মিসরে কেন এই রক্ত বন্যা

স্টাফ রিপোর্টার « আগের সংবাদ
পরের সংবাদ» ২১ জুন ২০১৫, ২:৫৮ অপরাহ্ন

নিজ দেশের সেনাদের হাতে গণহত্যার শিকার হওয়াই যেন মিসরবাসীর নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। শুরু সেই ২০১১ সালে, বিশ্ব কাঁপানো তাহরির স্কয়ার থেকে। স্বৈরাচারের পতন আর গণতন্ত্রের দাবিতে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিয়ে তারা বর্তমান শতাব্দীতে বিপ্লবের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। ঐতিহাসিক সেই গণঅভ্যুত্থানের পতন ঘটে মিসরের তিন দশকের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের। সেই যে জীবন দেয়া আর নেয়ার শুরু, তা আর যেন থামছেই না।
মোবরকের তিন দশকের শাসনের মূল শক্তি ছিল সেনাবাহিনী। কার্যত স্বাধীনতা লাভের পর থেকে গত ৬ দশক ধরেই সেনাবাহিনী মিসর শাসন করেছে।
প্রায় ৯০০ লোকের জীবনের বিনিময়ে মোবারকের পতন হলেও এরপর আবারও ক্ষমতা চলে যায় সেনাবাহিনীর হাতে। আবারও আন্দোলন করতে হয় মিসরবাসীকে। এরপর অনুষ্ঠিত হয় সংসদ নির্বাচন। এতে জয়ী হয় মিসরের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুড।
সেনাবাহিনীর নানা টালবাহানার পর ২০১২ সালের জুনে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও জয়ী হয় ব্রাদারহুডের নেতা মোহাম্মদ মুরসি। মুরসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও মূল ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে মোবারকের অনুগত সেনাবাহিনী, বিচারপতি ও আমলাতন্ত্র।
এ অবস্থায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য মুরসিকে প্রতি মুহূর্তে লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে তিনি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করেন যেখানে শরীয়াকে আইনের মূল উত্স হিসেবে গ্রহণ করা হয়। গ্রহণযোগ্য গণভোটেই সেই সংবিধান পাস হয়।
কিন্তু নতুন এই সংবিধানকে গ্রহণ করতে পারেনি মিসরের সেক্যুলার এস্টাব্লিশমেন্ট ও বামপন্থিরা। তারা মুরসিকে উত্খাতের ষড়যন্ত্র শুরু করে। মিসরে ‘রাষ্ট্রের ভেতর রাষ্ট্র’ হিসেবে খ্যাত সেনাবাহিনীও চায়নি মুরসি ক্ষমতা সংহত করুক। এসব চাওয়ার সঙ্গে সম্মিলন ঘটেছে ইহুদিবাদী ইসরায়েল ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশারও। তারাও চায়নি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ইসলামী দল ব্রাদারহুড শাসন করুক মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জনবহুল দেশটি। তাদের আশঙ্কা ব্রাদারহুড ক্ষমতায় টিকে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার পূজারি স্বৈরাচারী রাজা-বাদশাহদের মসনদ টিকবে না।
এ অবস্থায় কথিত বিক্ষোভের অজুহাত দেখিয়ে গত ৩ জুলাই সেনাবাহিনী মুরসিকে উত্খাত করে। অথচ তিনি এক বছরও দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাননি। তার বিরুদ্ধে নেই দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিও কোনো অভিযোগও।
মুরসিকে উত্খাতের পর তাকে অজ্ঞাত স্থানে বন্দি রাখা হয়েছে। আটক করা হয়েছে ব্রাদারহুডের প্রায় সব শীর্ষ নেতাকে। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আদলি মনসুর যে মন্ত্রিসভা নিয়োগ করেছেন সেখানে মুসলিম প্রধান মিসরের কোনো ইসলামপন্থিই স্থান পাননি। পুরো মন্ত্রিসভা বামপন্থি, খ্রিস্টান আর নারীদের দিয়ে পরিপূর্ণ।
এ অবস্থায় মিসরের ইসলামপ্রিয় মানুষ রাজপথে নেমে এসেছে। সংখ্যায় তারা হাজার হাজার নয়, ছিলেন লাখে লাখে। ট্যাঙ্কের সামনে টানা ৬ সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ করে তারা দুনিয়ার ইতিহাসই যেন পাল্টে দিয়েছেন।
এতে প্রমাদ গুণতে বাধ্য হয়েছে সেনা সরকার। ব্রাদারহুডের এ আন্দোলন অব্যাহত থাকলে মিসর কায়েমী স্বার্থবাদীদের তল্পিবাহক বানানোর স্বপ্ন যে অধরাই থেকে যাবে তা তারা ঠিকই বুঝতে পেরেছেন। তাই মুরসি সমর্থক ও ব্রাদারহুড কর্মীদের ওপর তারা একের পর গণহত্যা চালিয়েছে।
গণহত্যার সবচেয়ে রোমহর্ষক চিত্র দেখা গেছে গতকাল। এতে ঠিক কত লোক নিহত হয়েছে সেই চিত্র অদূর ভবিষ্যতে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে তা যে হাজার হাজার না হলেও শত শত, তাতে খুব কম লোকেরই সন্দেহ আছে।
মিসরের সেনাবাহিনী গুলি চালিয়ে নিজ দেশের সেসব প্রত্যয়দীপ্ত মানুষের বুক ঝাঝরা করে দিয়েছে যারা স্বপ্ন দেখেছিলেন গণতন্ত্রের, স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার।

প্রথম পাতা এর আরও সংবাদ

সাপ্তাহিকী


উপরে