মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রামাণ্য চলচ্চিত্র
মির্জা তারেকুল কাদের
বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণ এবং পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্মমতা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরার গভীর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয় যুদ্ধের সময়ে। এর পটভূমি বর্ণনা করে পলাশ জুবায়ের সংবাদে লিখেছেন, “ঢাকায় পাকিস্তানী বাহিনী ২৫শে মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু করলে জহির রায়হান সপ্তাহ-খানেক পালিয়ে থেকে ভারতে চলে যাওয়ার উপায় খুঁজতে থাকেন। শেষে এর দিন দশেক পরে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে কোলকাতায় চলে যান সম্পূর্ণ একা। স্ত্রী সুচন্দা ও দুই শিশু পুত্রকে ঢাকায় রেখে যান। কোলকাতা পৌঁছেই তিনি পাকিস্তানী সৈন্যদের হত্যাযজ্ঞ নিয়ে ছবি তৈরির পরিকল্পনা করতে থাকেন। অবরুদ্ধ বাংলাদেশ থেকে অনেক শিল্পী ও কলাকুশলী কোলকাতায় চলে যেতে শুরু করেন। জহির রায়হান তাদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ সময় ঢাকায় অবস্থানরত স্ত্রী-পুত্রদের চিঠি দিয়ে কোলকাতায় চলে যেতে বলেন। মে মাসের মধ্যভাগে সুচন্দা তার দুই শিশুপুত্র নিয়ে অনেক কষ্টে কোলকাতায় পৌঁছেন। এদিকে কোলকাতার বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও চলচ্চিত্রকাররা মুক্তিযুদ্ধ এবং কোলকাতায় সমবেত বাংলাদেশের শিল্পীদের অর্থ সাহায্য দেয়ার জন্য ‘বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি’ গঠন করেন। এই সমিতি জহির রায়হানকে একটি ছবি নির্মাণের জন্য অর্থ সাহায্য করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। তার পরই জহির রায়হান কাজে নেমে পড়েন।” এই কীর্তিমান পরিচালক এর আগে ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে সামনে রেখে নির্মাণ করেছিলেন ‘জীবন থেকে নেয়া’। ছবিটি আমাদের অনুপ্রাণিত করেছে স্বাধিকার আন্দোলনে—স্বাধীনতা অর্জনে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের চলচ্চিত্রকারদের এক ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্র নির্মাণে প্রেরণা যুগিয়েছিল। স্বাধীনতা-পূর্বকালীন চলচ্চিত্রের বিষয়বস্তু থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এই নবতর ধারার সূচনা হয় যুদ্ধ চলাকালীন—জহির রায়হানের তৈরি কিংবা তার নেতৃত্বে তৈরি প্রামাণ্য ছবি থেকে।
সীমিত সুযোগ সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের সময় ইংরেজি ভাষায় নির্মিত হয় ৪টি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র। এগুলো হলো : ১. ‘Stop Genocide’ (পরিচালনায় জহির রায়হান), ২. Liberation Fighters (চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনা আলমগীর কবির), ৩. ‘A State is Born’ (চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনা জহির রায়হান) এবং ৪. ‘Innocent Millions’ (পরিচালনায় বাবুল চৌধুরী)। যুদ্ধকালীন নির্মিত এসব প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত এবং আলোচিত হয় জহির রায়হানের ‘Stop Genocide’ বা ‘হত্যাযজ্ঞ বন্ধ কর’। জুলাই মাসে এই ছবিটির কাজ শুরু হয়েছিল। জহির রায়হানের মেধা ও পরম যত্নে নির্মিত ‘Stop Genocide’ ছবিটির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে আলমগীর কবির তার ‘Short Film Movement In Bangladesh : Search For Free Cinema’. শীর্ষক নিবন্ধে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের বিপ্লবী সরকার তাদের অস্থায়ী সদর দফতর কলিকাতায় ‘মুখ ও মুখোশ’ ছবির পরিচালক আবদুল জব্বারকে প্রধান করে ‘চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগ’ প্রতিষ্ঠা করে। এই সময় অনেক চলচ্চিত্র কর্মীর মধ্যে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সুভাষ দত্ত, নারায়ণ ঘোষ ও জহির রায়হান। এদের মধ্যে প্রথমোক্ত ২ জনের কারোরই রাজনৈতিক কমিটমেন্ট এবং যুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মাণের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। তত্কালীন পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখার একজন কর্মী হিসেবে জহির রায়হানের ছিল রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র বিষয়ে তাঁর ধারণাও ছিল অস্পষ্ট। এই সময় কাকতালীয়ভাবে জহির রায়হান Andre Wajda’i ‘Ashes and Diamonds’ এবং কিউবার Wizard Santiago Alvarez-এর ছবিসহ কয়েকটি কিউবান ছবি দেখার সুযোগ লাভ করেন। এই ছবিগুলো তাঁর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। জহির রায়হান ছিলেন জন্মগতভাবে চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি কোন চিত্রনাট্য রচনা না করেই পুরো ছবিটি সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা নিতে পারতেন। দুঃখজনক বিষয় হলো, জহির রায়হান ওই সময় চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা দফতর কর্তৃক ছবি তৈরির জন্য আমন্ত্রিত হননি। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের গণহত্যা ও মানবাধিকার লংঘনের উপর ছবি নির্মাণের জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন—এমন কিছু ভারতীয় বন্ধুর সহায়তায় কিছু অর্থ (ভারতীয়) সংগ্রহ করতে সমর্থ হন। খুব সামান্য পরিমাণ মাল-মসলা নিয়ে জহির রায়হান মূলত সম্পাদনা টেবিলেই নির্মাণ করেন বিখ্যাত ছবি ‘Stop Genocide’। চলচ্চিত্রের সহিত তাঁর এই নিবিড়তা ও একাগ্রতা বিপ্লবী চলচ্চিত্রকার Roberto Rossellinni-i ‘Paisa’ ছবির নির্মাণ ইতিহাসের সঙ্গে তুলনীয় এবং তা বিখ্যাত সোভিয়েত বিপ্লবের উপর চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশের জন্য গৌরবের দাবিদার এই প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটির কিছু অংশ অলস চলচ্চিত্র কর্মী ও আওয়ামী লীগের ডানপন্থী একটি অংশকে বিক্ষুব্ধ করে। কিন্তু শিক্ষিত এবং অসাধারণ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রী (তত্কালীন) তাজউদ্দিন আহমদের হস্তক্ষেপে বিষয়টির সুরাহা হয়। ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ছবিটি দেখে মুগ্ধ হন এবং ভারতীয় চলচ্চিত্র বিভাগকে ছবিটি ক্রয় করে আন্তর্জাতিকভাবে বিতরণের নির্দেশ দেন।” বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা, পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়া শরণার্থী, হত্যাকাণ্ডের প্রতিরোধে স্বাধীনতা সংগ্রামী বীর জনতার ইস্পাতকঠিন প্রতিজ্ঞা ও প্রতিরোধের তেজোদীপ্ত স্পৃহার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ‘Stop Genocide’ অচিরেই সমগ্র বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে গড়ে ওঠে বিশ্ব জনমত।
রিশিত খান ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবিটির বর্ণনা করেছেন এভাবে : “এ ছবির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্ব ও তাত্পর্য অনেকখানিই ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে ফুটে উঠেছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে মানবাধিকার লংঘনের বিষয়টি। ছবির আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু বেশ নাটকীয় ও চমত্কার। ... জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং তার সহযোগীদের আচরণের সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এতে তুলে ধরেছেন কীর্তিমান নির্মাতা জহির রায়হান। ছবিটি শুরু হয় মহামতি লেনিনের কয়েকটি মহান বাণী দিয়ে। শুরুতে গ্রামীণ পটভূমিতে চিত্রায়িত এ ছবিতে দেখা যায়, একজন কৃষ্ণকায় কিশোরী ঢেঁকিতে ধান ভানছে। ছন্দের তালে তালে সে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চলেছে। গ্রাম্য সহজ সরল এই কিশোরীর কোন কষ্ট নেই, কোন যন্ত্রণা নেই, নেই কোন উদ্বেগ এবং উত্কণ্ঠাও। কিশোরীর মুখাবয়বে সরল হাসি। নিরুদ্বিগ্নভাবে সে ধান ভেনে চলেছে। দৃশ্য পরিবর্তন হতেই সহজ-সরল গ্রাম্য লাজুক সেই সরল কিশোরীর হাসির রেশ মিলিয়ে যায়—সাউন্ড ট্র্যাকে ঢেঁকির পাড়ের শব্দ কানে বাজে, দূরে কুকুরের ঘেউ ঘেউ। কাকের কা-কা ডাক, গুলি, ব্রাশফায়ার, বুলেটের শব্দ—গগনবিদারী আর্তচিত্কার ধ্বনি। মুহূর্তে অন্ধকারে চারদিক ছেয়ে যায়—পর্দায় ভেসে ওঠে নারকীয় দৃশ্য লাশ-লাশ আর লাশ। যেদিকে তাকানো যায় শুধু লাশ। সামনে-পেছনে, ডানে-বামে লাশের স্তূপ, গলিত লাশ, বুলেটবিদ্ধ লাশ। চোখ উপড়ানো, মাথার খুলি উপড়ানো লাশ এবং মগজ বেরিয়ে যাওয়া লাশ। সাউন্ড ট্র্যাকে কখনো ব্রাশফায়ারের প্রচণ্ড শব্দ আশপাশের বাতাসকে ভারি করে রাখে।... এর পরে আমরা দেখতে পাই, বার্লিনের একটি প্রাচীর গৃহ আস্তে আস্তে ধসে পড়ছে। পর্দায় আস্তে আস্তে ভেসে উঠে ‘স্টপ জেনোসাইড’ শব্দ দুটি। এ ছবির মধ্য দিয়ে জহির রায়হান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সামনে রেখে গোটা বিশ্বে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি চমত্কারভাবে নিয়ে এসেছেন। তিনটি দৃশ্যের মধ্য দিয়ে তিনি এই অসাধারণ কাজটি করেছেন।
তার প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতর। সেখানে চমত্কার-চমত্কার কিছু কথা বলা হচ্ছে। ঠিক এর পরের দৃশ্যেই দেখা যায় ভিয়েতনামে বি-৫২ বোমারু বিমানের ধ্বংসযজ্ঞ, মার্কিনী কর্তৃক নারী-পুরুষ-শিশুদের গণহত্যা। ছবিতে আমরা আরো দেখতে পাই, ভিয়েতনামের যুদ্ধ অপরাধে বিচারাধীন জনৈক মার্কিন লেফটেন্যান্টের পক্ষে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সাফাই গাওয়ার দৃশ্য। ... এ দৃশ্যটি দেখাতে দেখাতে তিনি ভিয়েতনাম থেকে কাট করে চলে আসেন আমাদের এই বাংলাদেশে। ’৭১ এর সেই বাংলাদেশ মুহূর্তে পর্দায় ভেসে ওঠে। পর্দায় ভেসে ওঠে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর, গ্রাম-জনপদ। ভেসে ওঠে লাশ। হত্যাযজ্ঞের সব দৃশ্য। দূরে কোথাও কাকের কা-কা ডাক শোনা যায়। এ সময় নেপথ্যে শোনা যায় জাতিসংঘের মানবাধিকার লংঘনের ঘোষণা—‘তবে কি কেবল পরিহাস’?” যাহোক, এ ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহের অবকাশ নেই যে, অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে এবং বহু ত্যাগের বিনিময়ে জহির রায়হান নির্মাণ করেছিলেন ‘স্টপ জেনোসাইড’। কারণ মুক্তিযুদ্ধকে তিনি দেখিয়েছিলেন পৃথিবীর সকল শোষিত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের দুর্জয় সংগ্রামের একটি অংশ হিসেবেই। আর বরাবরই তিনি ছিলেন শোষিতের পক্ষে। অসাধারণ নির্মাণ শৈলী, চলচ্চিত্রিক ভাষার সাবলীল ও অনবদ্য প্রয়োগে এবং সম্পাদনার মুন্সিয়ানায় এই ছবিটি এক সার্বজনীন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। একজন অনন্যসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে জহির রায়হান এই ছবিতে যে শিল্প সঞ্জাত মেধা, নির্মাণ নৈপুণ্য ও মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা এদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিরল। ইন্টারকাট-এর মাধ্যমে কয়েকটি সুপরিচিত স্থিরচিত্রের ব্যবহার ছিল তার বিস্ময়কর চলচ্চিত্র বোধের বড় পরিচয়। ছবিটি সম্পর্কে আলমগীর কবির বলেন, ‘হানাদার বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের জনসাধারণের হত্যাযজ্ঞে চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রমাণাদির স্বল্পতা সত্ত্বেও নির্ভেজাল শৈল্পিক দূরদর্শিতায় জহির রায়হান একটি দুর্লভ ও রাজনৈতিক মহিমান্বিত কর্ম সমাধান করেছেন।’
অপরদিকে চিন্ময় মুত্সুদ্দী বলেন, “বক্তব্যের বলিষ্ঠতায় এবং আঙ্গিকের উত্কর্ষে ্তুঝঃড়ঢ় এবহড়পরফব্থ সকলকে আলোড়িত করবে। যুদ্ধকালীন এই ছবি বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগঠনে বিরাট সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়। ‘স্টপ জেনোসাইড’ যত প্রত্যক্ষভাবে, যত পজিটিভলি মুক্তিযুদ্ধকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে, আজ পর্যন্ত আর কোন ছবি তা পারেনি।” স্বল্পদৈর্ঘ্যের আঙ্গিকে নির্মিত ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন জহির রায়হান ও আলমগীর কবির। ইংরেজি ধারাবিবরণী লেখেন এবং তাতে কণ্ঠ দেন আলমগীর কবির। চিত্রগ্রাহক ছিলেন অরুণ রায়। স্বাধীনতার পর জহির রায়হানের এই ছবিটি তাসখন্দসহ বিদেশের একাধিক চলচ্চিত্র উত্সবে পুরস্কৃত ও প্রশংসিত হয়েছে। প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ শুধু এদেশের মানুষের জন্য নয়—ছবিটি বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের চেতনার প্রতীক এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি অমূল্য ও বিশ্বস্ত দলিল। সংবাদে প্রকাশিত আহমেদ জুবায়েরের এক নিবন্ধের তথ্যানুযায়ী ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর সমস্ত ব্যয়ভার গ্রহণ করে কলকাতার বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি। প্রথম বাজেট ধরা হয়েছিল ৫০ হাজার টাকা। পরে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। স্বাধীনতার পর সহায়ক সমিতি নেগেটিভসহ ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবিটি বাংলাদেশ সরকারকে উপহার দেয়।
একাত্তর সালের জুন মাসে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার জহির রায়হানকে আরো ৩টি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি নির্মাণের দায়িত্ব অর্পণ করেন। এজন্য তাকে ৪০ হাজার ভারতীয় টাকা প্রদান করা হয়। তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একে একে নির্মিত হয় ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ (Liberation Fighters), ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ (A state is Born) ও ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’ (Innocent Millions) । যুদ্ধকালীন এসব ছবি বিভিন্ন দেশে প্রদর্শিত হয় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। আলমগীর কবির পরিচালিত ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয় মুক্তিযোদ্ধা নিয়োগ, তাদের প্রশিক্ষণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানের বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে। মুক্তিযোদ্ধাদের শপথ গ্রহণের দৃশ্য দেখানোর মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটির সূচনা।
‘এ স্টেট ইজ বর্ন’-এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয় স্বাধীনতা যুদ্ধের আদর্শকে এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের গঠন ও কর্মকাণ্ড বর্ণনা করে। ছবিটির চিত্রগ্রাহক ছিলেন অরুণ রায়। ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’-এর বিষয়বস্তু ছিল হানাদার বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের শিকার এবং শরণার্থী শিবিরে অপুষ্টিসহ রোগাক্রান্ত বাংলাদেশের হাজার হাজার শিশুর করুণ মৃত্যুদৃশ্য। সাধন রায় ছিলেন এই ছবির চিত্রগ্রাহক। এসব ছবির ধারাবর্ণনা লেখা, কণ্ঠ দেয়া এবং অন্যান্য বিষয়ে সর্বাত্মক ও সার্বক্ষণিক সহযোগিতা প্রদান করেন আলমগীর কবির। মুক্তিযুদ্ধের সময় শত প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করে জহির রায়হান, আলমগীর কবির এবং বাবুল চৌধুরী নির্মাণ করেন এসব ছবি।
‘স্টপ জেনোসাইড’সহ অপর ৩টি ছবির প্রত্যেকটির ব্যাপ্তি ১৯ মিনিট করে এবং এগুলো সাদা-কালো ফিল্মে চিত্রায়িত। স্বল্পদৈর্ঘ্যের এই ৪টি ছবি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে যেমনি মূল্যবান, তেমনি আমাদের জাতীয় জীবনে এবং দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্ব জনমত সংগঠিত করার ক্ষেত্রে এসব ছবির অবদান অবিস্মরণীয়। ৪টি প্রামাণ্য চিত্র ছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কয়েকটি সংবাদচিত্রও নির্মিত হয়। এর একটি হচ্ছে পাইগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী সীমান্তে মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাণ্ড ও সিকিমে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সামরিক অফিসারদের প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণের ওপর। অপর কয়েকটি হচ্ছে : ‘এ চাইল্ড উইল ক্রাই’, ‘সান রাইজ সান ডাউন’ প্রভৃতি।
সীমিত সুযোগ সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের সময় ইংরেজি ভাষায় নির্মিত হয় ৪টি প্রামাণ্য চলচ্চিত্র। এগুলো হলো : ১. ‘Stop Genocide’ (পরিচালনায় জহির রায়হান), ২. Liberation Fighters (চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনা আলমগীর কবির), ৩. ‘A State is Born’ (চিত্রনাট্য রচনা ও পরিচালনা জহির রায়হান) এবং ৪. ‘Innocent Millions’ (পরিচালনায় বাবুল চৌধুরী)। যুদ্ধকালীন নির্মিত এসব প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত এবং আলোচিত হয় জহির রায়হানের ‘Stop Genocide’ বা ‘হত্যাযজ্ঞ বন্ধ কর’। জুলাই মাসে এই ছবিটির কাজ শুরু হয়েছিল। জহির রায়হানের মেধা ও পরম যত্নে নির্মিত ‘Stop Genocide’ ছবিটির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে আলমগীর কবির তার ‘Short Film Movement In Bangladesh : Search For Free Cinema’. শীর্ষক নিবন্ধে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের বিপ্লবী সরকার তাদের অস্থায়ী সদর দফতর কলিকাতায় ‘মুখ ও মুখোশ’ ছবির পরিচালক আবদুল জব্বারকে প্রধান করে ‘চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা বিভাগ’ প্রতিষ্ঠা করে। এই সময় অনেক চলচ্চিত্র কর্মীর মধ্যে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন সুভাষ দত্ত, নারায়ণ ঘোষ ও জহির রায়হান। এদের মধ্যে প্রথমোক্ত ২ জনের কারোরই রাজনৈতিক কমিটমেন্ট এবং যুদ্ধভিত্তিক ছবি নির্মাণের কোন অভিজ্ঞতা ছিল না। তত্কালীন পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক শাখার একজন কর্মী হিসেবে জহির রায়হানের ছিল রাজনৈতিক অঙ্গীকার। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র বিষয়ে তাঁর ধারণাও ছিল অস্পষ্ট। এই সময় কাকতালীয়ভাবে জহির রায়হান Andre Wajda’i ‘Ashes and Diamonds’ এবং কিউবার Wizard Santiago Alvarez-এর ছবিসহ কয়েকটি কিউবান ছবি দেখার সুযোগ লাভ করেন। এই ছবিগুলো তাঁর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। জহির রায়হান ছিলেন জন্মগতভাবে চলচ্চিত্র নির্মাতা। তিনি কোন চিত্রনাট্য রচনা না করেই পুরো ছবিটি সম্বন্ধে স্বচ্ছ ধারণা নিতে পারতেন। দুঃখজনক বিষয় হলো, জহির রায়হান ওই সময় চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা দফতর কর্তৃক ছবি তৈরির জন্য আমন্ত্রিত হননি। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের গণহত্যা ও মানবাধিকার লংঘনের উপর ছবি নির্মাণের জন্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন—এমন কিছু ভারতীয় বন্ধুর সহায়তায় কিছু অর্থ (ভারতীয়) সংগ্রহ করতে সমর্থ হন। খুব সামান্য পরিমাণ মাল-মসলা নিয়ে জহির রায়হান মূলত সম্পাদনা টেবিলেই নির্মাণ করেন বিখ্যাত ছবি ‘Stop Genocide’। চলচ্চিত্রের সহিত তাঁর এই নিবিড়তা ও একাগ্রতা বিপ্লবী চলচ্চিত্রকার Roberto Rossellinni-i ‘Paisa’ ছবির নির্মাণ ইতিহাসের সঙ্গে তুলনীয় এবং তা বিখ্যাত সোভিয়েত বিপ্লবের উপর চলচ্চিত্র নির্মাতাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশের জন্য গৌরবের দাবিদার এই প্রথম স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটির কিছু অংশ অলস চলচ্চিত্র কর্মী ও আওয়ামী লীগের ডানপন্থী একটি অংশকে বিক্ষুব্ধ করে। কিন্তু শিক্ষিত এবং অসাধারণ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্রধানমন্ত্রী (তত্কালীন) তাজউদ্দিন আহমদের হস্তক্ষেপে বিষয়টির সুরাহা হয়। ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী ছবিটি দেখে মুগ্ধ হন এবং ভারতীয় চলচ্চিত্র বিভাগকে ছবিটি ক্রয় করে আন্তর্জাতিকভাবে বিতরণের নির্দেশ দেন।” বাংলাদেশের মাটিতে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা, পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়া শরণার্থী, হত্যাকাণ্ডের প্রতিরোধে স্বাধীনতা সংগ্রামী বীর জনতার ইস্পাতকঠিন প্রতিজ্ঞা ও প্রতিরোধের তেজোদীপ্ত স্পৃহার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ‘Stop Genocide’ অচিরেই সমগ্র বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে গড়ে ওঠে বিশ্ব জনমত।
রিশিত খান ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবিটির বর্ণনা করেছেন এভাবে : “এ ছবির মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্ব ও তাত্পর্য অনেকখানিই ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে ফুটে উঠেছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশে মানবাধিকার লংঘনের বিষয়টি। ছবির আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু বেশ নাটকীয় ও চমত্কার। ... জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং তার সহযোগীদের আচরণের সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বটি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এতে তুলে ধরেছেন কীর্তিমান নির্মাতা জহির রায়হান। ছবিটি শুরু হয় মহামতি লেনিনের কয়েকটি মহান বাণী দিয়ে। শুরুতে গ্রামীণ পটভূমিতে চিত্রায়িত এ ছবিতে দেখা যায়, একজন কৃষ্ণকায় কিশোরী ঢেঁকিতে ধান ভানছে। ছন্দের তালে তালে সে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চলেছে। গ্রাম্য সহজ সরল এই কিশোরীর কোন কষ্ট নেই, কোন যন্ত্রণা নেই, নেই কোন উদ্বেগ এবং উত্কণ্ঠাও। কিশোরীর মুখাবয়বে সরল হাসি। নিরুদ্বিগ্নভাবে সে ধান ভেনে চলেছে। দৃশ্য পরিবর্তন হতেই সহজ-সরল গ্রাম্য লাজুক সেই সরল কিশোরীর হাসির রেশ মিলিয়ে যায়—সাউন্ড ট্র্যাকে ঢেঁকির পাড়ের শব্দ কানে বাজে, দূরে কুকুরের ঘেউ ঘেউ। কাকের কা-কা ডাক, গুলি, ব্রাশফায়ার, বুলেটের শব্দ—গগনবিদারী আর্তচিত্কার ধ্বনি। মুহূর্তে অন্ধকারে চারদিক ছেয়ে যায়—পর্দায় ভেসে ওঠে নারকীয় দৃশ্য লাশ-লাশ আর লাশ। যেদিকে তাকানো যায় শুধু লাশ। সামনে-পেছনে, ডানে-বামে লাশের স্তূপ, গলিত লাশ, বুলেটবিদ্ধ লাশ। চোখ উপড়ানো, মাথার খুলি উপড়ানো লাশ এবং মগজ বেরিয়ে যাওয়া লাশ। সাউন্ড ট্র্যাকে কখনো ব্রাশফায়ারের প্রচণ্ড শব্দ আশপাশের বাতাসকে ভারি করে রাখে।... এর পরে আমরা দেখতে পাই, বার্লিনের একটি প্রাচীর গৃহ আস্তে আস্তে ধসে পড়ছে। পর্দায় আস্তে আস্তে ভেসে উঠে ‘স্টপ জেনোসাইড’ শব্দ দুটি। এ ছবির মধ্য দিয়ে জহির রায়হান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সামনে রেখে গোটা বিশ্বে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি চমত্কারভাবে নিয়ে এসেছেন। তিনটি দৃশ্যের মধ্য দিয়ে তিনি এই অসাধারণ কাজটি করেছেন।
তার প্রথম দৃশ্যে দেখা যায় নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতর। সেখানে চমত্কার-চমত্কার কিছু কথা বলা হচ্ছে। ঠিক এর পরের দৃশ্যেই দেখা যায় ভিয়েতনামে বি-৫২ বোমারু বিমানের ধ্বংসযজ্ঞ, মার্কিনী কর্তৃক নারী-পুরুষ-শিশুদের গণহত্যা। ছবিতে আমরা আরো দেখতে পাই, ভিয়েতনামের যুদ্ধ অপরাধে বিচারাধীন জনৈক মার্কিন লেফটেন্যান্টের পক্ষে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সাফাই গাওয়ার দৃশ্য। ... এ দৃশ্যটি দেখাতে দেখাতে তিনি ভিয়েতনাম থেকে কাট করে চলে আসেন আমাদের এই বাংলাদেশে। ’৭১ এর সেই বাংলাদেশ মুহূর্তে পর্দায় ভেসে ওঠে। পর্দায় ভেসে ওঠে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর, গ্রাম-জনপদ। ভেসে ওঠে লাশ। হত্যাযজ্ঞের সব দৃশ্য। দূরে কোথাও কাকের কা-কা ডাক শোনা যায়। এ সময় নেপথ্যে শোনা যায় জাতিসংঘের মানবাধিকার লংঘনের ঘোষণা—‘তবে কি কেবল পরিহাস’?” যাহোক, এ ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহের অবকাশ নেই যে, অত্যন্ত প্রতিকূল অবস্থার মধ্য দিয়ে এবং বহু ত্যাগের বিনিময়ে জহির রায়হান নির্মাণ করেছিলেন ‘স্টপ জেনোসাইড’। কারণ মুক্তিযুদ্ধকে তিনি দেখিয়েছিলেন পৃথিবীর সকল শোষিত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের দুর্জয় সংগ্রামের একটি অংশ হিসেবেই। আর বরাবরই তিনি ছিলেন শোষিতের পক্ষে। অসাধারণ নির্মাণ শৈলী, চলচ্চিত্রিক ভাষার সাবলীল ও অনবদ্য প্রয়োগে এবং সম্পাদনার মুন্সিয়ানায় এই ছবিটি এক সার্বজনীন এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আবেদন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। একজন অনন্যসাধারণ চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে জহির রায়হান এই ছবিতে যে শিল্প সঞ্জাত মেধা, নির্মাণ নৈপুণ্য ও মননশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তা এদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে বিরল। ইন্টারকাট-এর মাধ্যমে কয়েকটি সুপরিচিত স্থিরচিত্রের ব্যবহার ছিল তার বিস্ময়কর চলচ্চিত্র বোধের বড় পরিচয়। ছবিটি সম্পর্কে আলমগীর কবির বলেন, ‘হানাদার বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশের জনসাধারণের হত্যাযজ্ঞে চলচ্চিত্র বিষয়ক প্রমাণাদির স্বল্পতা সত্ত্বেও নির্ভেজাল শৈল্পিক দূরদর্শিতায় জহির রায়হান একটি দুর্লভ ও রাজনৈতিক মহিমান্বিত কর্ম সমাধান করেছেন।’
অপরদিকে চিন্ময় মুত্সুদ্দী বলেন, “বক্তব্যের বলিষ্ঠতায় এবং আঙ্গিকের উত্কর্ষে ্তুঝঃড়ঢ় এবহড়পরফব্থ সকলকে আলোড়িত করবে। যুদ্ধকালীন এই ছবি বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগঠনে বিরাট সহায়ক শক্তিতে পরিণত হয়। ‘স্টপ জেনোসাইড’ যত প্রত্যক্ষভাবে, যত পজিটিভলি মুক্তিযুদ্ধকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে, আজ পর্যন্ত আর কোন ছবি তা পারেনি।” স্বল্পদৈর্ঘ্যের আঙ্গিকে নির্মিত ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন জহির রায়হান ও আলমগীর কবির। ইংরেজি ধারাবিবরণী লেখেন এবং তাতে কণ্ঠ দেন আলমগীর কবির। চিত্রগ্রাহক ছিলেন অরুণ রায়। স্বাধীনতার পর জহির রায়হানের এই ছবিটি তাসখন্দসহ বিদেশের একাধিক চলচ্চিত্র উত্সবে পুরস্কৃত ও প্রশংসিত হয়েছে। প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ শুধু এদেশের মানুষের জন্য নয়—ছবিটি বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের চেতনার প্রতীক এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি অমূল্য ও বিশ্বস্ত দলিল। সংবাদে প্রকাশিত আহমেদ জুবায়েরের এক নিবন্ধের তথ্যানুযায়ী ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর সমস্ত ব্যয়ভার গ্রহণ করে কলকাতার বাংলাদেশ সহায়ক সমিতি। প্রথম বাজেট ধরা হয়েছিল ৫০ হাজার টাকা। পরে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়। স্বাধীনতার পর সহায়ক সমিতি নেগেটিভসহ ‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবিটি বাংলাদেশ সরকারকে উপহার দেয়।
একাত্তর সালের জুন মাসে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার জহির রায়হানকে আরো ৩টি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি নির্মাণের দায়িত্ব অর্পণ করেন। এজন্য তাকে ৪০ হাজার ভারতীয় টাকা প্রদান করা হয়। তার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একে একে নির্মিত হয় ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ (Liberation Fighters), ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ (A state is Born) ও ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’ (Innocent Millions) । যুদ্ধকালীন এসব ছবি বিভিন্ন দেশে প্রদর্শিত হয় এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গড়ে তুলতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। আলমগীর কবির পরিচালিত ‘লিবারেশন ফাইটার্স’ প্রামাণ্য চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয় মুক্তিযোদ্ধা নিয়োগ, তাদের প্রশিক্ষণ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানের বাহিনীর সম্মুখযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে। মুক্তিযোদ্ধাদের শপথ গ্রহণের দৃশ্য দেখানোর মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রটির সূচনা।
‘এ স্টেট ইজ বর্ন’-এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয় স্বাধীনতা যুদ্ধের আদর্শকে এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের গঠন ও কর্মকাণ্ড বর্ণনা করে। ছবিটির চিত্রগ্রাহক ছিলেন অরুণ রায়। ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’-এর বিষয়বস্তু ছিল হানাদার বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের শিকার এবং শরণার্থী শিবিরে অপুষ্টিসহ রোগাক্রান্ত বাংলাদেশের হাজার হাজার শিশুর করুণ মৃত্যুদৃশ্য। সাধন রায় ছিলেন এই ছবির চিত্রগ্রাহক। এসব ছবির ধারাবর্ণনা লেখা, কণ্ঠ দেয়া এবং অন্যান্য বিষয়ে সর্বাত্মক ও সার্বক্ষণিক সহযোগিতা প্রদান করেন আলমগীর কবির। মুক্তিযুদ্ধের সময় শত প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করে জহির রায়হান, আলমগীর কবির এবং বাবুল চৌধুরী নির্মাণ করেন এসব ছবি।
‘স্টপ জেনোসাইড’সহ অপর ৩টি ছবির প্রত্যেকটির ব্যাপ্তি ১৯ মিনিট করে এবং এগুলো সাদা-কালো ফিল্মে চিত্রায়িত। স্বল্পদৈর্ঘ্যের এই ৪টি ছবি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে যেমনি মূল্যবান, তেমনি আমাদের জাতীয় জীবনে এবং দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য সংযোজন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বিশ্ব জনমত সংগঠিত করার ক্ষেত্রে এসব ছবির অবদান অবিস্মরণীয়। ৪টি প্রামাণ্য চিত্র ছাড়া স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় কয়েকটি সংবাদচিত্রও নির্মিত হয়। এর একটি হচ্ছে পাইগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী সীমান্তে মুক্তিযুদ্ধের কর্মকাণ্ড ও সিকিমে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সামরিক অফিসারদের প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণের ওপর। অপর কয়েকটি হচ্ছে : ‘এ চাইল্ড উইল ক্রাই’, ‘সান রাইজ সান ডাউন’ প্রভৃতি।


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


