Amardesh
আজঃঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৫ আগস্ট ২০১৩, ৩১ শ্রাবণ ১৪২০, ৭ সাওয়াল ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

অধিকার ও আদিলুর পরিবারের বিবৃতি : কোনো পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই মানবাধিকারের জন্য কাজ করছে অধিকার

স্টাফ রিপোর্টার
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন অধিকার বলেছে, কোনো পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই মানবাধিকারের জন্য তারা আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
গতকাল এক বিবৃতিতে অধিকার বলেছে, ১১ আগস্ট রাতে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অধিকার অফিসে তল্লাশি চালিয়ে দুটি সিপিইউ ও তিনটি ল্যাপটপ নিয়ে যায়। দুটি সিপিইউতেই অধিকারের ডকুমেন্টেশনের তথ্যানুসন্ধান রিপোর্ট ও ভিক্টিমদের ডকুমেন্টেশনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ ৫ ও ৬ মের প্রতিবেদন ও তথ্য ছিল। অধিকারের আশঙ্কা, এই তথ্যগুলোকে বিকৃত করা হতে পারে এবং ভিক্টিম ও স্বাক্ষীদের গোপনীয় তথ্য নিরাপত্তা ও বিঘ্নিত হতে পারে। আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সরকারের কাছে আদিলুর রহমান খানের অবিলম্বে মুক্তির ও ভিকটিমদের নিরাপত্তার দাবি জানিয়েছে অধিকার।
বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই অধিকার মানবাধিকার বিষয়ে তার অঙ্গীকার নিশ্চিত করে আসছে; যেজন্য জাতিসংঘসহ দেশে এবং বিদেশে অধিকার তার কাজের জন্য প্রশংসিত হয়েছে। অধিকার তার কার্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন এর বিষয়ে কখনোই ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, রাজনৈতিক দল ইত্যাদির প্রতি কোনোরকম পক্ষপাতিত্ব করেনি।
অধিকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, গুম, সংখ্যালঘুদের মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ অন্যান্য মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধের জন্য সচেষ্ট। তাই ১৯ বছর ধরে অধিকার প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিটি সরকার অধিকার এর কর্মকাণ্ডের ওপর তীঘ্ন নজর রাখছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, আদিলুর রহমান খানের পরিবার ও অধিকার বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছেন কারণ তারা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে আদিলুর রহমান খানকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেফতার করেছে তা নিশ্চিত করে প্রচার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, অধিকার শুরু থেকেই প্রতিটি সরকারের আমলে প্রতিমাসেই মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন সরকারের আমলে অথবা সেনাসমর্থিত সরকারের আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেই চলেছে। অধিকার এসব মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধের জন্য কাজ করে চলেছে। ১০ আগস্ট রাত আনুমানিক ১০টায় যখন অধিকার-এর সাধারণ সম্পাদক আদিলুর রহমান খান তার পরিবারসহ বাসায় ফিরছিলেন, তখন সাদা পোশাকের প্রায় ১০ জন লোক একটি সাদা মাইক্রোবাস যার নম্বর ঢাকা মেট্রো- ৫৩৪২০৬ থেকে নেমে এসে তাকে ঘিরে ফেলে। তারা নিজেদের গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বলে পরিচয় দেয়।
যখন তারা আদিলুর রহমান খানকে তাদের সঙ্গে যেতে বলে তখন তিনি তাদের কাছে গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখতে চান। কিন্তু তারা তা দেখাতে ব্যর্থ হন। সাদা পোশাকের ওই লোকগুলো সে সময়ে তাকে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নিয়ে চলে যায়। আদিলুর রহমান খানের পরিবার এবং অধিকার-এর কর্মীরা তখন তার সন্ধান পাওয়ার জন্য গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে।
এ বিষয়ে আদিলুর রহমান খানের পরিবার একটি সাধারণ ডায়রি করার জন্য গুলশান থানায় গেলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আদিলুর রহমান খানের বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ার কথা জানান এবং সাধারণ ডায়রি করার ব্যাপারে অপরাগতা প্রকাশ করেন।
১১ আগস্ট মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করার আগে তার আইনজীবী ও পরিবারের কেউই তাকে গ্রেফতারের কারণ কি তা জানতে পারেনি এমনকি তার সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারেনি। যখন তাকে ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হলো তখন জানা গেল, তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করা হয়েছে এবং পুলিশ তার ১০ দিনের রিমান্ড চেয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ৫ মে রাতে কোনো রক্তপাতের ঘটনা ঘটেনি বা কেউ মারা যায়নি, কিন্তু অধিকার ৬১ জন মারা গিয়েছে বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পুলিশ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে মৃতের তালিকা চাওয়া হলেও অধিকার কোনো তথ্য দেয়নি, যার জন্য আদিলুর রহমান খানকে গ্রেফতার করা হয়েছে এই বলে যে অধিকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ লঙ্ঘন করেছে। একই দিনে আদালত আদিলুর রহমান খানের জামিন নামঞ্জুর করে এবং ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে গোয়েন্দা পুলিশের হাজতে পাঠায়। ১২ আগস্ট আদিলুর রহমান খান ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও রিমান্ডের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে একটি ক্রিমিনাল মিসেলিনিয়াস পিটিশন দাখিল করেন। পিটিশনে আদিলুর রহমান খান উল্লেখ করেন যে, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বানোয়াট এবং যা অশুভ উদ্দেশ্যে তাকে নির্যাতন ও অপদস্থ করার লক্ষ্যে করা হয়েছে।
পিটিশন থেকে জানা যায়, তথ্য মন্ত্রণালয়ের ১০ জুলাই চিঠির জবাবে ১৭ জুলাই অধিকার পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেছে যে, সরকার যদি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করে, তবেই অধিকার ৫ ও ৬ মে ২০১৩ ঘটনার নিহতের তালিকা প্রকাশ করবে। কারণ তদন্ত কমিশন আইন ১৯৫৬ অনুযায়ী সরকারকে কমিশন গঠনের ক্ষমতা দেয়া আছে। আদিলুর রহমান খানের গ্রেফতার ও রিমান্ডের বৈধতার বিষয়ে উচ্চ আদালতে বলা হয়, ৫৪ ধারায় রিমান্ডে নেয়া ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ মামলায় (৫৫ ডিএলআর ৩৬৩) উচ্চ আদালতের রায়ের সরাসরি লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে বলা হয়, আদিলুর রহমান খানের আইনজীবীদের শুনানির পর উচ্চ আদালত তার রিমান্ড স্থগিতের আদেশ দিয়ে রুল জারি করে এবং বলে যদি প্রয়োজন হয়, তবে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ১৩ আগস্ট তাকে মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে হাজির করা হয় এবং সেখান থেকে প্রথমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং পরে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়। তবে জেলকোড অনুযায়ী আদিলুর রহমান খানের জন্য ডিভিশন চাওয়া হলেও ম্যাজিস্ট্রেট পিটিশনটি প্রত্যাখ্যান করে ডিভিশন চেয়ে প্রত্যাখ্যাত পিটিশনটি নির্দেশ করে যে, আদিলুর রহমান খানের সঙ্গে আইন অনুযায়ী ব্যবহার করা হচ্ছে না।
বিবৃতিতে বলা হয়, অধিকার প্রতিষ্ঠার আগে থেকেই আদিলুর রহমান খান মানবাধিকার রক্ষার কাজ করেছেন। আইনজীবী হিসেবে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের পক্ষে অনেক মানবাধিকারের মামলা লড়েছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম মৌলিক অধিকার সুরক্ষা কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি এবং অন্য তিনজন আইনজীবী ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে দণ্ডিত ব্যক্তিদের মুক্তির জন্য কাজ করেছেন। তিনি জাহানারা ইমামের সঙ্গে ’৭১-এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিতে থেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে ছিলেন সোচ্চার। ২০০১ সালের ৩১ অক্টোবর তিনি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে যোগ দেন এবং ১০ মে এ থেকে অব্যাহতি নেন। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে তিনি মানব পাচার অভিযুক্তদের বিচারকার্যের পরিচালনার সমন্বয়ক হিসেবে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। একজন তরুণ আইনজীবী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের (ইনু) সদস্য হিসেবে তিনি সক্রিয়ভাবে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১১ আগস্ট রাত ৮টার দিকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অধিকার অফিসে তল্লাশি চালায়। তারা দুটি সিপিইউ ও তিনটি ল্যাপটপ নিয়ে যায়। দুটি সিপিইউতেই অধিকারের ডক্যুমেন্টেশনের তথ্যানুসন্ধান রিপোর্ট ও ভিকটিমদের ডক্যুমেন্টেশনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ ৫ ও ৬ মে’র প্রতিবেদন ও তথ্য ছিল। অধিকার মনে করেছে এই তথ্যগুলোকে বিকৃত করা হতে পারে এবং ভিকটিম ও সাক্ষীদের গোপনীয় তথ্য নিরাপত্তা ও বিঘ্নিত হতে পারে। গোয়েন্দা পুলিশ আদিলুর রহমানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে বিভিন্ন জেলায় আয়োজিত র্যালিতে বাধা দিচ্ছে ও অধিকারের পরিচালক ও স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীদের তথ্য সংগ্রহ করছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, অধিকার আন্তরিকভাবে কোনো পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই মানবাধিকারের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অধিকার সরকারের কাছে আদিলুর রহমান খানের অবিলম্বে মুক্তির দাবি ও ভিকটিমদের নিরাপত্তার দাবি জানাচ্ছে। অধিকার আশা করে যে, কোনো ব্যক্তিরই অবমাননা ও ভুল বিচারের শিকার হওয়া উচিত নয়, যা যে কোনো মানবাধিকার কর্মীর মূল দর্শন।