Amardesh
আজঃঢাকা, বুধবার ০৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ২৪ মাঘ ১৪১৯, ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা

কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন : দ্বিতীয় রায়

আলমগীর হোসেন
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছে। গতকাল বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের দ্বিতীয় ট্রাইবু্যুনাল এ রায় দেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য বিচারপতি মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক মো. শাহিনুর ইসলাম এ সময় উপস্থিত ছিলেন। ১৩২ পৃষ্ঠার রায়ের ৩৫ পৃষ্ঠা পড়ে শোনান তিন বিচারক। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার দ্বিতীয় ও জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতার বিরুদ্ধে করা মামলার প্রথম রায় এটি।
৬টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি অভিযোগে কাদের মোল্লাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড (প্রচলিত আইন অনুযায়ী ৩০ বছর) দেয়া হয়েছে। তিনটি অপরাধে তাকে ১৫ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হওয়ায় আলাদা করে এ সাজা তাকে ভোগ করতে হবে না। গণহত্যার একটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। অপরাধ প্রমাণের জন্য ঘটনাস্থলে অভিযুক্তের উপস্থিতি অপরিহার্য নয় বলেও রায়ে বলা হয়েছে। রায় শেষে প্রতিবাদ জানিয়ে আসামি কাদের মোল্লা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ঢাকায় ছিলাম না। বিচারকরা বিচারকে কলঙ্কিত করেছেন এবং সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করেছেন।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় উপস্থিত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আমরা সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড আশা করেছিলাম। আমাদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণের পর আপিলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও রায়ে হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে রায়ের প্রতিবাদে আজ আবার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করেছে জামায়াত। প্রায় তিন বছর আগে শুরু হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে এই প্রথম জামায়াতের কোনো শীর্ষ নেতার ব্যাপারে রায় ঘোষণা করা হলো। এর আগে দলটির বহিষ্কৃত নেতা মাওলানা আবুল কালাম আযাদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেছিলো ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল রায় ঘোষণার জন্য প্রথম ট্রাইব্যুনালে বসার ব্যবস্থা করা হয়। এর আগে কাদের মোল্লাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে হাজির করা হয়। রায় উপলক্ষে আইনজীবী, সাংবাদিক ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ এজলাসে উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১০টা ৪৩ মিনিটে তিন বিচারক এজলাসে প্রবেশ করেন। তিন বিচারক আসন গ্রহণের পরই কাঠগড়া থেকে দাঁড়িয়ে কাদের মোল্লা বলেন, মাননীয় আদালতের সামনে আমার কিছু বলার আছে। এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান তাকে বসতে বলেন। ট্রাইব্যুনাল বেশ কয়েকবার বলার পর তিনি বসে পড়েন। কাদের মোল্লা সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পরা ছিলেন। এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান উপস্থিত আইনজীবীসহ সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, ১৩২ পৃষ্ঠার রায়ের ৩৫ পৃষ্ঠার ১১১টি অনুচ্ছেদ এখানে ঘোষণা করা হবে। আমরা তিন বিচারক মিলে এ অংশ ঘোষণা করব। পরে তিন বিচারক রায় পড়ে শোনান। আদেশ সংক্রান্ত অংশ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ওবায়দুল হাসান।
তিন অভিযোগে ১৫ বছরের কারাদণ্ড : ট্রাইব্যুনালে আনা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে প্রথম অভিযোগ, তিনি একাত্তরের ৫ এপ্রিল মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র পল্লবকে গুলি করে হত্যার নির্দেশ দেন। দ্বিতীয় অভিযোগ, একাত্তরের ২৭ মার্চ তিনি সহযোগীদের নিয়ে কবি মেহেরুননিসা, তার মা এবং দুই ভাইকে মিরপুর ৬ নম্বর সেকশনের বাসায় গিয়ে হত্যা করেন। তৃতীয় অভিযোগ, ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ বিকালে সাংবাদিক খন্দকার আবু তালেবকে আরামবাগ থেকে কাদের মোল্লা ও তার সহযোগীরা জল্লাদখানা পাম্প হাউসে নিয়ে জবাই করে হত্যা করেন। এই তিন অভিযোগের ব্যাপারে কাদের মোল্লাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ডের আদেশ দেয়া হয়েছে।
এক অভিযোগ থেকে অব্যাহতি : জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে চতুর্থ অভিযোগ অনুসারে, ২৫ নভেম্বর কাদের মোল্লা ও ৬০-৭০ জন রাজাকার কেরানীগঞ্জ থানার ভাওয়াল খানবাড়ি ও ঘাটারচরে (শহীদনগর) শতাধিক নিরস্ত্র গ্রামবাসীকে হত্যা করেন। এ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তা থেকে কাদের মোল্লাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
দুই অভিযোগে যাবজ্জীবন : আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে পঞ্চম অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনা ও অবাঙালি রাজাকারদের সঙ্গে কাদের মোল্লা মিরপুরের আলোবদী গ্রামে হামলা চালান। ওই ঘটনায় ৩৪৪ জনের বেশি নিহত হন। ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৬ মার্চ কাদের মোল্লা, তার সহযোগী ও পাকিস্তানি সেনারা মিরপুরের ১২ নম্বর সেকশনে হযরত আলী লস্করের বাসায় যায়। কাদের মোল্লার নির্দেশে হযরত, তার স্ত্রী, দুই মেয়ে ও দুই বছরের এক ছেলেকে হত্যা করা হয়, ধর্ষণের শিকার হন এক মেয়ে। এই দুই অভিযোগে কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।
অন্যায় রায় হয়েছে—কাদের মোল্লা : গতকাল ট্রাইব্যুনালের রায় শেষে এজলাসের কাঠগড়া থেকে আবদুল কাদের মোল্লা আল্লাহ আকবর বলে দাঁড়িয়ে যান। তিনি বলেন, আমি এ রায় মানি না। এ রায় অন্যায় হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে সে সময় আমি ঢাকায় ছিলাম না। তিনি বলেন, বিচারপতিরা জল্লাদের মতো আমার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। তারা আমার সঙ্গে জল্লাদের মতো আচরণ করেছেন। আমি বিশ্বমানবতার কাছে বিচার দিচ্ছি। তিনি বলেন, আমি পবিত্র কোরআন হাতে নিয়ে বলছি, এ ঘটনার সঙ্গে আমি যুক্ত নই। আমি বিচারকদের বিরুদ্ধে কেয়ামতের দিন মামলা দায়ের করব, যখন তাদের মুখে কথা বলার কোনো শক্তি থাকবে না। এছাড়া যারা তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে অন্যায়ভাবে শাস্তি দিতে চাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার কথাও বলেন। এরপর পুলিশ তাকে ধরে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নিয়ে যায়।
রায়ের আরও তথ্য : রায়ে বলা হয়, মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সে সময়কার বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল সহযোগিতা করেছে। তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন কোনো সংগঠনের ভূমিকার ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল আইন নীরব।
রায়ে বলা হয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব মানুষ মুক্তিযুদ্ধ সমর্থন করে এবং এতে অংশ নেয়। তবে স্বল্প সংখ্যক বাঙালি ও বিহারী, অন্যান্য পাকিস্তানপন্থী, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল, যেমন জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ, মুসলিম লীগ, পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, কাউন্সিল মুসলিম লীগ, নেজামী ইসলামী পার্টি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় এবং তাদের সহযোগিতা করে। মহিউদ্দিন চৌধুরীর লেখা ‘সানসেট অ্যাট মিডডে’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ইসলামী ছাত্রসংঘের কর্মীদের ডাকা হতো আলবদর, জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজাম-ই ইসলামী দলের কর্মীদের বলা হতো আল শামস, উর্দুভাষী বিহারিরা পরিচিত ছিল আল মুজাহিদ নামে। জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য পাকিস্তানপন্থি দল বাঙালিদের হত্যার জন্য আধা-সামরিক বাহিনী গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।
রায়ে ২০১০ সালের ১ জুলাই দ্যা ইকোনমিস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী পূর্ব-পাকিস্তানের অনেক ইসলামপন্থি দলের সমর্থন লাভ করেছিল। এরমধ্যে জামায়াতও রয়েছে যারা এখনও বাংলাদেশের সর্ববৃহত্ ইসলামী রাজনৈতিক দল। যাদের ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের দ্বারা আল-বদর বাহিনী গঠিত হয়েছিল।
রায়ে বলা হয় ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ছাড়া সহযোগী বাহিনীর সদস্য, ব্যক্তি এবং ব্যক্তিবর্গের বিচারেরও বিধান রয়েছে। ১৯৭৩ সালের আইনের অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনাল একটি অভ্যন্তরীণ ট্রাইব্যুনাল যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করছে। রায়ে মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে, কিন্তু পাকিস্তান সরকার জনগণের ম্যান্ডেটের প্রতি কোনো সম্মান দেখায়নি। এরফলে এ অংশে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ দেয়া ঐতিহাসিক ভাষণে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ২৬ মার্চের প্রথম অংশে তিনি স্বাধীনতারও ঘোষণা দেন।
রায়ে আরও বলা হয়েছে, ডিফেন্স টিমের আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক যুক্তি দেখিয়েছেন, ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে মামলা দায়েরে দেরি হলেও বিচারে বাধা নেই, কিন্তু দেরির কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে। ট্রাইব্যুনালের মত হচ্ছে, মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে, গণহত্যার ক্ষেত্রে বিলম্ব বিচারের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এখনও চলছে।
রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন তৈরি করা হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার পরিবারের সদস্যদের দুঃখজনক হত্যাকাণ্ডের পর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আদেশও বাতিল ঘোষণা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা নানাভাবে পুনর্বাসিত হয়। তাদের কেউ কেউ ক্ষমতারও অংশীদার হন।
রায়ে বলা হয়েছে, দালাল আইন করা হয় ফৌজদারি অপরাধের বিচারের জন্য। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ, জেনোসাইড এসব অপরাধের বিচারের বিধান করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আবদুল কাদের মোল্লা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদউল্লাহ হল শাখা ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য ট্রেনিং নিয়েছেন তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
কাদের মোল্লার রায়ে আইনজীবী ও পরিবারের প্রতিক্রিয়া : রায় ঘোষণার সময় তার বড় মেয়ে আমাতুল্লাহ পারভীন ও ছেলে হাসান জামিল ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। রায়ের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে পারভীন বলেন, এ বিচার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশে। রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে সরকার জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে এ মিথ্যা মামলা করেছে। এ রায় আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। এছাড়া রায় শেষে উপস্থিত আসামিপক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার নাজিব মুমেন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে যাব। ন্যায়বিচার থেকে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের সিনিয়র কোনো আইনজীবী হরতালের কারণে আজ ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত না থাকায় আমরা এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি নই।
কাদের মোল্লার উপস্থিতিতে রায় : রায় ঘোষণার সময় জামায়াত নেতা কাদের মোল্লা ট্রাইবু্যুনালে উপস্থিত ছিলেন। পুলিশের মহাপরিদর্শক (কারা) আশরাফুল ইসলাম জানান, কাদের মোল্লা এত দিন গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে ছিলেন। সেখান থেকে গতকাল রাতে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়। ঢাকার কারাগার থেকে তাকে গতকাল সকাল পৌনে ১০টার দিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। রায় ঘোষণার পর তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নেয়া হয়।
কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা : সোমবার রাত থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো ট্রাইব্যুনাল এলাকা কর্ডন করে ফেলে। হরতালের দিনে গতকাল ভোর থেকে সাংবাদিক, আইনজীবী, মুক্তিযোদ্ধাসহ নানা শ্রেণী ও পেশার মানুষ ভিড় করতে থাকেন ট্রাইব্যুনাল এলাকায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কড়া নিরাপত্তার মধ্যদিয়ে বিচারকরা ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ করেন। পুলিশের রমনা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার ইমানুল হক জানান, ট্রাইব্যুনাল ঘিরে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়। ট্রাইব্যুনাল ও সুপ্রিমকোর্ট এলাকায় ১০ প্লাটুন পুলিশ, র্যাব ও আর্মড ফোর্স মোতায়েন করা হয়। এছাড়া পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল ও সোয়াত দলও ছিল। ট্রাইব্যুনালের ভেতর ও বাইরে ৫০টির বেশি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ : মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থা ২০১০ সালের ২১ জুলাই কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত শুরু করে। তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন আবদুর রাজ্জাক খান ও মনোয়ারা বেগম। ওই বছরের ২ আগস্ট কাদের মোল্লাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রথম ট্রাইবু্যুনালে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। গত বছরের ২২ মার্চ দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে মামলাটি এ ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করেন প্রথম ট্রাইব্যুনাল। ওই বছরের ২৮ মে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ছয়টি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার শুরু করেন দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল।
৩ জুলাই থেকে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য নেয়া শুরু হয়। দুই তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দেন ১২ জন। পরে আসামিপক্ষে প্রথম সাক্ষী কাদের মোল্লাসহ ছয়জন সাক্ষ্য দেন। রাষ্ট্রপক্ষ ১৭ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ দিন যুক্তি উপস্থাপন করে। ৭ জানুয়ারি শুরু হয়ে আট দিন চলে আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন। ১৭ জানুয়ারি যুক্তি উপস্থাপন শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল মামলার রায় অপেক্ষমাণ বা সিএভি (কেস অ্যায়োইটস ভারডিক্ট) রাখেন।
সরকারপক্ষ আপিল করা নিয়ে প্রশ্ন : ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে শুধু আসামিপক্ষেরই ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ ছিল। সরকারের আপিলের কোনো সুযোগ ছিল না। বর্তমান সরকারের আমলে ওই আইনের সংশোধনীতে সরকার পক্ষকেও আপিলের সুযোগ দেয়া হয়েছে। তবে ওই বিধানের বলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরকারের আপিলের সুযোগ রয়েছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ আইনে বলা হয়েছে, খালাস আদেশের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করতে পারবে।
তবে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ গতকাল বলেছেন, ছয়টি অভিযোগের মধ্যে একটি অভিযোগে আবদুল কাদের মোল্লাকে খালাস দেয়া হয়েছে। যে অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয়েছে সে খালাস আদেশের বিরুদ্ধে সরকারের আপিলের সুযোগ রয়েছে। তখন পুরো বিষয়টিই চলে আসবে। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এমকে রহমানও একইমত দিয়েছেন। তবে আসামি পক্ষের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, খালাস আদেশের অংশ ব্যতীত অন্য কোনো অংশে তাদের আপিল বিভাগে যাওয়ার সুযোগ নেই। আবদুল কাদের মোল্লার রায়ের বিরুদ্ধে সরকার আপিল করতে পারবে কী-না এ প্রশ্নের সুরাহা আপিল বিভাগেই হতে পারে। তবে আরেকটি প্রশ্নও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। সাধারণত হাইকোর্টের কোনো রায়ের বিরুদ্ধে প্রথমে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) দায়ের করতে হয়। লিভ টু আপিল মঞ্জুর হলেই আপিল দায়েরের সুযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু ১৯৭৩ সালের আইনে প্রথম লিভ টু আপিল দায়ের করা হবে, না সরাসরি আপিল দায়ের করা হবে তাও স্পষ্ট নয়।
কাদের মোল্লার সংক্ষিপ্ত জীবনী : ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলার আমিরাবাদ গ্রামের মরহুম সানাউল্লা মোল্লার ছেলে আবদুল কাদের মোল্লা ১৯৪৮ সালের ২ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকায় ৪৯৩ বড়মগবাজার গ্রিন ভ্যালি অ্যাপার্টমেন্টের ৮/এ ফ্ল্যাটে থাকতেন। কাদের মোল্লা ১৯৬১ সালে আমিরাবাদ ফজলুল হক ইনিস্টিটিউশনে ৮ম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেন। ১৯৬৬ সালে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে বিএসসি প্রথম বর্ষে পড়ার সময় ছাত্র ইউনিয়ন ছেড়ে ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগদান করেন।
১৯৬৮ সালে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করে ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে মাস্টার্সে ভর্তি হন কাদের মোল্লা। ১৯৭৮ সালে তিনি ঢাকার রাইফেল পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ফুয়াদ আবদুল হামিদ আল খতিবের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ও আর্থিক সহায়তায় দেশে মুসলমান ছেলে-মেয়েদের আন্তর্জাতিক মানের একটি ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে গুলশান ১ নম্বর মার্কেটের দক্ষিণ পাশে ‘মানারাত ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’ নামে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে মানারাত ইউনিভার্সিটি হিসেবে পরিচিত। সেখানে তিনি প্রায় ১ বছর কাজ করেন।
১৯৮০ সালে তিনি দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। তখন তিনি ঢাকা মহানগর জামায়াতের কর্মপরিষদের সদস্য থেকে সহকারী সেক্রেটারি জোনারেল পদে নিয়োজিত হন। পরবর্তীতে আবদুল কাদের মোল্লা জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদে নিয়োজিত হন। তিনি ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদের নির্বাচনে ফরিদপুর-৪ (সদরপুর-চরভদ্রাসন) আসনে জামায়াত থেকে নির্বাচন করেন।
গতকাল রাতে কাদের মোল্লার আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান জানান, কাদের মোল্লা ১৯৯৫ সালে কেয়ারটেকার সরকার আন্দোলনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে সর্বদলীয় লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য হিসেবে তত্কালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তিনি সৌজন্য সাক্ষাত্ করেন। এখন সরকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এ মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। গতকাল কাদের মোল্লাকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এ রায় দুঃখজনক ও ইতিহাসের কালো অধ্যায়ের সূচনা— ডিফেন্স টিমের সংবাদ সম্মেলন : জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজা দিয়ে ট্রাইব্যুনাল যে আদেশ দিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে দুঃখজনক ও একটি কালো অধ্যায়ের সূচনা হলো বলে মন্তব্য করেছেন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা। তারা এ রায়কে ন্যায়ভ্রষ্ট ও স্বেচ্ছাচারী আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এ মামলায় কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এক মিনিট সাজা দেয়ার মতো সাক্ষ্য-প্রমাণের ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সরকারের প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগের প্রতিটি ডিফেন্স টিম নস্যাত্ করতে সক্ষম হলেও শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আবেগের বশে চরম দণ্ডের এ রায় দেয়া হয়েছে। সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুসারে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে মুক্তি দেয়া উচিত ছিল। গতকাল সন্ধ্যায় নয়াপল্টনের সিটিহার্ট ভবনে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের নিজস্ব চেম্বারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রায়ের ব্যাপারে এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ডিফেন্স টিম। সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান ডিফেন্স টিমের প্রধান আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। সম্মেলনে এ রায়ের বিরুদ্ধে দ্রুত সময়ের মধ্যে আপিল করা হবে বলে জানিয়ে বলা হয়, দিস ইজ এ ব্যাড জাজমেন্ট, পারভার্স জাজমেন্ট (স্বেচ্ছাচারী রায়)। এটা যত তাড়াতাড়ি বাতিল হবে দেশ ও জাতির জন্য তত মঙ্গল। আমাদের তো আপিল করতেই হবে। যত দ্রুত সম্ভব আপিল করব। আশা করি, উচ্চ আদালতে ন্যায়বিচার পাব।
সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আজ (গতকাল) আবদুল কাদের মোল্লার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে একটি দুঃখজনক এবং কালো অধ্যায়ের সূচনা হলো। ১৮৬০ সালে ভারতবর্ষে হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত এ রায়টির মতো দুঃখজনক একটি রায়ও খুঁজে পাওয়া যাবে না। এ মামলায় কাদের মোল্লা সাহেবকে দোষী প্রমাণ করার মতো সাক্ষ্য-প্রমাণের ছিটেফোঁটাও খুঁজে পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রপক্ষের আনা ৬টি অভিযোগের একটিও তারা প্রমাণ করতে পারেনি।
আমরা বিস্মিত এবং হতাশ, মাত্র ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে একজন আসামিকে কীভাবে এমন একটি চরম দণ্ড প্রদান করা হলো? যেখানে সাক্ষীদের অধিকাংশই হচ্ছে ‘শোনা সাক্ষী’ এবং মাত্র ৩ জন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দাবি করলেও ডিফেন্সপক্ষ তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে সাফল্যের সঙ্গে নস্যাত্ করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা বিস্মিত যে, এই রায়ের অনেক বক্তব্যই আবেগপ্রসূত। বিচারকের কাছ থেকে আবেগপ্রসূত বক্তব্য প্রত্যাশিত নয়। আমরা এই মামলার শুনানীকালে আমেরিকান এবং ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টের ৩টি নজির তুলে ধরে দেখিয়েছিলাম যে, একজন বিচারকের শুধু যুক্তি দ্বারাই পরিচালিত হওয়া উচিত, আবেগ দ্বারা নয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এই রায় হাইকোর্টের মানদণ্ডের অনেক নিচে অবস্থান করছে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ডিফেন্স পক্ষে যদিও মাত্র ৬ জন সাক্ষীকে সাক্ষ্য দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছিল, আদালত তবু এই ৬ জনের সাক্ষ্য থেকেই দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়েছে যে, আবদুল কাদের মোল্লা ১৯৭১ সালে সংঘটিত অপরাধের সময় ঢাকা শহরেই ছিলেন না, ছিলেন তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে। কিন্তু তাদের এ বক্তব্য গ্রহণ না করে মিরপুর অঞ্চলে বিহারি সম্প্রদায়ের করা অপরাধের দায় আবদুল কাদের মোল্লার ওপর চাপানো হয়েছে। সংরক্ষিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল, এমনকি প্রসিকিউশনের একজন সাক্ষী কবি রোজির লিখিত বইয়ে ১৯৭১ সালে বিহারিরা এসব অপরাধ করেছে বলে উল্লেখ আছে। সেখানে আবদুল কাদের মোল্লার নামও উল্লেখ নেই। এসব সাক্ষী সরকারি চাপে সত্য গোপন ও নিজের লিখিত বইয়ের তথ্য অস্বীকার করে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছে—যা আমরা প্রমাণ করতে সক্ষম হই। এরপরও আদালত সেসব সাক্ষ্যের ভিত্তিতে এই সাজা দিয়েছে। বিচারের যে কোনো মানদণ্ডে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করে মুক্তি দেয়া উচিত ছিল। আমরা মনে করি, এটি একটি পারভার্স জাজমেন্ট এবং আমার প্রত্যাশা করি যে, আপিল বিভাগে এই রায় সম্পূর্ণরূপে বাতিল হয়ে যাবে।
এরপর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, রায়টি বিচারিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেয়া হয়নি। আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা ৬টি অভিযোগের মধ্যে ১, ২ ও ৩নং অভিযোগের কোনো চাক্ষুস সাক্ষী ছিল না। ৪নং অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি বলে রায়ে বলা হয়েছে। ৫ ও ৬নং অভিযোগের বেলা চাক্ষুস সাক্ষী আনা হলেও আমরা জেরায় প্রমাণ করেছি, তারা মিথ্যা বলেছেন। কিন্তু আমাদের সেসব কথা আদালত আমলে নেননি।
তিনি বলেন, এটা একটা ক্রিমিন্যাল অফেন্স (ফৌজদারি অপরাধ)। এক্ষেত্রে কাউকে অপরাধী বলতে হলে চাক্ষুস প্রমাণ থাকতে হবে। কোনো অভিযোগের ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহ থাকলে আসামিকে অভিযোগ থেকে মুক্তি দিতে হবে। অথচ এখানে কাদের মোল্লার বেলায় সম্পূর্ণ সন্দেহের বশে রায় দেয়া হয়েছে। বিচারককে বারবার আবেগি হতে দেখা গেছে।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কোনো অপরাধের বিচার ৪০ বছর পরে হতে পারে। তবে বিচার চলাকালে কেন এত বছর পরে হচ্ছে, তার ব্যাখা দিতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে এ বিষয়টিও একবারও উল্লেখ করা হয়নি। আমরা এ সম্বন্ধে শত শত নজির দেখিয়েছি। কিন্তু আমাদের কথা শোনা হয়নি।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রায়ের ৩১নং প্যারায় কিছু বিষয় বলা হয়েছে। এগুলো বিচার্য বিষয় নয়। একজন মানুষের রাজনৈতিক পরিচয় কারও পক্ষেও যেতে পারে না। বিপক্ষেও যেতে পারে না। কিন্তু এখানে রাজনীতিকে টেনে আনা হয়েছে। আমি মনে করি, এমনটা করা বিচারকের ব্যর্থতা।
তিনি বলেন, একজন বিচারক আইনের ভিত্তিতে বিচার্য বিষয়ের পর্যালোচনা করে রায় দিয়ে থাকেন। তারা আইন তৈরি করতে পারেন না। বিশ্বের অনেক আইন বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন বলেছে, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনেক নিচে। সেখানে রায়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে আইনকে আন্তর্জাতিক বলা হয়েছে। এটা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত।
সম্মেলনে ডিফেন্স আইনজীবী সিনিয়র অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট মো. সাইফুর রহমান, অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন খান, আহমেদ বিন কাশেম, মো. আসাদ উদ্দিনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মনবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলা রায়ে গতকাল জামায়াতের এ অন্যতম শীর্ষ নেতাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় বিশ্ব মাধ্যমে আলোচিত ও বিতর্কিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। জামায়াত এ রায় প্রত্যাখ্যান করেছে।
রায় জাতির প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে —সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম : জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে হতাশা ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আওয়ামী ঘেঁষা সংগঠন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম।
গতকাল ফোরামের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম হতাশা ও চরম অসন্তোষ প্রকাশ করছে। নির্বিচারে গণহত্যা, খুন, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী ঘৃণ্য অপরাধের বহুবিধ সুনির্দিষ্ট অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় জাতির প্রত্যাশা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
এ রায়ের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আপিল করতে রাষ্ট্রপক্ষকে আহ্বান জানিয়েছে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম।