মুক্তিযুদ্ধের নাটক আরো চাই
ড. ইনামুল হক
স্বাধীনতা সংগ্রাম আমাদের জাতীয় জীবনের মূল্যবান অধ্যায়। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে ৩০ লাখ আদম সন্তানের জীবনের বিনিময়ে অসংখ্য বুদ্ধিজীবী ও লাখ লাখ মা-বোনের ইজ্জত এবং প্রাণ দানের মাধ্যমে বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পেয়েছে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ সর্ব ক্ষেত্রেই তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানিরা এদেশে আমাদের সঙ্গে বড়ভাইসুলভ আচরণে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। যার ফলে ওদের ওইসব আচরণ থেকে মুক্তির প্রত্যাশায়, নিজেদের অধিকার আদায় করার চেতনার তাগিদেই ’৭১-এ শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ শুধুমাত্র গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনই ছিল না, ছিল শৃঙ্খলিত সংস্কৃতি মুক্তি পাবার স্বপ্ন। কারণ হচ্ছে, যে কোনো দেশ তার শিল্প-সংস্কৃতির ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি মূল চেতনার জন্ম হয়েছিল। কারণ ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র ভারত থেকে ভাগাভাগির পর থেকেই মৌলিকভাবে সংস্কৃতির বিস্তর পার্থক্য সৃষ্টি করে বিভাজন তৈরি করে ছিল। সেই পার্থক্যের প্রাচীর ধ্বংস হয়েছিল ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।
’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আমরা রাষ্ট্রের ৪টি মৌলিক উপাদানে স্বাধীন হয়েছিলাম, পেয়েছিলাম স্বাধীন রাষ্ট্র, বাকস্বাধীনতা, সংস্কৃতির স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। ফলে পূর্ব অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে আমাদের মঞ্চ নাটক সত্যিকার অর্থে পেল মুক্ত আকাশ। আমাদের মতো সিনিয়র যারা নাট্যজন আছেন, এ ক’টি সত্য কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। স্বাধীনতা-উত্তর নব নাট্য আন্দোলনের বীজ ১৯৭১ সালের আগেই রোপিত হয়েছিল। কিন্তু মুক্ত আকাশ-বায়ুর অভাবে তা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ রেখামাত্র। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ক্ষীণ রেখাগুলোই অত্যন্ত সরল ও সাবলীল হয়ে ক্রমেই আলো ছড়িয়েছে, যা তখন দেশের সীমানা পেরিয়ে বাইরেও প্রশংসিত হয়েছিল। ওই নাটকগুলোর বিষয়বস্তুতে দুটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, প্রস্তুতিপর্ব অর্থাত্ যে নাটকগুলোতে আছে ১৯৭১ সালের পূর্বের ঘটনাসহ বিভিন্ন আন্দোলনের চিত্র এবং দ্বিতীয়ত ১৯৭১ সালের ঘটনাবহুল মুক্তিযুদ্ধ। এ মুক্তিযুদ্ধের পর্বে আবার দু’ধরনের অনুষঙ্গ বিদ্যমান ছিল। একটি শুধু যুদ্ধক্ষেত্র, অন্যটি যুদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। একটি সত্য কথা হচ্ছে যুদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের প্রকরণের নাটক খুব একটা রচিত হয়নি, যা রচিত হয়েছে তা হলো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অপকর্মের ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়বস্তুর অনুষঙ্গে যুক্ত করে।
পাঠকদের সুবিধার্থে একটি কথা না বললেই নয়। তা হচ্ছে স্বাধীনতার পটভূমি বা স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে নাটক আর মুক্তিযুদ্ধের নাটক ব্যাপক অর্থে ভিন্ন। আর একটু পরিষ্কার করে বললে বলা যায়, স্বাধীনতাপ্রাপ্তি আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন, যে অর্জনের পেছনে ছিল ভূখণ্ডের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক মুক্তি। এজন্যই এদেশের আপামর জনগণ যুদ্ধ করে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। মুক্ত স্বাধীন দেশে তখন আমরা মুক্তভাবে নাটক মঞ্চায়ন করলেও অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি, আমরা বাঁধা পড়েছিলাম দারিদ্র্যের শৃঙ্খলে।
যা হোক, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার পটভূমিতে নির্মিত নাটকের নাম এলেই সর্বাগ্রে চলে আসে সৈয়দ শামসুল হক রচিত থিয়েটার প্রযোজিত ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকটি। এর গল্পে দেখানো হয়েছে যুদ্ধে বিজয় অর্জন, রাজাকারদের ভূমিকা, তাদের প্রাপ্ত শাস্তির বর্ণনা। সৈয়দ শামসুল হকের ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ নাটকের গল্পে শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বাধীনতার ভাবনা এবং পরবর্তী সময়ে কার্যক্রম ও জীবনাচার নিয়ে রচিত নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিল থিয়েটার। সৈয়দ হক এই নাটকের মাধ্যমে সমাজের মানুষকে রাজাকারদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। আরও জানিয়েছেন স্বাধীনতা অর্জনের পরবর্তী করণীয় কী? বলেছেন অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ব্যক্তিক পতন ও বিচ্যুতির কথা।
মঞ্চে মুক্তিযুদ্ধের নাটক যতটা হওয়ার দরকার ছিল, আমার ধারণা ঠিক ততটা রচনা করা হয়নি। এর মূল কারণ নাট্যকারের সঙ্কট। তবে যে ক’টি নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে, সেগুলো আজও দর্শকদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। সেগুলো হচ্ছে—আরণ্যকের স্বাধীনতার পটভূমিতে মামুনুর রশীদের লেখা জয় জয়ন্তী, ঢাকা থিয়েটারের ‘একাত্তরের পালা’। মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ রচিত ও নির্দেশিত এ নাটকটিতে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ তার মুক্তিযুদ্ধের আবেগ, দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতিফলন দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছিলেন।
মঞ্চে বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের যে নাটকগুলো বর্তমান প্রজন্ম দেখছে তার মধ্যে থিয়েটার আর্ট ইউনিটের ‘সময়ের প্রয়োজনে’, ‘কোর্ট মার্শাল’, ঢাকা পদাতিকের ‘এই দেশে এই বেশে’ ও ‘কথা-’৭১’ নাটকে মুক্তিযুদ্ধের কথাই উপস্থাপিত হয়েছে।
এবার আমার রচিত মুক্তিযুদ্ধের ওপর নাটকগুলো সম্পর্কে পাঠকদের জানাতে চাচ্ছি। টিভি নাটক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক সব মিলিয়ে আমি ৬০টি নাটক রচনা করেছি, যার মধ্যে ৬টি নাটক মুক্তিযুদ্ধের ওপর। আমাদের নাট্যদল থেকে আগামী বছর মঞ্চে আনা হবে ‘সেই সব দিনগুলো’ নাটকটি। আমার লেখা এ নাটকটির নির্দেশনা দেবেন লাকী ইনাম, যা আমার দলের (নাগরিক নাট্যাঙ্গন) ১৭তম প্রযোজনা। ‘সেই সব দিনগুলো’ নাটকের কাহিনী হচ্ছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত একান্নবর্তী পরিবারের মুক্তিযুদ্ধকালীন নানা মাত্রার সঙ্কট, স্বপ্ন ও দৃষ্টিভঙ্গি। আমার লেখা মুক্তিযুদ্ধের সব নাটকই দর্শকদের মন জয় করতে পেরেছে। আমার মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত অন্য ৪টি নাটক হচ্ছে—‘সন্ধিক্ষণে আমরা’, ‘প্রতীক্ষার প্রহর’, ‘মেঘ ভাঙা রোদ’ এবং ‘অতঃপর একদিন’।
পরিশেষে আমি এ প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের অনুরোধ করব মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ঘটনা নিয়ে নাটক রচনা করতে। আজকাল প্রায়ই দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের ওপর সিম্বলিক নাটক নির্মাণ করা হচ্ছে, যা আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়। দাড়ি-টুপি লাগিয়ে রাজাকার সাজিয়ে, বন্দুক কাঁধে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সাজা যায়, কিন্তু তা মুক্তিযুদ্ধের নাটক হয় না। এক কথায় বলা যায়, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। মুক্তিযুদ্ধের দর্শন বা চেতনাহীন নাট্যকর্মী দ্বারা যুদ্ধের নাটক তৈরি করা যায় না।
কারণ হচ্ছে, নাটক দিয়ে আমরা মানুষের চেতনায় আঘাত করি। আমরা যদি এসব ঘটনা বিকৃত করে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরি, তাহলে তাদের কচি মনে একটি ভুলের প্রলেপ পড়বে, যার প্রভাব পড়বে আমাদের জাতীয় জীবনে।
পরিশেষে বলছি, বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের নাটক আসা উচিত সেভাবে না এসে মানহীন বাস্তবতা বিবর্জিত নাটক তৈরি হচ্ছে, যা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার কাছে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়। তাছাড়া একমাত্র মার্চ ও ডিসেম্বর মাস এলেই মুক্তিযুদ্ধের নাটক প্রচার/মঞ্চায়নের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় নির্মাতারা, যা আমার কাছে পিকুলিয়ার সাইকোলজি বলে মনে হয়। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে সিনিয়র নাট্যজনসহ মিডিয়ার ভূমিকা একান্ত প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। তাহলেই আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।
’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে আমরা রাষ্ট্রের ৪টি মৌলিক উপাদানে স্বাধীন হয়েছিলাম, পেয়েছিলাম স্বাধীন রাষ্ট্র, বাকস্বাধীনতা, সংস্কৃতির স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। ফলে পূর্ব অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়ে আমাদের মঞ্চ নাটক সত্যিকার অর্থে পেল মুক্ত আকাশ। আমাদের মতো সিনিয়র যারা নাট্যজন আছেন, এ ক’টি সত্য কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। স্বাধীনতা-উত্তর নব নাট্য আন্দোলনের বীজ ১৯৭১ সালের আগেই রোপিত হয়েছিল। কিন্তু মুক্ত আকাশ-বায়ুর অভাবে তা ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ রেখামাত্র। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ক্ষীণ রেখাগুলোই অত্যন্ত সরল ও সাবলীল হয়ে ক্রমেই আলো ছড়িয়েছে, যা তখন দেশের সীমানা পেরিয়ে বাইরেও প্রশংসিত হয়েছিল। ওই নাটকগুলোর বিষয়বস্তুতে দুটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, প্রস্তুতিপর্ব অর্থাত্ যে নাটকগুলোতে আছে ১৯৭১ সালের পূর্বের ঘটনাসহ বিভিন্ন আন্দোলনের চিত্র এবং দ্বিতীয়ত ১৯৭১ সালের ঘটনাবহুল মুক্তিযুদ্ধ। এ মুক্তিযুদ্ধের পর্বে আবার দু’ধরনের অনুষঙ্গ বিদ্যমান ছিল। একটি শুধু যুদ্ধক্ষেত্র, অন্যটি যুদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। একটি সত্য কথা হচ্ছে যুদ্ধ মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের প্রকরণের নাটক খুব একটা রচিত হয়নি, যা রচিত হয়েছে তা হলো স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অপকর্মের ঘটনা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়বস্তুর অনুষঙ্গে যুক্ত করে।
পাঠকদের সুবিধার্থে একটি কথা না বললেই নয়। তা হচ্ছে স্বাধীনতার পটভূমি বা স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে নাটক আর মুক্তিযুদ্ধের নাটক ব্যাপক অর্থে ভিন্ন। আর একটু পরিষ্কার করে বললে বলা যায়, স্বাধীনতাপ্রাপ্তি আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন, যে অর্জনের পেছনে ছিল ভূখণ্ডের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক মুক্তি। এজন্যই এদেশের আপামর জনগণ যুদ্ধ করে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা। মুক্ত স্বাধীন দেশে তখন আমরা মুক্তভাবে নাটক মঞ্চায়ন করলেও অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি, আমরা বাঁধা পড়েছিলাম দারিদ্র্যের শৃঙ্খলে।
যা হোক, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার পটভূমিতে নির্মিত নাটকের নাম এলেই সর্বাগ্রে চলে আসে সৈয়দ শামসুল হক রচিত থিয়েটার প্রযোজিত ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ নাটকটি। এর গল্পে দেখানো হয়েছে যুদ্ধে বিজয় অর্জন, রাজাকারদের ভূমিকা, তাদের প্রাপ্ত শাস্তির বর্ণনা। সৈয়দ শামসুল হকের ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ নাটকের গল্পে শহরের মধ্যবিত্ত পরিবারের স্বাধীনতার ভাবনা এবং পরবর্তী সময়ে কার্যক্রম ও জীবনাচার নিয়ে রচিত নাটকটি মঞ্চস্থ করেছিল থিয়েটার। সৈয়দ হক এই নাটকের মাধ্যমে সমাজের মানুষকে রাজাকারদের বিরুদ্ধে জেগে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। আরও জানিয়েছেন স্বাধীনতা অর্জনের পরবর্তী করণীয় কী? বলেছেন অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ও রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ব্যক্তিক পতন ও বিচ্যুতির কথা।
মঞ্চে মুক্তিযুদ্ধের নাটক যতটা হওয়ার দরকার ছিল, আমার ধারণা ঠিক ততটা রচনা করা হয়নি। এর মূল কারণ নাট্যকারের সঙ্কট। তবে যে ক’টি নাটক মঞ্চায়ন হয়েছে, সেগুলো আজও দর্শকদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। সেগুলো হচ্ছে—আরণ্যকের স্বাধীনতার পটভূমিতে মামুনুর রশীদের লেখা জয় জয়ন্তী, ঢাকা থিয়েটারের ‘একাত্তরের পালা’। মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ রচিত ও নির্দেশিত এ নাটকটিতে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ তার মুক্তিযুদ্ধের আবেগ, দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতিফলন দর্শকদের সামনে তুলে ধরেছিলেন।
মঞ্চে বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের যে নাটকগুলো বর্তমান প্রজন্ম দেখছে তার মধ্যে থিয়েটার আর্ট ইউনিটের ‘সময়ের প্রয়োজনে’, ‘কোর্ট মার্শাল’, ঢাকা পদাতিকের ‘এই দেশে এই বেশে’ ও ‘কথা-’৭১’ নাটকে মুক্তিযুদ্ধের কথাই উপস্থাপিত হয়েছে।
এবার আমার রচিত মুক্তিযুদ্ধের ওপর নাটকগুলো সম্পর্কে পাঠকদের জানাতে চাচ্ছি। টিভি নাটক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নাটক সব মিলিয়ে আমি ৬০টি নাটক রচনা করেছি, যার মধ্যে ৬টি নাটক মুক্তিযুদ্ধের ওপর। আমাদের নাট্যদল থেকে আগামী বছর মঞ্চে আনা হবে ‘সেই সব দিনগুলো’ নাটকটি। আমার লেখা এ নাটকটির নির্দেশনা দেবেন লাকী ইনাম, যা আমার দলের (নাগরিক নাট্যাঙ্গন) ১৭তম প্রযোজনা। ‘সেই সব দিনগুলো’ নাটকের কাহিনী হচ্ছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত একান্নবর্তী পরিবারের মুক্তিযুদ্ধকালীন নানা মাত্রার সঙ্কট, স্বপ্ন ও দৃষ্টিভঙ্গি। আমার লেখা মুক্তিযুদ্ধের সব নাটকই দর্শকদের মন জয় করতে পেরেছে। আমার মুক্তিযুদ্ধের ওপর রচিত অন্য ৪টি নাটক হচ্ছে—‘সন্ধিক্ষণে আমরা’, ‘প্রতীক্ষার প্রহর’, ‘মেঘ ভাঙা রোদ’ এবং ‘অতঃপর একদিন’।
পরিশেষে আমি এ প্রজন্মের নাট্যকর্মীদের অনুরোধ করব মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ঘটনা নিয়ে নাটক রচনা করতে। আজকাল প্রায়ই দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের ওপর সিম্বলিক নাটক নির্মাণ করা হচ্ছে, যা আমার কাছে হাস্যকর মনে হয়। দাড়ি-টুপি লাগিয়ে রাজাকার সাজিয়ে, বন্দুক কাঁধে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সাজা যায়, কিন্তু তা মুক্তিযুদ্ধের নাটক হয় না। এক কথায় বলা যায়, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। মুক্তিযুদ্ধের দর্শন বা চেতনাহীন নাট্যকর্মী দ্বারা যুদ্ধের নাটক তৈরি করা যায় না।
কারণ হচ্ছে, নাটক দিয়ে আমরা মানুষের চেতনায় আঘাত করি। আমরা যদি এসব ঘটনা বিকৃত করে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরি, তাহলে তাদের কচি মনে একটি ভুলের প্রলেপ পড়বে, যার প্রভাব পড়বে আমাদের জাতীয় জীবনে।
পরিশেষে বলছি, বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের নাটক আসা উচিত সেভাবে না এসে মানহীন বাস্তবতা বিবর্জিত নাটক তৈরি হচ্ছে, যা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার কাছে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়। তাছাড়া একমাত্র মার্চ ও ডিসেম্বর মাস এলেই মুক্তিযুদ্ধের নাটক প্রচার/মঞ্চায়নের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয় নির্মাতারা, যা আমার কাছে পিকুলিয়ার সাইকোলজি বলে মনে হয়। নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে সিনিয়র নাট্যজনসহ মিডিয়ার ভূমিকা একান্ত প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। তাহলেই আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে।


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


