Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ৩ পৌষ ১৪১৬, ২৯ জিলহজ ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

বায়ুযানে পঞ্চাশ মাইল (সফল স্বপ্ন)

বেগম রোকেয়া
সে বহুদিনের কথা (১৯০৫ খ্রীঃ) তখন আমরা ভাগলপুরের বাঁকা নামক সাব-ডিভিশনে ছিলাম। মরহুম ডেপুটি সাহেব (আমার পূজনীয় স্বামী) ‘টুর’-এ গিয়েছিলেন; আমি বাসায় সম্পূর্ণ একাকী ছিলাম। সময় যাপনের নিমিত্ত কিছু একটা লিখিলাম। তিনি দুই দিন পরে ফিরিয়া আসিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, এ দুই দিন আমি কি করিতেছিলাম! তদুত্তরে আমি তাঁহাকে খসড়া লেখা, “Sultana’s Dream” দেখাইলাম। তিনি দাঁড়াইয়াই সমস্ত পাঠ করিয়া বলিয়া উঠিলেন,— “A Terrible Revenge.” (ভয়ঙ্কর প্রতিশোধ!) অতঃপর তিনি সেই রচনাটা ভাগলপুরের তদানীন্তন কমিশনার মি. ম্যাক্ফারসনের নিকট সংশোধনের নিমিত্ত পাঠাইয়া দিলেন।
যথাসময় লেখাটা মি. ম্যাকফারসনের নিকট হইতে ফেরত আসিলে দেখা গেল, তিনি কোথাও কলমের আঁচড় দেন নাই। তিনি সেই সঙ্গে ডেপুটি সাহেবকে যে পত্র দিয়াছেন তাহাতে লিখিয়াছেন :
“The ideas expressed in it are quite delightful and full of originality and they are written in perfect English. ... I wonder if she has foretold here the manner in which we may be able to move about in the air at some future time. Her suggestions on this point are most ingenious.”
ভাবার্থ—
“ইহাতে যে ভাব প্রকাশ করা হইয়াছে তাহা অত্যন্ত আনন্দপ্রদ এবং অপূর্ব্ব। রচনার ইংরাজীও নিখুঁত। ... আমি সবিস্ময়ে মনে করি, সুদূর ভবিষ্যতে আমরা বায়ুপথে কিরূপে ভ্রমণ করিব এখানে লেখিকা তাহারই আভাস দিয়াছেন। এ বিষয়ে তাঁহার কল্পনা অতি মনোরম।”
যে সময় আমি ‘সুলতানার স্বপ্ন’ লিখিয়াছিলাম, তখন এরোপ্লেন বা জেপেলিনের অস্তিত্ব ছিল না; এমনকি সে সময় ভারতবর্ষে মোটরকারও আইসে নাই। বৈদ্যুতিক আলোক এবং পাখাও কল্পনার অতীত ছিল। অন্ততঃ আমি তখন সেই সব কিছুই দেখি নাই।
প্রায় ছয় বত্সর পরে (১৯১১ খ্রীঃ) কলিকাতায় আসিয়া প্রথম হাওয়াই জাহাজ অতি দূর হইতে শূন্যে উড়িতে দেখিলাম। আমি নিজে কখনও উড়োজাহাজে উঠিতে পাইব, এরূপ আশা কখনই করি নাই। শুধু নীরবে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিতাম।
গত ৩১শে নভেম্বর (১৯৩০ খ্রীঃ) রবিবার সন্ধ্যার পর যখন শ্রীমান মোরাদ আসিয়া বলিলেন, “খালা আম্মা, চলুন, আগামী পরশু আমার প্লেনে আপনাকে উড়াইয়া আনি; কলিকাতার চারিদিকে উড়িতে প্রায় ৩৫ মিনিট লাগিবে!” তখন আমার প্রাণ অভূতপূর্ব্ব আনন্দে নাচিয়া উছিল।
এ-শুভ সংবাদ বেশি লোককে জানাইলাম না দুই কারণে— প্রথম কারণ এই যে, মাত্র দুই মাস পূর্ব্বে, “আর ১০১” নামক সুবৃহত্ এরোপ্লেন ধ্বংস হওয়ায় ৪৫ জন হতভাগ্য আরোহী সশরীরে নরকানলে দগ্ধ হইয়াছে। তাহার বিভীষণ স্মৃতি লোকের মনে তখনও জাজ্জ্বল্যমান থাকায় সকলের মনে এরোপ্লেন সম্বন্ধে ভয়ানক আতঙ্ক আছে বলিয়া আমাকে লোকে উড়িতে বাধা দিবে। দ্বিতীয় কারণ, অনেকে ক্যামেরা লইয়া উপস্থিত থাকিবে আমার ফটো লইতে।
যথাকালে ২রা ডিসেম্বর মঙ্গলবার বেলা প্রায় ৪টার সময় আমরা শুভযাত্রা করিলাম। এক মোটরে মিসেস্ রাসাদ (শ্রীমান মোরাদের মাতা), তাঁহার তৃতীয় পুত্র ফোয়াদ, মিসেস্ দে এবং আমি; অপর মোটরে আমার ভগিনী ও তাঁহার পুত্র কন্যা প্রমুখ ছিলেন। যাত্রার সময়ে দেখি; আমার এক স্নেহময়ী ভগিনী মিসেস্ দাউদর রহমান আসিয়া উপস্থিত। তিনিও আমাদের সঙ্গে দমদম চলিলেন।
এরোড্রামে গিয়ে দেখি, একেবারে মুক্ত ময়দান! কেবল আমাদের মোটর তিনটি এবং আমরাই! আমি আল্লাহেক ধন্যবাদ দিয়া বঙ্গের গৌরব প্রথম মুসলিম পাইলট শ্রীমান ‘মোরাদের’ প্লেনে গিয়া বসিলাম। আকাশে উড়িয়া দেখি—ধরাখানা সত্যই সরা তুল্য। আমি ক্রমে ৩০০০ (তিন হাজার) ফিট ঊর্ধ্বে উঠিয়াছি। তখনকার দৃশ্য বড় চমত্কার। আমার দক্ষিণ দিকে অস্তগামী সূর্য্য, বাম দিকে ১১ই রজবের (দ্বাদশীর) পূর্ণ-প্রায় চন্দ্র,— উভয়ে যেন আমার দিকে চাহিয়া মৃদু হাসিতেছিল। নীচে চাহিয়া দেখি—কলিকাতার পাকা বাড়ীগুলি, কোঠা-বালাখানা, এমারত সব ইস্টক-স্তূপের মত দেখাইতেছে,—হাবড়ার পুল কতটুকু খেলনা বিশেষ, আর হুগলী নদী,— সে ত জলাশয়ের সামান্য একটি রেখার মত দেখাইতেছিল। আমরা পঞ্চাশ মাইল চক্কর দিয়া নীচে আসিলাম। আমি নামিলে পর মিসেস্ রাসাদ মাত্র ৫ মিনিটের জন্য উড়িলেন। শোক্র আল্-হামেদালিল্লাহ্।
২৫ বত্সর পূর্ব্বে লিখিত “সুলতানার স্বপ্নে” বর্ণিত বায়ুযানে আমি সত্যই বেড়াইলাম। বঙ্গের প্রথম মুসলিম পাইলটের সহিত যে প্রথম অবরোধ-বন্দিনী নারী উড়িল সে আমিই। আমার পূর্ব্বে যে কয়জন বঙ্গীয় মুসিলম মহিলা এরোপ্লেনে উঠিয়াছেন, তাঁহারা উড়িয়াছেন সুদক্ষ ইউরোপীয়ান পাইলটের সহিত। আর তাঁহাদের মাথায় হেলমেট, কানে টেলিফোন এবং চক্ষে গগল্স্ ছিল। আমার এসব কিছুই ছিল না। আমি সম্পূর্ণ নিরস্ত্র ও নিরুপায় অবস্থায় একটি বালকের সহিত গিয়াছিলাম। মধ্যপথে প্রয়োজন বোধ করিলে মোরাদের সহিত কথা বলিবার আমার কোনই উপায় ছিল না। শীতে কষ্ট হইবে না শুনিয়া গায়ের শালখানাও “মিসেস্”দের হাতে ফিরাইয়া দিলাম। প্লেনে বসিলে মোরাদ বলিলেন, “খালা আম্মা! ভাল মতে কান ঢাকিবেন।” যাঃ। কান আর কি দিয়া ঢাকিব? —শালটাও ত ফেলিয়া আসিলাম। সে সময় মাথার আঁচলখানাই ছিল একমাত্র সম্বল। ইঞ্জিনের ভয়ঙ্কর গর্জ্জনে যখন কানে তালা লাগিতেছিল, তখন বুঝিলাম, মোরাদ কেন কান ঢাকিতে বলিয়াছিলেন। কিন্তু আমার আভ্যন্তরীণ আনন্দের আতিশয্যের তুলনায় সে কষ্ট অসহ্য হইলেও, নগণ্য বোধ হইল।
বিমান-বীর মোরাদের সত্সাহস অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আল্লাহ্ তাঁহার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিয়া তাহাকে নিরাপদে ফিরাইয়া আনুন, ইহাই আমাদের আন্তরিক প্রার্থনা।
কিন্তু আমি বলি, মিসেস্ রাসাদের ধৈর্য্য এবং সাহসও কম নয়। বেচারী অসহায়া বিধবা যে কত বড় পাষাণে বুক বাঁধিয়া প্রথম সন্তানটিকে সম্পূর্ণ একাকী কেপটাউন অভিমুখে রওনা হইতে দিয়াছিলেন এবং এখনও মোরাদকে একাকী বিলাতে যাইয়া প্লেনে কাজ শিখিতে দিয়াছেন তাহা ভাবিবার বিষয়। আল্লাহ্ তাঁহার সহায় হউন! আমীন!


 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?