Amardesh
আজঃঢাকা, বুধবার ১৭ জুলাই ২০১৩, ২ শ্রাবণ ১৪২০, ০৭ রমজান ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

মাগফিরাত লাভের অপূর্ব সুযোগ

মাওলানা মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম (রহ.)
পরের সংবাদ»
এতেও এ কথাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, রমজানের রোজা হলো গোনাহ মাফ করানোর ও মাগফিরাত লাভ করার তথা চিরশান্তি, চিরমুক্তি লাভের একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা, একটি অতি নির্ভরযোগ্য সুযোগ।
কিন্তু যে এ সুযোগের সদ্ব্যবহার না করে তার ধ্বংস অনিবার্য, তার বিপদ অবশ্যম্ভাবী।
আর রোজাদার সম্পর্কে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এ সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন :
অনেক রোজাদার রয়েছে যাদের রোজায় অনাহারে থাকা ছাড়া কোনো উপকার নেই; আর অনেক লোক রয়েছে যারা রাতে জাগ্রত থেকে নামাজে দণ্ডায়মান হয়, জাগরণ ছাড়া তাদের কোনো উপকার নেই। কেননা সারাদিন রোজা রেখে হারাম অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থসম্পদ দিয়ে ইফতার করলে রোজা বা নামাজ দ্বারা কী উপকার হতে পারে?
অতএব, রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা না হলে, রোজার হক আদায় না করা হলে এর আসল উদ্দেশ্য হয় ব্যর্থ।
আত্মশুদ্ধি লাভ করে মানুষ যেন উন্নততর মহত্ত্বর চারিত্রিক গুণাবলীর অধিকারী হতে পারে, সংযম অভ্যাস করে আল্লাহ্পাকের বিধি-নিষেধ পালনে অভ্যস্ত হতে পারে, সবার ওপর এ জীবন-সাধনার মাধ্যমে পরম করুণাময় আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হতে পারে—এজন্যই রোজাসহ অন্যান্য ইবাদতের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কিন্তু যদি গাফলতি বা অবহেলা অথবা অন্য কোনো কারণে এ উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হলো তবে জীবন সাধনার ব্যর্থতা হবে অনিবার্য।
এ পর্যায়ে আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কয়েকটি মহান বাণী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হজরত আবু হুরায়রা (রা,) থেকে বর্ণিত হাদিসে হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন : আমার উম্মতকে রমজান শরীফের ব্যাপারে এমন পাঁচটি বৈশিষ্ট্য দান করা হয়েছে যা আর অন্য কোনো উম্মতকে প্রদান করা হয়নি।
১. রোজাদারের মুখ থেকে যে খুশবু বেরোয় তা আল্লাহ্পাকের কাছে কস্তুরি থেকেও অধিকতর পছন্দনীয়।
২. রোজাদারের জন্য সমুদ্রের মাছ পর্যন্ত দোয়া করতে থাকে এবং ইফতারের সময় পর্যন্ত তারা দোয়া করতে থাকে।
৩. প্রতিদিন জান্নাতকে রোজাদারের জন্য সুসজ্জিত করা হয়। আল্লাহ্পাক ইরশাদ করেন : আমার নেক বান্দারা দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট পশ্চাতে রেখে অতি শিগগিরই আমার কাছে আসবে।
৪. রমজানে দুর্বৃত্ত শয়তানকে বন্দি করা হয়, ফলে সে রমজানে সেসব অন্যায়ের দিকে ধাবিত হতে সক্ষম হয় না, যা রমজান ছাড়া অন্য সময়ে সক্ষম হয়।
৫. রমজানের শেষ রাতে আল্লাহ্পাক রোজাদারদের মাগফিরাত দান করেন।
সাহাবায়ে কিরাম জিজ্ঞাসা করলেন—এ রাত কি শবে-মাগফিরাত না শবেকদর? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন : না, বরং নিয়ম হলো এই যে, শ্রমিক যখন তার কাজ শেষ করে তখন তাকে পারিশ্রমিক দিয়ে দেয়া হয়।
অন্য একটি হাদিসে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন : যদি মানুষ জানত রমজানের সত্যিকার মাহাত্ম্য কী তবে আমার উম্মত আকাঙ্ক্ষা করত যেন সারা বছর রমজান হয়।
আর একটি হাদিসে ইরশাদ হয়েছে : রমজান মুবারকের রোজা এবং প্রতি মাসের তিনটি রোজা অন্তরের সব খুঁত ও সন্দেহ দূর করে।
হজরত উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন : রমজানুল মুবারকে আল্লাহ্পাককে স্মরণকারী ব্যক্তিকে মাফ করা হয়, আর আল্লাহ্পাকের মহান দরবারে প্রার্থনাকারী ব্যক্তি বঞ্চিত হয় না।
হজরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, রমজানের প্রত্যেক রাতে একজন ফেরেশতা এই ঘোষণা করে, হে কল্যাণকামী! এদিকে মন দাও, কল্যাণের পথে অগ্রসর হও। হে অন্যায়কারী! এবার বিরত হও। চক্ষু খোল। এরপর সেই ফেরেশতা বলে :
আছে কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থী? যাকে ক্ষমা করা যায়।
আছে কি কোনো তওবাকারী? যার তওবা কবুল করা যায়।
আছে কি কোনো প্রার্থনাকারী? যার প্রার্থনা মঞ্জুর করা যায়।
অর্থাত্ রোজাদারের যে কোনো নেক দোয়া আল্লাহপাক কবুল করেন। যে সিয়াম সাধনায় রত, যে আল্লাহ্পাকের প্রেমে মুগ্ধ হয়ে পালন করছে রোজা, তার সব প্রার্থনা আল্লাহপাকের দরবারে গ্রহণ করা হয়, তার যাবতীয় প্রয়োজনের আয়োজন করা হয়।
এমনকি একখানি হাদিসে ইরশাদ হয়েছে : ‘আল্লাহপাক তাঁর আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের নির্দেশ দান করেন, তোমাদের নিজস্ব ইবাদত মুলতবি রাখ এবং রোজাদারদের দোয়ার সময় আমিন বলতে থাক।’
রোজাদারের দোয়া মঞ্জুর করাই যে আল্লাহপাকের মর্জি, এ হাদিস দ্বারাও একথাই প্রমাণিত হয়।
হজরত রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন : রোজাদারের উচিত মিথ্যা কথা থেকে বিরত থাকা, কেউ যদি কারও সঙ্গে ঝগড়া করে এবং গালাগাল করে, তবে তার বলা উচিত—ভাই আমি রোজাদার, তোমার গালির জবাব আমি দেব না।
আল্লাহপাকের ইরশাদ : সব নেক কাজের সওয়াবই দশ গুণ হারে হয়ে থাকে, কখনও কখনও তা পাঁচশ’ গুণ পর্যন্ত হয়ে থাকে আবার একটি নেক কাজের বদলে সাতশ’ গুণ সওয়াবও লিপিবদ্ধ করা হয়। কিন্তু রোজা সব নেক কাজ থেকে স্বতন্ত্র। এই নেক কাজের সম্পর্ক বিশেষভাবে আমারই সঙ্গে, তার বদলা আমিই দান করব, বান্দা তার পানাহারের আগ্রহ আমার জন্যই দমন করে থাকে, সুতরাং আমি নিজ হাতে তার মূল্য বা পুরস্কার দান করব। (হাদিসে কুদসি ও মুসলিম শরীফ)
রোজাদাররা জান্নাতের একটি বিশেষ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। সেই দরজার নাম রাইয়ান। যখন রোজাদারদের প্রবেশ করা শেষ হবে তখন সে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। অতঃপর অন্য কেউ আর সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। ‘রাইয়ান’ দরজা দিয়ে প্রবেশকারীদের কখনও তৃষ্ণার কষ্ট হবে না। (তিরমিযি শরীফ)
হে লোকসব! জিহাদ করতে থাক, আল্লাহ্ তায়ালা সম্পদ দান করবেন। রোজা রাখতে থাক, স্বাস্থ্যসুখ লাভ করবে। ভ্রমণ করতে থাক, সম্পদশালী হবে।
রোজা এবং কোরআন শরীফ উভয়ই কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। রোজা বলবে : আমার জন্য এই বান্দা খানা-পিনা বন্ধ রেখেছিল তার জন্য আমার সুপারিশ কবুল করা হোক। কোরআন শরীফ বলবে : আমার কারণে সে রাত্রিকালে শয়ন করেনি তার জন্য আমার সুপারিশ কবুল করা হোক। অতঃপর আল্লাহ্ তায়ালা উভয়ের সুপারিশই গ্রহণ করবেন।
হজরত আবু উমামা (রা.) আরজ করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম! উত্তম কোনো আমল আমাকে শিক্ষা দিন। হজরত রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন—রোজা রাখতে থাক, এর চেয়ে উত্তম আমল আর কিছুই নেই।
আল্লাহপাক আমাদের এর তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : সাবেক খতিব, লালবাগ শাহী মসজিদ