মুক্তিযুদ্ধের ছবি : নির্মাণ, ব্যর্থতা ও সম্ভাবনা
হাসান শান্তনু
স্বাধীনতা লাভের আটত্রিশ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের উপর আটত্রিশটি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মিত হয়নি। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, চিত্রকলায় বার বার উঠে এলেও শিল্পের আরেক শাখা সিনেমায় মুক্তিযুদ্ধ অনেকটাই উপেক্ষিত থেকে গেছে। রাষ্ট্রের অসহযোগিতা, অর্থের অভাব, অভিজ্ঞ নির্মাতা ও চলচ্চিত্র মুক্তিযোদ্ধা পরিষদ নেতাদের এগিয়ে না আসা, কলুষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সিনেমা শিল্পে নীতিমালা না থাকাকেই এজন্য মোটা দাগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে ভোটের রাজনীতি; পত্রিকার পাতা, টিভি চ্যানেলের পর্দা, মঞ্চে গলাবাজি একাত্তরে বিজয় লাভের পর থেকেই সমানতালে চলে আসছে। অথচ এ পর্যন্ত স্বল্পদৈর্ঘ্য, প্রামাণ্যচিত্র, পূর্ণদৈর্ঘ্য মিলিয়ে নির্মিত সিনেমার সংখ্যাটা আটত্রিশের বেশি হলেও সরকারি অনুদানে নির্মিত হয়েছে বড়জোর দশটি। বাকিগুলো ব্যক্তিগত উদ্যোগ, টাকায় নির্মিত হয়েছে। অনুদান দিতে, এমনকি ব্যক্তি উদ্যোগে নির্মাণের পথটুকু সহজ করে দিতে সরকারি অনীহা, আমলাতান্ত্রিক বাড়াবাড়ি এখন মর্মান্তিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশের টিভি চ্যানেল প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছে। অথচ দেশের একমাত্র সরকারি টিভি চ্যানেল বিটিভি তা করেনি, বা পারেনি। ১৯৯৩ সালে শিশু একাডেমী স্বল্পদৈর্ঘ্যের আঙ্গিকে মুক্তিযুদ্ধনির্ভর শিশুতোষ সিনেমা নির্মাণ শুরু করে। আট কি নয়টির মতো সিনেমা নির্মাণের পর সেই উদ্যোগও থেমে আছে। বিদেশি টিভি চ্যানেল ছাড়াও কয়েকজন বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকারের নির্মিত সিনেমা, প্রামাণ্যচিত্র সরকারের কেউ, ফিল্ম আর্কাইভ এখনও পর্যন্ত সংগ্রহ করেনি। সংগ্রহের কোনো উদ্যোগও তাদের নেই।
দেশে নির্মিত সিনেমাগুলো উপস্থাপনা, মেকিং, অভিনয় দুর্বলতা, টেকনিক, পারফরম্যান্সের বিচারে বোদ্ধাদের সমালোচনার বাইরে নয়। এসব সিনেমার মধ্যে একটাও নেই, যা তাদের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধের দলিল হয়ে থাকতে পারে। একাত্তরে আশি লাখ শরণার্থীর দুর্দশা, মানবিক সমস্যার উপর একটাও চলচ্চিত্র নেই। মুক্তিযুদ্ধের এ রকম অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা যায়, যেদিকে নির্মাতাদের চোখ পড়েনি। যুদ্ধে নারীর বীরের ভূমিকা ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ (নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম, নির্মাণকাল ’৯৭) ছাড়া আর কোনোটাতেই উঠে আসেনি। ‘বাঘা বাঙালি’ (আনন্দ), ‘রক্তাক্ত বাংলা’ (মমতাজ আলী), ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ (সুভাষ দত্ত)সহ আরও কয়েকটি সিনেমায় নারীর ভূমিকা দেখাতে গিয়ে ধর্ষণ, সুড়সুড়ি জাগানিয়া দৃশ্যই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এসব সিনেমা দেখে দর্শকের মনে হতে পারে, একাত্তরে কেবল ধর্ষিত হওয়া ছাড়া নারীর আর কোনো ভূমিকা ছিল না। ‘ফ্রম হিয়ার টু ইটোরনিটি’, ‘দ্য গানস অব নাভারন’-এর মতো পৃথিবী কাঁপানো যুদ্ধভিত্তিক সিনেমায় ধর্ষণের দৃশ্য নেই। বোদ্ধাদের মতে, যৌন সুড়সুড়িকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থনৈতিক ফায়দা লোটার এ আইডিয়া নির্মাতারা ভারত থেকে আমদানি করেন। আর তাতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা শিল্পটাই কেবল বিতর্কিতই হয়নি, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ, নারীদের অবমাননা করা হয়েছে ঘৃণিত কায়দায়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর ’৭২ সালে হিন্দি ভাষায় ভারতীয় চলচ্চিত্রকার আই এস জোহরের নির্মিত ‘জয় বাংলাদেশ’ সিনেমাটি নিতান্তই যৌন দৃশ্যনির্ভর। এতে কবরী সারোয়ারও অভিনয় করেন। বিতর্কিত এ ছবি বাংলাদেশের অনুরোধে ভারত সরকার মুক্তি পাওয়ার বছরই নিষিদ্ধ করে। তবে বাজারি মনোভাব থেকে নির্মাণ থেমে থাকেনি। ভারতকে অশ্লীলতার অভিযোগ জানালেও দেশে নির্মিত যৌনতানির্ভর সিনেমার ব্যাপারে সরকারের আপত্তির কথা জানা যায় না।
মির্জা তারেকুল কাদেরের ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প’ বই থেকে জানা যায়, ‘বাঘা বাঙালি’তে ধারণকৃত নাচের দৃশ্য নিম্ন রুচির হওয়ার কারণে সেন্সর বোর্ড সেগুলো কেটে দিতে চায়। সিনেমার প্রযোজক ছিলেন শেখ মুজিব সরকারের এক মন্ত্রীর নিকটাত্মীয়। ওই মন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে সেন্সর বোর্ড তখন তা পারেনি। অন্যদিকে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার কারণে মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকার কথা অনেক নারীই প্রকাশ করতে পারেননি, বা করেননি। নির্মাতাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় তা নেই। সে সময়ে কোনো নারীও সিনেমা নির্মাণে এগিয়ে আসেননি। তাই তাদের ত্যাগের বিষয়টি সেভাবে আসেনি। তবে রাবেয়া খাতুন, সেলিনা হোসেনের মতো কথা সাহিত্যিকদের গল্প, উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের নারীর ত্যাগের বিষয়টি উঠে এলেও সুষ্ঠু পরিবেশ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এগুলোকে অবলম্বন করে সিনেমা বানাতে দক্ষ নির্মাতারা এগিয়ে আসেননি বলে অনেকেরই অভিমত। কয়েকটি সিনেমা কেবল আর্মস, কামান, গোলাবারুদ, ভারতের ট্রেনিংদানের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেও কয়েকটি সিনেমা নির্মিত হয়। শেখ মুজিবের ভারত বান্ধব সরকারকে খুশি করা এবং ওই সরকারের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে সমর্থনের নামে নির্মিত সিনেমার মধ্যে রয়েছে আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (৭৩), সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। তবে বেশ কয়েকটি সিনেমা একাত্তরের ইতিহাস ধরে রেখেছে, পরবর্তী প্রজন্মকে জানাচ্ছে রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাসের কথা, বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছে রক্তাক্ত গৌরবগাথা। পৃথিবীর অন্য দেশের শক্তিশালী সিনেমার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পুরস্কারও ছিনিয়ে এনেছে। এসব সিনেমা সৃজনশীলতা, মৌলিকত্ব, নতুনত্বের বিচারে কুড়িয়েছে প্রচুর প্রশংসা।মুক্তিযুদ্ধকে ভিত্তি করে এ পর্যন্ত নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য, স্বল্পদৈর্ঘ্য, প্রামাণ্য সিনেমার সংখ্যা ঠিক কত, তথ্যটা ফিল্ম আর্কাইভ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নেই। এফডিসিতেও আলাদা করে এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নেই। জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নির্মিত হয় চারটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা। এগুলো হলো জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’, ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’, আলমগীর কবিরের ‘লিবারেশন ফাইটার্স’, বাবুল চৌধুরীর ‘ইননোসেন্ট মিলিয়নস’। দুঃখজনক হলেও সত্য পাকিস্তানিদের ধ্বংসযজ্ঞ সমর্থন করে সে সময় বিদেশি নির্মাতার দ্বারা ‘বিট্রেয়াল’ এবং ‘স্লটার হাউস’ নামের দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমাও নির্মিত হয়। একাত্তরের আগে নির্মিত জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’, ফখরুল আলমের ‘জয় বাংলা’, আলমগীর কবিরের ‘রূপালী নদীতে’ মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকাল, পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের নানা দিক চিত্রিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর ’৭২ সালে প্রথম পূর্ণর্দৈঘ্য সিনেমা ‘ওরা এগারজন’ নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। এরপর নির্মিত হয় ‘আমার জন্মভূমি’ (আলমগীর কুমকুম, ’৭৩), ‘আবার তোরা মানুষ হ’ (খান আতাউর রহমান, ’৭৩), ‘সংগ্রাম’ (চাষী নজরুল ইসলাম, ’৭৪), ‘আলোর মিছিল’ (নারায়ণ ঘোষ মিতা, ’৭৪), বাংলার ২৪ বছর (মোহাম্মদ আলী, ’৭৪), ‘কার হাসি কে হাসে’ (মোহাম্মদ আলী, ’৭৪), মেঘের অনেক রং (হারুনুর রশীদ, ’৭৬), ‘বাঁধনহারা (এ জে মিন্টু, ’৮১), ‘কলমীলতা’ (শহীদুল হক খান, ’৮১), চিত্কার (মতিন রহমান, ’৮২), ‘আগুনের পরশমণি’ (হুমায়ূন আহমেদ, ’৯৪), ‘এখনো অনেক রাত’ (খান আতাউর রহমান, ’৯৭)। এছাড়া হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’, তানভীর মোকাম্মেলের ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’, ‘রাবেয়া’, তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’, তৌকীর আহমেদের ‘জয়যাত্রা’, চাষী নজরুল ইসলামের ‘ধ্রুবতারা’ এবং ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ‘কখনও মেঘ কখনও বৃষ্টি’ ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দর্শকনন্দিত সিনেমা।
আশির দশকের মাঝামাঝি সিনেমাপ্রেমী, দক্ষ কয়েকজন তরুণ মিলে গড়ে তোলেন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন। এ সংসদ মুক্তিযুদ্ধনির্ভর স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণের পাশাপাশি উত্সব আয়োজনের মাধ্যমে দর্শক সৃষ্টিতে এগিয়ে আসে। তবে তাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা মেলেনি। চলচ্চিত্র মুক্তিযোদ্ধা পরিষদও তেমনভাবে সমর্থন করেনি এ সংসদকে। সংসদের সঙ্গে জড়িতদের নির্মিত এ পর্যন্ত সিনেমার সংখ্যা পঁচিশটিরও বেশি। যার মধ্যে মোরশেদুল ইসলামের ‘আগামী’, তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’, ‘একাত্তরের স্মৃতি’, ‘নদীর নাম মধুমতি’, হাবীবুল ইসলাম আবীরের ‘বখাটে’, মোস্তফা কামালের ‘প্রত্যাবর্তন’, খান আখতার হোসেনের ‘দুরন্ত’, দিলদার হোসেনের একজন ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘ঢাকা টোকাই’, ‘একটি প্রজন্ম’, আবু সাঈদের ‘অন্তর্যাত্রা’, এনায়েত করিম বাবুলের ‘পতাকা’, সুমন আহমেদের ‘নীল দংশন’, নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘একাত্তরের যীশু’, সাদুল্লাহ আল মাসুদের ‘কালো চিল’, তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’, জামিউর রহমানের ‘ছাড়পত্র’, শাহজাহান আলীর ‘ওরা আসছে’, কাওসার চৌধুরীর ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’ উল্লেখযোগ্য। অবশ্য ’৭৩, ’৭৪ সালেও ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘বাংলাদেশ ডায়েরি’, ‘টুয়ার্ডস গোল্ডেন বাংলাদেশ’, ‘প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’ নামে চারটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে খ্যাতিমান জাপানি চলচ্চিত্রকার বানিয়েছেন ‘বাংলাদেশ স্টোরি’। তবে বিদেশে প্রথম সিনেমা নির্মিত হয় ভারতে। কলকাতার উমা প্রাসাদ মৈত্রের ‘জয় বাংলা’, মুম্বাইয়ের আইএস জোহরের ‘জয় বাংলাদেশ’, সুকদেবের ‘নাইন মানথ্স টু ফ্রিডম’, ঋত্বিক ঘটকের ‘দুর্বার গতি পদ্মা’, গীতা মেহতার ‘দুরন্ত পদ্মা দুর্গা প্রসাদ’, মিলিয়ে প্রায় সাত/আটটি সিনেমা সেখানে নির্মিত হয়েছে। এসব সিনেমা সংগ্রহ করার উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কেউ নেয়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ফিল্ম আর্কাইভও এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয়, নির্বিকার।
১৯৯৩ সালে শিশু একাডেমী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিশুদের জন্য স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণ শুরু করে। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে কয়েক বছরের মধ্যেই একাডেমীর উদ্যোগে সিনেমা নির্মাণের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অভিজ্ঞদের বক্তব্য মতে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা হওয়ায় অন্যান্য প্রকল্পের মতো এর সিনেমা নির্মাণ প্রকল্পটিও রাজনৈতিক রোষানলের শিকার হয়। একাডেমীর নির্মিত সিনেমাগুলো হচ্ছে—হারুনুর রশীদের ‘আমরা তোমাদের ভুলব না,’ জাঁনেসার ওসমানের ‘দুর্জয়’, রফিকুল বারী চৌধুরীর ‘বাংলা মায়ের দামাল ছেলে’, বাদল রহমানের ‘ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ’, দেবাশীষ সরকারের ‘শোভনদের একাত্তর’, মোরশেদুল ইসলামের ‘শরত্ ৭১’, মান্নান হীরার ‘একাত্তরের রংপেন্সিল’, কবরী সারোয়ারের ‘একাত্তরের মিছিল।’
সমালোচক, বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে নির্মিত কোনো সিনেমাই আমেরিকার গৃহযুদ্ধভিত্তিক ডি ডব্লিউ গ্রিফিথের ‘বার্থ অব এ নেশন’, জার বাহিনীর গণহত্যাভিত্তিক আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন,’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধভিত্তিক ভিত্তোরিও ডি সিকার ‘টু উইমেন’ প্রমুখের মতো মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের বর্বরতা, নৃশংসতা দর্শকের সামনে উপস্থাপন করতে পারেনি। যথার্থ শৈল্পিক চেতনার, আবেদনময় সিনেমা নির্মাণে এদেশের চলচ্চিত্রকাররা ব্যর্থ হয়েছেন। এফডিসিনির্ভর নির্মাতাদের দিয়ে ব্যবসা ছাড়া যে ভালো কিছু হয় না, সেটা প্রমাণিত সত্য। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপসহ অন্য দেশের চলচ্চিত্রকাররা ফ্যাসিবাদের নির্মমতা সেলুলয়েডে তুলে ধরতে এখনও অক্লান্ত শ্রম দিচ্ছেন, এত বছর পরও তারা সিনেমা নির্মাণ করছেন। অথচ আমাদের দেশের নির্মাতারা নানা কারণে এক্ষেত্রে নির্বিকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের দাবিদার ক্ষমতাসীন সরকারও নীরব।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মার্কিন একটি টিভি চ্যানেলের জন্য গীতা মেহেতা নির্মাণ করেছেন ‘ডেটলাইন বাংলাদেশ’। গ্রানাডা টিভির জন্য ব্রিটিশ চলচ্চিত্রকার ভানিয়া ফিউলির ‘খালেদ’স ওয়ার’, ব্রিটিশ টিভি চ্যানেল ফোরের প্রযোজনায় ‘ক্রাইম ফাইল’ ডকুমেন্টারি ফিল্ম নির্মিত হয়েছে। এছাড়া বিবিসি, এনবিসি, ফরাসি টিভি, সিবিএস এবং অন্যান্য বিদেশি টিভি চ্যানেল ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানিয়েছে। কিন্তু বিটিভি চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছে বলে জানা যায় না। বোদ্ধারা বলছেন, বছরে বিটিভি মুক্তিযুদ্ধের উপর কমপক্ষে চার-পাঁচটা ছবি নিজস্ব প্রযোজনায় বানালেও সেই টাকা স্পন্সরদের কাছ থেকে তুলতে পারবে। দেশে যত চ্যানেলই থাক, বিটিভির যে বিস্তার, তাতে দর্শকের দিক থেকে অন্য কোনো চ্যানেলই বিটিভির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পারবে না। তাই স্পন্সররাও টাকা দিতেন। তবে স্বাধীনতার পর থেকেই এ ‘জাদুর বাক্সের’ এক শ্রেণীর কর্মকর্তা সরকারের দালালি, টাকা-পয়সা চুরির কাজে ব্যস্ত। সেজন্যই কোনো সিনেমা নির্মাণ, প্রযোজনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
প্রত্যাশা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে সিনেমা নির্মিত না হওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। অভিনেতা আলী যাকের একবার আলাপে বলেন—‘মুক্তিযুদ্ধের পর ধীরে ধীরে সিনেমা ব্যবসাটা আলু, পটল ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে। সেজন্যই মুক্তিযুদ্ধকে সেলুলয়েডে যথার্থভাবে চিত্রায়িত করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।’ তাছাড়া দর্শকের রুচিও বদলে গেছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমার ক্ষেত্রে তারা বলেন, ‘স্পেশাল টাইপের সিনেমা’ বা ‘আর্ট ফিল্ম।’ শিল্প ও বাণিজ্য পরস্পর বিরোধী হলেও সার্থক সিনেমার জন্য এ দুটি ক্ষেত্র পরস্পর সম্পূরক হওয়া প্রয়োজন। আর্ট ফিল্মকে চিহ্নিত করতে গিয়ে তারা বলে থাকেন—এগুলো বাণিজ্যিক ছবি নয়। তাই বাণিজ্যিক দিক থেকে এসব সিনেমায় ক্ষতির সম্ভাবনাই প্রবল হয়ে ওঠে। এসব কথা বিবেচনা করেও অনেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নন। তারা টাকা কামানোকেই বড় করে দেখেন। সেজন্যও সিনেমার সংখ্যা বাড়েনি। আবার অনেক দর্শকের মতে, আর্ট ফিল্মগুলো কঠিন, সহজে বোঝা যায় না। এদেশে খুব কম দর্শক বই, পত্রিকা পড়ে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট জেনে সিনেমা দেখতে যান। কাঠিন্যের বাইরে এসে সাধারণ দর্শকের কাছে সহজে উপভোগ্য করার ফর্মুলায় নির্মিত হয়েছে খুব কম সিনেমা। দর্শক টানতে পারেনি বলে ব্যবসায়িক দিক থেকে সেগুলো ফ্লপ হয়েছে। বাণিজ্যিক সিনেমার বেলায় যে পাবলিসিটি হয়, এ সিনেমার বেলায় এর সামান্যও হয় না। সে কারণেও ব্যবসা ভালো হয় না। যার জন্য মুক্তিভিত্তিক সিনেমা নির্মাণের জন্য প্রযোজক খুঁজে পান না নির্মাতারা।
আরেকটা বিষয়, মুক্তিযুদ্ধের উপর প্রথম নির্মিত ‘ওরা ১১ জন’ সিনেমাতে ব্যবহৃত বুলেট, গ্রেনেড ছিল রিয়েল। সিনেমার সঙ্গে জড়িত সবার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকায় তা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন এর নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম। নতুন প্রজন্মের অভিনেতা, অভিনেত্রী যারা মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেননি, তারা অভিনয়ে অনেক সময় তা ফুটিয়ে তুলতে পারেন না বলেও সিনেমা ফ্লপ হয়।
অন্যদিকে সারা পৃথিবীতে সিনেমা হলের ওপর ট্যাক্স নেই। ভারতে কেউ নতুন সিনেমা হল বা মেরামত করলে সেগুলোকে সরকার পাঁচ বছরের ট্যাক্স মওকুফ করে দেয়। ট্যাক্সও মাত্র শতকরা পনের বা বিশভাগ। কিন্তু বাংলাদেশে তা নেই। এখানে ট্যাক্স অনেক বেশি। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের অনেক সিনেমা হল। বিদেশে একটি শপিং কমপ্লেক্সে চার-পাঁচটা সিনেমা হল থাকে। অথচ এদেশে তা তো নেই-ই, (একটি বাদে) বরং সিনেমা হল ভেঙে শপিংমল নির্মিত হচ্ছে। সেজন্যও অনেক নির্মাতা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা বানাতে আগ্রহী নন বলে মনে করেন তারেক মাসুদ। তার মতে, ‘যে কোনো শিল্পের ক্ষেত্রে যেমন একটা নীতি থাকে, তেমনি সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও থাকে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে জাতীয় চলচ্চিত্র নীত
দেশে নির্মিত সিনেমাগুলো উপস্থাপনা, মেকিং, অভিনয় দুর্বলতা, টেকনিক, পারফরম্যান্সের বিচারে বোদ্ধাদের সমালোচনার বাইরে নয়। এসব সিনেমার মধ্যে একটাও নেই, যা তাদের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধের দলিল হয়ে থাকতে পারে। একাত্তরে আশি লাখ শরণার্থীর দুর্দশা, মানবিক সমস্যার উপর একটাও চলচ্চিত্র নেই। মুক্তিযুদ্ধের এ রকম অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা যায়, যেদিকে নির্মাতাদের চোখ পড়েনি। যুদ্ধে নারীর বীরের ভূমিকা ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’ (নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম, নির্মাণকাল ’৯৭) ছাড়া আর কোনোটাতেই উঠে আসেনি। ‘বাঘা বাঙালি’ (আনন্দ), ‘রক্তাক্ত বাংলা’ (মমতাজ আলী), ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ (সুভাষ দত্ত)সহ আরও কয়েকটি সিনেমায় নারীর ভূমিকা দেখাতে গিয়ে ধর্ষণ, সুড়সুড়ি জাগানিয়া দৃশ্যই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এসব সিনেমা দেখে দর্শকের মনে হতে পারে, একাত্তরে কেবল ধর্ষিত হওয়া ছাড়া নারীর আর কোনো ভূমিকা ছিল না। ‘ফ্রম হিয়ার টু ইটোরনিটি’, ‘দ্য গানস অব নাভারন’-এর মতো পৃথিবী কাঁপানো যুদ্ধভিত্তিক সিনেমায় ধর্ষণের দৃশ্য নেই। বোদ্ধাদের মতে, যৌন সুড়সুড়িকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থনৈতিক ফায়দা লোটার এ আইডিয়া নির্মাতারা ভারত থেকে আমদানি করেন। আর তাতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা শিল্পটাই কেবল বিতর্কিতই হয়নি, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ, নারীদের অবমাননা করা হয়েছে ঘৃণিত কায়দায়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর ’৭২ সালে হিন্দি ভাষায় ভারতীয় চলচ্চিত্রকার আই এস জোহরের নির্মিত ‘জয় বাংলাদেশ’ সিনেমাটি নিতান্তই যৌন দৃশ্যনির্ভর। এতে কবরী সারোয়ারও অভিনয় করেন। বিতর্কিত এ ছবি বাংলাদেশের অনুরোধে ভারত সরকার মুক্তি পাওয়ার বছরই নিষিদ্ধ করে। তবে বাজারি মনোভাব থেকে নির্মাণ থেমে থাকেনি। ভারতকে অশ্লীলতার অভিযোগ জানালেও দেশে নির্মিত যৌনতানির্ভর সিনেমার ব্যাপারে সরকারের আপত্তির কথা জানা যায় না।
মির্জা তারেকুল কাদেরের ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প’ বই থেকে জানা যায়, ‘বাঘা বাঙালি’তে ধারণকৃত নাচের দৃশ্য নিম্ন রুচির হওয়ার কারণে সেন্সর বোর্ড সেগুলো কেটে দিতে চায়। সিনেমার প্রযোজক ছিলেন শেখ মুজিব সরকারের এক মন্ত্রীর নিকটাত্মীয়। ওই মন্ত্রীর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে সেন্সর বোর্ড তখন তা পারেনি। অন্যদিকে প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার কারণে মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের ভূমিকার কথা অনেক নারীই প্রকাশ করতে পারেননি, বা করেননি। নির্মাতাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় তা নেই। সে সময়ে কোনো নারীও সিনেমা নির্মাণে এগিয়ে আসেননি। তাই তাদের ত্যাগের বিষয়টি সেভাবে আসেনি। তবে রাবেয়া খাতুন, সেলিনা হোসেনের মতো কথা সাহিত্যিকদের গল্প, উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের নারীর ত্যাগের বিষয়টি উঠে এলেও সুষ্ঠু পরিবেশ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এগুলোকে অবলম্বন করে সিনেমা বানাতে দক্ষ নির্মাতারা এগিয়ে আসেননি বলে অনেকেরই অভিমত। কয়েকটি সিনেমা কেবল আর্মস, কামান, গোলাবারুদ, ভারতের ট্রেনিংদানের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধকে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেও কয়েকটি সিনেমা নির্মিত হয়। শেখ মুজিবের ভারত বান্ধব সরকারকে খুশি করা এবং ওই সরকারের ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে সমর্থনের নামে নির্মিত সিনেমার মধ্যে রয়েছে আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’ (৭৩), সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। তবে বেশ কয়েকটি সিনেমা একাত্তরের ইতিহাস ধরে রেখেছে, পরবর্তী প্রজন্মকে জানাচ্ছে রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাসের কথা, বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছে রক্তাক্ত গৌরবগাথা। পৃথিবীর অন্য দেশের শক্তিশালী সিনেমার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পুরস্কারও ছিনিয়ে এনেছে। এসব সিনেমা সৃজনশীলতা, মৌলিকত্ব, নতুনত্বের বিচারে কুড়িয়েছে প্রচুর প্রশংসা।মুক্তিযুদ্ধকে ভিত্তি করে এ পর্যন্ত নির্মিত পূর্ণদৈর্ঘ্য, স্বল্পদৈর্ঘ্য, প্রামাণ্য সিনেমার সংখ্যা ঠিক কত, তথ্যটা ফিল্ম আর্কাইভ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নেই। এফডিসিতেও আলাদা করে এ সংক্রান্ত পরিসংখ্যান নেই। জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নির্মিত হয় চারটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা। এগুলো হলো জহির রায়হানের ‘স্টপ জেনোসাইড’, ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’, আলমগীর কবিরের ‘লিবারেশন ফাইটার্স’, বাবুল চৌধুরীর ‘ইননোসেন্ট মিলিয়নস’। দুঃখজনক হলেও সত্য পাকিস্তানিদের ধ্বংসযজ্ঞ সমর্থন করে সে সময় বিদেশি নির্মাতার দ্বারা ‘বিট্রেয়াল’ এবং ‘স্লটার হাউস’ নামের দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমাও নির্মিত হয়। একাত্তরের আগে নির্মিত জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’, ফখরুল আলমের ‘জয় বাংলা’, আলমগীর কবিরের ‘রূপালী নদীতে’ মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিকাল, পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের নানা দিক চিত্রিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর ’৭২ সালে প্রথম পূর্ণর্দৈঘ্য সিনেমা ‘ওরা এগারজন’ নির্মাণ করেন চাষী নজরুল ইসলাম। এরপর নির্মিত হয় ‘আমার জন্মভূমি’ (আলমগীর কুমকুম, ’৭৩), ‘আবার তোরা মানুষ হ’ (খান আতাউর রহমান, ’৭৩), ‘সংগ্রাম’ (চাষী নজরুল ইসলাম, ’৭৪), ‘আলোর মিছিল’ (নারায়ণ ঘোষ মিতা, ’৭৪), বাংলার ২৪ বছর (মোহাম্মদ আলী, ’৭৪), ‘কার হাসি কে হাসে’ (মোহাম্মদ আলী, ’৭৪), মেঘের অনেক রং (হারুনুর রশীদ, ’৭৬), ‘বাঁধনহারা (এ জে মিন্টু, ’৮১), ‘কলমীলতা’ (শহীদুল হক খান, ’৮১), চিত্কার (মতিন রহমান, ’৮২), ‘আগুনের পরশমণি’ (হুমায়ূন আহমেদ, ’৯৪), ‘এখনো অনেক রাত’ (খান আতাউর রহমান, ’৯৭)। এছাড়া হুমায়ূন আহমেদের ‘শ্যামল ছায়া’, তানভীর মোকাম্মেলের ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’, ‘রাবেয়া’, তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’, তৌকীর আহমেদের ‘জয়যাত্রা’, চাষী নজরুল ইসলামের ‘ধ্রুবতারা’ এবং ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ‘কখনও মেঘ কখনও বৃষ্টি’ ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দর্শকনন্দিত সিনেমা।
আশির দশকের মাঝামাঝি সিনেমাপ্রেমী, দক্ষ কয়েকজন তরুণ মিলে গড়ে তোলেন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন। এ সংসদ মুক্তিযুদ্ধনির্ভর স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণের পাশাপাশি উত্সব আয়োজনের মাধ্যমে দর্শক সৃষ্টিতে এগিয়ে আসে। তবে তাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা মেলেনি। চলচ্চিত্র মুক্তিযোদ্ধা পরিষদও তেমনভাবে সমর্থন করেনি এ সংসদকে। সংসদের সঙ্গে জড়িতদের নির্মিত এ পর্যন্ত সিনেমার সংখ্যা পঁচিশটিরও বেশি। যার মধ্যে মোরশেদুল ইসলামের ‘আগামী’, তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’, ‘একাত্তরের স্মৃতি’, ‘নদীর নাম মধুমতি’, হাবীবুল ইসলাম আবীরের ‘বখাটে’, মোস্তফা কামালের ‘প্রত্যাবর্তন’, খান আখতার হোসেনের ‘দুরন্ত’, দিলদার হোসেনের একজন ‘মুক্তিযোদ্ধা’, ‘ঢাকা টোকাই’, ‘একটি প্রজন্ম’, আবু সাঈদের ‘অন্তর্যাত্রা’, এনায়েত করিম বাবুলের ‘পতাকা’, সুমন আহমেদের ‘নীল দংশন’, নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘একাত্তরের যীশু’, সাদুল্লাহ আল মাসুদের ‘কালো চিল’, তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’, জামিউর রহমানের ‘ছাড়পত্র’, শাহজাহান আলীর ‘ওরা আসছে’, কাওসার চৌধুরীর ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’ উল্লেখযোগ্য। অবশ্য ’৭৩, ’৭৪ সালেও ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘বাংলাদেশ ডায়েরি’, ‘টুয়ার্ডস গোল্ডেন বাংলাদেশ’, ‘প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’ নামে চারটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে খ্যাতিমান জাপানি চলচ্চিত্রকার বানিয়েছেন ‘বাংলাদেশ স্টোরি’। তবে বিদেশে প্রথম সিনেমা নির্মিত হয় ভারতে। কলকাতার উমা প্রাসাদ মৈত্রের ‘জয় বাংলা’, মুম্বাইয়ের আইএস জোহরের ‘জয় বাংলাদেশ’, সুকদেবের ‘নাইন মানথ্স টু ফ্রিডম’, ঋত্বিক ঘটকের ‘দুর্বার গতি পদ্মা’, গীতা মেহতার ‘দুরন্ত পদ্মা দুর্গা প্রসাদ’, মিলিয়ে প্রায় সাত/আটটি সিনেমা সেখানে নির্মিত হয়েছে। এসব সিনেমা সংগ্রহ করার উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কেউ নেয়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা ফিল্ম আর্কাইভও এ বিষয়ে নিষ্ক্রিয়, নির্বিকার।
১৯৯৩ সালে শিশু একাডেমী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিশুদের জন্য স্বল্পদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণ শুরু করে। ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে কয়েক বছরের মধ্যেই একাডেমীর উদ্যোগে সিনেমা নির্মাণের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অভিজ্ঞদের বক্তব্য মতে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একাডেমীর প্রতিষ্ঠাতা হওয়ায় অন্যান্য প্রকল্পের মতো এর সিনেমা নির্মাণ প্রকল্পটিও রাজনৈতিক রোষানলের শিকার হয়। একাডেমীর নির্মিত সিনেমাগুলো হচ্ছে—হারুনুর রশীদের ‘আমরা তোমাদের ভুলব না,’ জাঁনেসার ওসমানের ‘দুর্জয়’, রফিকুল বারী চৌধুরীর ‘বাংলা মায়ের দামাল ছেলে’, বাদল রহমানের ‘ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ’, দেবাশীষ সরকারের ‘শোভনদের একাত্তর’, মোরশেদুল ইসলামের ‘শরত্ ৭১’, মান্নান হীরার ‘একাত্তরের রংপেন্সিল’, কবরী সারোয়ারের ‘একাত্তরের মিছিল।’
সমালোচক, বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে নির্মিত কোনো সিনেমাই আমেরিকার গৃহযুদ্ধভিত্তিক ডি ডব্লিউ গ্রিফিথের ‘বার্থ অব এ নেশন’, জার বাহিনীর গণহত্যাভিত্তিক আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটেলশিপ পটেমকিন,’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধভিত্তিক ভিত্তোরিও ডি সিকার ‘টু উইমেন’ প্রমুখের মতো মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের বর্বরতা, নৃশংসতা দর্শকের সামনে উপস্থাপন করতে পারেনি। যথার্থ শৈল্পিক চেতনার, আবেদনময় সিনেমা নির্মাণে এদেশের চলচ্চিত্রকাররা ব্যর্থ হয়েছেন। এফডিসিনির্ভর নির্মাতাদের দিয়ে ব্যবসা ছাড়া যে ভালো কিছু হয় না, সেটা প্রমাণিত সত্য। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপসহ অন্য দেশের চলচ্চিত্রকাররা ফ্যাসিবাদের নির্মমতা সেলুলয়েডে তুলে ধরতে এখনও অক্লান্ত শ্রম দিচ্ছেন, এত বছর পরও তারা সিনেমা নির্মাণ করছেন। অথচ আমাদের দেশের নির্মাতারা নানা কারণে এক্ষেত্রে নির্বিকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের দাবিদার ক্ষমতাসীন সরকারও নীরব।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মার্কিন একটি টিভি চ্যানেলের জন্য গীতা মেহেতা নির্মাণ করেছেন ‘ডেটলাইন বাংলাদেশ’। গ্রানাডা টিভির জন্য ব্রিটিশ চলচ্চিত্রকার ভানিয়া ফিউলির ‘খালেদ’স ওয়ার’, ব্রিটিশ টিভি চ্যানেল ফোরের প্রযোজনায় ‘ক্রাইম ফাইল’ ডকুমেন্টারি ফিল্ম নির্মিত হয়েছে। এছাড়া বিবিসি, এনবিসি, ফরাসি টিভি, সিবিএস এবং অন্যান্য বিদেশি টিভি চ্যানেল ডকুমেন্টারি ফিল্ম বানিয়েছে। কিন্তু বিটিভি চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছে বলে জানা যায় না। বোদ্ধারা বলছেন, বছরে বিটিভি মুক্তিযুদ্ধের উপর কমপক্ষে চার-পাঁচটা ছবি নিজস্ব প্রযোজনায় বানালেও সেই টাকা স্পন্সরদের কাছ থেকে তুলতে পারবে। দেশে যত চ্যানেলই থাক, বিটিভির যে বিস্তার, তাতে দর্শকের দিক থেকে অন্য কোনো চ্যানেলই বিটিভির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পারবে না। তাই স্পন্সররাও টাকা দিতেন। তবে স্বাধীনতার পর থেকেই এ ‘জাদুর বাক্সের’ এক শ্রেণীর কর্মকর্তা সরকারের দালালি, টাকা-পয়সা চুরির কাজে ব্যস্ত। সেজন্যই কোনো সিনেমা নির্মাণ, প্রযোজনা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
প্রত্যাশা অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে সিনেমা নির্মিত না হওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। অভিনেতা আলী যাকের একবার আলাপে বলেন—‘মুক্তিযুদ্ধের পর ধীরে ধীরে সিনেমা ব্যবসাটা আলু, পটল ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে। সেজন্যই মুক্তিযুদ্ধকে সেলুলয়েডে যথার্থভাবে চিত্রায়িত করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।’ তাছাড়া দর্শকের রুচিও বদলে গেছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমার ক্ষেত্রে তারা বলেন, ‘স্পেশাল টাইপের সিনেমা’ বা ‘আর্ট ফিল্ম।’ শিল্প ও বাণিজ্য পরস্পর বিরোধী হলেও সার্থক সিনেমার জন্য এ দুটি ক্ষেত্র পরস্পর সম্পূরক হওয়া প্রয়োজন। আর্ট ফিল্মকে চিহ্নিত করতে গিয়ে তারা বলে থাকেন—এগুলো বাণিজ্যিক ছবি নয়। তাই বাণিজ্যিক দিক থেকে এসব সিনেমায় ক্ষতির সম্ভাবনাই প্রবল হয়ে ওঠে। এসব কথা বিবেচনা করেও অনেকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমায় বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নন। তারা টাকা কামানোকেই বড় করে দেখেন। সেজন্যও সিনেমার সংখ্যা বাড়েনি। আবার অনেক দর্শকের মতে, আর্ট ফিল্মগুলো কঠিন, সহজে বোঝা যায় না। এদেশে খুব কম দর্শক বই, পত্রিকা পড়ে ইতিহাসের প্রেক্ষাপট জেনে সিনেমা দেখতে যান। কাঠিন্যের বাইরে এসে সাধারণ দর্শকের কাছে সহজে উপভোগ্য করার ফর্মুলায় নির্মিত হয়েছে খুব কম সিনেমা। দর্শক টানতে পারেনি বলে ব্যবসায়িক দিক থেকে সেগুলো ফ্লপ হয়েছে। বাণিজ্যিক সিনেমার বেলায় যে পাবলিসিটি হয়, এ সিনেমার বেলায় এর সামান্যও হয় না। সে কারণেও ব্যবসা ভালো হয় না। যার জন্য মুক্তিভিত্তিক সিনেমা নির্মাণের জন্য প্রযোজক খুঁজে পান না নির্মাতারা।
আরেকটা বিষয়, মুক্তিযুদ্ধের উপর প্রথম নির্মিত ‘ওরা ১১ জন’ সিনেমাতে ব্যবহৃত বুলেট, গ্রেনেড ছিল রিয়েল। সিনেমার সঙ্গে জড়িত সবার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকায় তা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন এর নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম। নতুন প্রজন্মের অভিনেতা, অভিনেত্রী যারা মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেননি, তারা অভিনয়ে অনেক সময় তা ফুটিয়ে তুলতে পারেন না বলেও সিনেমা ফ্লপ হয়।
অন্যদিকে সারা পৃথিবীতে সিনেমা হলের ওপর ট্যাক্স নেই। ভারতে কেউ নতুন সিনেমা হল বা মেরামত করলে সেগুলোকে সরকার পাঁচ বছরের ট্যাক্স মওকুফ করে দেয়। ট্যাক্সও মাত্র শতকরা পনের বা বিশভাগ। কিন্তু বাংলাদেশে তা নেই। এখানে ট্যাক্স অনেক বেশি। ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে দেশের অনেক সিনেমা হল। বিদেশে একটি শপিং কমপ্লেক্সে চার-পাঁচটা সিনেমা হল থাকে। অথচ এদেশে তা তো নেই-ই, (একটি বাদে) বরং সিনেমা হল ভেঙে শপিংমল নির্মিত হচ্ছে। সেজন্যও অনেক নির্মাতা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমা বানাতে আগ্রহী নন বলে মনে করেন তারেক মাসুদ। তার মতে, ‘যে কোনো শিল্পের ক্ষেত্রে যেমন একটা নীতি থাকে, তেমনি সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও থাকে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে জাতীয় চলচ্চিত্র নীত


সাধারণ বিভাগ
আবহাওয়া


