ি চাইনি। শিল্পীরা সেটা চায়ও না, কিন্তু যে সামান্য চাওয়া থাকে শিল্পীমাত্রেরই সেটুকুও পাওয়া যায়নি।
নতুন প্রজন্মের দেশাত্মবোধ সম্পর্কে দারুণভাবে আশাবাদী বিপুল ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম আমাদের সেই গানগুলো এত সুন্দরভাবে শিখেছে যে, আমি খুবই আনন্দিত এবং আশাবাদী। চ্যানেল আই সেরা কণ্ঠের শিল্পীরা যেভাবে তাদের কণ্ঠে ধারণ করেছে, তাতে আশাবাদী না হয়ে উপায় নেই। তাছাড়া বর্তমান প্রজন্ম শত্রু-মিত্র ভালো করেই চেনে। তারা আগের থেকেও সচেতন।

নমিতা ঘোষ
স্বাধীন বাংলা বেতারের প্রথম মহিলা শিল্পী নমিতা ঘোষ। শুধু কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবেই নন, মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহেও তিনি বিরাট অবদান রেখেছেন। তিনি বলেন, আমরা প্রায় ৩০০ শিল্পী স্বাধীন বাংলা বেতারে গান করেছি। আমাদের জন্য এই ৩৮ বছরে কোনো সরকারই কিছু করেনি। কতজনের জন্য কত কিছু করেছে, কিন্তু আমরা যারা কণ্ঠযোদ্ধা ছিলাম তাদের কোনো খোঁজ-খবরও কেউ নেয়নি—এটাই আমার ক্ষোভ। আমরা তো অন্যকিছু চাইনি। শুধু চেয়েছি নতুন প্রজন্ম জানুক সত্যিকারের ইতিহাস। আমাদের যদি খোঁজ-খবরই নেয়া না হয়, তাহলে নতুন প্রজন্ম জানবে কীভাবে।
শুধু কণ্ঠযোদ্ধা হিসেবে নয়, সে সময় আমরা ১৪ জনের একটি টিম মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রায় ১১ লাখ টাকা সংগ্রহ করেছিলাম। সেটা এখনকার ১১ কোটি টাকা হবে হয়তো। তত্কালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা টাকাটা জমা দিয়েছিলাম। এত কিছু করেছিলাম সে সময়, কিন্তু প্রতিদানে বলার মতো কিছুই পাইনি। শিল্পী নমিতা ঘোষ বলেন, আমাদের ৩০০ শিল্পীর অনেকেই বেঁচে নেই। যারা বেঁচে আছেন তারা আর ক’দিন বেঁচে থাকবেন? সবাইকে চলে যেতে হবে। তারা ক্ষোভ আর দুঃখ নিয়েই কী চলে যাবে? তিনি বলেন, ৩৮ বছর পার হয়েছে। তবু আশা ছাড়িনি। আশা করছি, এ সরকার হয়তো কিছু করবে।


 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?