Amardesh
আজঃঢাকা, সোমবার ০১ জুলাই ২০১৩, ১৭ আষাঢ় ১৪২০, ২১ শাবান ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন অপহরণ : চট্টগ্রামে আসামি বলী মুনসুর গুম : পরিবারের অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে

সোহাগ কুমার বিশ্বাস, চট্টগ্রাম
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
চট্টগ্রামের আলোচিত ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন অপহরণ-গুম-খুন মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মুনসুর আহমেদ ওরফে বলী মুনসুরকে পুলিশ গুম করেছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। একই সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া মুনসুরের বন্ধু রিজভী হাসানকে ৯ দিন থানায় আটকে নির্যাতনের পর চারটি পেইন্ডিং মামলায় আসামি করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ২৬ মার্চ ফটিকছড়ির বিবিরহাট বাজারের একটি চায়ের দোকান থেকে প্রথমে রিজভীকে ও পরে একই উপজেলার উত্তরের চোর ভোলার ছোলার পাহাড় এলাকার এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে বলী মুনসুরকে পুলিশের পোশাক পরিহিতরা গ্রেফতার করে নিয়ে আসে। ৪ এপ্রিল রিজভীকে দুটি অস্ত্র ও দুটি ডাকাতি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠালেও আজও বলী মুনসুরের কোনো সন্ধান মেলেনি। পুলিশ বলী মুনসুরকে গ্রেফতারের খবর অস্বীকার করেছে। তবে গত ১৬ এপ্রিল স্থানীয় একটি পত্রিকায় বলী মুনসুর গ্রেফতার সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও পুলিশের পক্ষ থেকে তার ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। ২০০৩ সালের ২২ জুলাই চট্টগ্রামের চকবাজার এলাকা থেকে অপহৃত হন বিএনপি নেতা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন। ২০০৬ সালে ফটিকছড়ির একটি পাহাড়ি এলাকা থেকে তার কঙ্কাল উদ্ধার করে পুলিশ। ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন অপহরণ ও হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত আসামি ফটিকছড়ির খামারপাড়া গ্রামের মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে মনসুর আহমদ ওরফে বলী মনসুর। ২০০৭ সালের শেষের দিকে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন বলী মুনসুর। ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান মুনসুর। ২০১১ সালের শেষে ওই মামলায় মুনসুরের বিরুদ্ধে ফের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। গ্রেফতার এড়াতে বলী মুনসুর নিজবাড়ি ছেড়ে একই উপজেলার উত্তরের চোর ভোলার ছোলার পাহাড় এলাকার চাচা সোলাইমানের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখান থেকেই ২৬ মার্চ রাতে ২ জন পোশাক পরিহিত ও ৮-৯ জন সাদা পোশাকধারী একদল লোক পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। গত তিন মাসেও তার সন্ধান মেলেনি।
বলী মুনসুরের স্ত্রী রাহেনা বেগম জানান, ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন অপহরণ ও হত্যা মামলায় ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তার স্বামীকে ফাঁসিয়ে দেয়া হয়। জেল থেকে বেরিয়ে ফের গ্রেফতার এড়াতে ২ বছর ধরে ভোলার ছোলার পাহাড় এলাকায় আত্মীয়ের বাড়িতে থেকে কৃষিকাজ করে জিবিকা নির্বাহ করছিলেন। ২৭ মার্চ ভোরে তার গ্রেফতারের খবর পেয়ে ওই দিন দুপুরে ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী থানায় খোঁজ করলেও পুলিশ তার গ্রেফতারের খবর অস্বীকার করে। বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করতে ফটিকছড়ি থানার কয়েকজন পুলিশ ও ওই এলাকার কয়েকজন কথিত পুলিশ সোর্স অব্যাহতভাবে হুমকি দিচ্ছে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন তার স্বামী অপরাধী হলে তার বিচার করা হোক। কোনো কারণে তার মৃত্যু হলে তার লাশটি অন্তত ফেরত চান বলী মুনসুরের স্ত্রী।
মুনসুরের চাচা ভোলার ছোলার পাহাড় এলাকার মোহাম্মদ সোলাইমান জানান, তার বাড়ি থেকেই মুনসুরকে গ্রেফতার করা হয়। ২৬ মার্চ রাত ৪টার দিকে কয়েকজন পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাদের ঘরের দরজা খুলতে বলেন। দরজা খুলতে দেরি হওয়ায় তারা ঝাঁপ দিয়ে তৈরি করা দরজাটি বাইরে থেকে ভেঙে ফেলে। এ সময় দুজন পোশাকধারী ৮-১০ জন পুলিশ সদস্য ছিল। তারা হাটহাজারী এবং ফটিকছড়ি থানার সদস্য বলে জানান। তাদের সঙ্গে মুনসুরের বন্ধু রিজভী হাসান হাতকড়া অবস্থায় ছিলেন। রিজভী মুনসুরকে চিনিয়ে দেয়। পুলিশ সদস্যরা মুনসুরকে গ্রেফতার করে অস্ত্র বের করতে বলে। মুনসুর অস্ত্রের বিষয়টি অস্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে তাকে পেটানো শুরু করে। একপর্যায়ে আমাদের ঘরের মধ্যে বেশ কয়েকজায়গায় মাটি খোঁড়ে পুলিশ। অস্ত্র না পেয়ে আবারও মুনসুর ও রিজভীকে একসঙ্গে পেটাতে থাকে। কয়েক মিনিট পিটিয়ে সাদা রঙের মাইক্রোবাসে তুলে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়।
বর্তমানে কারাগারে থাকা মুনসুরের বন্ধু রিজভী হাসান কারাগেটে আমার দেশ-কে জানান, ২৬ মার্চ বিকালে ফটিকছড়ির বিবিরহাট বাজারের বসুন্ধরা হোটেল থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ফটিকছড়ি থানার সামনে থেকে গ্রেফতার করা হলেও তাকে নিয়ে যাওয়া হয় হাটহাজারী থানায়। থানার হাজতখানায় রাখার পর রাত ১২টার দিকে কয়েকজন পুলিশ হাজতে এসে তাকে পেটানো শুরু করে। একপর্যায়ে কয়েক দফায় ইলেকট্রিক শক দেয়া শেষে গাড়িতে তুলে হাটহাজারী ও ফটিকড়ির বিভিন্ন এলাকায় ঘোরাতে থাকে। ভোররাতে ফটিকছড়ির ভোলার ছোলা উত্তরের ছোর পাহাড়ে টিলায় সোলেমানের বাড়িতে নিয়ে যায়। ওই বাড়ির বেশ কয়েকজনের মধ্যে বলী মুনসুরকে চিনিয়ে দিতে বলে। তাদের কথায় আমি বলী মুনসুরকে চিনিয়ে দিই। এরপর তাকে অস্ত্র বের করে দিতে বলে। অস্ত্র না পাওয়ায় মুনসুরসহ আমাকে পেটানো হয়। তরপর আবারও তাদের গাড়িতে তুলে হাটহাজারী থানায় নিয়ে আসা হয়। সকালে আমাদের দু’জনকেই ইনজেকশন দেয়া হয়। এরপর জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। সন্ধ্যায় জ্ঞান ফেরে। ওই রাতে আবারও আমাদের দুজনকে একসঙ্গে একটি ঘরে নিয়ে বেঁধে রাতভর পেটানো হয়। সকালে আবার ইনজেকশন দিয়ে সংজ্ঞাহীন করে রাখা হয়। এভাবে তিন দিন চলে। ৩০ মার্চ রাতে মুনসুরকে হাজতখানা থেকে বের করে নিয়ে যায় পুলিশ; এরপর আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি। গ্রেফতারের ৯ দিন পর ৪ এপ্রিল রিজভীকে একটি অস্ত্র ও একটি ডাকাতি মামলায় আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। রিমান্ডে ফের নির্যাতন করে আরও একটি অস্ত্র ও একটি ডাকাতি মামলায় ফাঁসিয়ে আবারও রিমান্ডে নিয়ে টানা ২০ দিন তার ওপর পুলিশ অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে বলে জানান রিজভী। সব থেকে চমকপ্রদ তথ্য হলো রিজভীর বিরুদ্ধে সবক’টি মামলা ফটিকছড়ি থানায় হলেও তাকে আটকে রাখা হয়েছিল হাটহাজারী থানায়। এমনকি খাতা-কলমে ফটিকছড়ি থানায় রিমান্ডে নিলেও রাখা হয়েছিল হাটহাজারী থানায়। হাটহাজারী থানার এসআই শরীফ, এসআই আনিছ, এসআই মিথুন তাদের ওপর প্রতিরাতে নিয়মিত নির্যাতন চালাত। এ সময় ফটিকছড়ি থানার ওসি তদন্ত মনজুর কাদের মজুমদার, এএসআই মাজেদ, হাটহাজারী থানা সার্কেল আ ফ ম নিজামউদ্দিন উপস্থিত থাকতেন বলে জানান রিজভী।
সহকারী পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) আ ফ ম নিজাম উদ্দিন জানান, বলী মুনসুর নামের কোনো ব্যক্তিকে আটক বা গ্রেফতার করার খবর তার জানা নেই। একাধিক ডাকাতি ও অস্ত্র মামলায় অভিযুক্ত রিজভী হাসান নামের এক ব্যক্তিকে ৩ এপ্রিল রাতে ফটিকছড়ির ঝংকার সিনেমা হলের পাশ থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ২৬ মার্চ গ্রেফতার করে আটকে রেখে নির্যাতন করার অভিযোগ ঠিক নয়।