Amardesh
আজঃ ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৭ ডিসেম্বর ২০০৯, ৩ পৌষ ১৪১৬, ২৯ জিলহজ ১৪৩০     আপডেট সময়ঃ রাত ২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 সাপ্তাহিকী
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 বিশেষ বিভাগ
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

মুক্তিযুদ্ধের ছবির প্রশ্নে সব সরকারই কৃপণ

চাষী নজরুল ইসলাম
বিশিষ্ট চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম নির্মিত প্রথম ছবি ‘ওরা ১১ জন’। সেটি স্বাধীন বাংলাদেশে নির্মিত প্রথম মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র। একইসঙ্গে স্বাধীন দেশের প্রথম চলচ্চিত্রও। ‘ওরা ১১ জন’ সম্পর্কে তিনি স্মৃতিচারণ করলেন এভাবে—একাত্তরে যুদ্ধের সময় ভেবেছিলাম যদি দেশ স্বাধীন হয়, কোনো ছবি করি, তাহলে যুদ্ধের ওপর ছবি বানাব। উত্তাল সেই সময়ে দেখেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কিত অনেক সাড়া জাগানো চলচ্চিত্র। রাশিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড—বহু দেশের ছবি। তখনই মনের নিভৃতে লালন শুরু করি, আমিও একদিন আমাদের দেশের মুক্তি সংগ্রামের, রক্তাক্ত যুদ্ধের ছবি তৈরি করব।
লাখো শহীদের চূড়ান্ত ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। স্বাধীনতার পর ভাবলাম, এবার যুদ্ধের ছবি বানানোর কাজে নেমে পড়তে হবে। সবার আগে টাকার প্রশ্ন। স্টার ফিল্ম কর্পোরেশন তখন এগিয়ে এলো। নতুন অভিযাত্রায় শরিক হলো তারা। ডিস্ট্রিবিউটর হিসেবে অর্থ যোগান দেয়ার অঙ্গীকার করল স্টার। কাজী আজিজ আহমদ আমাদের চলচ্চিত্র জগতের খ্যাতিমান একজন পরিচালক, গীতিকার। চিত্রনাট্যও করেছেন অনেক। মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মাণ প্রসঙ্গে তাঁর সঙ্গে আলাপ করলাম। তাঁকে বললাম, সম্মিলিত যুদ্ধ দেখাতে চাই। নাম ‘ওরা ১১ জন’ দিলে কেমন হয়? তিনি বললেন, এটা কেমন নাম হলো? তখন তাকে বলি, আমার পরিকল্পনা হচ্ছে ১১ জন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এই ছবিতে অভিনয় করবেন। ১১ দফা ছিল আমাদের মুক্তি সংগ্রামের অন্যতম অনুপ্রেরণা। ১১ দফা আন্দোলনের ছবি ভেসে উঠছে আমার মনে। আর, মুক্তিযুদ্ধের সময় ১১টি সেক্টরে বিভক্ত ছিল দেশ। এসব কথা শুনে তিনি বললেন, বেশ তো ভালো আইডিয়া। মুক্তিযোদ্ধা খসরুকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। খসরু অনেক সাহায্য-সহায়তা করেছেন। মাসুদ পারভেজও করেছেন। এলেন মুরাদ, নান্টু, ফিরোজ রশীদ। তারা সরাসরি মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। আমিও এমনটাই চাইছিলাম।
তারপর গল্পের লাইনআপ করা হলো। এই ছবির মুক্তিযোদ্ধারা আগে কেউ কখনও ছবিতে অভিনয় করেননি। আরও কাস্টিং করলাম রাজ্জাক, শাবানা, সুমিতা দেবী, খলিল, রাজু আহমেদ প্রমুখকে। ‘ওরা ১১ জন’ ছবির সম্পাদনা করেছেন বশীর হোসেন, ক্যামেরায় ছিলেন এমএ সামাদ। সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন খোন্দকার নূরুল আলম। ছবিটির কাজ দ্রুতই সুসম্পন্ন হলো। মুক্তি পেল ১৯৭২ সালের ১৩ কি ১৪ আগস্ট। ‘ওরা ১১ জন’ ছিল প্রচণ্ড ব্যবসাসফল ছবি। এই সাফল্য সংশ্লিষ্ট সবার।
এক প্রশ্নের উত্তরে চাষী নজরুল ইসলাম বলেন, ১৯৭৩ সালে আমি মুক্তিযুদ্ধের উপর আরেকটা ছবি নির্মাণ করি। সেটার নাম ‘সংগ্রাম’। স্বাধীনতা যুদ্ধে আমাদের সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও অবদান ছিল এই ছবির মূল বিষয়। প্রথমে চেয়েছিলাম শহীদ জিয়াউর রহমানের উপর ছবিটা করব। তাঁকে সেটা বলার পর তিনি বললেন, আমার যুদ্ধের গল্পটা তত রোমাঞ্চকর নয়। আপনি বরং এক কাজ করুন। খালেদ মোশাররফের গল্প নিয়ে ছবি নির্মাণ করুন। শহীদ জিয়ার পরামর্শ মোতাবেক আমি তাই করলাম। ‘সংগ্রাম’ চলচ্চিত্রের সর্বশেষ সিকোয়েন্স ছাড়া পুরোটাই খালেদ মোশাররফের ডায়রির ভিত্তিতে নির্মিত হয়েছে।
চাষী নজরুল আরও জানান, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমি মোট পাঁচটি ছবি তৈরি করেছি। বাকিগুলো হচ্ছে—হাঙর নদী গ্রেনেড, মেঘের পর মেঘ এবং ধ্রুবতারা। একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছি শহীদ সালাহউদ্দিন মমতাজ বীর উত্তমের উপর। দেড় ঘণ্টার এই প্রামাণ্যচিত্র শুটিং করা হয়েছিল কামালপুর বিওপিতে। এই প্রামাণ্যচিত্রের প্রযোজক ছিল ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্ট।
নতুন করে কি মুক্তিযুদ্ধের ছবি করতে চান? জানতে চাইলে চাষী নজরুল বলেন, মহান ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে একটা ছবি করার স্বপ্ন মনের মধ্যে লালন করি। কারণ, ৫২’র ভাষা আন্দোলনেই তো সূচনা। ওই লড়াই থেকে আন্দোলনের নানা পর্যায় পার হয়ে আমরা অর্জন করেছি স্বাধীনতা। আশা করছি, এই ছবিটির কাজ ২০১১ সাল নাগাদ শুরু করতে পারব। এই ছবি নির্মাণ অবশ্যই একটি কঠিন কাজ। তবে, একটা সুবিধেও আছে। একটু দূর থেকে দেখলে আসল সত্যিটা তুলে আনা যায়। নির্মোহ, নিরাসক্ত মূল্যায়ন করা সম্ভবপর হয়। এই সময়ে যদি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ছবি করি, কার পক্ষে বলব? একপক্ষ খুশি, তো অন্যপক্ষ নারাজ। এসব সমস্যার কারণেও মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মাণের ব্যাপারে অনেকে নিস্পৃহ, অনাগ্রহী। এ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ছবি যা হয়েছে, তা অবশ্যই অপ্রতুল। প্রত্যাশিত পরিমাণের ছবি বানানো হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমরা ভুলে বসে আছি। একাত্তরে লড়াই হয়েছিল শোষক ২২ পরিবারের বিরুদ্ধে। এখনকার বাংলাদেশে তো ভাই, ২২ হাজার পরিবার দাঁড়িয়ে গেছে। আমাদের মধ্যে সামগ্রিক বিচারে, দেশ প্রেমের ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক—সব ক্ষেত্রেই অবক্ষয়। সব ক্ষেত্রেই ধস নেমেছে। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের উপায় কি? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, একাত্তরের মতো আবার জাগতে হবে আমাদের। সত্যিকারের ঐকমত্য হতে হবে দেশের কল্যাণ ও সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের প্রশ্নে।
টিভি নাটকে, টেলিফিল্মে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি কেমন এসেছে, এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি? পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম বলেন, টিভিতে যা এসেছে, সেগুলো পূর্ণাঙ্গ ক্যানভাস তো নয়। খণ্ডিতভাবে এসব নাটক ও টেলিফিল্মে উপস্থাপন করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকে। নতুন প্রজন্মের বেশ কয়েকজন পরিচালক সম্ভাবনার পরিচয় দিয়েছেন এক্ষেত্রে। নতুন প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়তে হলে নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। সরকারের অবহেলা, ঔদাসীন্যও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ছবি নির্মাণের ব্যাপারে। সব সরকারই এ ব্যাপারে এক। মুখে বড় বড় কথা বলে তারা। মাত্র ৩০ লাখ টাকা অনুদানে কোনো ভালো ছবি তৈরি করা কি সম্ভব? এই বাজারে সেটা কোনোমতেই সম্ভব না। যিনিই সরকারে আসছেন, তিনিই দলীয়করণ করছেন। কার্পণ্য করছেন। স্বাধীনতা অর্জনের পর এতগুলো বছর পার হয়ে গেল। সরকারের উদ্যোগে, পৃষ্ঠপোষকতায় অন্তত ৫০টি ছবি নির্মিত হওয়া উচিত ছিল এই সময় পরিধিতে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি সত্যিই হতাশ। খুব শিগগিরই এই অবস্থার পরিবর্তন হবে বলেও মনে হয় না।
সাক্ষাত্কার : হাসান হাফিজ


 
সদস্য লগইন
ইউজার আইডি :
পাসওয়ার্ড :
সাইন আপ
পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ?