Amardesh
আজঃঢাকা, রোববার ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ৩১ ভাদ্র ১৪২০, ৮ জিলকদ ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

মরণ নেশায় ধ্বংসের মুখে প্রজন্ম

শি শি র র ঞ্জ ন দা স বা বু
« আগের সংবাদ
১৬ আগস্ট রাজধানীর চামেলীবাগের বাসায় পুলিশের পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান একমাত্র মেয়ের হাতে খুন হয়েছেন। ওই দম্পতির দুই সন্তানের মধ্যে ও লেভেল পড়ুয়া মেয়ে ঐশী রহমান ও ছেলে ঐহী রহমান। ঐশী ধানমন্ডির একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্রী। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঐশী বলেছে, ‘না জানিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করা এবং ইয়াবা সেবনের কারণে তাকে বাসায় আটকে রাখা হতো। মা-বাবার এই কড়াকড়ি শাসন তাকে ক্ষিপ্ত করে তোলে। এক পর্যায়ে সে বন্ধুদের নিয়ে মা-বাবাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে। খুনের আগে মা-বাবাকে কফির সঙ্গে চেতনানাশক খাওয়ানো হয়। এই খুনের ঘটনায় ঐশীসহ ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে মাহফুজুর দম্পতির মেয়ে ঐশীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তবে হত্যার কারণ, হত্যায় কজন জড়িত এ ব্যাপারে কিছু বলা যাচ্ছে না। ঐশী ও তার বন্ধুরা মিলে প্রথমে স্বপ্নাকে ১১টি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। পরে মাহফুজুরকে দুটি ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। এ হত্যায় মাহফুজুর রহমানের ছোট ভাই মশিহুর রহমান অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করে। হত্যাকাণ্ডটি চরম নৃশংসতা ও বর্বোরচিত।
সম্প্রতি দেশে মাদকাসক্তি ব্যাপক হারে বেড়েছে। মাদকের মরণ ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে দেশের যুবসমাজ। যার বহিঃপ্রকাশ এ নারকীয় হত্যাকাণ্ড। বিশেষ করে নারীরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় সমাজে বেশি অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নারীর সহিংস আচরণ কেন ঘটছে এ প্রশ্ন আজকের দিনের নয়, এ ধরনের ঘটনা ৩০-৪০ বছর আগেও ঘটত। সম্প্রতি এর পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। এর ভয়াবহতা যেন সভ্যতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই নৃশংসতা, নির্মমতা আইয়ামে জাহেলি যুগের সময়ের বর্বরতাকে হার মানিয়ে নারীরা যেন পশুতে রূপান্তরিত হচ্ছে নির্মম আচরণের দিক দিয়ে। মানুষের মধ্যে দুই ধরনের নফস আছে। একটি মানুষকে অপরাধপ্রবণতা থেকে রক্ষা করা; অপরটি অপরাধপ্রবণতার দিকে ধাবিত করা। মানুষ ধর্মীয় শিক্ষা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। নারীর অপরাধপ্রবণতা বেড়েই চলেছে। ইংরেজি শিক্ষার নামে দেশে যে শিক্ষা কারিকুলাম তা যুগোপযোগী ও আনন্দদায়ক শিক্ষানীতি নয়। যার ফলে শিশুরা আনন্দহীন শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এক সময় এরাই বড় হয়ে নৈতিকতাবিহীন জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে চরম অপরাধী হয়ে সমাজে চিহ্নিত হচ্ছে।
প্রতিদিনের শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুরা ছোটবেলা থেকেই কিছু নৈতিকতা গ্রহণ করতে পারে। বাংলাদেশে প্রত্যেকটি অপরাধের শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু এর কোনো প্রয়োগ নেই। যার ফলে দিন দিনই অপরাধপ্রবণতা কেবল বাড়ছেই। এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে ঐশী আত্মসমর্পণ করে পুলিশের কাছে সবকিছু স্বীকার করেছে। সে-ই তার মা-বাবার খুনের জন্য দায়ী। এটুকু স্পষ্ট, মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী তাদের একমাত্র কন্যাসন্তান ঐশীর হাতে খুনের শিকার হয়েছেন। সে মাদকাসক্ত তরুণী। ইয়াবা মাদকে আসক্ত ঐশী, যা মানুষকে শুধু মৃত্যুর দিকেই ঠেলে দেয় না—মৃত্যুর আগে ওই ইয়াবাসেবীকে পাগলেও পরিণত করে ফেলে। প্রাথমিকভাবে ইয়াবার এই ভয়ঙ্কর রূপ সে বুঝতে পারে না। এমনকি সেবনকারী নিজেও বুঝতে পারে না যে, তার শরীর ও মান কোনদিকে যাচ্ছে। এক পর্যায়ে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, শুধু সেবনকারী নয়, তার পুরো পরিবার ইয়াবার যন্ত্রণায় দিশেহারা হয়ে ওঠে। মাদক মাত্রই মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর, মাদক মানেই মৃত্যু। মাদক সেবনকারী বিভিন্নভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোতে থাকে। ইয়াবা এমন একটি ভয়ঙ্কর মাদক, যা মানুষকে শুধু মেরেই ফেলে না, মারার আগে ওই মানুষকে পাগলে পরিণত করে ফেলে। যার পাগলামির কারণে গোটা পরিবার ধ্বংস হয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে ইয়াবা শরীরে উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়। মন থেকে ভয়ভীতি দূর করে দেয়। যার কারণে সে বুঝতে পারে না কী করবে। সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে। এক সময় ভয়ঙ্কর কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। ইয়াবা সেবনকারীদের মধ্যে বেপরোয়া মনোভব সব থেকে বেশি থাকে। একটি কাজ করলে পরে তার ফল কী হবে সেটা ভাবে না। সেবনের এক পর্যায়ে সে ধীরে ধীরে তার পাশে একটি অবান্তর জগত্ তৈরি করতে থাকে। কল্পনায় সে তার চারপাশের মানুষদের শত্রু ভাবতে শুরু করে। আত্মীয়-স্বজন, ভাই-বোন, স্ত্রী-স্বামী-সন্তান, বাবা-মা সবাইকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। পুলিশ কর্মকর্তা দম্পতি হত্যার ঘটনাটি মাদক সেবনের নির্মমতার বহিঃপ্রকাশ। ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী ঈশী কিছু বন্ধু-বান্ধবীর সঙ্গে মিশে একেবারে বখে গিয়েছে। ইয়াবা সেবন, বেলেল্লাপনা, গভীর রাতে বাসায় ফেরা, ম-বাবার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা তার নিত্যদিনের আচরণে পরিণত হয়েছিল। মা-বাবা তার আচরণে অতিষ্ঠ। মাদক সেবনের টাকা দিতে না পারলেই মা-বাবার সঙ্গে খারাপ আচরণ, এমনকি মারধর করত তাদের। শেষ পর্যন্ত ম-বাবা রোজার আগে ঐশীর বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দেন। সে একজন মাদকাসক্ত তরুণী। ঐশীর এ অধঃপতনের জন্য প্রথমে সে নিজেই দায়ী। এ সত্য অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তার ওই বেপরোয়া হয়ে ওঠার পেছনে হয়তো তার অভাগা মা-বাবার দায় এড়ানো যাবে না। উঠতি বয়সের একটি মেয়েকে প্রথম থেকেই যেভাবে দেখাশোনা করার দরকার ছিল, তাতে হয়তো ত্রুটি ছিল। ফলে ঐশী চরম অধঃপতনের দ্বারপ্রান্তে গিয়ে পৌঁছেছে। যখন সে চরম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, তখন হয়তো তাদের কিছুই করার ছিল না, শুধু তাকে ঘরে বন্দি করে সুপথে ফিরিয়ে আনার ব্যর্থ প্রয়াস চালানো ছাড়া। এ ঘটনা থেকে প্রতিটি মা-বাবা, পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির ভাবার আছে অনেক কিছুই। প্রত্যেক মা-বাবাকে শুরু থেকে সজাগ থাকতে হবে, কোনো সন্তান যেন তাদের অসতর্কতার কারণে ঐশীর মতো বখে না যেতে পারে। ঐশীদের এ ধরনের পরিণতি থেকে বাঁচাতে হলে আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে বে-লাগাম জীবনযাত্রার কোনো সুযোগ থাকবে না। এক্ষেত্রে সন্তানদের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। তাহলে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তেমন একটি পরিবেশ সৃষ্টির আন্তরিক প্রয়াস থাকতে হবে। উপসংহারে বলতে হয়, এ মাদকের মরণ ছোবল থেকে রক্ষা করতে পুলিশকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। পুলিশের সদিচ্ছা থাকলে অচিরেই মাদক নির্মূল করা সম্ভব। মাদকের কারণেই জাতি একজন পুলিশ অফিসারকে হারালো। শুধু পুলিশ বাহিনীরই নয়, জাতির এ অপূরণীয় ক্ষতি কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। তাই দ্রুত মাদক ব্যবসায়ীদের আটক করে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির বিধান করাই পুলিশের মহান কর্তব্য ও দায়িত্ব। জাতি প্রত্যাশা করে পুলিশ বাহিনী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হবে। আর যেন মাদকের কারণে একটি প্রাণও ঝরে না পড়ে, সে দিকে সজাগ দৃষ্টি দিবে। এ প্রত্যাশায় থাকলাম আগামীর অপেক্ষায়। সংশ্লিষ্টরা সজাগ থাকলে অচিরেই মাদকমুক্ত বাংলাদেশ হবে। এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।