Amardesh
আজঃঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৫ আগস্ট ২০১৩, ৩১ শ্রাবণ ১৪২০, ৭ সাওয়াল ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

মানবতা বিরোধী অপরাধ : সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার রায় যে কোনো দিন

স্টাফ রিপোর্টার
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলার রায় যে কোনোদিন ঘোষণা করা হবে মর্মে সিএভি (অপেক্ষমাণ) রেখে দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। গতকাল উভয় পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রথম ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন। প্রায় সোয়া এক বছর বিচারিক কার্যক্রম শেষে গতকাল মামলাটির সমাপ্তি ঘটে। এদিকে নিজের মামালার কাজ শেষ করে দেয়ার পরে ট্রাইব্যুনালকে ধন্যবাদ জানান সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী। এ সময় তিনি ট্রাইব্যুনালকে বলেন, ধৈর্য ধরে দুই বছর আট মাসে মামলার কার্যক্রম শেষ করায় আপনাদের ধন্যবাদ। এছাড়া তার পক্ষের আইনজীবীরা দাবি করছেন, প্রসিকিউশন তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছে তা তারা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং তিনি এ মামলায় সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। অন্যদিকে প্রসিকিউশন দাবি করেছে, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণ করতে তারা সক্ষম হয়েছেন। এতে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের আমলে গঠিত কথিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই প্রথম কোনো বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হলো।
গতকাল সকালে এক ঘন্টার মধ্যে আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হলে পাল্টা যুক্তিতর্ক ও সমাপনী বক্তব্য উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ, জেয়াদ আল মালুম ও সুলতান মাহমুদ সীমন। এর আগে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন তার প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল হক হেনা। ব্যারিস্টার ফখরুল ইসলাম যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা ট্রাইব্যুনালে এসে মিথ্যা বলেছেন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের আগ পর্যন্ত তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তা প্রমাণে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। আসামিপক্ষের অপর আইনজীবী আহসানুল হক হেনা বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের জবানবন্দিতে অসঙ্গতি রয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) বিনা নোটিশে ইচ্ছামতো সাক্ষী বানিয়েছেন। নিজেই জবানবন্দি নিয়েছেন, আবার নিজেই লিখেছেন। সালাহউদ্দিন কাদের নির্দোষ। এরপর ফখরুল ইসলাম আইনি বিষয়ে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, এটা মিথ্যা মামলা। সাক্ষীরা এখানে এসে মিথ্যা বলেছেন। ১৯৭১ সালে সালাহউদ্দিন কাদেরকে তারা দেখেননি। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ থেকে ১৯৭৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে ছিলেন না। এটা আমরা দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। রাষ্ট্রপক্ষ জেরাকালে সালাহউদ্দিন কাদেরকে প্রশ্ন করেছিল, তিনি বেনামে ও বেআইনিভাবে ১৯৭৪ সালে দেশে এসেছিলেন। এ প্রশ্নের মাধ্যমে তারা স্বীকার করে নিয়েছেন, ১৯৭১ সালে সালাহউদ্দিন কাদের দেশে ছিলেন না। ১৯৭৪ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। আমরা মিথ্যা মামলা থেকে সালাহউদ্দিন কাদেরের অব্যাহতি প্রার্থনা করছি।
এরপর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সুলতান মাহমুদ। তিনি বলেন, আসামিপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্য-প্রমাণে অসঙ্গতি রয়েছে। এরপর আইনি বিষয়ে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করেন কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ। তিনি ও অপর কৌঁসুলি জেয়াদ আল মালুম সালাহউদ্দিন কাদেরের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রার্থনা করেন।
এ সময় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ট্রাইব্যুনালকে বলেন, বিভিন্ন সময়ে আমার ওপর দয়া করেছেন এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। এই পৌনে তিন বছরে আমি আমার এবং আপনাদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বুঝতে পেরেছি। এ সময় বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমরা আপনাকে কোনো দয়া করিনি। আইন যেটুকু অনুমতি দেয় তা-ই করেছি।
গত ২৮ জুলাই সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলায় প্রসিকিউশনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। ৩১ জুলাই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন প্রথম পর্যায়ে শেষ করে প্রসিকিউশন। এরপর ১ আগস্ট থেকে সালাহউদ্দিন কাদেরের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু করেন তার আইনজীবী আহসানুল হক হেনা।
গত ২৪ জুলাই সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলায় আসমিপক্ষের সাফাই সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়। তার পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনি নিজেসহ মোট চারজন। অন্য তিন সাফাই সাক্ষী হলেন তার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু নিজাম আহমেদ, এশিয়া-প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য কাইয়ুম রেজা চৌধুরী এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত আবদুল মোমেন চৌধুরী। এর আগে সালাহউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. নূরুল ইসলামসহ প্রসিকিউশনের মোট ৪১ জন সাক্ষী। আর চারজন সাক্ষীর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে ট্রাইব্যুনাল। এছাড়া অন্য চার সাক্ষী মৃত জ্যোত্স্না পাল চৌধুরী, মৃত জানতি বালা চৌধুরী ও মৃত আবুল বশর এবং ভারতে থাকা বাদল বিশ্বাসের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দিকেই সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছে ট্রাইব্যুনাল।
হরতালে ভাংচুর-অগ্নিসংযোগের একটি মামলায় ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর গ্রেফতার করা হয় বিএনপির সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে। পরে ১৯ ডিসেম্বর তাকে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। ৩০ ডিসেম্বর আদালতের নির্দেশে প্রথমবারের মতো আদালতে হাজির করা হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধের ২৩টি অভিযোগে গত বছরের ৪ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এই বিএনপি নেতার বিচার শুরু হয়।
সালাহউদ্দিন কাদেরের বিরুদ্ধে ২৩ অভিযোগ : ১৯৭১ সালে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্মান্তরে বাধ্য করাসহ ২৩টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে। তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ৩(২)(এ)(সি)(১)(জি)(এইচ) ধারা অনুযায়ী অপরাধ করেছেন বলে এসব অভিযোগে বলা হয়।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ৪ বা ৫ এপ্রিল ৬ ব্যক্তিকে অপহরণ করে ট্রাকে তুলে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বাসভবন গুডস হিলে নিয়ে আটক করে রাখা এবং সেখানেই হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৩ এপ্রিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি হানাদার দখলদার সেনাবাহিনীর একদল সদস্য গহিরা গ্রামে হিন্দু অধ্যুষিত পাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালায়। অভিযান চালিয়ে নিরীহ নিরস্ত্র হিন্দুদের ডাক্তার মাখন লাল শর্মার বাড়িতে জড়ো করা হয়। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর সদস্যরা ব্রাশফায়ার করে তাদের হত্যা করে।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৩ এপ্রিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীকে নিয়ে ঘটনাস্থল গহিরা কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ে আসেন। ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মালিক নূতন চন্দ্র সিংহের সঙ্গে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনারা ৫-৭ মিনিট কথাবার্তা বলে চলে যায়। চলে যাওয়ার আনুমানিক ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে আসামি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী পুনরায় পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে কুণ্ডেশ্বরী ভবনে প্রবেশ করেন। ওই সময় নূতন চন্দ্র সিংহ বাড়ির ভেতরে মন্দিরে প্রার্থনারত ছিলেন। আসামি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তাকে মন্দিরের ভেতর থেকে টেনে হিঁচড়ে সামনে নিয়ে আসেন এবং উপস্থিত পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশে বলেন যে, একে হত্যা করার জন্য বাবার নির্দেশ আছে। পরে নূতন চন্দ্র সিংহকে হত্যা করার জন্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী উপস্থিত পাকিস্তানি সেনাসদস্যদের নির্দেশ প্রদান করেন। সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি সেনারা কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের মালিক নূতন চন্দ্র সিংহকে ব্রাশফায়ার করে। গুলিবিদ্ধ নূতন চন্দ্র সিংহ মাটিতে পড়ে ছটফট করা অবস্থায় আসামি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নিজে তাকে গুলি করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী স্থানীয় সহযোগীসহ পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত জগত্মল্লপাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালান এবং সেখানে গুলিতে ৩২ নারী-পুরুষকে হত্যা করেন।
পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ১৩ এপ্রিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী কতিপয় অনুসারীকে নিয়ে চট্টগ্রাম জেলার রাউজানের সুলতানপুর গ্রামে হামলা চালিয়ে এলাকার নেপাল চন্দ্র ধর, মনীন্দ্র লাল ধর, উপেন্দ্র লাল ধর ও অনিল বরণ ধরকে একত্রিত করে গুলি করেন। এতে প্রথম ৩ জন মৃতুবরণ করেন ও শেষেরজন আহত হন।
ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ১৩ এপ্রিল বিকাল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী হিন্দু জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার জন্য রাউজানের ঊনসত্তরপাড়ায় সশস্ত্র অভিযান চালান। ওই পাড়ায় পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসররা এলাকার হিন্দু নর-নারীকে স্থানীয় ক্ষিতীশ মহাজনের বাড়ির পেছনে পুকুরপাড়ে শান্তি মিটিংয়ের নামে একত্রিত করে। পরে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনারা নিরীহ-নিরস্ত্র ও একত্রে বসানো হিন্দু নর-নারীদের ব্রাশফায়ারে হত্যা করে।
সপ্তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে একদল পাকিস্তানি সেনাসদস্য রাউজান পৌরসভা এলাকার সতীশ চন্দ্র পালিতের বাড়িতে প্রবেশ করে। পরে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাকে গুলি করে হত্যা করে এবং তার লাশ কাঁথাকাপড় দিয়ে মুড়িয়ে তাতে পাউডার ছিটিয়ে আগুন দিয়ে লাশ পুড়িয়ে ফেলে।
অষ্টম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল সকাল আনুমানিক ১১টা। চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মোজাফফর আহম্মদ, তার ছেলে শেখ আলমগীরসহ তার পরিবারের কয়েক সদস্যকে হত্যা করা হয়।
নবম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে এপ্রিলের মাঝামাঝি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীসহ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার সিও অফিসস্থিত রাজাকার ক্যাম্পে আসেন। এ সময় মুন্সীরহাটের শান্তি দেবকে ধরে নিয়ে পাকসেনারা থানার উত্তর পাশে বণিকপাড়ায় গুলি করে হত্যা করে। অনতিদূরে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তখন ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন।
দশম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানিরা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সঙ্গে ডাবুয়া গ্রামে মানিক ধরের বাড়িতে এসে তার জিপগাড়ি ও ধান ভাঙার কল লুট করে নিয়ে যায়। মানিক ধর সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে এ বিষয়ে থানায় মামলা দায়ের করেন।
১১তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল সকালবেলা কনভেনশন মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী ও আসামি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী মুসলিম লীগের লোকজন তাদের নির্দেশেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং মুসলিম লীগ সমর্থক রাজাকার খয়রাতি, জহির এবং জসিমকে নিয়ে একযোগে পারস্পরিক ঘনিষ্ঠ যোগসাজশে ও চক্রান্তে চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা শাকপুরা গ্রামে সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে হিন্দুদের হত্যা করে।
১২তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ৫ মে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাউজান থানার জ্যোতিমল্ল গ্রামে গুলি করে বিজয় কৃষ্ণ চৌধুরী রাখাল, বিভূতি ভূষণ চৌধুরী, হীরেন্দ্র লাল চৌধুরীকে হত্যা করে।
১৩তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১৫ মে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশে তাদের সহযোগী শান্তি কমিটির সদস্যরা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বাড়িঘর লুটপাট, ৬ জনকে গুলি করে হত্যা, ২ জনকে গুরুতর আহত এবং অন্তত ৫ মহিলাকে ধর্ষণ করে।
১৪তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২০ মে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে তার সহযোগী ক’জন রাজাকার পাকিস্তানি সেনাসদস্যসহ আওয়ামী লীগ নেতা মো. হানিফের বাড়িতে যায়। তাকে অপহরণ ও আটক করে গুডসহিল নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মুক্তিপণের টাকা দিতে না পারায় মো. হানিফকে হত্যা করা হয়।
১৫তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে দুটি ট্রাকে পাকিস্তানি সেনাসদস্যসহ বেসামরিক পোশাকে কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি শেখ মায়মুন আলী চৌধুরীকে গুডসহিল নির্যাতন কেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখানে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও ফজলুল কাদের চৌধুরীর নির্দেশে পরনের জাঙ্গিয়া ছাড়া সব কাপড়চোপড় খুলে ফেলে হাত-পা বেঁধে তাকে দৈহিক নির্যাতন করা হয়।
১৬তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ৭ জুন জামাল খান রোড থেকে ওমর ফারুককে ধরে নিয়ে গিয়ে ফজলুল কাদের চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণাধীন গুডসহিলের চর্টার সেলে রাখেন। পরবর্তীতে আটকাবস্থায় তাকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নির্দেশে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়।
১৭তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ৫ জুলাই সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী তার আরও দু’তিন সহযোগীসহ পাকিস্তান সেনাসদস্যরা চট্টগ্রাম জেলার কোতোয়ালি থানার হাজারী লেনের জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর পোড়োবাড়ি থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিজাম উদ্দিন আহম্মেদ, সিরাজ ও ওয়াহেদ ওরফে ঝুনু পাগলাকে অপহরণ করে। অপহরণ করে তাদের গুডসহিলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মেজর গজনফরের নেতৃত্বে ঘণ্টা দেড়েক তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়। পরে সেদিন রাত ১১-১২টায় নিজাম উদ্দিন ও সিরাজকে চট্টগ্রাম কারাগারে নিয়ে গিয়ে কারারুদ্ধ করা হয়। সেখানে তারা দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত বন্দি ছিলেন।
১৮তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে চান্দগাঁও থানার মোহরা গ্রামে আবদুল মোতালেব চৌধুরীর বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে তারা মো. সালেহউদ্দিনকে অপহরণ করেন। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গাড়িতে নিয়ে তাকে গুডসহিলে টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।
১৯তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টায় হাটহাজারীর নেয়ামত আলী রোডের সাহেব মিয়ার বাড়ি (রজমান টেন্ডলের বাড়ি) ঘেরাও করে তার দুই ছেলে নুর মোহাম্মদ ও নুরুল আলমকে অপহরণ করা হয়। এরপর তাদের রশি দিয়ে বেঁধে গুডসহিলে টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তারা তাদের অপর ভাই মাহবুব আলমের সন্ধান পান। আসামি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী নুর মোহাম্মদ ও নুরুল আলমকে ১০ হাজার টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে গুডসহিলের নির্যাতন কেন্দ্র থেকে ছেড়ে দেন।
২০তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২৭-২৮ জুলাই বিকাল আনুমানিক ৪টায় রাজাকার বাহিনী আকলাচ মিয়াকে ধরে নিয়ে যায়। এরপর তাকে গুডসহিলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। সেখানে তার মৃত্যু ঘটে।
২১তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে রাউজান থানার বিনাজুরি গ্রামের ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক চৌধুরীকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা অপহরণ করে গুডসহিলে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে ৩-৪ দিন আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়।
২২তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শেষদিকে মো. নুরুল আনোয়ার চৌধুরীকে অপহরণ করে গুডসহিলে নিয়ে যান। সেখানে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী মো. নুরুল আনোয়ারের কাছ থেকে সাড়ে ছয় হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করেন।
২৩তম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী মুসলিম ছাত্র পরিষদ সভাপতি ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের আলশামস কমান্ডার হামিদুল কবির চৌধুরী খোকা, মাহবুব, সৈয়দ ওয়াহিদুর আলম গং চট্টগ্রাম জেলার কোতোয়ালি থানার ৪০ নং আবদুস সাত্তার রোড এলাকার এম সলিমুল্লাহর এক হিন্দু কর্মচারীকে মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগের ভিত্তিতে মারধর করতে থাকেন। তাদের অভিযোগ হলো—ওই হিন্দু কর্মচারী বিহারিদের ঘরে অগ্নিসংযোগ করেছেন। এম সলিমুল্লাহ এতে বাধা দিলে তাকে গুডসহিলে নির্যাতন সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সারারাত নির্যাতন শেষে তার আত্মীয়দের অনুরোধে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।