সাহিত্যরত্ন সকাশে
ইংরেজ রাজত্বে সূর্য অস্ত যেতো না, এখনও যায় না ইংরেজি ভাষা, বিবিসি রেডিও ও টিভির কল্যাণে। এছাড়া ইয়াঙ্কি-ইউরোপীয় ইয়াররা তো আছেই। তাদের সঙ্গে মিলেঝুলে ফকল্যান্ড থেকে ইরাক-আফগান সবখানে সেই সিনাজুরি তার চলে এখনও। নির্বিবাদেই চলে। সারা দুনিয়া কুটোটি পর্যন্ত নাড়ে না। আর এমনি এক ভাষা এই ইংরেজি—এর দ্বারা করা যায় না কি! এ ভাষা হ্রবস্কা, স্কিপেরা, ডয়েশ্চলান্ড, চুং-কে বানিয়েছে ক্রোয়েশিয়া, আলবেনিয়া, জারমানি, চায়না; পারি, প্রাহা, বিয়েন, পেইচিংকে করেছে প্যারিস, প্রাগ, ভিয়েনা, বেইজিং; আমাদের রঙ্গমতী, চাটিগাঁও, যশোহর, মোমেনশাহীকে করেছে রাঙ্গামাটি, চিটাগাং, জেশোর, মাইমেনসিং। আমাদের ঠাকুর হয়েছেন টেগোর। আর আমার জন্মভূমি টাঙ্গাইলের আতিয়া হয়েছে আটিয়া, করাতিয়া হয়েছে করটিয়া। কে জানে টাঙ্গাইল হয়তো ছিল তঙ্কাইল। গত ১৩ই নভেম্বর হাটি কুমরুল গিয়ে জানলাম এর আসল নাম হাতি কুমরুল। জানালেন শহীদুল ইসলাম। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার ধানগড়া মহিলা কলেজে জীববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক তিনি। ওই উপজেলায় আছে একটি লেখক বহুমুখী সমবায় সমিতি লি.। এর কার্যালয় চান্দাইকোনায়। ‘চেতনা’ নামে একটি সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশ করে সমিতি। শহীদুল ইসলাম এর সহকারী সম্পাদক। আরও পরিচয় আছে তার। সে কথায় আসছি পরে।
হাটি কুমরুল কোন উপজেলায়, এ নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভোগেন অনেকে। উল্লাপাড়া না রায়গঞ্জ না সলঙ্গায়। না, এখনও উপজেলা হয় নি সলঙ্গা। তবে হতে বেশি বাকি নেই বলে আশা করেন অনেকে।
হাটি কুমরুলকে আমরা চিনি পশ্চিমাঞ্চলের এক গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক-সংযোগস্থল হিসেবে। ঢাকা, পাবনা, বগুড়া ও রাজশাহীর দিকে মহাসড়ক-পথে যাওয়ার সময় ওখানে থামি আমরা কোনও না কোনও খাবারের দোকানের সামনে। দোকানগুলোর নাম সব ইংরেজিতে। বাংলায় কোনওটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এর কারণও আছে মনে হয়। ইংরেজি নাম থাকলে অন্যরকম এক মাহাত্ম্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বোধ হয়। সম্ভ্রান্ত, আভিজাত্য, পারিপাট্য ইত্যাদি গোছের একটা ভাবচেহারাও ফুটে ওঠে। এর সুবিধা আছে অনেক। দেড়-দু’গুণ দরে বেচাকেনা করা যায়, কেউ কিছু বলে না। একটা তুলনা করা যেতে পারে এই দরদামের।
হাটি কুমরুলের ‘ফুড ভিলেজ’-এ ১৪ই নভেম্বর সন্ধ্যায় নানরুটি আর বটিকাবাব খেয়ে দাম দিতে গিয়ে হিসাব কষলাম ঢাকার স্টার কাবাব হাউসের সঙ্গে। ফুড ভিলেজের ১০ টাকা দামের নানরুটি স্টার কাবারের ১০ টাকা দামের নানরুটির ঠিক অর্ধেক। অর্থাত্ এর দাম হতে পারে পাঁচ টাকা। একইভাবে ৩৫ টাকার যে বটিকাবাব, তার দাম স্টার কাবাবের তুলনায় হতে পারে ২৫ টাকা। এর বেশি নয়।
দূরপাল্লার বাসের যাত্রীরা অনেক কষ্ট করে, অনেক ভোগান্তিতে জেরবার হয়ে যাতায়াত করেন। নানা বিপদ-আপদের আশঙ্কা নিয়েও চলতে হয় তাদের। তারপর তাদের পকেট ওভাবে কাটতে সকলেরই কিছুটা মায়া-দয়া হওয়া উচিত। ফুড-মালিকদের হয়তো হবে না, কিন্তু সরকারের একটা উদযোগ নেয়া উচিত এ ক্ষেত্রে।
ফুড ভিলেজ-এর কথায় অনেকের মতো আমারও মনে পড়ে সুমিষ্ট নারীকণ্ঠের ঘোষণা—অমুক বাস এখনই ছেড়ে যাচ্ছে, অমুক বাসের যাত্রীরা এখনই বাসে উঠুন... ইত্যাদি। সেদিন কৌতূহল জাগে ওই সুমিষ্ট কণ্ঠের নারীকে দেখার। কিন্তু কাউন্টারে বসে কর্মরত যিনি ওই সব ঘোষণা করছেন—দেখলাম, তিনি কোনও নারী নন—নূরানি চেহারার এক মুসল্লি যুবক। মুখভরা দাড়ি, মাথায় কারুকাজ করা টুপি, পরনে নকশা করা পাঞ্জাবি। কাউন্টার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন—তখন ভাবলাম।
হাসিমুখে এগিয়ে এলেন তিনি, একটু খুঁড়িয়ে হাঁটেন দেখলাম। কথায়-কথায় জানতে চাইলাম তাঁর কণ্ঠের রহস্য। কারণ এমনিতে তাঁর কণ্ঠ স্বাভাবিক, পুরুষালি। বললেন, মাইকে কথা বলার সময় আমার কণ্ঠ অমন শোনা যায়। তবে এমনিতে কণ্ঠ ঠিক আছে, স্বাভাবিক আছে।
তার কথা অবশ্য আমার আশপাশে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কেউ বিশ্বাস করলেন না। বললেন, না—উনি ইচ্ছা করেই কণ্ঠ অমন করে কথা বলেন। নারীকণ্ঠের মতো শোনালে আকর্ষণ জাগবে—এমন ভাবনা থেকেই এসব করেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানলাম ওই ঘোষণাকারীর নাম মোহাম্মদ আবদুল বাতেন। আমার সঙ্গে ছিলেন তখন আমার হাটি কুমরুল অভিযানের অগ্রনায়ক ইসরাইল হোসেন বাবু। তিনি সিরাজগঞ্জের দৈনিক যমুনা প্রবাহের সহকারী সম্পাদক, ঢাকার দৈনিক মানবজমিনের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি। সলঙ্গা থানা প্রেসক্লাবের সভাপতি কোরবান আলি এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী গোলাম মকসুদ। মকসুদের ব্যবসা মাছের। তিনি মত্স্য আড়তদার হিসেবে পরিচিত। তবে আরও এক বিশেষ পরিচয় আছে তাঁর। তিনি বাংলা সাহিত্যের একদা সর্বাধিক জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের নাতি। মকসুদের বয়স ৩০ বছর। তাঁর পিতার নাম হবিবর রহমান।
এর আগে বসেছিলাম ফুড ভিলেজ-এর অদূরে ফুড গারডেন-এর দোতলায় একটি বড় টেবিল ঘিরে।
(এরপর ৮-এর পৃষ্ঠায়)সেখানে ছিলেন মকসুদের বড় ভাই গোলাম আমবিয়া। তার বয়স ৪০ বছর। ছোটখাটো চাকরি করেন, একটি দোকানও আছে তাঁর। আরও ছিলেন শহীদুল ইসলাম। এ লেখার শুরুতে বলেছি তাঁর কথা। তিনি নজিবর রহমান একাডেমির প্রকাশনা সচিব। ছিলেন এসএম আনিসুর রহমান, তিনি রায়গঞ্জের বেগম নূরুন্নাহার তর্কবাগীশ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এম ফিল করছেন মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের ওপর। বিষয় ‘নজিবর রহমান ও তার রচনাশৈলী’। আর ছিলেন দীপক কুমার কর। মাওলানা তর্কবাগীশ গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি। সাহিত্য সাময়িকী ‘চেতনা’র সহকারী সম্পাদক।
আমার কাছে ‘চেতনা’র যে সংখ্যাটি আছে, তাতে দীপক কুমার কর, শহীদুল ইসলাম ও এসএম আনিসুর রহমানের লেখা আছে। তিনজনই কবিতা লিখেছেন। দীপক কুমার কর লিখেছেন—
“নির্যাতিতের জমেছে পাওনা পাহাড়
সুদে আসলে এর হিসাব আদায়ে
ভাঙতে হবে এ সমাজ আবার,
তাই বড় বেশি প্রয়োজন আর একজন নজরুল।
মানুষের জন্য, মানুষের বাস উপযোগী
পৃথিবীর জন্য চাই আর একজন রবীন্দ্রনাথ।”
(‘বড় বেশি প্রয়োজন’)
শহীদুল ইসলাম লিখেছেন—
“তবু মন বলে, মাঝে মাঝে চিত্ত ওঠে জেগে
ভাষাহীন মুখে উচ্চারিত হয়
চির নতুনের আহ্বান—
রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া
দেবো রে পরাণ ঢালি’
সব পুরাতন, সকল আঁধার করবো লয়
আমাদের হবে জয়, সত্যের হবে জয়।”
(‘রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া’)
এসএম আনিসুর রহমান লিখেছেন—
“তোমার চেতনা আজও যুদ্ধ করে—
শহরে নগরে গ্রামে লাঞ্ছিত বঞ্চিতদের পাশে
মসজিদ মন্দির আর অবরুদ্ধ কারাগার থেকে
মুক্তির সীমান্তে।...”
(‘চিরবিদ্রোহী’)
মহাসড়কের পাশে যেখানে হাটি কুমরুল ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, তার উল্টো দিক থেকে পশ্চিমে পাকা সড়ক চলে গেছে গাঁয়ের ভেতরে। যেতে-যেতে হাটি কুমরুল গাঁ যেখানে গৈগেরাম হয়ে উঠেছে, সেখানে বসতবাড়ি মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের। এখানেই চির নিদ্রায় শায়িত তিনি।
ফুড গারডেন-এ কফির কাপ সামনে নিয়ে আমরা কথা বলি সাহিত্যরত্নকে নিয়ে। জহির রায়হানের চলচ্চিত্র এবং বিটিভি’র সিরিজ নাটকের কারণে ‘আনোয়ারা’র লেখক হিসেবে সমধিক পরিচিত তিনি। এ উপন্যাসই প্রথম উপন্যাস তাঁর। প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে। প্রকাশের পরপরই ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পায় ‘আনোয়ারা’। এ প্রিয়তা ষাট দশক পর্যন্ত প্রায় অক্ষুণ্ন ছিল। তবে পঞ্চাশ-ষাট দশকে সাহিত্যরত্নের অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে ‘গরীবের মেয়ে’ (১৯২৩)-র পাঠকপ্রিয়তাই লক্ষ্য করেছি বেশি। তাঁর অন্যান্য উপন্যাস ‘চাঁদতারা বা হাসান গঙ্গা বাহমণি’ (১৯১৭), ‘পরিণাম’ (১৯১৮), ‘মেহেরউন্নিসা’ (১৯২৩), ‘প্রেমের সমাধি’ ও ‘দুনিয়া আর চাই না’ (১৯২৪)। ‘মেহেরউন্নিসা’ পড়ার সুযোগ হয় নি, কিন্তু অন্যান্য উপন্যাস পড়েছিলাম স্কুলজীবনেই। না পড়ে উপায় ছিল না। গ্রীষ্মের ছুটিতে গাঁয়ের বাড়ি দেলদুয়ার, মামার বাড়ি মীরের বেতকা, দাদীর বাড়ি পাছ চারান, দাদীর চাচার বাড়ি ইছাপুর, দাদীর বোনের বাড়ি বড় বাঁশলিয়া বা খালার বাড়ি মঙ্গলহোড়, যেখানেই গেছি কারও না কারও বাড়ির আলমারি-ট্রাঙ্কে পেয়েছি সাহিত্যরত্নের ‘আনোয়ারা’, ‘গরীবের মেয়ে’, ‘চাঁদতারা বা হাসান গঙ্গা বাহমণি’, ‘পরিণাম’, ‘প্রেমের সমাধি’, ‘দুনিয়া আর চাই না’—সেই সঙ্গে মোহাম্মদ কোরবান আলীর ‘মনোয়ারা’ (১৯২৫), আবদুল ফাত্তাহ কোরেশীর ‘সালেহা’ (১৯২৬), মোজাম্মেল হকের ‘জোহরা’, মোহাম্মদ ইদরিস আলীর ‘প্রেমের পথে’, ডা. লুত্ফুর রহমানের ‘প্রীতি উপহার’—এমন আরও অনেক পাঠকপ্রিয় উপন্যাস। সেকালে বিয়েতে সেরা উপহার ছিল এমনি সব উপন্যাস। (চলবে)
হাটি কুমরুল কোন উপজেলায়, এ নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভোগেন অনেকে। উল্লাপাড়া না রায়গঞ্জ না সলঙ্গায়। না, এখনও উপজেলা হয় নি সলঙ্গা। তবে হতে বেশি বাকি নেই বলে আশা করেন অনেকে।
হাটি কুমরুলকে আমরা চিনি পশ্চিমাঞ্চলের এক গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক-সংযোগস্থল হিসেবে। ঢাকা, পাবনা, বগুড়া ও রাজশাহীর দিকে মহাসড়ক-পথে যাওয়ার সময় ওখানে থামি আমরা কোনও না কোনও খাবারের দোকানের সামনে। দোকানগুলোর নাম সব ইংরেজিতে। বাংলায় কোনওটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এর কারণও আছে মনে হয়। ইংরেজি নাম থাকলে অন্যরকম এক মাহাত্ম্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে বোধ হয়। সম্ভ্রান্ত, আভিজাত্য, পারিপাট্য ইত্যাদি গোছের একটা ভাবচেহারাও ফুটে ওঠে। এর সুবিধা আছে অনেক। দেড়-দু’গুণ দরে বেচাকেনা করা যায়, কেউ কিছু বলে না। একটা তুলনা করা যেতে পারে এই দরদামের।
হাটি কুমরুলের ‘ফুড ভিলেজ’-এ ১৪ই নভেম্বর সন্ধ্যায় নানরুটি আর বটিকাবাব খেয়ে দাম দিতে গিয়ে হিসাব কষলাম ঢাকার স্টার কাবাব হাউসের সঙ্গে। ফুড ভিলেজের ১০ টাকা দামের নানরুটি স্টার কাবারের ১০ টাকা দামের নানরুটির ঠিক অর্ধেক। অর্থাত্ এর দাম হতে পারে পাঁচ টাকা। একইভাবে ৩৫ টাকার যে বটিকাবাব, তার দাম স্টার কাবাবের তুলনায় হতে পারে ২৫ টাকা। এর বেশি নয়।
দূরপাল্লার বাসের যাত্রীরা অনেক কষ্ট করে, অনেক ভোগান্তিতে জেরবার হয়ে যাতায়াত করেন। নানা বিপদ-আপদের আশঙ্কা নিয়েও চলতে হয় তাদের। তারপর তাদের পকেট ওভাবে কাটতে সকলেরই কিছুটা মায়া-দয়া হওয়া উচিত। ফুড-মালিকদের হয়তো হবে না, কিন্তু সরকারের একটা উদযোগ নেয়া উচিত এ ক্ষেত্রে।
ফুড ভিলেজ-এর কথায় অনেকের মতো আমারও মনে পড়ে সুমিষ্ট নারীকণ্ঠের ঘোষণা—অমুক বাস এখনই ছেড়ে যাচ্ছে, অমুক বাসের যাত্রীরা এখনই বাসে উঠুন... ইত্যাদি। সেদিন কৌতূহল জাগে ওই সুমিষ্ট কণ্ঠের নারীকে দেখার। কিন্তু কাউন্টারে বসে কর্মরত যিনি ওই সব ঘোষণা করছেন—দেখলাম, তিনি কোনও নারী নন—নূরানি চেহারার এক মুসল্লি যুবক। মুখভরা দাড়ি, মাথায় কারুকাজ করা টুপি, পরনে নকশা করা পাঞ্জাবি। কাউন্টার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন—তখন ভাবলাম।
হাসিমুখে এগিয়ে এলেন তিনি, একটু খুঁড়িয়ে হাঁটেন দেখলাম। কথায়-কথায় জানতে চাইলাম তাঁর কণ্ঠের রহস্য। কারণ এমনিতে তাঁর কণ্ঠ স্বাভাবিক, পুরুষালি। বললেন, মাইকে কথা বলার সময় আমার কণ্ঠ অমন শোনা যায়। তবে এমনিতে কণ্ঠ ঠিক আছে, স্বাভাবিক আছে।
তার কথা অবশ্য আমার আশপাশে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কেউ বিশ্বাস করলেন না। বললেন, না—উনি ইচ্ছা করেই কণ্ঠ অমন করে কথা বলেন। নারীকণ্ঠের মতো শোনালে আকর্ষণ জাগবে—এমন ভাবনা থেকেই এসব করেন তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানলাম ওই ঘোষণাকারীর নাম মোহাম্মদ আবদুল বাতেন। আমার সঙ্গে ছিলেন তখন আমার হাটি কুমরুল অভিযানের অগ্রনায়ক ইসরাইল হোসেন বাবু। তিনি সিরাজগঞ্জের দৈনিক যমুনা প্রবাহের সহকারী সম্পাদক, ঢাকার দৈনিক মানবজমিনের সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি। সলঙ্গা থানা প্রেসক্লাবের সভাপতি কোরবান আলি এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী গোলাম মকসুদ। মকসুদের ব্যবসা মাছের। তিনি মত্স্য আড়তদার হিসেবে পরিচিত। তবে আরও এক বিশেষ পরিচয় আছে তাঁর। তিনি বাংলা সাহিত্যের একদা সর্বাধিক জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের নাতি। মকসুদের বয়স ৩০ বছর। তাঁর পিতার নাম হবিবর রহমান।
এর আগে বসেছিলাম ফুড ভিলেজ-এর অদূরে ফুড গারডেন-এর দোতলায় একটি বড় টেবিল ঘিরে।
(এরপর ৮-এর পৃষ্ঠায়)সেখানে ছিলেন মকসুদের বড় ভাই গোলাম আমবিয়া। তার বয়স ৪০ বছর। ছোটখাটো চাকরি করেন, একটি দোকানও আছে তাঁর। আরও ছিলেন শহীদুল ইসলাম। এ লেখার শুরুতে বলেছি তাঁর কথা। তিনি নজিবর রহমান একাডেমির প্রকাশনা সচিব। ছিলেন এসএম আনিসুর রহমান, তিনি রায়গঞ্জের বেগম নূরুন্নাহার তর্কবাগীশ ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এম ফিল করছেন মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের ওপর। বিষয় ‘নজিবর রহমান ও তার রচনাশৈলী’। আর ছিলেন দীপক কুমার কর। মাওলানা তর্কবাগীশ গবেষণা কেন্দ্রের সভাপতি। সাহিত্য সাময়িকী ‘চেতনা’র সহকারী সম্পাদক।
আমার কাছে ‘চেতনা’র যে সংখ্যাটি আছে, তাতে দীপক কুমার কর, শহীদুল ইসলাম ও এসএম আনিসুর রহমানের লেখা আছে। তিনজনই কবিতা লিখেছেন। দীপক কুমার কর লিখেছেন—
“নির্যাতিতের জমেছে পাওনা পাহাড়
সুদে আসলে এর হিসাব আদায়ে
ভাঙতে হবে এ সমাজ আবার,
তাই বড় বেশি প্রয়োজন আর একজন নজরুল।
মানুষের জন্য, মানুষের বাস উপযোগী
পৃথিবীর জন্য চাই আর একজন রবীন্দ্রনাথ।”
(‘বড় বেশি প্রয়োজন’)
শহীদুল ইসলাম লিখেছেন—
“তবু মন বলে, মাঝে মাঝে চিত্ত ওঠে জেগে
ভাষাহীন মুখে উচ্চারিত হয়
চির নতুনের আহ্বান—
রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া
দেবো রে পরাণ ঢালি’
সব পুরাতন, সকল আঁধার করবো লয়
আমাদের হবে জয়, সত্যের হবে জয়।”
(‘রবির কিরণে হাসি ছড়াইয়া’)
এসএম আনিসুর রহমান লিখেছেন—
“তোমার চেতনা আজও যুদ্ধ করে—
শহরে নগরে গ্রামে লাঞ্ছিত বঞ্চিতদের পাশে
মসজিদ মন্দির আর অবরুদ্ধ কারাগার থেকে
মুক্তির সীমান্তে।...”
(‘চিরবিদ্রোহী’)
মহাসড়কের পাশে যেখানে হাটি কুমরুল ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, তার উল্টো দিক থেকে পশ্চিমে পাকা সড়ক চলে গেছে গাঁয়ের ভেতরে। যেতে-যেতে হাটি কুমরুল গাঁ যেখানে গৈগেরাম হয়ে উঠেছে, সেখানে বসতবাড়ি মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্নের। এখানেই চির নিদ্রায় শায়িত তিনি।
ফুড গারডেন-এ কফির কাপ সামনে নিয়ে আমরা কথা বলি সাহিত্যরত্নকে নিয়ে। জহির রায়হানের চলচ্চিত্র এবং বিটিভি’র সিরিজ নাটকের কারণে ‘আনোয়ারা’র লেখক হিসেবে সমধিক পরিচিত তিনি। এ উপন্যাসই প্রথম উপন্যাস তাঁর। প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে। প্রকাশের পরপরই ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পায় ‘আনোয়ারা’। এ প্রিয়তা ষাট দশক পর্যন্ত প্রায় অক্ষুণ্ন ছিল। তবে পঞ্চাশ-ষাট দশকে সাহিত্যরত্নের অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে ‘গরীবের মেয়ে’ (১৯২৩)-র পাঠকপ্রিয়তাই লক্ষ্য করেছি বেশি। তাঁর অন্যান্য উপন্যাস ‘চাঁদতারা বা হাসান গঙ্গা বাহমণি’ (১৯১৭), ‘পরিণাম’ (১৯১৮), ‘মেহেরউন্নিসা’ (১৯২৩), ‘প্রেমের সমাধি’ ও ‘দুনিয়া আর চাই না’ (১৯২৪)। ‘মেহেরউন্নিসা’ পড়ার সুযোগ হয় নি, কিন্তু অন্যান্য উপন্যাস পড়েছিলাম স্কুলজীবনেই। না পড়ে উপায় ছিল না। গ্রীষ্মের ছুটিতে গাঁয়ের বাড়ি দেলদুয়ার, মামার বাড়ি মীরের বেতকা, দাদীর বাড়ি পাছ চারান, দাদীর চাচার বাড়ি ইছাপুর, দাদীর বোনের বাড়ি বড় বাঁশলিয়া বা খালার বাড়ি মঙ্গলহোড়, যেখানেই গেছি কারও না কারও বাড়ির আলমারি-ট্রাঙ্কে পেয়েছি সাহিত্যরত্নের ‘আনোয়ারা’, ‘গরীবের মেয়ে’, ‘চাঁদতারা বা হাসান গঙ্গা বাহমণি’, ‘পরিণাম’, ‘প্রেমের সমাধি’, ‘দুনিয়া আর চাই না’—সেই সঙ্গে মোহাম্মদ কোরবান আলীর ‘মনোয়ারা’ (১৯২৫), আবদুল ফাত্তাহ কোরেশীর ‘সালেহা’ (১৯২৬), মোজাম্মেল হকের ‘জোহরা’, মোহাম্মদ ইদরিস আলীর ‘প্রেমের পথে’, ডা. লুত্ফুর রহমানের ‘প্রীতি উপহার’—এমন আরও অনেক পাঠকপ্রিয় উপন্যাস। সেকালে বিয়েতে সেরা উপহার ছিল এমনি সব উপন্যাস। (চলবে)


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


