বিজয়ে বিষাদ
মাহমুদ শামসুল হক
ঊনচল্লিশতম মহান বিজয় দিবস যুগপত্ আনন্দ ও বিষাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল আমাদের। গত আটত্রিশ বছর ধরে আমরা বিজয় থেকে বিষাদকে বিয়োগ করতে পারিনি। এবারও না। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’—যা জাতি হিসেবে আমাদের যূথবদ্ধ করেছিল একাত্তরে, বিজয়ের পর তা আর সংহত থাকেনি। ‘সোনার বাংলা’ নির্মাণের অঙ্গীকার অনেকটা ছেলে ভোলানো গল্পের মতোই থেকে গেছে। বিজয় দিবসের মতো জাতীয় মহোত্সবে আমরা যেন কেবলই আনন্দ উদযাপন করি, বিজয় উদযাপন করতে পারি না। আমাদের স্মৃতি পরিচ্ছন্ন, কিন্তু চেতনার স্তরে ধুলো-ময়লা রয়েই গেছে। কারণ, বিজয় ছিনিয়ে এনেছে ঐক্যবদ্ধ মানুষ, আর বিজয়ের ফল ভোগ করছে কেউ কেউ। এই পটভূমিতে আপামর জনগণের কাছে বিজয় দিবসের তাত্পর্য মোটেই স্পষ্ট নয়। মানুষ অপেক্ষা করেছে তিন যুগেরও বেশি সময়। তাদের কাম্য সোনার বাংলা, খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার মতো দেশ। অন্যকিছু নয়।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের রথ গত আটত্রিশ বছরে কখনও একটি অবিচ্ছিন্ন পথ ধরে এগোয়নি। পরস্পরবিরোধী স্বার্থের টানে এদিক-ওদিক চলেছে। ব্যক্তি স্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থ, শ্রেণী স্বার্থ ইত্যাদি স্বার্থের সংঘাতের মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থ প্রবলভাবে মাথা খাড়া করে দাঁড়াতে পারেনি। যারা রথের চালক হয়েছেন, তাদের মর্জি-মাফিক রথের চাকাও ঘুরেছে। বারবার বিধি-বিধান বদলেছে, এমনকি সংবিধানও। এই অদল-বদলের মধ্য দিয়ে সর্বস্তরে বেড়েছে শোষণ-দুর্নীতি। কাজেই ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে যারা স্বাধীনতাকে অপরিহার্য মনে করেছিল, সেই আপামর জনগণ কেবলই ঠকেছে, প্রতারিত হয়েছে। ফলে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলে যে কথাটি সুযোগ পেলেই বিপুল গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলে থাকেন আমাদের বেশিরভাগ রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিক ও কথিত সুশীল সমাজ তা সাধারণের কাছে বিমূর্ত শব্দমাত্র। দেশের শতকরা ৯০ বা ততোধিক মানুষ ৩৯তম বিজয় দিবসকে কেবল স্মৃতিতে ধারণ করা একটি জাতীয় উত্সব হিসেবেই দেখছেন, অন্যকিছু নয়। তারা দেখেছেন, এ দিবসের তাত্পর্যকে স্মরণে রেখে এ দেশে কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়নের শক্ত ভিত তৈরি হয়নি। যা কিছু হয়েছে, তার ন্যায্য হিস্যা পায়নি সাধারণ মানুষ। দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে শতধাবিভক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হয়নি। মৌলিক জাতীয় স্বার্থেও একই সমতলে কখনও দেখা যায়নি তাদের। এমনকি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ পর্যন্ত দলীয় এবং ব্যক্তির মর্জিমত বিশ্লেষিত হয়েছে। এটাই মানুষের পূর্বাপর অভিজ্ঞতা, এটাই বাস্তবতা। বস্তুত মানুষকে যেন গাছ দেখিয়ে ভুলিয়ে রাখা হয়েছে, চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে অরণ্যের ছবি। আমাদের সার্বিক রাজনৈতিক চালচিত্র এমনই যে, বিজয় দিবসের তাত্পর্য তারা মুখে বলবেন, কাজে নয়। তারা অজস্র অজুহাত দেখিয়ে ঐক্যের পথ রুদ্ধ করবেন এবং প্রতিপক্ষের ওপর সমস্ত দায় চাপিয়ে স্খলন করবেন নিজেদের দোষ। এ অবস্থায় জাতীয় উন্নয়ন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তথা সুষম বণ্টন সম্পর্কে যে উচ্চবাচ্য করা হয়, তা কেবলই হতাশার বৃত্তকেই বড় করে। কেন এই এক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে এদেশে, এবারের বিজয় দিবসের আলোকে তা ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব—সবদিক থেকে অন্বেষণ করে দেখার বিষয়।
জাতীয় উন্নয়ন, জাতীয় ঐক্য ও সংহতির সুরক্ষা দেয় প্রধানত রাজনৈতিক দল ও নেতারা। কিন্তু দলে দলে এবং দলের অভ্যন্তরে ব্যক্তি সংঘাত, গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব সক্রিয় থাকলে জাতীয় স্বার্থ উদ্ধার অনিবার্যভাবে পিছিয়ে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন। কোনো কোনো অর্থকরী খাত উত্সন্নেও যেতে পারে। এসব নজির এদেশে বিস্তর। রাজনৈতিক নেতৃত্বে দুর্বলতা, রেষারেষি, উচ্চ নৈতিকতার অভাব ইত্যাদি প্রকট হলেই অযাচিত শক্তি এসে মসনদ দখল করে। এভাবে আমাদের রাজনৈতিক মূল স্রোত বারবার হীনবল হয়ে পড়েছে। পরিণামে অর্থনীতি শক্ত ভিতে দাঁড়াতে পারেনি, শিথিল হয়েছে সাংস্কৃতিক সংহতির বাঁধন। এর মধ্য দিয়েই বছর ঘুরে আসে বিজয় দিবস। আবার শত পরাজয়ের গ্লানিতে জর্জরিত সাধারণ মানুষ পূর্বাপরের মতো আশায় উজ্জীবিত হয়।
রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই দেশে গত আটত্রিশ বছর ধরে শেকড় গেড়েছে এক দুর্দমনীয় আমলাতন্ত্র, দুর্নীতিবাজ প্রশাসন। প্রশাসনের হাতে সাধারণ নাগরিকের মর্মন্তুদ নিগ্রহের যে চিত্র দেখা যায়, তা যে কোনো বিবেচনায়ই বিজয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কাজেই জনতার অর্জিত যে কোনো ‘বিজয়’কে প্রধানত অর্থনৈতিক মুক্তির দিক থেকেই বিচার করতে হবে। এটা কোনো তত্ত্ব নয়। যুদ্ধ করার মূল প্রেরণাই ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। গত আটত্রিশ বছরে সেই মুক্তি যে কারও কপালেই জোটেনি, তা নয়। শ্রেণী বিশেষ তো শুরু থেকেই সেটি কব্জা করেছে। ক্ষমতাসীনরা এক সময় সপারিষদ দধির অগ্র ঘোলের শেষ ভোগ করেছে। সেই ধারা ক্রমেই প্রবল হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে চলে এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একপর্যায়ে সমাজতন্ত্রের বদলে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা—সবকিছুই সংবিধানের ভুক্তি হিসেবেই থেকে গেল, কতবার তা সংশোধন হলো কিন্তু আখেরে যে লাউ, সেই কদু। বরং অর্থনৈতিক সাম্য, সুষম বণ্টন ইত্যাদি চেতনাকে ছাপিয়ে নতুন নতুন চেতনার উদ্ভব দেখতে পেল দেশবাসী। তা থেকে বেরিয়ে এলো ভূমিদস্যু, বনদস্যু, নগর সামন্ত ইত্যাদি। রাজনীতিক, প্রতিপত্তিশালী শাসক-প্রশাসক সবাই মিলে তৈরি করলেন এক তস্কর শ্রেণী। সেই ভাগ-বাটোয়ারার পরিণামে ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হলো দারিদ্র্যের সূচক। আটত্রিশ বছরে ভূমিহীনের সংখ্যা বেড়েছে আটত্রিশ গুণেরও বেশি। ঢাকাসহ সারা দেশের সরকারি, খাস জমির বিরাট অংশ এখন ভূমিদস্যুদের ভোগে। স্বাধীনতার পর থেকেই এই জবরদখল শুরু হয়েছিল। মাঝে মধ্যে ভূমিহীনরা যিকঞ্চিত্ ভূমি বন্দোবস্ত পেলেও এক সময় তার বেশিরভাগই দস্যুদের হস্তগত হয়েছে। দেশের অন্যান্য দুর্ঘটের মতো খাস জমি দখলে প্রশাসনের কালোহাত সব সময়ই প্রসারিত। ফলে বন কেটে বসতি না হলেও তৈরি হয়েছে বড় বড় কারখানা, ইটভাটা, পুকুর, বাগান ইত্যাদি। বনাঞ্চলে যেসব হতদরিদ্র মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছিল তাদের খেদিয়ে দিয়েছে খোদ বনবিভাগের লোকজন ভূমিদস্যুদের টাকা খেয়ে। কলা-মুলোটা পেয়ে দুর্নীতিবাজ প্রশাসন তাদের নামে ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে দিয়েছে, বন্দোবস্ত বরাদ্দ করেছে। এভাবে দখল হয়েছে এমনকি নদীর তলদেশ পর্যন্ত। একটি দেশের শতকরা ২৫ ভাগ বনাঞ্চল থাকা পরিবেশের জন্য প্রয়োজন। সেখানে বাংলাদেশে পাঁচ ভাগ আছে কিনা সন্দেহ। বন উজাড়, নদীর মৃত্যু—এসব দৃশ্য ঊনচল্লিশতম বিজয় দিবসে দেশের তাবত্ হর্তা-কর্তাদের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করবে কিনা, সন্দেহ। সাধারণ মানুষ স্রেফ কিছু আনুষ্ঠানিকতার আনন্দে ক্রমাগত অর্থনৈতিক বঞ্চনার যন্ত্রণা ভুলে থাকবেন কিনা, তাতেও সন্দেহ রয়েছে। তবে বিজয় দিবস অন্তত এই প্রণোদনা সৃষ্টি করে যে, দেশ জনগণের। সে অর্থে সরকারি খাস জমির প্রকৃত মালিকও তারা। এ জমি কেউ পেলে তার প্রথম দাবিদার ভূমিহীন পরিবার। স্বাধীনতার আটত্রিশ বছরে দেখা গেছে এর বিপরীত। এখন চলছে জবর-দখলের মহোত্সব। বিজয় দিবসের মহোত্সবে সেই মহোত্সব যেন মিলেমিশে একাকার! মানুষ পাকিস্তানিদের হটাল মাত্র নয় মাসে। অথচ স্বাধীন দেশের সরকার স্বদেশি তস্করদের হটাতে পারল না এত বছরেও এর নাম গণতন্ত্র! এর নাম আইনের শাসন! শতকরা ৯০ জন কৃষিজীবী মানুষের দেশে ‘বিজয়’ কি এই বার্তা নিয়ে এসেছিল?
বলতেই হবে, ক্ষমতাসীন হয়েছে এমন সব রাজনৈতিক দলই কম-বেশি জননিপীড়ক প্রশাসনের জন্য দায়ী। বহু ক্ষেত্রেই ফলের চেয়ে বীচি বড় হয়ে টিকে আছে। ফলে না হয়েছে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন, না প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আইনের শাসন। এসব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিস্মরণের ফলাফল কিনা, বিজয় দিবস উদযাপনের রেশ থাকতেই তা উপলব্ধি করা দরকার।
একটি কথা তো মনে রাখতেই হবে যে, দেশে উত্পাদন যতই বাড়ুক, যতই বয়ে যাক উন্নয়নের জোয়ার, তার সুফল ভোগ করতে হলে সাধারণ মানুষের রোজগারের রাস্তা খোলা থাকা চাই, উপার্জন বাড়ার উপায় বের করা চাই। এ যাবত তাদের জীবন ধারণের অনেক সুযোগ নিশ্চয়ই তৈরি হয়েছে কিন্তু বেশিরভাগই পিতৃপুরুষের আয়ের সীমানা ছাড়িয়ে উঠতে পারেনি। কাজেই দারিদ্র্য এবং অর্ধাহার-অনাহার এখনও ব্যাপক আকারে বিদ্যমান। এই প্রেক্ষাপটে সমস্ত জাতীয় পরিকল্পনার সাফল্য নির্ণীত হবে গড় হিসেবের সাহায্যে নয়, খুব কম আয়ের মানুষের আয় কতটা বাড়ানো সম্ভব হলো, তা দিয়ে। অথচ সব ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব অর্থনীতিকরা এতকাল ‘গড় আয়’ বৃদ্ধি নিয়ে বহ্বারম্ভ করেছেন। এখনও করছেন। মানুষ এসব হিসেবের লুকোচুরি ধরে ফেলেছে। কাজেই তথাকথিত ‘চেতনা’র কথা বলে তাদের আর বিভ্রান্ত করার রাহা নেই।
আমাদের বিজয়ের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল মানচিত্রখচিত পতাকা উড়িয়ে। তার সীমা-চৌহদ্দি নিয়েও তো প্রশ্ন জিইয়ে রাখা হয়েছে। সমুদ্র সীমা ও আরও কিছু অঞ্চল নিয়ে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিরোধের অবসান হয়নি এত বছর পরেও। কারা আমাদের তেল-গ্যাস উত্তোলন করবে, তার হিস্যা কেমন হবে— তা নিয়েও রাজনৈতিক কূটচালের শেষ নেই। তাহলে?
এ অবস্থায় মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠায় এখন জরুরি সঙ্কীর্ণ মনোবৃত্তি দূর করে জাতীয় স্বার্থে শক্তপোক্ত ঐক্য গড়ে তোলা। স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পরে বোঝা যাচ্ছে, এই ঐক্যে প্রাণ সঞ্চার করে, নতুন যুগের উপযোগী করে এগিয়ে যাওয়া কত প্রয়োজন। আর তা রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য প্রয়াসেই সম্ভব। অর্থাত্ বাংলাদেশকে যদি ‘সোনার বাংলা’ তথা সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে তার একমাত্র নিয়ামক ঐক্য। কারণ, জাতীয় ঐক্যই স্বাধীনতা এনেছিল। যদি তা আবার সম্ভব হয় তাহলে আগামীর কোনো বিজয় দিবসে একই ছত্রতলে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষ আনন্দ উদযাপন করবে। বিষাদ সেদিন কাউকে স্পর্শ করবে না।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের রথ গত আটত্রিশ বছরে কখনও একটি অবিচ্ছিন্ন পথ ধরে এগোয়নি। পরস্পরবিরোধী স্বার্থের টানে এদিক-ওদিক চলেছে। ব্যক্তি স্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থ, শ্রেণী স্বার্থ ইত্যাদি স্বার্থের সংঘাতের মধ্য দিয়ে জাতীয় স্বার্থ প্রবলভাবে মাথা খাড়া করে দাঁড়াতে পারেনি। যারা রথের চালক হয়েছেন, তাদের মর্জি-মাফিক রথের চাকাও ঘুরেছে। বারবার বিধি-বিধান বদলেছে, এমনকি সংবিধানও। এই অদল-বদলের মধ্য দিয়ে সর্বস্তরে বেড়েছে শোষণ-দুর্নীতি। কাজেই ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে যারা স্বাধীনতাকে অপরিহার্য মনে করেছিল, সেই আপামর জনগণ কেবলই ঠকেছে, প্রতারিত হয়েছে। ফলে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বলে যে কথাটি সুযোগ পেলেই বিপুল গাম্ভীর্যের সঙ্গে বলে থাকেন আমাদের বেশিরভাগ রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিক ও কথিত সুশীল সমাজ তা সাধারণের কাছে বিমূর্ত শব্দমাত্র। দেশের শতকরা ৯০ বা ততোধিক মানুষ ৩৯তম বিজয় দিবসকে কেবল স্মৃতিতে ধারণ করা একটি জাতীয় উত্সব হিসেবেই দেখছেন, অন্যকিছু নয়। তারা দেখেছেন, এ দিবসের তাত্পর্যকে স্মরণে রেখে এ দেশে কোনো অর্থনৈতিক উন্নয়নের শক্ত ভিত তৈরি হয়নি। যা কিছু হয়েছে, তার ন্যায্য হিস্যা পায়নি সাধারণ মানুষ। দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে শতধাবিভক্ত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে সক্ষম হয়নি। মৌলিক জাতীয় স্বার্থেও একই সমতলে কখনও দেখা যায়নি তাদের। এমনকি ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ পর্যন্ত দলীয় এবং ব্যক্তির মর্জিমত বিশ্লেষিত হয়েছে। এটাই মানুষের পূর্বাপর অভিজ্ঞতা, এটাই বাস্তবতা। বস্তুত মানুষকে যেন গাছ দেখিয়ে ভুলিয়ে রাখা হয়েছে, চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে অরণ্যের ছবি। আমাদের সার্বিক রাজনৈতিক চালচিত্র এমনই যে, বিজয় দিবসের তাত্পর্য তারা মুখে বলবেন, কাজে নয়। তারা অজস্র অজুহাত দেখিয়ে ঐক্যের পথ রুদ্ধ করবেন এবং প্রতিপক্ষের ওপর সমস্ত দায় চাপিয়ে স্খলন করবেন নিজেদের দোষ। এ অবস্থায় জাতীয় উন্নয়ন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তথা সুষম বণ্টন সম্পর্কে যে উচ্চবাচ্য করা হয়, তা কেবলই হতাশার বৃত্তকেই বড় করে। কেন এই এক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে এদেশে, এবারের বিজয় দিবসের আলোকে তা ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব—সবদিক থেকে অন্বেষণ করে দেখার বিষয়।
জাতীয় উন্নয়ন, জাতীয় ঐক্য ও সংহতির সুরক্ষা দেয় প্রধানত রাজনৈতিক দল ও নেতারা। কিন্তু দলে দলে এবং দলের অভ্যন্তরে ব্যক্তি সংঘাত, গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব সক্রিয় থাকলে জাতীয় স্বার্থ উদ্ধার অনিবার্যভাবে পিছিয়ে যায়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন। কোনো কোনো অর্থকরী খাত উত্সন্নেও যেতে পারে। এসব নজির এদেশে বিস্তর। রাজনৈতিক নেতৃত্বে দুর্বলতা, রেষারেষি, উচ্চ নৈতিকতার অভাব ইত্যাদি প্রকট হলেই অযাচিত শক্তি এসে মসনদ দখল করে। এভাবে আমাদের রাজনৈতিক মূল স্রোত বারবার হীনবল হয়ে পড়েছে। পরিণামে অর্থনীতি শক্ত ভিতে দাঁড়াতে পারেনি, শিথিল হয়েছে সাংস্কৃতিক সংহতির বাঁধন। এর মধ্য দিয়েই বছর ঘুরে আসে বিজয় দিবস। আবার শত পরাজয়ের গ্লানিতে জর্জরিত সাধারণ মানুষ পূর্বাপরের মতো আশায় উজ্জীবিত হয়।
রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণেই দেশে গত আটত্রিশ বছর ধরে শেকড় গেড়েছে এক দুর্দমনীয় আমলাতন্ত্র, দুর্নীতিবাজ প্রশাসন। প্রশাসনের হাতে সাধারণ নাগরিকের মর্মন্তুদ নিগ্রহের যে চিত্র দেখা যায়, তা যে কোনো বিবেচনায়ই বিজয়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কাজেই জনতার অর্জিত যে কোনো ‘বিজয়’কে প্রধানত অর্থনৈতিক মুক্তির দিক থেকেই বিচার করতে হবে। এটা কোনো তত্ত্ব নয়। যুদ্ধ করার মূল প্রেরণাই ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। গত আটত্রিশ বছরে সেই মুক্তি যে কারও কপালেই জোটেনি, তা নয়। শ্রেণী বিশেষ তো শুরু থেকেই সেটি কব্জা করেছে। ক্ষমতাসীনরা এক সময় সপারিষদ দধির অগ্র ঘোলের শেষ ভোগ করেছে। সেই ধারা ক্রমেই প্রবল হয়েছে। ক্ষেত্রবিশেষে চলে এসেছে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একপর্যায়ে সমাজতন্ত্রের বদলে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা—সবকিছুই সংবিধানের ভুক্তি হিসেবেই থেকে গেল, কতবার তা সংশোধন হলো কিন্তু আখেরে যে লাউ, সেই কদু। বরং অর্থনৈতিক সাম্য, সুষম বণ্টন ইত্যাদি চেতনাকে ছাপিয়ে নতুন নতুন চেতনার উদ্ভব দেখতে পেল দেশবাসী। তা থেকে বেরিয়ে এলো ভূমিদস্যু, বনদস্যু, নগর সামন্ত ইত্যাদি। রাজনীতিক, প্রতিপত্তিশালী শাসক-প্রশাসক সবাই মিলে তৈরি করলেন এক তস্কর শ্রেণী। সেই ভাগ-বাটোয়ারার পরিণামে ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী হলো দারিদ্র্যের সূচক। আটত্রিশ বছরে ভূমিহীনের সংখ্যা বেড়েছে আটত্রিশ গুণেরও বেশি। ঢাকাসহ সারা দেশের সরকারি, খাস জমির বিরাট অংশ এখন ভূমিদস্যুদের ভোগে। স্বাধীনতার পর থেকেই এই জবরদখল শুরু হয়েছিল। মাঝে মধ্যে ভূমিহীনরা যিকঞ্চিত্ ভূমি বন্দোবস্ত পেলেও এক সময় তার বেশিরভাগই দস্যুদের হস্তগত হয়েছে। দেশের অন্যান্য দুর্ঘটের মতো খাস জমি দখলে প্রশাসনের কালোহাত সব সময়ই প্রসারিত। ফলে বন কেটে বসতি না হলেও তৈরি হয়েছে বড় বড় কারখানা, ইটভাটা, পুকুর, বাগান ইত্যাদি। বনাঞ্চলে যেসব হতদরিদ্র মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই করেছিল তাদের খেদিয়ে দিয়েছে খোদ বনবিভাগের লোকজন ভূমিদস্যুদের টাকা খেয়ে। কলা-মুলোটা পেয়ে দুর্নীতিবাজ প্রশাসন তাদের নামে ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে দিয়েছে, বন্দোবস্ত বরাদ্দ করেছে। এভাবে দখল হয়েছে এমনকি নদীর তলদেশ পর্যন্ত। একটি দেশের শতকরা ২৫ ভাগ বনাঞ্চল থাকা পরিবেশের জন্য প্রয়োজন। সেখানে বাংলাদেশে পাঁচ ভাগ আছে কিনা সন্দেহ। বন উজাড়, নদীর মৃত্যু—এসব দৃশ্য ঊনচল্লিশতম বিজয় দিবসে দেশের তাবত্ হর্তা-কর্তাদের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করবে কিনা, সন্দেহ। সাধারণ মানুষ স্রেফ কিছু আনুষ্ঠানিকতার আনন্দে ক্রমাগত অর্থনৈতিক বঞ্চনার যন্ত্রণা ভুলে থাকবেন কিনা, তাতেও সন্দেহ রয়েছে। তবে বিজয় দিবস অন্তত এই প্রণোদনা সৃষ্টি করে যে, দেশ জনগণের। সে অর্থে সরকারি খাস জমির প্রকৃত মালিকও তারা। এ জমি কেউ পেলে তার প্রথম দাবিদার ভূমিহীন পরিবার। স্বাধীনতার আটত্রিশ বছরে দেখা গেছে এর বিপরীত। এখন চলছে জবর-দখলের মহোত্সব। বিজয় দিবসের মহোত্সবে সেই মহোত্সব যেন মিলেমিশে একাকার! মানুষ পাকিস্তানিদের হটাল মাত্র নয় মাসে। অথচ স্বাধীন দেশের সরকার স্বদেশি তস্করদের হটাতে পারল না এত বছরেও এর নাম গণতন্ত্র! এর নাম আইনের শাসন! শতকরা ৯০ জন কৃষিজীবী মানুষের দেশে ‘বিজয়’ কি এই বার্তা নিয়ে এসেছিল?
বলতেই হবে, ক্ষমতাসীন হয়েছে এমন সব রাজনৈতিক দলই কম-বেশি জননিপীড়ক প্রশাসনের জন্য দায়ী। বহু ক্ষেত্রেই ফলের চেয়ে বীচি বড় হয়ে টিকে আছে। ফলে না হয়েছে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন, না প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আইনের শাসন। এসব মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিস্মরণের ফলাফল কিনা, বিজয় দিবস উদযাপনের রেশ থাকতেই তা উপলব্ধি করা দরকার।
একটি কথা তো মনে রাখতেই হবে যে, দেশে উত্পাদন যতই বাড়ুক, যতই বয়ে যাক উন্নয়নের জোয়ার, তার সুফল ভোগ করতে হলে সাধারণ মানুষের রোজগারের রাস্তা খোলা থাকা চাই, উপার্জন বাড়ার উপায় বের করা চাই। এ যাবত তাদের জীবন ধারণের অনেক সুযোগ নিশ্চয়ই তৈরি হয়েছে কিন্তু বেশিরভাগই পিতৃপুরুষের আয়ের সীমানা ছাড়িয়ে উঠতে পারেনি। কাজেই দারিদ্র্য এবং অর্ধাহার-অনাহার এখনও ব্যাপক আকারে বিদ্যমান। এই প্রেক্ষাপটে সমস্ত জাতীয় পরিকল্পনার সাফল্য নির্ণীত হবে গড় হিসেবের সাহায্যে নয়, খুব কম আয়ের মানুষের আয় কতটা বাড়ানো সম্ভব হলো, তা দিয়ে। অথচ সব ক্ষমতাসীন দলের নিজস্ব অর্থনীতিকরা এতকাল ‘গড় আয়’ বৃদ্ধি নিয়ে বহ্বারম্ভ করেছেন। এখনও করছেন। মানুষ এসব হিসেবের লুকোচুরি ধরে ফেলেছে। কাজেই তথাকথিত ‘চেতনা’র কথা বলে তাদের আর বিভ্রান্ত করার রাহা নেই।
আমাদের বিজয়ের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল মানচিত্রখচিত পতাকা উড়িয়ে। তার সীমা-চৌহদ্দি নিয়েও তো প্রশ্ন জিইয়ে রাখা হয়েছে। সমুদ্র সীমা ও আরও কিছু অঞ্চল নিয়ে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিরোধের অবসান হয়নি এত বছর পরেও। কারা আমাদের তেল-গ্যাস উত্তোলন করবে, তার হিস্যা কেমন হবে— তা নিয়েও রাজনৈতিক কূটচালের শেষ নেই। তাহলে?
এ অবস্থায় মনে হয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠায় এখন জরুরি সঙ্কীর্ণ মনোবৃত্তি দূর করে জাতীয় স্বার্থে শক্তপোক্ত ঐক্য গড়ে তোলা। স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পরে বোঝা যাচ্ছে, এই ঐক্যে প্রাণ সঞ্চার করে, নতুন যুগের উপযোগী করে এগিয়ে যাওয়া কত প্রয়োজন। আর তা রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য প্রয়াসেই সম্ভব। অর্থাত্ বাংলাদেশকে যদি ‘সোনার বাংলা’ তথা সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে তার একমাত্র নিয়ামক ঐক্য। কারণ, জাতীয় ঐক্যই স্বাধীনতা এনেছিল। যদি তা আবার সম্ভব হয় তাহলে আগামীর কোনো বিজয় দিবসে একই ছত্রতলে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষ আনন্দ উদযাপন করবে। বিষাদ সেদিন কাউকে স্পর্শ করবে না।


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


