Amardesh
আজঃঢাকা, বুধবার ১৭ জুলাই ২০১৩, ২ শ্রাবণ ১৪২০, ০৭ রমজান ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

ইউনূস সেন্টারের বিবৃতি : শেখ হাসিনার বক্তব্য পুরোটাই মিথ্যা

স্টাফ রিপোর্টার
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রসঙ্গে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী যেসব মন্তব্য করেছেন তার সবই মিথ্যা বলে মন্তব্য করেছে ইউনূস সেন্টার।
গতকাল ইউনূস সেন্টারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গত ১১ জুলাই গণভবনে মন্ত্রী পরিষদের কয়েকজন সদস্য ও শীর্ষস্থানীয় দলীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনাকালে ড. ইউনূস প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কিছু মন্তব্য করেছেন বলে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ড. ইউনূস সম্পর্কে অনেক অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। অভিযোগগুলো সবই মিথ্যা।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পত্রপত্রিকায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেখে দেশের মানুষ হতবাক হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম প্রধানমন্ত্রী এ রিপোর্টের প্রতিবাদ করবেন এবং বলবেন তিনি এ ধরনের কথা বলেননি। কিন্তু পাঁচদিন যাওয়ার পরও এ প্রতিবাদ আসেনি। তাই বাধ্য হয়ে আমরা আমাদের প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের জন্য এবং ব্যক্তিগতভাবে প্রফেসর ইউনূসের জন্যও বড় রকম তাত্পর্য আছে। এর ফলে দেশের মানুষের মনে কিছু ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে। তাই আমরা এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এ ব্যাপারে ইউনূস সেন্টারের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত বক্তব্য তুলে ধরা হলো :
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ড. ইউনূস একজন স্বার্থপর মানুষ, যিনি নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য যে কোনো কাজ করতে পারেন।
ইউনূস সেন্টারের বক্তব্য : ড. ইউনূস সারা জীবন গরিবের জন্য কাজ করেছেন। ব্যক্তিগত স্বার্থে তিনি কোনো কাজ করেননি। তার মালিকানায় কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই। গ্রামীণ নামধারী কিংবা গ্রামীণ নামধারী নয়, কোনো কোম্পানিতে তার একটিও শেয়ার নেই। গ্রামীণ কোম্পনিগুলো দেশের এবং দেশের গরিব মানুষের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। মুনাফাকেন্দ্রিক বিশ্বকে পরিবর্তনের জন্য ড. ইউনূস যে ‘সামাজিক ব্যবসা’র ধারণা সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দেয়ার আন্দোলনে নেমেছেন, তাকেই কিনা তার দেশের প্রধানমন্ত্রী মহোদয় বলছেন তিনি স্বার্থপর? যেখানে সামাজিক ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো পরার্থপরতা, সেখানে ড. ইউনূস স্বার্থপর হলেন কিভাবে? প্রফেসর ইউনূসের স্বার্থপরতার একটি দৃষ্টান্ত কী প্রধানমন্ত্রী মহোদয় দেবেন? ড. ইউনূস কি গ্রামীণ ব্যাংকের মালিক হয়েছেন? তিনি কি এক লাখেরও বেশি ছেলেমেয়েকে চাকরি দিতে গিয়ে তাদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে বড়লোক হয়েছেন? নাকি তিনি তার কোন ব্যবসায়িক কার্যক্রম থেকে অন্য কাউকে ভাগ দেয়নি বলে তাকে স্বার্থপর বলা হচ্ছে?
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নরওয়ের টেলিনর কোম্পানি প্রফেসর ইউনূসের জন্য লবি করেছে। টেলিনর বিশাল অংকের অর্থ ক্লিনটন ফাউন্ডেশনকে দিয়েছে, যাতে তারা ইউনূসের জন্য নোবেল পুরস্কার এনে দিতে পারে।
ইউনূস সেন্টারের বক্তব্য : প্রধানমন্ত্রী যেহেতু পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের কোনো প্রতিবাদ করেননি, সেহেতু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে সিরিয়াসলি নিতে হবে। বক্তব্যটি দেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকারক। এই বক্তব্য প্রমাণ করার জন্য তার যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ লাগবে। তা না হলে দুটি বন্ধু দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিদেশি তিনটি প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় রকম দুর্নীতের অভিযোগ এসেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। বিষয়টা কেউ হালকাভাবে নেবে না। এ তিনটি প্রতিষ্ঠান হলো ক্লিনটন ফাউন্ডেশন, যেটা প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এবং তিনি সেটা নিজে পরিচালনা করেন। তার স্ত্রী হিলারি ক্লিনটন এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। হিলারি ক্লিনটন আগামীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিযোগিতা করবেন বলে জল্পনা-কল্পনা শোনা যাচ্ছে। তার প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এটা প্রমাণ করা গেলে তার প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আর কোনো সুযোগই থাকবে না। যদি প্রমাণ করা না যায়, তাদের বিরুদ্ধে এই ব্যক্তিগত অভিযোগ করার ফলে তাদের অনুসারীদের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি বিপুল পরিমাণ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।
দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানটি হলো টেলিনর। এটা নরওয়েজিয়ান সরকারের মালিকানায় পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতির এই অভিযোগ নরওয়েজিয়ান সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়াল। তারা আমাদের একটি উন্নয়ন সহযোগী দেশ। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার আগে আমাদের হাতে কী ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ আছে, তা ভালোভাবে যাচাই করে দেখতে হবে। তা না হলে এটা একটা বন্ধুরাষ্ট্রের প্রতি বিরূপ আচরণ করার শামিল হবে।
তৃতীয় প্রতিষ্ঠানটি হলো ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটি’। লবিং করে নোবেল পুরস্কার কেনা যায়—এই অভিযোগের পক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ দিতে পারলে পুরো পুরস্কারটিই আগামীতে তার সব মর্যাদা হারাবে। প্রমাণ করতে না পারলে সেটাও নরওয়েজিয়ান সরকার ও জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্ব সৃষ্টি করবে। কারণ নরওয়ের মানুষ এই পুরস্কারটিকে কেন্দ্র করে জাতীয়ভাবে গর্ব অনুভব করে। এই ব্যাপারে বিনা প্রমাণে দুর্নীতির অভিযোগ তাদের সবাইকে বিশেষভাবে আহত করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, গরিব মানুষকে ঋণ দেয়ার জন্য গ্রামীণ ব্যাংক সৃষ্টি করা হয়েছিল। কিন্তু এই ব্যাংকের টাকা ড. ইউনূস গ্রামীণ শক্তি ও এ ধরনের অন্যান্য ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে সরিয়ে ফেলেছেন।
ইউনূস সেন্টারের বক্তব্য : গ্রামীণ ব্যাংকের বিধান অনুসারে গ্রামীণ ব্যাংক তার পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে, দাতা সংস্থাগুলোর শর্তানুসারে দাতা সংস্থা কর্তৃক প্রদত্ত টাকা ব্যবহার করেছে। প্রফেসর ইউনূস তার ব্যক্তিগত কোনো প্রতিষ্ঠানে কোনো টাকা সরিয়ে ফেলেননি। তার কোনো ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানই নেই, তাই ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে টাকা সরিয়ে ফেলার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রফেসর ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের টাকায় এমনকি ‘ইউনূস সেন্টার’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার ভাইয়েরা এবং আত্মীয়-স্বজনরা গ্রামীণ ব্যাংক এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে অনেক আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন।
ইউনূস সেন্টারের বক্তব্য : অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। গ্রামীণ ব্যাংক ইউনূস সেন্টারকে কখনো কোনো টাকা দেয়নি। একজন সম্মানিত প্রধানমন্ত্রী দেশের একজন সম্মানিত নাগরিক সম্বন্ধে মিথ্যা বক্তব্য দেবেন, এটা কখনো কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তিনি যদি তার বক্তব্য প্রমাণ করতে না পারেন, তাহলে তার বক্তব্য প্রত্যাহার করাটাই সম্মানজনক পন্থা হবে।
ইউনূস সেন্টার সম্পূর্ণভাবে প্রফেসর ইউনূসের নিজস্ব উপার্জনের টাকা দিয়ে চলে। তিনি তার নিজস্ব টাকা ইউনূস সেন্টারকে দান করেন। প্রতিবছর বিভিন্ন সম্মেলনে বক্তৃতা দিয়ে তিনি যে উপার্জন করেন তার সামান্য অংশ দিলেই এর খরচ পুষিয়ে যায়। প্রতিবছর তিনি অনেক বক্তৃতা করেন। প্রতি বক্তৃতার জন্য তিনি বিরাট অঙ্কের সম্মানী পান। তার থেকে একটা বা দুটো বক্তৃতা থেকে প্রাপ্ত সম্মানীর টাকা দিলেই ইউনূস সেন্টারের সব খরচ বহন করা হয়ে যায়। ইউনূস সেন্টারের অফিস গ্রামীণ ব্যাংক ভবনে অবস্থিত। গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড গ্রামীণ ‘নোবেল লরিয়েট ট্রাস্ট’ নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করে ব্যাংকের একটি ফ্লোর এই ট্রাস্টকে ২৫ বছরের জন্য বিনা মূল্যে ইজারা দেয়।
তার ভাইদের প্রসঙ্গে প্রফেসর ইউনূস আগেও বলেছেন। তার দুই ভাই ঢাকায় থাকেন। মুহাম্মদ ইব্রাহীম এবং মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর। মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে গ্রামীণের কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক নেই। মুহাম্মদ ইব্রাহীম তার যোগ্যতায় চারটি মুনাফাবিহীন গ্রামীণ কোম্পানির বোর্ডের সদস্য। বোর্ডের কোনো সদস্য এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো আর্থিক সুবিধা নিতে পারে না, তারা শুধু বোর্ড সভায় যোগদান করেন। ড. ইব্রাহীম ছাড়া আর কোনো ভাইয়ের সঙ্গে গ্রামীণ নামধারী কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রফেসর ইউনূসের কোনো আত্মীয়- স্বজনের সঙ্গে গ্রামীণ নামধারী কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রধানমন্ত্রী মিথ্যা অভিযোগ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, একটি শক্তিশালী দেশ প্রফেসর ইউনূসকে এতদিন মদত দিয়ে এসেছে। এমন দিন আর দূরে নয় যেদিন সে দেশের মানুষ যখন প্রফেসর ইউনূসের অজানা সব তথ্য জেনে যাবে, তখন তারা প্রফেসর ইউনূসের কাছ থেকে সব সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয়ার জন্য তাদের সরকারের ওপর চাপ দেবে। সেদেশের সরকার যখন মুখ ফিরিয়ে নেবে, তখন প্রফেসর ইউনূস যাবেন কোথায়?
ইউনূস সেন্টারের বক্তব্য : ড. ইউনূস কোনো এক বা একাধিক দেশের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে কাজ করেন না। তিনি যেটা ভালো মনে করেন, সেটা করে যান। তার কাজ দেখে যেমন এদেশের মানুষ তাকে গভীরভাবে ভালোবাসেন, অন্য দেশের মানুষও তেমনি তাকে গভীরভাবে ভালোবাসেন। বাংলাদেশ সরকার বহুরকমভাবে এমনকি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ব্যবহার করে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রফেসর ইউনূসের ‘দুর্নীতি ও অনাচারের’ মিথ্যা তালিকা প্রচার করেও না দেশের মানুষ, না বিদেশের মানুষকে প্রফেসর ইউনূসের তথাকথিত অজানা কাহিনীগুলো বিশ্বাস করাতে পেরেছে। একজন নাগরিককে ভণ্ড প্রমাণ করার পেছনে সরকার যতই তার মেধা ও অর্থ ব্যয় করছে, ততই সে নিজে নিজের দেশের সামনে, দুনিয়ার সামনে নিজেকে ভণ্ড প্রমাণ করে যাচ্ছে। পৃথিবীর সম্মানের আসন থেকে বাংলাদেশকে ক্রমেই তাচ্ছিল্যের দূরত্বে সরিয়ে দিচ্ছে।