Amardesh
আজঃঢাকা, সোমবার ০১ জুলাই ২০১৩, ১৭ আষাঢ় ১৪২০, ২১ শাবান ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

গাজীপুর সিটি নির্বাচনে দশ ফ্যাক্টর

এম আবদুল্লাহ
পরের সংবাদ»
রাজধানীর উপকণ্ঠে অবস্থিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচনে লড়াই এখন তুঙ্গে। আয়তন ও ভোটার সংখ্যার দিক থেকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট গ্রহণের আর মাত্র চারদিন বাকি। শেষ মুহূর্তেও প্রচারণায় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও সমর্থকদের এখন ঘুম হারাম হয়ে গেছে। বৈরী আবহাওয়া কিংবা নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধ—কোনো কিছুই প্রার্থীদের মরণপণ লড়াইয়ে বাধা হতে পারছে না। ৬ জুলাইর এ ভোটাভুটি যেন জাতীয় রাজনীতির দুই মেরুর দুই নেত্রীর প্রেস্টিজ কনসার্ন।
মাত্র ১৫ দিন আগে অনুষ্ঠিত খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহীর নগরপিতা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর সরকার গাজীপুরকে নিয়েছে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার নির্বাচন হিসেবে। যে কোনো মূল্যে জেতার জন্য মরিয়া সরকারের শীর্ষ মহল। এজন্য গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে গাজীপুরে নিয়োগ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে চার সিটিতে জেতার পর বেশ ফর্মে থাকা বিরোধী শিবির গাজীপুরে সরকারকে চূড়ান্ত ধাক্কা দিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। অন্যান্য সিটি করপোরেশনের মতোই গাজীপুরের আগামী শনিবারের ভোটে অনেক ফ্যাক্টর ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে। অন্তত ১০টি ফ্যাক্টর গাজীপুর সিটির নির্বাচনে নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে বলে বিভিন্ন স্তরের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। তবে এ ফ্যাক্টরগুলোর বেশিরভাগই বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মান্নানের পক্ষে। বিরোধী শিবিরের আশঙ্কা ও উদ্বেগ ভুল প্রমাণ হলে অর্থাত্ শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ফলাফল যে অন্য চার সিটির মতো হবে তা পরিষ্কারভাবে আঁচ করা যাচ্ছে।
গতকাল গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করে ও অনুসন্ধান চালিয়ে যেসব তথ্য মিলেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় ও স্থানীয় মিলিয়ে অন্তত যে ১০টি ফ্যাক্টর ৬ জুলাইর নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে, সেগুলো হচ্ছে— ১. সরকারের দুঃশাসন ও গণহত্যা : ১৫ জুন অনুষ্ঠিত চার সিটি নির্বাচনের মতোই গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ব্যাপক প্রভাব পড়ছে জাতীয় রাজনীতির। মহাজোট সরকারের সাড়ে চার বছরে দুর্নীতি, দুঃশাসন, হত্যা, গুম, নিপীড়ন, নির্যাতন, মামলা-হামলা, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, শেয়ারবাজার লুটসহ সামগ্রিক ব্যর্থতায় অতিষ্ঠ গাজীপুরের জনগণও সিটি নির্বাচনে সরকারকে বার্তা দিতে চায়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও ভোটাররা সিটি নির্বাচনকে সরকার ও বিরোধী দলের লড়াই হিসেবেই নিয়েছে। অধ্যাপক এম এ মান্নান ও আজমতউল্লাহ খানের ভোটযুদ্ধ হয়ে উঠেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার মধ্যকার লড়াইয়ে। প্রচারযুদ্ধেও পরিষ্কার হয়েছে এটা আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামীবিরোধী শিবিরের যুদ্ধ।
প্রচণ্ড দম্ভ, অহমিকা ও বেপরোয়া আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের ড্যামকেয়ার মনোভাবের যুত্সই জবাব দিতে চায় গাসিক (গাজীপুর সিটি করপোরেশন)-এর প্রায় সাড়ে দশ লাখ ভোটারের অধিকাংশই।
২. মহাজোটের বিভক্তি, একঘরে আওয়ামী লীগ : এর আগে চার সিটিতে মহাজোট অনেকটাই ঐক্যবদ্ধ ছিল। একটিতে জাতীয় পার্টি আলাদা প্রার্থী দিলেও অন্য তিনটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে মাঠে ছিল জাতীয় পার্টি। মহাজোটের অন্যান্য শরিক তো মরিয়া প্রচারণায় ছিল। কিন্তু গাজীপুরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ সিটিতে জাতীয় পার্টির ভোটব্যাংক আছে। উত্তরাঞ্চলের শ্রমিক আর টঙ্গীর পুনর্বাসন এলাকা এরশাদ নগরসহ অর্ধলক্ষাধিক ভোট রয়েছে এরশাদের। এই ভোটব্যাংক এখন বিএনপি সমর্থিত অধ্যাপক মান্নানের পক্ষে। জাতীয় পার্টির সমর্থন পেতে খোদ প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত উদ্যোগী হয়েও ফল হয়নি। এরশাদের মন গলাতে দুই মন্ত্রী ছুটে গিয়েছিলেন এরশাদের প্রেসিডেন্ট পার্কের বাসায়। ব্যর্থ হয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণকেও পাঠানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী প্রায় এক ঘণ্টা ব্যর্থ বৈঠক করেন এরশাদের সঙ্গে। কিন্তু গাজীপুরের জাপা নেতাকর্মীদের অনড় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত মহাজোট ছাড়ার ঘোষণা দিয়ে অধ্যাপক মান্নানের পক্ষে মাঠে নেমেছে জাপা।
আজমতউল্লাহ খান নিজেকে ১৪ দল সমর্থিত প্রার্থী বলে দাবি করলেও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ১৪ দলের শরিকদের মতামতকে কখনোই গুরুত্ব দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি কাউন্সিলর পদেও শরিকদের মতামত নেয়া হয়নি। ফলে জোটগতভাবে কোনো তত্পরতাও দেখা যাচ্ছে না। মহাজোটের অন্য শরিকরা আজমতউল্লাহর সঙ্গে আছেন দায়সারা মনোভাব নিয়ে।
৩. ১৮ দলে সুদৃঢ় ঐক্য ও সংহতি : গাজীপুর সিটিতে ১৮ দলের শরিকদের মধ্যে মোটাদাগে ভোট আছে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটের। অন্য ক্ষুদ্র দলগুলোর সীমিত আকারে কর্মী-সমর্থক আছে। গত সংসদসহ অন্যান্য নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে অনেক ভেদাভেদ, ভুল বোঝাবুঝি, মান-অভিমান ছিল। ফলে গত নির্বাচনে বিএনপিপ্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের পক্ষে জোটের শরিকরা আন্তরিকভাবে কাজ করেনি। এবার শরিক দল, বিশেষ করে জামায়াত ও ইসলামী ঐক্যজোট নেতাকর্মীরা অধ্যাপক মান্নানের টেলিভিশন প্রতীক নিয়ে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন। তারা বলছেন, এটা ব্যক্তি মান্নানের জন্য নয়—সরকার তাদের ওপর যে নিপীড়ন চালাচ্ছে, তার জবাব ব্যালটে দিতে নিজের পকেটের অর্থ খরচ করে কাজ করছেন। জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা নিজ খরচায় জোট সমর্থিত প্রার্থীকে জেতাতে কাজ করছেন দিন-রাত। এ যেন তাদের অস্তিত্বের লড়াই। এ চিত্র দেখে টঙ্গীর আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কালাম অনেকটা ক্ষোভের সুরেই বলেন, সাঈদীসহ জামায়াত নেতাদের বিচারের মুখোমুখি করে সরকার বিএনপি-জামায়াতের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে দিয়েছে। আগে জামায়াত নির্বাচনে নানা ইস্যুতে দরকষাকষি করত। কাউন্সিলর পদে তাদের প্রার্থীর প্রতি সমর্থন আদায়ের শর্ত দিত। এখন তারা অস্তিত্ব রক্ষায় নিঃশর্তভাবে নিজের খেয়ে সরকারবিরোধী প্রার্থীর পক্ষে নেমেছে। তাছাড়া মাওলানা সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর সারাদেশে বিক্ষোভে নির্বিচারে গণহত্যা সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মধ্যেও অনেক সাঈদীভক্ত রয়েছেন বলে আবুল কালাম জানান।
৪. হেফাজতের সমাবেশে গণহত্যা : অন্যান্য সিটি করপোরেশনের মতোই গাজীপুর সিটি এলাকায়ও রয়েছে কয়েকশ’ কওমি মাদরাসা। এসব মাদরাসা ও মসজিদকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের শক্ত অবস্থান রয়েছে। এদের ভোটের সংখ্যাও লাখের কাছাকাছি বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এ ভোটাররা ব্যালটের সামনে গেলে তাদের চোখের সামনে ভেসে উঠবে ৫ মে’র গভীর রাতে শাপলা চত্বরে বাতি নিভিয়ে ভয়ানক হত্যাযজ্ঞের দৃশ্য। তারা আজমতের দোয়াত-কলমে ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সর্বশেষ রঙ মেখে শাপলা চত্বরে শুয়ে থাকার যে গল্প ছেড়ে নিষ্ঠুর উপহাস করেছেন, তার প্রতি সমর্থন জানাতে পারবেন না। বরং অধ্যাপক মান্নানের টেলিভিশনে সিল মেরে জানান দেবেন দেশের হক্কানি আলেম ও নিরীহ মাদরাসা ছাত্রদের হত্যা করলে ভোটের বাক্সে কেমন ভাটির টান পড়ে। চার সিটিতে ভরাডুবির পর গাজীপুরে হেফাজত ফ্যাক্টরকে ভোঁতা করতে সরকার সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। কিন্তু তাতে তেমন একটা ফল হচ্ছে না।
আজমতউল্লাহ খান তার সঙ্গে হেফাজতের বেশ ক’জন আলেম কাজ করছেন বলে যে দাবি করেছেন—এটা আংশিক সত্য। টঙ্গী বাজার এলাকায় আজমতউল্লাহ খানের বাসার কাছাকাছি কয়েকটি মসজিদের ইমাম তার পক্ষে কথা বলছেন। টঙ্গী পৌরসভার মেয়র থাকাকালে সুবিধা লাভসহ বৈষয়িক বিবেচনায় এবং কিছুটা চক্ষুলজ্জার কারণে যে ক’জন ইমাম তার পক্ষে রয়েছেন, হেফাজতের সাধারণ নেতাকর্মীদের ওপর তাদের তেমন প্রভাব নেই। তাছাড়া হেফাজত কর্মীদের কাছে তারা ভোট চাইতে সাহসও পাচ্ছেন না। হেফাজতের গাজীপুর জেলা সভাপতি মুফতি মাসউদুল করীম সরকারি মহলের প্রচণ্ড চাপে একটি বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন হওয়ায় কাউকে সরাসরি সমর্থন দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। পক্ষান্তরে হেফাজতের জেলা সেক্রেটারি মাওলানা ফজলুর রহমান তার প্রার্থিতা অধ্যাপক মান্নানের পক্ষে প্রত্যাহার করে পুরোদমে কাজ করছেন। হেফাজতের আরও শত শত নেতা মাঠে রয়েছেন মান্নানের পক্ষে।
গাজীপুর পুলিশের পক্ষ থেকে হেফাজত নেতাদের ডেকে নিয়ে মান্নানের পক্ষে কাজ না করতে শাসানো হয়েছে। এতে সরকারের বিরুদ্ধে হেফাজতের ক্ষোভ আরও বেড়েছে। হেফাজত নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে যা-ই বলুক, ৬ জুলাইর নির্বাচনে ব্যালটে সরকারকে সমুচিত জবাব দেয়া হবে।
৫. জাহাঙ্গীর নাটক : গাজীপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক যুবলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলমকে নির্বাচনী ময়দান থেকে জোর করে সরিয়ে দেয়াও সরকার সমর্থিত প্রার্থীর জন্য বুমেরাং হয়েছে। জাহাঙ্গীর আলম মাঠে থাকলে ত্রিমুখী লড়াইয়ে অধ্যাপক মান্নানের জেতার সম্ভাবনা থাকলেও ব্যবধান হতো কম। জাহাঙ্গীর আলম আওয়ামী লীগের একাংশের ভোট যেমন পেতেন, তেমনি দলনিরপেক্ষ এবং সরকারবিরোধী শিবিরের কিছু ভোটও টানতে পারতেন বলে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এখন জাহাঙ্গীরের ভোটব্যাংকের প্রায় পুরোটাই অধ্যাপক মান্নানের মার্কায় যাবে বলে জাহাঙ্গীরের সমর্থকরা জানিয়েছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, জাহাঙ্গীরের মূল শত্রুই ছিলেন আজমতউল্লাহ। জোর করে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরিয়ে রাখলেও প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় প্রায় দু’বছর ধরে জাহাঙ্গীর গ্রুপ ও আজমত গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে যে ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে তা শুকায়নি। ফলে কেউ কেউ জাহাঙ্গীরের মার্কা আনারসে এবং অন্যরা অধ্যাপক মান্নানের টেলিভিশনে ভোট দিয়ে মধুর প্রতিশোধ নেয়ার প্রহর গুনছেন। জাহাঙ্গীরের চোখের পানি তারা বৃথা যেতে দিতে চান না। এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে যে, জাহাঙ্গীর তার নির্বাচনী বাজেট ঠিকই খরচ করছেন এবং তা অবশ্যই আজমতউল্লাহর জন্য নয়। নির্বাচনের পর সুবিধাজনক সময়ে জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগ ছেড়ে প্রতিপক্ষ দলে যোগ দেবেন—এমন গুঞ্জনও গাজীপুরে ডালপালা মেলেছে।
৬. আঞ্চলিকতা : আঞ্চলিকতা নির্বাচনে ফ্যাক্টর হয়ে থাকে। গাজীপুরেও ব্যতিক্রম ঘটছে না। এই আঞ্চলিকতাও অধ্যাপক মান্নানের টেলিভিশনের গায়ে সুবাতাস দিচ্ছে। মোট প্রায় সাড়ে ১০ লাখ ভোটের মধ্যে টঙ্গীতে সাড়ে তিন লাখের কিছু বেশি। বাকি ভোট গাজীপুর সদর উপজেলায়। আজমতউল্লাহ খান টঙ্গীতে যখন আঞ্চলিতকতার স্লোগান তুলছেন, তখন গাজীপুরের ৭ লাখ ভোট ওই এলাকার অধিবাসী অধ্যাপক মান্নানের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে। আবার আজমতউল্লাহ খান টঙ্গীতেও একচেটিয়া আধিপত্যের ভরসা করতে পারছেন না। কারণ গত পৌর নির্বাচনে আজমতউল্লাহ খান তার প্রতিপক্ষ প্রার্থী আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত নুরুল ইসলাম সরকারকে ৬ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছিলেন। তবে অভিযোগ আছে, ওই নির্বাচনে এরশাদনগরের একটি কেন্দ্র দখল করে নিয়েছিলেন আজমতউল্লাহর সমর্থকরা। তার আগের নির্বাচনে নুরুল ইসলাম সরকারের বিপরীতে আজমতউল্লাহ জিতেছিলেন মাত্র ৩৩৮ ভোটের ব্যবধানে। এতে দেখা যাচ্ছে, টঙ্গীর ভোটের বড়জোর ৫০ শতাংশ পাবেন আজমতউল্লাহ খান। আর গাজীপুর সদরে অধ্যাপক মান্নান ৫০ শতাংশ পেলেও এগিয়ে যাবেন লক্ষাধিক ভোটে। যদিও গাজীপুর সদরের অধিবাসী জাহাঙ্গির আলম এবং জাতীয় পার্টির ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদ হাসান ভোটের লড়াইয়ে না থাকায় বড় সুবিধা পাবেন অধ্যাপক মান্নানই।
৭. গার্মেন্ট শ্রমিক : শিল্পকারখানা অধ্যুষিত গাজীপুর সিটিতে গার্মেন্ট শ্রমিকের ভোটই তিন লক্ষাধিক বলে জানা গেছে। এ ভোট টানতে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থীই নানা কৌশল নিচ্ছেন। শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করার অঙ্গীকার করছেন। শ্রমিকদের বড় সমস্যা আবাসনের ব্যবস্থা করার অঙ্গীকার ইশতিহারে করেছেন অধ্যাপক মান্নান। আজমতউল্লাহ খানও শ্রমিক আকৃষ্ট করার মতো অনেক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন আজমতউল্লাহ খানের পক্ষে বিবৃতি দিয়ে সমর্থনের কথাও জানিয়েছে।
তবে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের ভোট একচেটিয়া কারও দিকে ঝুঁকবে না। বামপন্থী সংগঠনগুলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকায় আজমতউল্লাহ খান যেমন শ্রমিকদের বড় অংশের ভোট পাবেন, তেমনি রানা প্লাজার মতো ঘটনা, লাগামহীন দ্রব্যমূল্য, ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করতে গিয়ে পুলিশের হাতে নির্যাতিত হওয়ার মতো বহু কারণে অধ্যাপক মান্নানও প্রচুর ভোট টানবেন। এছাড়া শ্রমিকদের বড় একটি অংশ নোয়াখালী অঞ্চলের হওয়ায় তারা সরকারবিরোধী মনোভাবাপন্ন। উত্তরাঞ্চলের শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য অংশ এরশাদের দিকে তাকিয়ে। এসব কারণেও শ্রমিক ভোটে দুর্বোধ্য সমীকরণ হচ্ছে। অবশ্য অনেকের মতে, ভোটের ব্যাপারে শ্রমিকদের বড় একটি অংশ সিদ্ধান্ত নেবে আগের রাতে প্রার্থীদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের পর।
৮. বৃষ্টি-বর্ষা : গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো সরকার-সমর্থিত প্রার্থী আজমতউল্লাহ খানের জন্য কাল হয়ে দেখা দিয়েছে টানা বৃষ্টি। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে টঙ্গী ও গাজীপুরের অধিকাংশ রাস্তা থৈথৈ পানিতে নিমজ্জিত। বিশেষ করে টঙ্গীর রাস্তাঘাট চলাচলের অনুপযোগী হয়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও হাঁটু ও কোমরপানি। গত ১৭ বছর টঙ্গী পৌরসভার মেয়র ছিলেন আজমতউল্লাহ খান। এ সময়ে জলাবদ্ধতা সমস্যার নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার ব্যর্থতা কোনোভাবেই টঙ্গীর ভোটাররা মানতে পারছেন না। আজমতউল্লাহ খান ও তার পক্ষে ভোট চাইতে গিয়ে পানিবন্দি মানুষের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে। কোনো সদুত্তর দিতে পারছেন না আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। টিভির লাইভ টকশোতে টঙ্গীর একটি কারখানার কর্মী জানতে চান কোমরপানিতে ডুবন্ত সড়ক দিয়ে তিনি কীভাবে অফিসে যাবেন। অধ্যাপক মান্নান তার বক্তৃতায় বলছেন, টেলিভিশনের পক্ষে ভোটের জোয়ার আর দোয়াত-কলমের পক্ষে পানির জোয়ার উঠেছে।
জলাবদ্ধতা ছাড়াও ক্ষমতায় থাকলে জনতুষ্টি অর্জনের কঠিন কাজটি আজমতউল্লাহ খানের পক্ষেও সম্ভব হয়নি। ফলে মাত্র ৫ মাস আগে মেয়র পদ থেকে বিদায় নেয়া সরকার-সমর্থিত প্রার্থীকে বেশ বেকায়দায়ই পড়তে হচ্ছে।
পক্ষান্তরে অধ্যাপক মান্নানের তরতাজা কোনো আমলনামা ভোটারদের সামনে নেই। তিনি ১৯৯১ সালে দেশের সর্বাধিক ভোট পেয়ে এমপি হয়ে প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। ধর্ম ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে কাজ করলেও প্রায় দেড় যুগ আগের তার সফলতা-ব্যর্থতা ভোটারদের কাছে বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে না।
৯. রাসেল ও হাসান সরকারের ভূমিকা : আজমতউল্লাহ খানের নির্বাচনে সহযোদ্ধা হিসেবে আছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল। পক্ষান্তরে অধ্যাপক মান্নানের জন্য মাঠে আছেন একই আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার। এ দুজন দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কেমন কাজ করছেন, তাও পযবেক্ষণ করছে ভোটাররা। নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের আগ পর্যন্ত টঙ্গী আওয়ামী লীগে রাসেল গ্রুপ ও আজমত গ্রুপের তত্পরতা ছিল স্পষ্ট। রাসেল-আজমত বিরোধ দীর্ঘদিনের। এ বিরোধের জেরে রাসেলের সমর্থন নিয়ে এলাকায় শক্ত অবস্থান তৈরি করেন জাহাঙ্গির আলম। এক মাস আগেও এলাকাবাসী জানত রাসেলের প্রার্থী হিসেবে জাহাঙ্গির আজমতউল্লাহ খানের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। শেষ পর্যন্ত হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপে রাসেল আজমতউল্লাহ খানের পক্ষে কাজ করলেও খোদ আওয়ামী লীগ সমর্থকরাও মনে করেন, রাসেল সমর্থকরা দীর্ঘদিনের বিরোধ রাতারাতি ভুলে গিয়ে আজমতউল্লাহ খানের বিজয় আন্তরিকভাবে চাইছে না। রাসেলের তত্পরতায় তেমন স্বতঃস্ফূর্ততার ছাপও দেখছেন না অনেকে।
অন্যদিকে বিএনপিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অধ্যাপক এম এ মান্নান ও হাসান উদ্দিন সরকারের বেলায় ঘটছে উল্টো। হাসান উদ্দিন সরকার তার ছোটভাই নূরুল ইসলামকে আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় জড়িয়ে ফাঁসির দণ্ড দিয়ে কনডেম সেলে রাখার জন্য দায়ী আজমতউল্লাহ খানকে ধরাশায়ী করতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন। নিজের সব সামর্থ্য উজাড় করে দিয়ে নির্ঘুম কাজ করছেন। সিটি নির্বাচনে নিজে প্রার্থিতা থেকে সরে এসেছেন একই কারণে। হাসান সরকারের জন্য এটা যেন জীবন-মরণ লড়াই। তিনি মনে করেন, তার নির্দোষ ভাইকে হত্যা মামলায় জড়িয়ে ফাঁসির রশি মাথার ওপর ঝুলিয়ে রাখার মূল হোতা আজমউল্লাহর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়ার এটাই বড় সুযোগ। তার ভাষায়, ১৭ বছরের জগদ্দল পাথর সরাতে হবে। অধ্যাপক মান্নানের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, হাসান উদ্দিন সরকার নিজে নির্বাচন করলে যতটা সিরিয়াস হতেন, সে রকম সিরিয়াস হয়ে এবং নিজের অর্থ ব্যয়ে অধ্যাপক মান্নানকে জেতানোর জন্য কাজ করছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন অধ্যাপক মান্নানের মনোনয়ন নিশ্চিত করার সময় হাসান সরকারকে আগামী নির্বাচনে গাজীপুর-২ আসনে ১৮ দলের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেয়া এবং ক্ষমতায় গেলে উপযুক্ত মূল্যায়নের আশ্বাসও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
এছাড়া গাজীপুরের অধিবাসী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসম হান্নান শাহ, গাজীপুর জেলা সভাপতি ও কেন্দ্রীয় নেতা ফজলুল হক মিলনও নিজেদের মধ্যকার ভেদাভেদ ভুলে নিরলসভাবে কাজ করছেন।
১০. চার সিটির বিজয় : গাজীপুরের আগে দেশের পুরনো চার সিটির নির্বাচনে বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীদের বিপুল বিজয় গাজীপুরের ভোটারদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন অনেকে। দোদুল্যমান ভোটাররা ওই চার সিটিতে সরকারের ভরাডুবির পর মনস্থির করে ফেলেছেন বলে অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। বাংলাদেশের মানুষ স্বভাবগতভাবেই বিজয়ী পক্ষে থাকতে চায়। অনেক সাধারণ ভোটার কোনো কারণ ছাড়াই যে প্রার্থী জেতার সম্ভাবনা আছে, তাকে ভোট দেয়। কারণ হিসেবে সরলোক্তি করে যে—ভোট নষ্ট করে কী লাভ? চার সিটির আগে চট্টগ্রাম ও নবগঠিত কুমিল্লায় বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা বিজয়ী হন। ওই ছয় সিটির সঙ্গে নবগঠিত গাজীপুরে সরকারবিরোধী নগরপিতা নির্বাচিত করতে চাইবে অনেকে।