সংসদীয় দলের বৈঠকে শেখ হাসিনা : দলের নেতারাই সরকার ও দলের বেশি ক্ষতি করেছে : রাজনীতিবিদদের হেয় করে কাদের ক্ষমতায় আনার ষড়যন্ত্র চলছে?

স্টাফ রিপোর্টার « আগের সংবাদ
পরের সংবাদ» ১৭ জুলাই ২০১৩, ০০:০৫ পূর্বাহ্ন

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) রিপোর্টের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকারের শেষ মুহূর্তে এসে রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। রাজনীতিবিদদের দোষ-ত্রুটি থাকতে পারে। তবে ঢালাওভাবে রাজনীতিবিদদের ওপর দোষ চাপানো মেনে নেয়া যায় না। রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের হেয় করে কাদের ক্ষমতায় আনার ষড়যন্ত্র চলছে? এ সময় তিনি বলেন, কেন রাজনীতিবিদদের হেয় করার চেষ্টা চলছে তা সবাইকে ভেবে দেখতে হবে। এদের ষড়যন্ত্র মেনে নেয়া যায় না। টিআইবি কর্তব্যক্তিদের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তারা কত টাকার মালিক, কিভাবে এ টাকার মালিক হলেন, অতীতে তারা কী কী করেছে, এগুলোর তথ্য তালাশ করা দরকার। গতকাল বিকালে গণভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠকে সংসদীয় দলের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। বৈঠকে শেখ হাসিনা শিগগিরই আগামী নির্বাচনের প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করবেন বলে জানান।
সূত্র জানিয়েছে, সংসদীয় দলের সভায় বক্তব্যে অধিকাংশ এমপি হতাশার কথা জানান। তারা বলেন, আমরা মুখে যতই বলি না কেন সারাদেশে আমাদের সাংগঠনিক অবস্থা চরম খারাপ। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। এ অবস্থা বিরাজ করলে আগামীতে দলীয় প্রার্থীদের জয়লাভ করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
এ সময় শেখ হাসিনা দলের সিনিয়র নেতাদের ইঙ্গিত করে বলেন, দলকে তো আমরাই ডুবিয়েছি। দলের বড় বড় নেতারা সংসদে দাঁড়িয়ে যেভাবে মন্ত্রীদের সমালোচনা করেন, বিরোধী দলের নেতারাও এমন সমালোচনা করে না। বিরোধী দল যতটা না, আমাদের দলের নেতারা আওয়ামী লীগ ও সরকারের ক্ষতি করেছে তারচেয়ে বেশি।
এর আগে সূচনা বক্তব্যে বিরোধীদলের তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের সংসদীয় গণতন্ত্রে যেভাবে নির্বাচন হয়, এদেশের আগামী নির্বাচনও সেভাবেই হবে। জনগণ যাকে ভোট দেবে তারাই ক্ষমতায় আসবে। সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক উপায়েই সেই নির্বাচন হবে।
তিনি বলেন, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার তিন মাসের কথা বলে দুই বছর থেকে গিয়েছিল। রাজনীতিবিদসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষই তখন নির্যাতনের শিকার হন। আগামীতে যাতে দেশে এমন পরিস্থিতি আর সৃষ্টি না হয় সেটাই আমরা চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দেশে হত্যা-ক্যু, ষড়যন্ত্র, ইমারজেন্সি, আর্মি ব্যাকড সরকার—অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষাই হয়েছে। আগামীতে আর যেন কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে না পারে, সেটাই আমরা চাই। জনগণের ভাগ্য নিয়ে আর কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া হবে না।
টিআইবি রিপোর্ট প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা আরও বলেন, অনেকেই রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের হেয় করতে চাইছেন। বলা হচ্ছে রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদরা দুর্নীতিগ্রস্ত। উদ্দেশ্যমূলকভাবে যে এগুলো বলা হচ্ছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তবে যারা এ তত্ত্ব দিচ্ছেন, তারা কে কত টাকার মালিক, কত কালো টাকা সাদা করেছেন, কে কত টাকা কর দিয়েছেন, সেগুলোও তো খুঁজে দেখা দরকার। দেশ স্বাধীন হয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তেই। রাজনৈতিক নেতারাই দেশ স্বাধীন করেছেন। আবার রাজনৈতিক দলগুলো বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে মানুষের কল্যাণ ও দেশের উন্নয়ন হয়। এই রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের হেয় করে কারা ক্ষমতায় আসতে চান?
আইয়ুব-ইয়াহিয়া-জিয়া-এরশাদের সামরিক শাসনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে অনেকে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে নানা কথা বলে রাতারাতি ক্ষমতা দখল করেছেন। রাজনীতিবিদদের হেয় করে তারাই আবার রাজনীতিবিদ বনে গেছেন।
ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার সম্পর্কে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি তার সরকারের সফলতার বিবরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক চর্চায় বিশ্বাস করে বলেই দেশের সব সেক্টরে উন্নয়ন হয়েছে। তবে চাহিদার তো কোন শেষ নেই। মানুষেরও আকাশছোঁয়া চাহিদা থাকে। তবে আমরা চাহিদার কতটুকু পূরণ করেছি তা একবার ভেবে দেখা দরকার।
সূত্র জানায়, বৈঠকে টাঙ্গাইলের সংসদ সদস্য একাব্বর হোসেন বলেন, নেত্রী সারাদেশে দলের সাংগঠনিক অবস্থা চরম নাজুক। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দিয়েছে। এটি পাঁচটি সিটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ। এ অবস্থা থেকে উত্তোরণ করতে না পারলে জাতীয় নির্বাচনে ভাল ফল পাওয়া যাবে না। বৈঠকে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের প্রতি ইঙ্গিত করে দু’জন সংসদ সদস্য দলীয় মুখপাত্র পরিবর্তনের দাবি তোলেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে দলীয় এমপিদের প্রতি হুশিয়ারি উচ্চারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, দলের যেসব সংসদ সদস্য নেতাকর্মী বিচ্ছিন্ন তারা বিজয়ী হবে না। তারা মনোনয়নও পাবে না। তিনি বলেন, তৃণমূলের মতামতের ভিত্তিতেই প্রার্থী বাছাই করা হবে। শিগগিরই তিনি তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করবেন। ওই বৈঠকের মধ্য দিয়ে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়াও শুরু করা হবে। জেলা নেতাদের ডেকে এনে ১০টি করে প্রশ্ন দেয়া হবে। সে প্রশ্নের উত্তরের ওপর নির্ভর করেই দলীয় প্রার্থী ঠিক করা হবে।
এ সময় সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় প্রসঙ্গ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, সিটি নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় হবে তা আমি জানতাম। যে প্রার্থীকেই ফোন করেছি সে-ই বলেছে, ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার ভোটের ব্যবধানে আমি জয়লাভ করবো। এতো ওভার কনফিডেন্স দেখে আমি অনুমান করেছিলাম কেউই জিততে পারবে না। তবে ফলাফল মেনে নেয়ার মতো মানসিকতা ছিল। গাজীপুরের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে আমাদের তৃণমূল নেতাকর্মীরাই মাঠে নামেনি। তারা সঠিকভাবে কাজ করলে দলীয় প্রার্থী জয়লাভ করতো। কাজেই যেসব এমপি ওভার কনফিডেন্সে ভুগছেন তারা হুশিয়ার হোন।
এর আগে চট্টগ্রামের সংসদ সদস্য আবুল কাশেম ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অবস্থা তুলে ধরে বক্তৃতা করেন। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফজিলাতুন্নেসা ইন্দিরা কথা বলতে চাইলে শেখ হাসিনা বলেন, তোমার কোনো ভোট নেই। তোমার কথা বলতে হবে না বলে তাকে বসিয়ে দেন।
এ সময় অপপ্রচারে বিএনপি-জামায়াত এগিয়ে দাবি করে শেখ হাসিনা তাদের সমালোচনার জন্য দলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে নির্দেশ দেন। এ সময় শেখ হাসিনা খালেদার উদ্দেশে বলেন, তিনি তো শফী সাহেবের তেঁতুল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠক মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ প্রমুখ।

প্রথম পাতা এর আরও সংবাদ

সাপ্তাহিকী


উপরে

X