Amardesh
আজঃঢাকা, বুধবার ১৭ জুলাই ২০১৩, ২ শ্রাবণ ১৪২০, ০৭ রমজান ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

নির্বাচনে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক বিষয়

এ র শা দ ম জু ম দা র
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
প্রশ্ন উঠেছে ধর্মকে জাতীয় জীবনে বিশেষ করে নির্বাচনের মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সামনে আনা যাবে কিনা বা আলোচনা করা যাবে কিনা। চলমান সরকার এবং নির্বাচন কমিশন বলছে রাজনীতি বা নির্বাচনে ধর্ম নিয়ে কথা বলা যাবে না। কেন বা এর কারণ কী? উত্তর, ধর্ম খুবই একটা স্পর্শকাতর বিষয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষ ধর্মের ব্যাপারে খুবই ভাবপ্রবণ বা কাতর। তাই নির্বাচনে ধর্মকে আলোচনার বিষয় করা যাবে না। মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির নেতা সেলিম বলেছেন, ধর্ম পারলৌকিক বিষয়, ইহলৌকিক বিষয়ে এর ব্যবহার করা যাবে না। তার কথা ধর্ম রাজনীতির বিষয় হতে পারে না। আওয়ামী লীগের সিনিয়ার নেতা তোফায়েল বলেছেন, গাজীপুর নির্বাচনে ধর্মকে ব্যবহার করা হয়েছে, যা সংবিধান পরিপন্থী। বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ। ইংরেজি শব্দ সেক্যুলার (ঝবপঁষধত্) অনুবাদ করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ। যা ভুল অনুবাদ। সেক্যুলারের অর্থ হচ্ছে জাগতিক বা ইহলৌকিক। মানে যিনি বা যারা পরলোক বা পারলৌকিক বিষয়ে বিশ্বাস করেন না। বাংলাদেশের নাগরিকরা সবাই নিজ নিজ ধর্মে বিশ্বাস করেন। পরলোকেও বিশ্বাস করেন। তাদেরও স্বর্গ-নরক আছে। কিন্তু ধর্ম বিশ্বাসে বাংলাদেশের ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান। ইসলাম একমাত্র ধর্ম যা ইহলোক, পরলোক, রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজনীতিসহ সবকিছুকেই সমন্বিত করে একস্থানে উপস্থাপিত করেছে। মদিনার রাষ্ট্রই জগতে গণমানুষের প্রথম রাষ্ট্র। যখন সারাবিশ্ব সম্রাট, রাজা বাদশাহদের দাপটে কম্পিত; তখনই আল্লাহর রাসুল মোহম্মদ (সা.) মদিনায় গণমানুষের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এটাই জগতের প্রথম রাষ্ট্র যেখানে ধনী-গরিব ও সর্বহারাদের অধিকারকে সংরক্ষণ ও সমন্বিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে এ রাষ্ট্রে আশরাফ (অভিজাত) আতরাফ (সাধারণ), ধনী-গরিবের কোনো মানদণ্ড থাকবে না। সুনাগরিকের একমাত্র মানদণ্ড আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস। যেমন হজরত বেলাল (রা.) ছিলেন একজন সর্বহারা এবং মদিনা রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ সম্মানিত ব্যক্তি। বেহেশতে যাওয়ার জন্য সুসংবাদ প্রাপ্ত প্রথম দশজনের মধ্যে প্রথম দিকের একজন। ইসলামে রাষ্ট্র কিরূপ হবে তার সুস্পষ্ট বর্ণনা এবং ব্যাখ্যা আল কোরআন ও হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। এইতো মাত্র কয়েকদিন আগেই আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মদিনা রাষ্ট্র নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি না জেনে বা না বুঝে বলে ফেলেছেন, রাষ্ট্র্র মদিনা সনদ অনুযায়ী চলবে। তাকে কে বা করা বুঝিয়েছে, মদিনা সনদ সেক্যুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষ। তাই তিনি বলে ফেলেছেন মদিনা সনদের কথা। মদিনা রাষ্ট্র সব ধর্ম ও বর্ণের লোকদের নিয়ে গঠিত হয়েছে। কিন্তু এর সংবিধান বা সনদ ছিল আল কোরআন ও রাসুলের (সা.) হাদিস। এ সনদ সনদ শুরুই হয়েছে, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। জাতীয় কোনো ইস্যুতে মতভেদ দেখা দিলে ফায়সালার মালিক ছিলেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)। মদিনার অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও এ সনদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। নির্বাচনের ম্যানিফেস্টোতে ধর্মের উপস্থিতি সব সময় ছিল। ১৯৫৪ সালে ইসলামী দলগুলোকে নিয়েই যুক্তফ্রন্ট করা হয়েছিল। ২১ দফার একটি দফা ছিল কোরআন ও সুন্নাহ বিরোধী কোনো আইন করা হবে না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ও দফাটি রেখেছে। এর মানে ধর্ম সব সময় উপস্থিত আছে। অতি সম্প্রতি আওয়ামী লীগ সংবিধান থেকে আল্লাহর নাম তুলে দিয়েছে। কোরআন ও সুন্নাহ বিরোধী কথা বলছে। সংবিধানে সেক্যুলার বা ধর্মহীনতার কথা লেখা থাকাতে এখন রাজনীতিতে আল্লাহর কথা বলা যাবে না। সংবিধানে আছে জনগণই সার্বভৌম, আর ইসলাম বলে আল্লাহ সার্বভৌম। এবার আপনারাই বলুন, একজন মুসলমান কোন দিকে যাবেন। আমি যদি বলি আল্লাহ সার্বভোম, তখনই আওয়ামী লীগ ও তার বন্ধুরা তেড়ে আসবেন এবং বলবেন আমি সংবিধান মানি না। কোরআন বলছে মানুষ আল্লাহর দাস, আর বাংলাদেশের সংবিধান বলছে না, বাংলাদেশের মানুষের ওপর আল্লাহর সার্বভৌমত্ব নেই (নাউজুবিল্লাহ)। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বহু শিক্ষিত মানুষ এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল নন। তাই তারা এ বিষয়ে ভাবেন না। যারা সেক্যুলার বা ইহলোকিক তাদের বিষয়টা আলাদা। তারা বলেন, ধর্ম মানি, আল্লাহ মানি, কিন্তু পরলোকে বিশ্বাস করি না। জগত্ই মানুষের শেষ ঠিকানা। রাসুলের (সা.) জামানায়ও এমন ধারা লোক ছিল। এরা আসলে মোনাফিক, অবিশ্বাসী কাফিরের চেয়েও এরা খারাপ; এরা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড। এরা মানুষকে ধোঁকা দেয়। এরা নির্বাচন এলে মাথায় টুপি দেয়। জামাতে নামাজ পড়ার ভান করে। নারী রাজনীতিকরা হিজাব পরেন, ফুলহাতার জামা পরেন। এর কারণ তারা জানেন, ভোট পেতে হলে তাদের এ ভণ্ডামি করতে হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকতো বলেই দিয়েছেন, তিনি হিন্দু মুসলমান কিছুই নন। তার স্ত্রীও মুসলমান নন। প্রধানমন্ত্রীর ছেলে জয় খ্রিস্টান বিয়ে করেছেন। তার বোনঝি মানে শেখ রেহানার মেয়ে অমুসলমান বিয়ে করেছেন। এসব ব্যাপারে দেশবাসীর কিছু বলার আছে কিনা আমি জানি না। কিন্তু রাজনীতিতে এসব নিয়ে আলোচনা হতেই পারে।
পাকিস্তানের বাঙালিরা স্বাধীনতা চেয়েছে কেন? এর উত্তর একেক জনের কাছে একেক রকম। পাকিস্তানের ভৌগোলিক সীমারেখায় আমাদের পরিচয় ছিল পাকিস্তানি বাঙালি বা বাঙালি মুসলমান। পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের বিরোধ কি নিয়ে ছিল? এর উত্তরও একরকম নয়। আমার কাছে এর উত্তর শোষণ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানরা মানে বাঙালি মুসলমানরা ব্রিটিশ আমলেও সীমাহীন শোষণের স্বীকার হয়েছিল। যে কারণে, আরব, পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি ও ইংরেজ বণিকরা এদেশে এসেছিল তার প্রধান কারণ ছিল এদেশের সম্পদ। অখণ্ড বঙ্গদেশে ’৪৭ সালে লোকসংখ্যা ছিল সাত কোটির মতো। এখন প্রায় ২৫ কোটি। শোষিত পূর্ববঙ্গ বা পরে পূর্ব পাকিস্তানে ’৪৭ সালে লোকসংখ্যা ছিল সাড়ে চার কোটি। ’৭১ সালে ছিল সাড়ে সাত কোটি। ৪২ বছর পর এখন লোকসংখ্যা হচ্ছে প্রায় ১৬ কোটি। প্রশ্ন হলো ’৭১ সালে কেন আমরা একটা আলাদা স্বাধীন দেশ গঠন করলাম? মুসলমান হিসেবে পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ বা লড়াই ছিল না। আমরা মানে বাঙালি মুসলমানরা ছিলাম মেজরিটি। আমরাই পাকিস্তান বানিয়েছি। কিন্তু পরে দেখা গেল পাকিস্তানটা একটা সীমাহীন বৈষম্যের দেশে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতাসীন দল বা সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি মুসলমানদের শোষণ অব্যাহত রেখেছে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সমঝোতার পথ পরিহার করে শক্তি প্রয়োগের পথ অবলম্বন করে। সেই বল প্রয়োগের বিরুদ্ধেই ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তানিরা বল প্রয়োগ না করলে কী হতো? এ ব্যাপারেও নানা জনের নানা মত আছে। আমি মনে করি সমঝোতাই হচ্ছে গণতন্ত্রের পথ। পাকিস্তানিরা গায়ের জোরে সে পথ পরিহার করেছে। এর প্রধান উসকানিদাতা ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো।
আমরা এখন স্বাধীন। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ৪২ বছর পার হয়ে গেছে। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে আমরা মুসলমান না শুধুই বাঙালি। বিরাট প্রশ্ন। এ নিয়ে দিনরাত সেমিনার আলাপ আলোচনা চলছে। একদল বলছে আমরা শুধুই বাঙালি। ধর্মীয় দ্বিজাতি তত্ত্বের কবর দিয়েছি আমরা ১৯৭১ সালে। সুতরাং বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রধান পরিচয় বাঙালিত্ব বা বাঙালিয়ানা। এখানে ধর্মের কোনো স্থান নেই। শুধু ভাষার কারণেই আমরা স্বাধীন হয়েছি। পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের লড়াই ছিল ভাষা নিয়ে। তাই আমরা ’৭১ সালে যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছি। এ ব্যাপারে আমার বিশ্বাস ও মত একেবারেই ভিন্ন। আমি মনে করি পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের দ্বিমত বা লড়াইয়ের মূল কারণ ছিল রাষ্ট্রীয় জীবনের সব ক্ষেত্রে সীমাহীন বৈষম্য ও শোষণ। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফার মূলমন্ত্রই ছিল সব ধরনের বৈষম্য দূর করা। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের রাত পর্যন্ত তিনি ও তার দলের শীর্ষ নেতারা ছয় দফা নিয়েই আলোচনা করেছেন। ছয় দফা ছিল মূলত একটি কনফেডারেশনের প্রস্তাব। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকরা তা গ্রহণ করতেও ব্যর্থ হয়। আলোচনাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছেন ভুট্টো ও পাকিস্তানের কিছু আমলা এবং জেনারেল। ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর চেষ্টাতো ছিলই। সে সময় ধর্ম, ইসলাম বা মুসলমানিত্ব নিয়ে বিরোধ ছিল না বা এ নিয়ে কোনো দ্বিমত বা বিরোধ ছিল না।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরা যদি সামরিক আক্রমণ না করত তাহলে কি হতো? যদি আলো না অব্যাহত থাকত তাহলে কী হতো? বঙ্গবন্ধু শেষমুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সেনা বাহিনীর একাংশ ও ভুট্টো পাকিস্তানের অস্তিত্বের সঙ্গে বেঈমানি ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা ভারতের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কাজ করেছে। পাকিস্তানের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাঙালি মুসলমানদের সশস্ত্র প্রতিরাধ ছিল অতীব ন্যায় সঙ্গত। একটি কথা আমাদের সবাইকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে মুসলমান বা বাঙালি হিসেবে বা অস্তিত্ব নিয়ে কোনো বিরোধ ছিল না। আগেই বলেছি, বিরোধটা ছিল সীমাহীন বৈষম্য। রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক স্বাধীনতা রক্ষার জন্য জগতের যে কোনো মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বা মুক্তি অপরিহার্য। এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা পাকিস্তানি শাসকরা বুঝার চেষ্টা কখনই করেনি। শুধু রাজনৈতিক বা ভৌগোলিক স্বাধীনতা মানুষকে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা দিতে পারে না। আগেই বলেছি ব্রিটিশ শাসনামলে সবচেয়ে বেশি শোষিত ও অত্যাচারিত হয়েছে বাংলার মুসলমানরা। ইংরেজ শাসক ও হিন্দু জমিদাররাও মুসলমানদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। তাই তারাই বেশ ত্যাগ স্বীকার করেছে পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য। কিন্তু তাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে ১৯৪৭ সালের পর পরই। প্রথমেই বিরোধ বাধে ভাষা নিয়ে। তারপর আস্তে আস্তে অন্য দাবি যোগ হতে থাকে। এক নম্বর দাবিতে পরিণত হয় অর্থনৈতিক বৈষম্য। পাকিস্তানি শাসকরা এ দাবি পূরণে একেবারেই ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগের ভরাডুবির পর এই অঞ্চলে দলটি আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। পূর্বপাকিস্তানে মুসলিম লীগ নেতাদের কোনো দূরদর্শিতাও ছিল না। ফলে ২৩ বছরের মাথায় পাকিস্তান আর টিকে থাকতে পারেনি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়। এ বাংলাদেশের মূল জনতা হচ্ছে দরিদ্র কৃষক ও শ্রমিক। যাদের ৯৭ ভাই হচ্ছে মুসলমান। ৪২ বছরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে কয়েক হাজার মানুষ দেশের সম্পদ লুট করে নিজেরা ধনী হয়েছে। পাকিস্তান আমলের ২২ পরিবারের জায়গায় এখন ২২ হাজার পরিবার সীমাহীন সম্পদের মালিকে পরিণত হয়েছে। দরিদ্র দিনমুজুর, কৃষিশ্রমিক বা সাধারণ শ্রমিকরা এখন দুই টাকার জায়গায় দিনে দুইশ’ টাকা কামায়। শিক্ষা তাদের কাছে পৌঁছতে পারেনি। তাদের চিকিত্সাও হয় না। এ ব্যর্থতার ষোলোআনা দায়ভার হলো রাজনীতিকদের। টিআইবি বলছে দেশের রাজনীতিকরা সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিবাজ। একজন সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী যিনি একবার সংসদ সদস্য হতে পেরেছেন তিনিই ধনী বা বিত্তবান হয়ে গেছেন। রাজনীতিকদের কাছে কেউ হিসাব ও চাইতে পারে না। এর মানে রাজনীতিকরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে।
শুরুতেই বলেছি, আজকের আলোচ্য বিষয় হলো রাজনীতি বা নির্বাচনে ধর্মের প্রভাব। আমি মনে করি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে ধর্ম একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারা ধর্ম মানে বলেই সমাজে নীতি নৈতিকতা এখনও জারি আছে। মানুষ বিশ্বাস করে অন্যায় অবিচার করলে পরলোকে কঠিন বিচার হবে। তাই আর্থিকভাবে সমাজের নিম্নবর্গের মানুষেরা সহজে কোনো অপরাধ করে না। বাংলাদেশে সমাজের উচ্চবর্গের মানুষরা সবচেয়ে বেশি অপরাধ করে। পূর্ব-পাকিস্তানে পুঁজির বিকাশের কথা বলে পাকিস্তান আমলে রেহমান সোবহান সাহেবরা অনেক লড়াই করেছেন বাঙালি উঠতি পুঁজিপতিদের পক্ষে। বাংলাদেশ হওয়ার পরে রেহমান সোবহানরাই বঙ্গবন্ধুকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছিলেন। একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বাংলাদেশে কখনোই কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। ফলে ৭২-৭৫ সাল নাগাদ সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে সমাজতন্ত্রের নামে সীমাহীন লুটপাট হয়েছে। কারখানার ম্যানেজার হয় গেছে কারখানার মালিক। যে সমস্যা সে সময় সৃষ্টি হয়েছিল তা আজও বিরাজমান। সে সময়ের রাষ্ট্রীয় লোকসান আজও রাষ্ট্রকে বহন করতে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগের মাথা থেকে সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা বা অর্থনীতির ভূত নামেনি। সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো কিছু বামপন্থী দৈত্য আওয়ামী লীগে ঢুকে বসে আছে। এরাই নাকি শেখ হাসিনাকে চালাচ্ছে। ওদের চালাচ্ছে নাকি ভারত। বাংলাদেশের ধর্মীয় অবস্থানের ব্যাপারে ভারত আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোর অবস্থান একই রেখায়। তারা চায় বাংলাদেশে ইসলাম গৃহধর্ম হিসেবে থাকুক। সমাজে বা রাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা থাকতে পারবে না। আমেরিকা ও ভারতের এবং তাদের মিত্রদের এই ব্রিফিং বহন করছে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা। মিসরের কথা আমরা ভুলতে পারি না। শুধু ইসলামের কারণে মুরসির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে সেনাবাহিনী। পর্দার পেছন থেকে সমর্থন দিয়েছে আমেরিকা, সৌদি আরব ও ইউএই। আমেরিকা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে, এবং বিদেশে সরকারগুলোকে নিজের মতো করে পেতে চায়। ভারতও বাংলাদেশে গণতন্ত্র চায়, কিন্তু তা হতে হবে তাদের পছন্দমতো দলকে ক্ষমতায় বসিয়ে। ১/১১’র সরকারটাও তারাই বসিয়েছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনের ফলাফল তারাই নির্ধারণ করেছিল। এ ব্যাপারে আমি ভারতকে দোষ দিই না। ভারত তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার জন্যই করে। কিন্তু বাংলাদেশে রাজনীতির অবস্থান জাতীয় স্বার্থে তেমন শক্তিশালী নয়। রাজনৈতিক দলগুলো না চাইলেও এখানে ধর্ম বা ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থানটা তৈরি করেছে আওয়ামী রাজনীতি। না চাইলেও আওয়ামী লীগের অবস্থান আজ ইসলামের বিরুদ্ধে। দেশের মানুষ বুঝতে পেরেছে আওয়ামী লীগ ইসলামের পক্ষে নয়। গাজীপুরের নির্বাচনে হেরে তারা এখন আল্লামা শফীর চরিত্র হননের কাজে নেমেছেন। আল্লামা শফী এদের একজন প্রধান ধর্মীয় নেতা। তিনি বার বার বলেছেন, রাজনীতি বা ক্ষমতা তার লক্ষ্য নয়। তিনি সংবিধানে ইসলামের বাস্তবায়ন দেখতে চান। তাই ১৩ দফা দিয়েছেন। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। আওয়ামী লীগ এখন মহা বিভ্রান্তিতে পড়েছে। বুঝতে পারছে না কোনো পথে যাবে। ধর্ম ও হেফাজত তাদের জন্য একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
লেখক : কবি ও ঐতিহ্য গবেষক
www.humannewspaper.wordpress.com