ঘাতক
মোস্তফা কামাল
জমিরউদ্দিন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। অপারেশন থিয়েটারের লালবাতি জ্বলছে। লালবাতি সবুজ হবে, তারপর ডাক্তার এসে খবর দেবেন। তিনি সেই খবরের জন্য অপেক্ষা করছেন। ডাক্তার এসে কী খবর দেবেন, তার ওপর নির্ভর করছে জমির উদ্দিনের ভষিষ্যত্। হয় বাঁচা, না হয় মরা। এই বাঁচা-মরার দ্বন্দ্বে তার নাভিশ্বাস ওঠার মতো অবস্থা। টেনশনে তার মাথা ঘুরছে। মানসিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে। পাগলের মতো অবস্থা হয়েছে তার।
জমিরউদ্দিন মনে মনে ভাবেন, বদ মেজাজটা কোথা থেকে যে এলো! আসলে মেজাজটা এমন জিনিস, এটাকে কন্ট্রোল করতে না পারলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। অমানুষে পরিণত হয়। আমিও আজ সেই অমানুষে পরিণত হয়েছি। অথচ এই আমি, কোনোদিন কোনো মানুষের সঙ্গে জোরে কথা বলিনি। ঝগড়াঝাঁটি করিনি। কাউকে চোখ রাঙাইনি। আজ কী হতে কী হয়ে গেল! আমার তো সম্পদ কম ছিল না! ডাক্তারি করে ভালোই তো আয়-রোজগার হতো! একদিনের আয় দিয়ে ত্রিশ দিন চলত। তারপরও কেন এত লোভ! ছোট ভাই না হয়, বাবার সম্পদ একটু বেশিই নিয়েছে। তাতে হয়েছে কি? অন্য কেউ তো নেয়নি! রক্তের সম্পর্কের ভাই নিয়েছে! সেই ভাইয়ের সঙ্গে আমি এমন আচরণ করলাম! বাবা কি আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছেন? আমি কিসের ভাই, কেমন ভাই! মানুষে বলে না, লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। আমার হয়েছে তাই। অতি লোভ করতে গিয়ে এখন মহাবিপদের মুখে পড়েছি। এই বিপদ কাটানোর উপায় কি?
আনিকা জাহান জমিরউদ্দিনের স্ত্রী। তিনিও অপারেশন থিয়েটারের সামনে জমিরউদ্দিনের পাশে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো কথা বলছেন না। দু’একবার অপারেশন থিয়েটারের লালবাতির দিকে দৃষ্টি দিলেন। তারপর তিনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। অপারেশন থিয়েটারে কী ঘটছে, তা নিয়ে তার ভাবনার অন্ত নেই। নানা নেতিবাচক ভাবনা তার মাথায় ঘুরপাক খায়। যদি অপারেশন থিয়েটার থেকে নেগেটিভ খবর আসে, তখন কী ঘটবে তাদের জীবনে! তিনি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন! তার ছেলেমেয়েদেরই বা কোথায় ঠাঁই হবে! না, তিনি আর ভাবতে পারছেন না।
জমিরউদ্দিনের ছোট ভাই জসিমউদ্দিনের স্ত্রী তনিমা আক্তার খবর পেয়েই ছুটে আসে হাসপাতালে। রাগে-ক্ষোভে-দুঃখে তার চোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি ঝরছে। জমির উদ্দিন সম্পর্কে তার বড় না হলে সে আজ তাকে অপমানে জর্জরিত করত। কিন্তু তনিমা কিছুই করল না। সে অস্বাভাবিক শান্ত গলায় বলল, ভাইজান, জসিমের কি খবর!
জমিরউদ্দিন কোনো কথা বললেন না। তিনি চোখের পানি ছেড়ে দিলেন।
তনিমা বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চাইল, ভাইজান! আপনি কাঁদছেন কেন?
অস্ফুট কণ্ঠে জমিরউদ্দিন বললেন, জানি না।
আপনি কাঁদছেন, আপনি জানেন না!
আমার কেন জানি কান্না পাচ্ছে। খুব কান্না পাচ্ছে।
জমিরউদ্দিনের কান্না দেখে তনিমা পাগলের মতো অপারেশন থিয়েটারের দিকে ছুটে যেতে লাগল। তখন তাকে পেছন থেকে আটকালেন আনিকা। তিনি লালবাতি দেখিয়ে বললেন, ‘এখনও অপারেশন চলছে। এখন কিছুতেই ঢোকা যাবে না। আরেকটু অপেক্ষা কর।’
কিন্তু ভাইজান কেন কাঁদছেন?
তিনি তার ভুল বুঝতে পেরে কাঁদছেন। তিনি যে অপরাধ করেছেন, সেটা তাকে এখন পীড়া দিচ্ছে। সে জন্য তিনি কাঁদছেন।
জমিরউদ্দিন মনে মনে ভাবেন— অপারেশন থিয়েটারের সবুজবাতি জ্বলে ওঠে। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে আসেন। জমিরউদ্দিন তার সামনে এগিয়ে যান। জানতে চান অপারেশনের খবর। ডাক্তার মুখটা মলিন করে বলেন, খবর নেগেটিভ!
নেগেটিভ মানে!
আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই বাঁচাতে পারলাম না।
খবরটা শুনে জমিরউদ্দিন যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি কাউকে কিছু না বলে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দৌড় শুরু করলেন। ছুটে চললেন অজানার পথে। গন্তব্য কোথায়, তা তিনি জানেন না। কোথায় তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখবেন, তাও ভেবে পাচ্ছেন না। তার সামনে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি। অথচ মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে তার জীবনটা অন্ধকারের চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে। সময়টা কি নির্মম! এই কিছুক্ষণ আগে যিনি রাজা, পরক্ষণেই তিনি ভিখিরি। জমিরউদ্দিন কিছুক্ষণ আগেও ডাক্তারি পেশার মতো মহান পেশার স্বনামধন্য ব্যক্তি ছিলেন। আর এখন তার পরিচয় ঘাতক হিসেবে। নিজের প্রতি ঘৃণা হয় তার। মনে মনে বলেন, আমি এতটা অমানুষ হলাম কি করে? ক্রোধ যে মানুষকে ধ্বংস করে দেয়, তা আজ আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আমার ক্রোধই আমার শত্রু। সে আমাকে ঘাতকের খাতায় নাম লিখিয়েছে। এখন আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। মানুষের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখতে চাইছি। কিন্তু পৃথিবী আমাকে পালানোর কোনো সুযোগ দিতে চায় না। এই প্রকৃতি, এই মাটি আমাকে শাস্তি দিতে চায়। কেনই বা চাইবে না! এই আমি কী করেছি! সামান্য সম্পত্তির লোভে আমি আমার আপন ছোট ভাইকে নিজের হাতে খুন করেছি! আমি কিভাবে এত বড় অন্যায় কাজটা করতে পারলাম? না না! জসিম মরেনি! জসিম বেঁচে আছে! জসিম বেঁচে আছে!!
আনিকা জমিরউদ্দিনের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে বললেন, এই! এমন করছো কেন! তুমিই যদি এমন কর, তাহলে ওর স্ত্রী কি করবে! সে তো পাগল হয়ে যাবে!
কি করেছি আমি! আনিকা এই দেখ, এই দেখ! আমার হাতে কোনো রক্ত আছে! নেই, আমার হাতে কোনো রক্ত নেই!
আনিকা জমিরউদ্দিনকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বললেন, প্লিজ জমির! শান্ত হও। আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া কর, যেন জসিম বেঁচে থাকে। আল্লাহ যেন তাকে বাঁচিয়ে রাখেন।
আনিকার কথাটা জমিরউদ্দিনের কাছে বেশ যুত্সই লেগেছে। তিনি বললেন, ঠিক বলেছো আনিকা। আমি যাই, নামাজ পড়ে ওর জন্য দোয়া করে আসি। তোমরা এখানেই থেকো। আমি যাব আর আসব।
২.
ডাক্তার জাকিউদ্দিন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তার বেশির ভাগ সময় কাটে শুয়ে-বসে। তার স্ত্রী গত হয়েছেন দু’বছর আগে। তারপর থেকে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছেন। বয়স আর নিঃসঙ্গতা তাকে একেবারেই পেয়ে বসেছে। দেখাশোনা করার জন্য বিশ বছর বয়সের একটি ছেলে রয়েছে। তার নাম মনিরুল। সেও এক খেয়ালি স্বভাবের মানুষ। প্রায়ই সে জাকিউদ্দিনের কথা ভুলে যায়। তাই জাকিউদ্দিনকে মাঝেমধ্যে বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়। তারপরও এসব নিয়ে তিনি ভাবেন না। কিন্তু দুই ছেলের বিবাদের খবর শুনে তিনি একেবারেই ভেঙে পড়েছেন। তিনি জানতে পেরেছেন, সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিবাদের এক পর্যায়ে জমিরউদ্দিন জসিমউদ্দিনের গলায় ছুরি চালিয়েছেন। সেই ছেলে এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। এ খবর শোনার পর কার মাথা ঠিক থাকে!
জাকিউদ্দিন ভাবতেই পারছেন না তার সুশিক্ষিত ছেলেরা এরকম কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে। যে ছেলেদের নিয়ে তিনি গর্ব করতেন, সেই ছেলেরা আজ মূর্খের মতো বিবাদে লিপ্ত। অথচ তার বড় ছেলে জেলা জজ। মেজ ছেলে ডাক্তার, আরেক ছেলে আইনজীবী এবং ছোট ছেলে ব্যবসায়ী। তাদের কারোরই টানাপড়েন অবস্থা নেই। পৈতৃক সম্পত্তি না পেলেও তাদের না খেয়ে থাকতে হবে না। এরপরও কেন যে তারা পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি করছে কে জানে! শিক্ষিত ছেলেরা নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত হবে—এটা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। তিনি মনে মনে বলেন, হে ভাগ্যবিধাতা, এসব দেখার জন্যই কী আমাকে পৃথিবীতে রেখে দিয়েছো! আরও আগে কেন আমাকে নিয়ে যাওনি! আমার ছেলের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার আগেই যেন আমার মৃত্যু হয়! আমি মরে যেতে চাই। আমি আর বাঁচতে চাই না।
মনিরুল দৌড়াতে দৌড়াতে জাকিউদ্দিনের ঘরে এসে ঢুকেছে। সে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সে কিছু বলবে-বলবে করছে, কিন্তু বলতে পারছে না। জাকিউদ্দিন ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছু বলছেন না। কারণ তিনি টের পেয়েছেন, মনিরুল কিছু বলার জন্যই তার কাছে এসেছে। অবশ্য মনিরুলও খুব একটা দেরি করল না। সে হাঁপাতে হাঁপাতেই বলল, দাদা, দাদা!
কিরে, বল। কি হয়েছে?
দাদা, জমির চাচা নাকি জসিম চাচাকে জবাই করছে? গলায় ছুরি চালাইছে!
এই খবর তো শুনছি। জসিম হাসপাতালে। এখন কি খবর সেটা বল।
দাদা, খবর ভালো না!
কেন, কি হয়েছে?
জসিম চাচা নাকি মারা গেছে!!
মনিরুল কাঁদতে শুরু করল। জাকিউদ্দিন জসিমউদ্দিনের মৃত্যু সংবাদ শোনার পর কেমন যেন হয়ে গেলেন। তারপর তিনি অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে মনিরুলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনিরুল তাকে এত ডাকল, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। মনিরুল জাকিউদ্দিনকে জড়িয়ে ধরে আবারও কাঁদতে শুরু করল। দাদা, দাদাগো! একি হলো!
জমিরউদ্দিন নামাজের নাম করে হাসপাতাল ত্যাগ করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, তার আর ফেরা ঠিক হবে না। কারণ জসিমউদ্দিনের মৃত্যু হলে তাকে জেলহাজতে যেতে হবে। আর যে রক্তক্ষরণ হয়েছে, তাতে জসিমউদ্দিনের মৃত্যু অনিবার্য। ডাক্তাররা চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারবেন না। হত্যার বিচার মৃত্যুদণ্ড। এই দণ্ড এড়ানোর জন্য পালিয়ে থাকাই উত্তম পন্থা। পালিয়ে থেকে তিনি মৃত্যুদণ্ড মওকুফের চেষ্টা চালাবেন। এ জন্য তিনি টাকা ছড়াবেন। কিন্তু কি কারণে যেন তিনি আবার হাসপাতালে ফিরে আসেন। হাসপাতালে আসার পর তিনি দূর থেকে দেখলেন, অপারেশন থিয়েটারের সামনে কান্নার রোল। এ দৃশ্য দেখে তিনি আর সামনে এগুলেন না। মনে মনে ভাবলেন, এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার সাধ্য আমার নেই! আমি বরং পালাই! এরপর জমিরউদ্দিন গা ঢাকা দিলেন। আনিকা জাহানও বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান।
জসিমউদ্দিনের স্ত্রী তনিমা আক্তার রংপুর সদর থানায় গিয়ে জমির উদ্দিনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তিনি তার অভিযোগে বলেন, ‘ঘাতক জমিরউদ্দিন, আমার চোখের সামনে আমার স্বামী জসিমউদ্দিনকে ছুরি দিয়ে জবাই করে হত্যা করেছে। এ সময় তার স্ত্রী আনিকা জাহানও উপস্থিত ছিলেন। তাকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেই সব তথ্য বেরিয়ে যাবে। আমার স্বামীর ঘাতক জমিরউদ্দিনকে গ্রেফতার করে উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার জন্য আমি আবেদন করছি।’
থানায় মামলা দেয়ার পর শুরু হয় পুলিশি অভিযান। জসিমউদ্দিনের হত্যাকারী জমিরউদ্দিনকে আটক করতে না পেরে পুলিশ তার ছেলেমেয়েকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। এ খবর প্রথমে জানতে পারেন আনিকা জাহান। তিনি তার স্বামী জমিরউদ্দিনকে মোবাইল ফোনে খবরটি জানিয়ে বলেন, ‘তুমি যদি পুলিশের হাতে ধরা না দাও, তাহলে আমি ধরা দেব। তোমার জন্য আমাকে এবং আমার ছেলেমেয়েকে নির্যাতন করবে। এখন তুমি কী করবে, সে সিদ্ধান্ত তোমার।’
জমিরউদ্দিন বললেন, তুমি কি বাবার খবর জানো?
না, কী হয়েছে তার!
জসিমের মৃত্যুর খবর শুনে বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।
কী বলছো তুমি!
কাঁদতে কাঁদতে জমিরউদ্দিন বললেন, আমি শুধু আমার ভাইকেই হারাইনি, বাবাকেও হারিয়েছি! আমার ভুলের জন্য দুটি জীবন চলে গেছে। আমার আর কী আছে! আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জসিমকে হত্যা করার কথা স্বীকার করে পুলিশের হাতে ধরা দেব। আজই থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করব। আনিকা, তুমি থানায় যাও, সেখানে গিয়ে তোমার ছেলেমেয়েকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসো। আমার অপরাধের জন্য ওরা কেন শাস্তি পাবে! ওরা তো কোনো দোষ করেনি! আমি যদি মেজাজটা কন্ট্রোল করতে পারতাম, তাহলে আমার এই পরিণতি হতো না! ভাইকে হত্যা করার জন্য আমার ফাঁসি হবে। এটাই আমার প্রাপ্য। আমার কষ্ট হচ্ছে একটি কথা ভেবে, আমি আমার ছেলেমেয়েদের নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিলাম! সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। যদি পার, আমার সেই স্বপ্ন সত্যি করতে চেষ্টা কর। আর যদি কোনোকালে দেখা হয়ে যায়, তাহলে ঘাতক বলে ঘৃণা করো। তোমার কাছে এ আমার মিনতি!’
জমিরউদ্দিন পুলিশের কাছে ধরা দেয়ার পর প্রথমে নিম্ন আদালতে এবং পরে উচ্চ আদালতে শুনানির পর শুনানি শেষে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। এ খবরটি শুনে নির্বাক হয়ে যান আনিকা জাহান। তিনি শুধু হাউমাউ করে কাঁদলেন। এ ছাড়া তার কিইবা করার ছিল!
জমিরউদ্দিন মনে মনে ভাবেন, বদ মেজাজটা কোথা থেকে যে এলো! আসলে মেজাজটা এমন জিনিস, এটাকে কন্ট্রোল করতে না পারলে মানুষ আর মানুষ থাকে না। অমানুষে পরিণত হয়। আমিও আজ সেই অমানুষে পরিণত হয়েছি। অথচ এই আমি, কোনোদিন কোনো মানুষের সঙ্গে জোরে কথা বলিনি। ঝগড়াঝাঁটি করিনি। কাউকে চোখ রাঙাইনি। আজ কী হতে কী হয়ে গেল! আমার তো সম্পদ কম ছিল না! ডাক্তারি করে ভালোই তো আয়-রোজগার হতো! একদিনের আয় দিয়ে ত্রিশ দিন চলত। তারপরও কেন এত লোভ! ছোট ভাই না হয়, বাবার সম্পদ একটু বেশিই নিয়েছে। তাতে হয়েছে কি? অন্য কেউ তো নেয়নি! রক্তের সম্পর্কের ভাই নিয়েছে! সেই ভাইয়ের সঙ্গে আমি এমন আচরণ করলাম! বাবা কি আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছেন? আমি কিসের ভাই, কেমন ভাই! মানুষে বলে না, লোভে পাপ পাপে মৃত্যু। আমার হয়েছে তাই। অতি লোভ করতে গিয়ে এখন মহাবিপদের মুখে পড়েছি। এই বিপদ কাটানোর উপায় কি?
আনিকা জাহান জমিরউদ্দিনের স্ত্রী। তিনিও অপারেশন থিয়েটারের সামনে জমিরউদ্দিনের পাশে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। কোনো কথা বলছেন না। দু’একবার অপারেশন থিয়েটারের লালবাতির দিকে দৃষ্টি দিলেন। তারপর তিনি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। অপারেশন থিয়েটারে কী ঘটছে, তা নিয়ে তার ভাবনার অন্ত নেই। নানা নেতিবাচক ভাবনা তার মাথায় ঘুরপাক খায়। যদি অপারেশন থিয়েটার থেকে নেগেটিভ খবর আসে, তখন কী ঘটবে তাদের জীবনে! তিনি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবেন! তার ছেলেমেয়েদেরই বা কোথায় ঠাঁই হবে! না, তিনি আর ভাবতে পারছেন না।
জমিরউদ্দিনের ছোট ভাই জসিমউদ্দিনের স্ত্রী তনিমা আক্তার খবর পেয়েই ছুটে আসে হাসপাতালে। রাগে-ক্ষোভে-দুঃখে তার চোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি ঝরছে। জমির উদ্দিন সম্পর্কে তার বড় না হলে সে আজ তাকে অপমানে জর্জরিত করত। কিন্তু তনিমা কিছুই করল না। সে অস্বাভাবিক শান্ত গলায় বলল, ভাইজান, জসিমের কি খবর!
জমিরউদ্দিন কোনো কথা বললেন না। তিনি চোখের পানি ছেড়ে দিলেন।
তনিমা বিস্ময়ের সঙ্গে জানতে চাইল, ভাইজান! আপনি কাঁদছেন কেন?
অস্ফুট কণ্ঠে জমিরউদ্দিন বললেন, জানি না।
আপনি কাঁদছেন, আপনি জানেন না!
আমার কেন জানি কান্না পাচ্ছে। খুব কান্না পাচ্ছে।
জমিরউদ্দিনের কান্না দেখে তনিমা পাগলের মতো অপারেশন থিয়েটারের দিকে ছুটে যেতে লাগল। তখন তাকে পেছন থেকে আটকালেন আনিকা। তিনি লালবাতি দেখিয়ে বললেন, ‘এখনও অপারেশন চলছে। এখন কিছুতেই ঢোকা যাবে না। আরেকটু অপেক্ষা কর।’
কিন্তু ভাইজান কেন কাঁদছেন?
তিনি তার ভুল বুঝতে পেরে কাঁদছেন। তিনি যে অপরাধ করেছেন, সেটা তাকে এখন পীড়া দিচ্ছে। সে জন্য তিনি কাঁদছেন।
জমিরউদ্দিন মনে মনে ভাবেন— অপারেশন থিয়েটারের সবুজবাতি জ্বলে ওঠে। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে আসেন। জমিরউদ্দিন তার সামনে এগিয়ে যান। জানতে চান অপারেশনের খবর। ডাক্তার মুখটা মলিন করে বলেন, খবর নেগেটিভ!
নেগেটিভ মানে!
আমরা প্রাণপণ চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই বাঁচাতে পারলাম না।
খবরটা শুনে জমিরউদ্দিন যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি কাউকে কিছু না বলে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দৌড় শুরু করলেন। ছুটে চললেন অজানার পথে। গন্তব্য কোথায়, তা তিনি জানেন না। কোথায় তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখবেন, তাও ভেবে পাচ্ছেন না। তার সামনে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি। অথচ মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে তার জীবনটা অন্ধকারের চোরাবালিতে হারিয়ে যাচ্ছে। সময়টা কি নির্মম! এই কিছুক্ষণ আগে যিনি রাজা, পরক্ষণেই তিনি ভিখিরি। জমিরউদ্দিন কিছুক্ষণ আগেও ডাক্তারি পেশার মতো মহান পেশার স্বনামধন্য ব্যক্তি ছিলেন। আর এখন তার পরিচয় ঘাতক হিসেবে। নিজের প্রতি ঘৃণা হয় তার। মনে মনে বলেন, আমি এতটা অমানুষ হলাম কি করে? ক্রোধ যে মানুষকে ধ্বংস করে দেয়, তা আজ আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আমার ক্রোধই আমার শত্রু। সে আমাকে ঘাতকের খাতায় নাম লিখিয়েছে। এখন আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। মানুষের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখতে চাইছি। কিন্তু পৃথিবী আমাকে পালানোর কোনো সুযোগ দিতে চায় না। এই প্রকৃতি, এই মাটি আমাকে শাস্তি দিতে চায়। কেনই বা চাইবে না! এই আমি কী করেছি! সামান্য সম্পত্তির লোভে আমি আমার আপন ছোট ভাইকে নিজের হাতে খুন করেছি! আমি কিভাবে এত বড় অন্যায় কাজটা করতে পারলাম? না না! জসিম মরেনি! জসিম বেঁচে আছে! জসিম বেঁচে আছে!!
আনিকা জমিরউদ্দিনের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে বললেন, এই! এমন করছো কেন! তুমিই যদি এমন কর, তাহলে ওর স্ত্রী কি করবে! সে তো পাগল হয়ে যাবে!
কি করেছি আমি! আনিকা এই দেখ, এই দেখ! আমার হাতে কোনো রক্ত আছে! নেই, আমার হাতে কোনো রক্ত নেই!
আনিকা জমিরউদ্দিনকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বললেন, প্লিজ জমির! শান্ত হও। আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া কর, যেন জসিম বেঁচে থাকে। আল্লাহ যেন তাকে বাঁচিয়ে রাখেন।
আনিকার কথাটা জমিরউদ্দিনের কাছে বেশ যুত্সই লেগেছে। তিনি বললেন, ঠিক বলেছো আনিকা। আমি যাই, নামাজ পড়ে ওর জন্য দোয়া করে আসি। তোমরা এখানেই থেকো। আমি যাব আর আসব।
২.
ডাক্তার জাকিউদ্দিন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তার বেশির ভাগ সময় কাটে শুয়ে-বসে। তার স্ত্রী গত হয়েছেন দু’বছর আগে। তারপর থেকে নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছেন। বয়স আর নিঃসঙ্গতা তাকে একেবারেই পেয়ে বসেছে। দেখাশোনা করার জন্য বিশ বছর বয়সের একটি ছেলে রয়েছে। তার নাম মনিরুল। সেও এক খেয়ালি স্বভাবের মানুষ। প্রায়ই সে জাকিউদ্দিনের কথা ভুলে যায়। তাই জাকিউদ্দিনকে মাঝেমধ্যে বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়। তারপরও এসব নিয়ে তিনি ভাবেন না। কিন্তু দুই ছেলের বিবাদের খবর শুনে তিনি একেবারেই ভেঙে পড়েছেন। তিনি জানতে পেরেছেন, সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিবাদের এক পর্যায়ে জমিরউদ্দিন জসিমউদ্দিনের গলায় ছুরি চালিয়েছেন। সেই ছেলে এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। এ খবর শোনার পর কার মাথা ঠিক থাকে!
জাকিউদ্দিন ভাবতেই পারছেন না তার সুশিক্ষিত ছেলেরা এরকম কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে। যে ছেলেদের নিয়ে তিনি গর্ব করতেন, সেই ছেলেরা আজ মূর্খের মতো বিবাদে লিপ্ত। অথচ তার বড় ছেলে জেলা জজ। মেজ ছেলে ডাক্তার, আরেক ছেলে আইনজীবী এবং ছোট ছেলে ব্যবসায়ী। তাদের কারোরই টানাপড়েন অবস্থা নেই। পৈতৃক সম্পত্তি না পেলেও তাদের না খেয়ে থাকতে হবে না। এরপরও কেন যে তারা পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি করছে কে জানে! শিক্ষিত ছেলেরা নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত হবে—এটা তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না। তিনি মনে মনে বলেন, হে ভাগ্যবিধাতা, এসব দেখার জন্যই কী আমাকে পৃথিবীতে রেখে দিয়েছো! আরও আগে কেন আমাকে নিয়ে যাওনি! আমার ছেলের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার আগেই যেন আমার মৃত্যু হয়! আমি মরে যেতে চাই। আমি আর বাঁচতে চাই না।
মনিরুল দৌড়াতে দৌড়াতে জাকিউদ্দিনের ঘরে এসে ঢুকেছে। সে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সে কিছু বলবে-বলবে করছে, কিন্তু বলতে পারছে না। জাকিউদ্দিন ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছু বলছেন না। কারণ তিনি টের পেয়েছেন, মনিরুল কিছু বলার জন্যই তার কাছে এসেছে। অবশ্য মনিরুলও খুব একটা দেরি করল না। সে হাঁপাতে হাঁপাতেই বলল, দাদা, দাদা!
কিরে, বল। কি হয়েছে?
দাদা, জমির চাচা নাকি জসিম চাচাকে জবাই করছে? গলায় ছুরি চালাইছে!
এই খবর তো শুনছি। জসিম হাসপাতালে। এখন কি খবর সেটা বল।
দাদা, খবর ভালো না!
কেন, কি হয়েছে?
জসিম চাচা নাকি মারা গেছে!!
মনিরুল কাঁদতে শুরু করল। জাকিউদ্দিন জসিমউদ্দিনের মৃত্যু সংবাদ শোনার পর কেমন যেন হয়ে গেলেন। তারপর তিনি অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে মনিরুলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। মনিরুল তাকে এত ডাকল, কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। মনিরুল জাকিউদ্দিনকে জড়িয়ে ধরে আবারও কাঁদতে শুরু করল। দাদা, দাদাগো! একি হলো!
জমিরউদ্দিন নামাজের নাম করে হাসপাতাল ত্যাগ করেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, তার আর ফেরা ঠিক হবে না। কারণ জসিমউদ্দিনের মৃত্যু হলে তাকে জেলহাজতে যেতে হবে। আর যে রক্তক্ষরণ হয়েছে, তাতে জসিমউদ্দিনের মৃত্যু অনিবার্য। ডাক্তাররা চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারবেন না। হত্যার বিচার মৃত্যুদণ্ড। এই দণ্ড এড়ানোর জন্য পালিয়ে থাকাই উত্তম পন্থা। পালিয়ে থেকে তিনি মৃত্যুদণ্ড মওকুফের চেষ্টা চালাবেন। এ জন্য তিনি টাকা ছড়াবেন। কিন্তু কি কারণে যেন তিনি আবার হাসপাতালে ফিরে আসেন। হাসপাতালে আসার পর তিনি দূর থেকে দেখলেন, অপারেশন থিয়েটারের সামনে কান্নার রোল। এ দৃশ্য দেখে তিনি আর সামনে এগুলেন না। মনে মনে ভাবলেন, এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার সাধ্য আমার নেই! আমি বরং পালাই! এরপর জমিরউদ্দিন গা ঢাকা দিলেন। আনিকা জাহানও বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যান।
জসিমউদ্দিনের স্ত্রী তনিমা আক্তার রংপুর সদর থানায় গিয়ে জমির উদ্দিনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তিনি তার অভিযোগে বলেন, ‘ঘাতক জমিরউদ্দিন, আমার চোখের সামনে আমার স্বামী জসিমউদ্দিনকে ছুরি দিয়ে জবাই করে হত্যা করেছে। এ সময় তার স্ত্রী আনিকা জাহানও উপস্থিত ছিলেন। তাকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেই সব তথ্য বেরিয়ে যাবে। আমার স্বামীর ঘাতক জমিরউদ্দিনকে গ্রেফতার করে উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার জন্য আমি আবেদন করছি।’
থানায় মামলা দেয়ার পর শুরু হয় পুলিশি অভিযান। জসিমউদ্দিনের হত্যাকারী জমিরউদ্দিনকে আটক করতে না পেরে পুলিশ তার ছেলেমেয়েকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। এ খবর প্রথমে জানতে পারেন আনিকা জাহান। তিনি তার স্বামী জমিরউদ্দিনকে মোবাইল ফোনে খবরটি জানিয়ে বলেন, ‘তুমি যদি পুলিশের হাতে ধরা না দাও, তাহলে আমি ধরা দেব। তোমার জন্য আমাকে এবং আমার ছেলেমেয়েকে নির্যাতন করবে। এখন তুমি কী করবে, সে সিদ্ধান্ত তোমার।’
জমিরউদ্দিন বললেন, তুমি কি বাবার খবর জানো?
না, কী হয়েছে তার!
জসিমের মৃত্যুর খবর শুনে বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।
কী বলছো তুমি!
কাঁদতে কাঁদতে জমিরউদ্দিন বললেন, আমি শুধু আমার ভাইকেই হারাইনি, বাবাকেও হারিয়েছি! আমার ভুলের জন্য দুটি জীবন চলে গেছে। আমার আর কী আছে! আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, জসিমকে হত্যা করার কথা স্বীকার করে পুলিশের হাতে ধরা দেব। আজই থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করব। আনিকা, তুমি থানায় যাও, সেখানে গিয়ে তোমার ছেলেমেয়েকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসো। আমার অপরাধের জন্য ওরা কেন শাস্তি পাবে! ওরা তো কোনো দোষ করেনি! আমি যদি মেজাজটা কন্ট্রোল করতে পারতাম, তাহলে আমার এই পরিণতি হতো না! ভাইকে হত্যা করার জন্য আমার ফাঁসি হবে। এটাই আমার প্রাপ্য। আমার কষ্ট হচ্ছে একটি কথা ভেবে, আমি আমার ছেলেমেয়েদের নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিলাম! সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। যদি পার, আমার সেই স্বপ্ন সত্যি করতে চেষ্টা কর। আর যদি কোনোকালে দেখা হয়ে যায়, তাহলে ঘাতক বলে ঘৃণা করো। তোমার কাছে এ আমার মিনতি!’
জমিরউদ্দিন পুলিশের কাছে ধরা দেয়ার পর প্রথমে নিম্ন আদালতে এবং পরে উচ্চ আদালতে শুনানির পর শুনানি শেষে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। এ খবরটি শুনে নির্বাক হয়ে যান আনিকা জাহান। তিনি শুধু হাউমাউ করে কাঁদলেন। এ ছাড়া তার কিইবা করার ছিল!


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


