Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ৩ পৌষ ১৪১৬, ২৯ জিলহজ ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

জয়যাত্রা আমার আনন্দ, বেদনা আর মুক্তিযুদ্ধ

তৌকীর আহমেদ
এখনো পর্যন্ত এদেশে যতগুলো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মিত হয়েছে, তার মধ্যে বিশেষ একটি স্থানে জয়যাত্রাকে স্থান দিতে হবে। কেননা, এ ছবির গল্প, উপস্থাপনা আর আধুনিক নির্মাণশৈলী জয়যাত্রাকে এনে দিয়েছে বোদ্ধাদের ব্যাপক প্রশংসা। তার চেয়েও বড় কথা, ছবিটির নির্মাতা তৌকীর আহমেদ এখনো পর্যন্ত এদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবির নির্মাতা, যিনি যুদ্ধের সময় ছিলেন শিশু। অর্থাত্ মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি, অথচ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে ছবি নির্মাণ করা নির্দেশক তৌকীরই প্রথম। তার ধারণা ছিল তরুণ প্রজন্মের একজন নির্মাতা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি নির্মাণ করেছেন, এই প্রজন্মের তরুণরা সিনেমা হলে ভিড় করে ছবিটি দেখবেন। কিন্তু তা হয়নি। তৌকীরের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ছবিটি টিভিতে দেখে সবাই প্রশংসা করেছেন সত্যি, তবে সিনেমা হলে গিয়ে অনেকেই দেখেননি ছবিটি। যে কারণে ছবিতে লগ্নিকৃত অর্থের জোগান দিতে তাকে বিক্রি করে দিতে হয়েছে তার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়া আর্কিটেকচার ফার্মটি। সুতরাং জয়যাত্রা নির্মাণে তিনি যে আনন্দ পেয়েছিলেন, তেমনি বেদনায় আচ্ছন্ন হয়েছেন ছবিটি মুক্তির পর। তবে এত কিছুর পরও শিশু তৌকীরের রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ভয়াবহ অনেক স্মৃতি। জয়যাত্রা ছবিটিকে তাই তিনি উল্লেখ করেন তার মুক্তিযুদ্ধ হিসেবে। আমার দেশ সাহিত্য সাময়িকী পাতায় তৌকীর নিজেই কলম ধরেছেন জয়যাত্রা আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা বলতে—
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর। এ বয়সী একজন শিশুর স্মৃতিতে যুদ্ধজয়ের গাথা বা যুদ্ধের ভয়াবহতা খুব বেশি মনে থাকার কথা নয়। কেননা, বোঝার মতো বয়স যেমন এটা নয়, তেমনি এ বয়সী শিশুদের সব ধরনের ভয়াবহতা থেকে মুক্ত রাখে বাবার আদর আর মায়ের আঁচল। আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সেই ব্যতিক্রমই হয়েছে। যুদ্ধের সময় এমন এক পরিবেশ পরিস্থিতির মধ্যে আমি ছিলাম, যা স্মৃতিতে অম্লান। সেই কারণেই পরিণত বয়সে এই প্রজন্মের একজন তরুণ হয়েও আমি প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করি মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে। জয়যাত্রা নামের সেই ছবিটি সর্ব মহলের প্রশংসা অর্জন করেছে সত্যি, তবে ব্যবসায়িকভাবে আমি সফল হতে পারিনি।
আমার জন্ম ১৯৬৬ সালে। সেই হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর। সাধারণত এ বয়সের স্মৃতি মনে থাকার কথা নয়। তারপরও খুব ছোটবেলার অনেক স্মৃতি মনে থাকে, যদি সেটা ভয়াবহ, আতঙ্কিত বা অতি সুখের কোনো স্মৃতি হয়। হয়তো এ কারণেই আমার কাছে এখনো যুদ্ধ দিনের সেসব স্মৃতি অম্লান হয়ে আছে। অনেকেই জানেন না যে আমার পিতার চাকরির কারণে যুদ্ধের সময় আমাকে পাকিস্তানেই থাকতে হয়েছে। আমার বাবা লে. কর্নেল কফিলউদ্দিন আহমেদ ছিলেন পাকিস্তান আর্মির ডাক্তার। যুদ্ধের সময় বাবার চাকরির কারণে আমাদের রাখা হয় কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। আর কনসেনট্রেশন ক্যাম্প কী রকম, তা কিছুটা অনুভব করা যায় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত কোনো ছবি দেখলে। আমাদের পাঠকদের বোঝার জন্য সহজে বলা যায়, আমরা বন্দি ছিলাম একটি ক্যাম্পে। কাঁটাতারের বেড়া, একটা রুম আর সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে আমাদের থাকতে হতো। আমার গোটা পরিবারই সেখানে ছিল। আমি, বাবা-মা, বোন, আমার মামা সবাই ছোট্ট একটি ঘরে থাকতাম। মজার বিষয় হলো, দুই-এক মাস পরপর আমাদের ক্যাম্প বদল করে রাখা হতো। কখনো মান্ডি বাহাউদ্দিন ক্যাম্প, কখনো ডেরা ইসমাইল খাঁ দুর্গ কিংবা কখনো মংলা ক্যাম্পে। এ সময়ই আমার লেখাপড়ার জীবন শুরু হয়। আমার স্পষ্ট মনে আছে, কাঁটাতারে ঘেরা একটি মাঠে গাছের ছায়ার নিচে আমার মতো কয়েক শিশুকে নিয়ে ক্লাস করাতেন আর্মির শিক্ষকরা। যুদ্ধের ভয়াবহতা আর গভীরতা যত বাড়ছে, ততই আমাদের সুযোগ-সুবিধা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। এরই মাঝে আমার মায়ের সব গহনা শেষ। অর্থাত্ গহনা বিক্রি করে চলতে হচ্ছিল আমাদের। সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দিয়ে বাধ্য করা হয় আমার মায়ের গহনা বিক্রি করতে। পাকিস্তান আর্মিই এই গহনাগুলো নামমাত্র মূল্যে কিনে নিয়েছিল কয়েক দফায়।
এক সময় দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু আমাদের বন্দিদশা রয়েই গেল। স্বাধীন দেশে মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে সবাই যখন ছুটছে, আমরা তখনো বন্দি। দীর্ঘ প্রায় দুই বছর আমাদের থাকতে হয়েছে এই বন্দিদশায়। যুদ্ধের সময়কার ভয়াবহতা এক রকম ছিল, আর যুদ্ধের শেষে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই ভয়াবহ আতঙ্ক আরো বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ আমরা বন্দি। দেশ স্বাধীন। এখন আমাদের কেউ যদি মেরে ফেলে আক্রোশের বশবর্তী হয়ে, তাহলে আমাদের কিছুই করার নেই। আর মেরে ফেলাটাই ছিল স্বাভাবিক। যে কারণে যখনই ক্যাম্পের সামনে কোনো আর্মিকে আসতে দেখেছি, তখই আতঙ্কিত হয়েছি। এই বোধহয় জীবনের শেষ ক্ষণ। আমার স্পষ্ট মনে আছে, আর্মি আসতে দেখলেই মা আমাকে জড়িয়ে নিত বুকে। আর বাবা চলে যেতেন মায়ের সামনে। প্রায় দুই বছর এই ভাবে কেটেছে। প্রতিটি ক্ষণ প্রতিটি মুহূর্ত কেটেছে এক ধরনের আতঙ্ক নিয়ে। আর মৃত্যুভয় যে কী রকম ভয়াবহ হতে পারে, সেটা কেবল মৃত্যু পথযাত্রীরাই বুঝতে পারে। যেহেতু আমরা সবাই একটি ছোট ঘরে বন্দি ছিলাম, সেহেতু সব ধরনের আলোচনায় আমার সামনে হতো। যে কারণে শিশু বয়সেও আমার অনেক কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে বাবা-মা আর মামাকে। আর সেসব উত্তর আর আমার মায়ের মুখ আমাকে আতঙ্কিত করে তুলেছিল বেশি করে। যাই হোক, ১৯৭৩ সালে যখন বন্দিবিনিময় চুক্তি স্বাক্ষর হলো, তখন আমরা দেশে ফিরতে পারলাম। বন্দিদশা থেকে দুই বছর পর বেরিয়ে এলাম। কাঁটাতারের বাইরে গিয়ে স্বাধীনতা উপভোগ করলাম। বুঝতে পারলাম মুক্ত জীবন কত মধুর। অনুভব করলাম কেন মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিকামী হয়েছিল।
শিশু বয়স পার হয়ে কিশোর বয়স, তারপর যৌবন। কিন্তু কখনো ভুলতে পারিনি সেইসব দিনের কথা। একটা পর্যায়ে যখন ছবি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিলাম। তখনই ভাবলাম, আমার প্রথম ছবিটি হবে মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে। নির্মাণ করলাম জয়যাত্রা। এর আগে একটি কথা বলে রাখি। জয়যাত্রা নির্মাণের আগে আমার প্রায়ই মনে হতো যুদ্ধের সময় আমি যদি যুবক থাকতাম, তাহলে কি আমি যুদ্ধে যেতাম? অনেকেই তো যায়নি বা যেতে পারেনি। আমি কি যেতাম? প্রতিবারই মনে হয়েছে হ্যাঁ, আমি যেতাম। যুদ্ধ করতে পারিনি— এই দুঃখবোধটি আমাকে পীড়া দিত। কিন্তু জয়যাত্রা নির্মাণের পর সেই পীড়া কিছুটা কমেছে। কেননা আমার মনে হয়েছে, জয়যাত্রাই আমার মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীনতার পরের প্রজন্মের একজন হিসেবে এটাই আমার উপলব্ধি। আর একটা কথা বলে রাখি, যদি কখনো পর্যাপ্ত বাজেট আর সাপোর্ট পাই, তাহলে আমার জীবনের এই গল্পটি নিয়েই আমি নির্মাণ করবো মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি ছবি। জয়যাত্রা ব্যবসায়িকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আমার ধারণা ছিল, এই প্রজন্মের একটি ছেলে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে ছবি নির্মাণ করেছে হয়তো নতুন প্রজন্ম সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটি দেখবে। কিন্তু তা হয়নি। আমি সিনেমা হলের টিকিটের মুড়ি গুনে মাত্র ১৮ হাজার মুড়ি পেয়েছি। অর্থাত্ মাত্র ১৮ হাজার দর্শক সিনেমা হলে গিয়ে ছবিটি দেখেছেন। এই ব্যর্থতা কার? তবে টিভিতে ছবিটি প্রচার হওয়ার পর আমি অনেক প্রশংসা পেয়েছি।
বিশ্বের কোনো দেশেই এ ধারার ছবিগুলো সাধারণত ব্যবসায়িক সাফল্য পায় না। তারপরও আমি মনে করি জয়যাত্রা, মাটির ময়নার মতো ছবিগুলো একধরনের প্রতিবাদ। জয়যাত্রা ওই অর্থে বীরের গাথা নয়, তবে এটা ছিল ত্যাগের গল্প। আর এ ধরনের ত্যাগের গল্পের জন্য লগ্নিকারক পাওয়া যায় না। আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি নির্মাণের জন্য আমাদের কারিগরি অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে আমাদের মেধার সংকট। আমাদের মেধা সংকটের কারণেই কারিগরি সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে পারছি না। আগামীতে আমি একটি তথাকথিত বাণিজ্যিক ছবি নির্মাণ করব। সেই ছবিটি ব্যবসা করলে সেই অর্থ দিয়ে আমি আবারো ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি নির্মাণ করব। সবশেষে একটি কথা বলতেই হয়, জয়যাত্রা নির্মাণের জন্য আমি বরেণ্য ঔপন্যাসিক নির্মাতা আমজাদ হোসেনের কাছে কৃতজ্ঞ। তার অবেলায় অসময়ে উপন্যাসটি নিয়ে জয়যাত্রা নির্মাণে অনুমতি দেয়ার জন্য। কৃতজ্ঞ মরহুম রফিকুল বারী চৌধুরীর কাছে। তার অসাধারণ ফটোগ্রাফি ছবিটিকে অনেক প্রশংসা এনে দিয়েছে।


 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?