Amardesh
আজঃ ঢাকা, রোববার ২০ ডিসেম্বর ২০০৯, ৬ পৌষ ১৪১৬, ২ মহররম ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

মনে হয় সেদিন সকাল

সঞ্জীব চৌধুরী
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর, যেদিন পূর্ব ও পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়, আমি তখন ছিলাম কলকাতায়। মুজিবনগর সরকারের সদর দফতর ছিল কলকাতার ৮ নং থিয়েটার রোডে, যার বর্তমান নাম শেক্সপিয়র সরণি। সেদিন শহরজুড়ে টান টান উত্তেজনা। কয়েকদিন ধরে রণাঙ্গন থেকে আমাদের জন্য উত্সাহব্যঞ্জক সাফল্যের খবর আসছিল। ৩ ডিসেম্বর কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে কংগ্রেসের জনসভা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ওই জনসভায় ভাষণ দেবেন। জোর গুজব, সেখানেই ভারত কর্তৃক স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার ঘোষণা আসবে। কলকাতায় এবং আশপাশে অবস্থানরত বাংলাদেশীরা দলে দলে সেদিনের সেই জনসভায় যোগ দিলেও আমি যেতে পারিনি। ফেরদৌস ভাইয়ের (বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনীতিক ফেরদৌস কোরেশী) স্ত্রী পান্না ভাবী ছিলেন সন্তানসম্ভবা। সেদিন দুপুরেই এন্টালির কাছে মেজর ঘোষের নার্সিং হোমে তিনি এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। এ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে আমি আর ফেরদৌস ভাই নার্সিং হোমের কাছে একটি পানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ট্রানজিস্টরে ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ শুনছিলাম। তার বক্তৃতার মাঝপথে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় কানে কানে কিছু একটা বলার পর মিটিংয়ের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। ইন্দিরা গান্ধী অতি দ্রুত সভাস্থল ত্যাগ করে বিমানবন্দরে চলে যান। সেখান থেকে বিশেষ বিমানে দিল্লি। পরে আমরা জেনেছি, পাকিস্তান ওইদিনই পশ্চিম সীমান্তে ভারতের ওপর স্থল আক্রমণ শুরু করে এবং পাকিস্তানের যুদ্ধ বিমানগুলো ভারতের বিভিন্ন শহরে বোমা ফেলে। সেদিন রাতে জাতির উদ্দেশে দেয়া বেতার ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জানালেন, তার দেশ এখন পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধরত।
আমরা, বাংলাদেশীরা এটাই চাইছিলাম। কারও মনে আর এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ রইল না যে বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার লগ্ন নিয়ে এখন ক্ষণগণনা শুরু করা যায়। যুদ্ধের আমেজ পুরোপুরি পৌঁছে গেল কলকাতাতেও। ভারতের অন্য সব শহরের মতো কলকাতায় জারি হলো ব্ল্যাক আউট। সন্ধ্যার পর বাতি জ্বলে না কোথাও; জ্বললেও অতি সাবধানে, বাইরে থেকে যেন আলো দেখা না যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী মস্কো থেকে বিমানে উড়ে এসে দিল্লিতে অবস্থান নিলেন। আমাদের মনের জোর আরেকটু বাড়ল।
ফেরদৌস ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা কয়েকজন মিলে কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক দেশবাংলা নামে একটা পত্রিকা বের করেছিলাম। আলোচনাক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যেহেতু মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ চলছে, সে কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে সেই সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই পত্রিকা বের করা উচিত। আমরা পত্রিকা বের করার আগে কলকাতা থেকে আরও কয়েকটি সাপ্তাহিক প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে প্রধান ছিল আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সম্পাদিত জয় বাংলা। এসব পত্রিকা যারা বের করেছিলেন, তারা কিন্তু সরকারের কাছে দরখাস্ত করে ডিক্লারেশন নেয়ার বিষয়টি চিন্তা করেননি। আমরা যখন দরখাস্ত করলাম, তখন মুজিবনগর সরকারের সদর দফতরে এটা দিয়েই একটা ফাইল খোলা হলো। দেশবাংলার ডিক্লারেশন নম্বর ছিল এক। লেখালেখি, ছাপা, বিক্রি সবই করতাম আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে। পত্রিকার দাম ছিল ৩০ পয়সা। এক কপি বিক্রি করলে একজনের মোটামুটি খাওয়া হয়ে যেত। আর্মহার্স্ট স্ট্রিট বৌ বাজারের মোড়ে একটা ছোট হোটেল ছিল। প্রতিটি ১০ পয়সা দামে ৩০ পয়সায় ৩টি রুটি মিলত। সঙ্গে লাবড়া (এক ধরনের নিরামিষ তরকারি) আর ছোলার ডাল ফ্রি। ৬০ পয়সা খরচ করলে খাওয়া যেত খাসির মাংস আর পরোটা। ছোট্ট এক টুকরা মাংসের মাখামাখি সামান্য ঘন ঝোল, আটার ২টি পরোটা খেয়ে ঢেঁকুর তুলতে অসুবিধা কোথায়!
সিলেটের বিজয় দত্ত মাইকেল দত্ত নাম ধারণ করে সাপ্তাহিক বাংলা নামে একটা পত্রিকা বের করেন। তার সঙ্গে কলকাতাতেই পরিচয়। তিনি তার মাসির বাসায় (৮ নং বংশী দত্ত রোড) এন্টালি জোড়া গির্জার কাছে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দেন। সেই বাসাটি দেশবাংলার অফিস হয়ে উঠেছিল। গোটা পরিবারটি অজানা-অচেনা আমাদের জন্য যা করেছে, সে ঋণ শোধ করা আমার সাধ্যাতীত। এ ধরনের বহু নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের অকাতর সহযোগিতা পেয়েছে বাংলাদেশের অনেক শরণার্থী। এ সময় সাধারণভাবে পশ্চিমবঙ্গে এবং বিশেষভাবে কলকাতায় নকশাল আন্দোলন অত্যন্ত প্রবল ছিল। অপরিচিত এলাকায় যাওয়া ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু ‘জয় বাংলার লোকদের’ ব্যাপারে দলমত নির্বিশেষে সবার মধ্যে ছিল এক ধরনের কোমল আন্তরিকতা। ফলে নকশাল অধ্যুষিত বেলেঘাটায় অনেক বাংলাদেশী অত্যন্ত সস্তায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। এছাড়া কলকাতার বিভিন্ন এলাকার ‘জয় বাংলার লোকদের’ আনাগোনা ছিল নজর কাড়ার মতো।
ভারত-বাংলাদেশ যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিন (৩ ডিসেম্বর) অথবা তার পরদিন ভুটান বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তার পরপরই ভারতের স্বীকৃতি পাওয়া যায়। মুক্তিবাহিনী আর ভারতীয় সৈন্যরা একের পর এক এলাকা শত্রুমুক্ত করে ঢাকার দিকে এগোতে থাকে। এরই মাঝে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের উপস্থিতি কিছুটা উদ্বেগের জন্ম দিলেও কলকাতায় অন্তত এ নিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টির কোনো লক্ষণ ছিল না। জাতিসংঘে সোভিয়েত প্রতিনিধি যে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রগতি ঠেকানোর মার্কিন প্রয়াস একের পর এক ভেটো প্রয়োগের মাধ্যমে ব্যর্থ করে দিচ্ছিলেন, সে খবরও আমরা পাচ্ছিলাম কলকাতায় বসে। ১৫ ডিসেম্বর যখন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশ’র কণ্ঠ বেতারে ভেসে এলো—‘হাতিয়ার ডাল দো’, তখনকার আবেগ-উত্তেজনা বর্ণনা করা অসম্ভব। পরদিন ১৬ ডিসেম্বর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ঢাকার প্রায় এক লাখ পাকিস্তানি সৈন্য হেঁটমুণ্ড হয়ে আত্মসমর্পণ করল যৌথ বাহিনীর কাছে। বাংলাদেশ রাহুমুক্ত হলো।
সবকিছু গুছিয়ে স্বাধীন মাতৃভূমিতে ফিরে এলাম জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে। এর মধ্যে ‘বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে জীবনে প্রথমবার ৩০০ টাকা পেলাম পথ খরচ হিসেবে। আমরা ফিরছি, লক্ষ্য ঢাকা। ফেরি চালু হয়েছে। এক ফেরি ঘাটে চাটাই বিছিয়ে চাদর টানিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে অস্থায়ী হোটেল। আমরা চারজন খেতে বসে গেলাম। গরম ভাত আর মুরগির মাংস। মালিক এবং পরিবেশনকারী একই ব্যক্তি। মুখে দাড়ি, মাথায় টুপি, প্রৌঢ়। আমাদের সঙ্গে টাকা বেশি নেই; তাই সাবধানে খাচ্ছিলাম। হঠাত্ আমাদের মধ্যে কে যেন একটু ঝোল চেয়ে বসল। হোটেল মালিক চারজনকে ঝোল তো দিলেনই, সেই সঙ্গে প্রত্যেকের পাতে পড়ল এক টুকরো করে বাড়তি মাংস। আমরা হাঁ হাঁ করে উঠলাম। হোটেল মালিক হেসে বললেন, এতদিন পর বাড়ি ফিরছেন, শুধু ঝোল কীভাবে দিই? এর জন্য বাড়তি টাকা দিতে হবে না।
দেখতে দেখতে ৩৮ বছর পেরিয়ে গেল। অথচ মনে হয়, যেন সেদিন সকালের ঘটনা। আজ সেই প্রৌঢ় হোটেল মালিকের কথা বারবার মনে পড়ছে। তাকে আজ পাওয়া গেলে অবশ্যই দাড়ি রাখা এবং টুপি পরার দায়ে জঙ্গি সন্দেহে ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়া হতো!


 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?