Amardesh
আজঃঢাকা, সোমবার ০১ জুলাই ২০১৩, ১৭ আষাঢ় ১৪২০, ২১ শাবান ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

নির্বাচিত মন্তব্য প্রতিবেদন : সততায় পারবেন না প্রধানমন্ত্রী

মা হ মু দু র র হ মা ন
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার জাতীয় সংসদে দেয়া ভাষণে দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান সম্পর্কে গুরুতর মিথ্যাচার করেছেন। যেমন বলেছেন, জ্বালানি উপদেষ্টা থাকাকালে মাহমুদুর রহমান নাকি গ্যাস ও বিদ্যুতের উত্পাদন কমিয়ে ফেলেছিলেন! অথচ বিদ্যুত্ জ্বালানি উপদেষ্টার অধীন কোনো বিষয় নয়। তাছাড়া মাহমুদুর রহমান যখন জ্বালানি উপদেষ্টা ছিলেন তখন দেশে গ্যাসেরও কোনো সঙ্কট ছিল না। এজন্যই প্রধানমন্ত্রীর ‘জ্ঞানের বহর’ দেখে জনগণ স্তম্ভিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মুখে না বললেও বুঝতে অসুবিধা হয়নি, তার জ্বালার কারণ আসলে মাহমুদুর রহমানের দেশপ্রেমিক সাহসী ভূমিকা। এজন্যই মিথ্যা মামলায় মাহমুদুর রহমানকে দ্বিতীয়বারের মতো গ্রেফতার করেছে তার সরকার। রিমান্ডে নিয়ে পুলিশকে দিয়ে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েও মনের ঝাল মিটিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আমার দেশ-এর প্রেসেও তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন তিনি। কিন্তু এতকিছুর পরও মনের জ্বালা ও আক্রোশ লুকিয়ে রাখতে পারছেন না প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সংসদেও টেনে এনেছেন মাহমুদুর রহমানকে। প্রধানমন্ত্রীর বলাটাই অবশ্য সব নয়। এসব বিষয়ে যারা জড়িত ছিলেন এবং জানেন তাদের প্রায় সবাই এখনও জীবিত আছেন। চাইলে যে কেউ তাদের কাছ থেকে সত্য জেনে নিতে পারেন। তাছাড়া মাহমুদুর রহমান নিজেও বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের অভিযোগের কষেই জবাব দিয়েছেন। নিচে মুদ্রিত মন্তব্য প্রতিবেদনেও মাহমুদুর রহমানের জবাব রয়েছে। পড়লে পাঠকরা জানতে পারবেন, প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কেন মিথ্যাচারের অভিযোগ উঠেছে। নিবন্ধটি ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আমার দেশ-এ প্রকাশিত হয়েছিল।

নানারকম প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সব অর্থে সততা এবং দায়িত্ববোধ নিয়েই আমরা সম্মিলিতভাবে আমার দেশ পত্রিকাটি বের করি। পত্রিকা পরিচালনার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলার ওপর জোর দেয়া হলেও সেটা এখানে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যকার ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক এবং সার্বিক পেশাদারিত্বকে অদ্যাবধি প্রভাবিত করতে পারেনি। একাধারে বোর্ড চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দ্বিবিধ দায়িত্ব পালন করলেও সেই বাস্তবতা আমার সঙ্গে সকল স্তরের সাংবাদিক এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিঃসঙ্কোচ মতবিনিময়ে সচরাচর কোনোরকম বাধার সৃষ্টি করে না। তারপরও, ৬ ফেব্রুয়ারি সকালে একজন সিনিয়র রিপোর্টার টেলিফোনে পেশাদারী সাংবাদিকের ভাষাতেই আমারই বিরুদ্ধে সরকারি অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য চাইলে খানিকটা আশ্চর্য হইনি বললে মিথ্যাচার করা হবে। তার ওপর সাংবাদিকদের ওপর বর্তমান সরকারের নির্যাতনের প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত রাজশাহীর সভা শেষে গভীর রাতে সড়কপথে ঢাকায় ফেরার কারণে কিছুটা ক্লান্তও ছিলাম। সহকর্মী সাংবাদিককে বিকালে সরকারি অভিযোগের তথ্য-প্রমাণসহ সংবাদপত্রের অফিসে এসে সাক্ষাত্কার নিতে বলে তখনকার মতো আলোচনায় ইতি টানলাম। বিকাল পর্যন্ত বেশ কৌতূহল নিয়েই কাগজপত্র দেখার জন্য যে অপেক্ষা করছিলাম সেটা বলাই বাহুল্য। যথাসময়ে সহকর্মী সাংবাদিক যে অভিযোগের ফিরিস্তি নিয়ে হাজির হলেন—তার মিথ্যাচার, শিষ্টাচারবহির্ভূত বাক্য প্রয়োগ এবং আইনি দুর্বলতার নমুনায় সম্ভবত সম্পূর্ণ অন্ধ আওয়ামী সমর্থকও একাধারে হতাশা এবং কৌতুক অনুভব না করে পারবেন না।
আমার অবশ্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর জন্য করুণা হচ্ছিল। বেসরকারি খাতে এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় প্রধানমন্ত্রীকে জোরের সঙ্গে বলতে পারি, এই কিসিমের অপদার্থ এবং মূর্খ আমলাশ্রেণী নিয়ে রাষ্ট্র তো দূরের কথা একটা মুদি দোকান চালানোও সম্ভব নয়। বুঝলাম, অন্ধ দলীয়করণের কুপ্রভাব কেমন করে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রযন্ত্রকে এক বছরের মধ্যেই অকার্যকর করে তুলেছে। আরও একটি সন্দেহ আমার মনে ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছে। এতদিন আমরা জানতাম জেনারেল মইন তার ভারত সফরকালে ছয়টি ঘোড়া সেখান থেকে উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন। এখন সন্দেহ হচ্ছে, ওগুলো প্রকৃতপক্ষে গাধা ছিল এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এই প্রকার মিথ্যা অভিযোগপত্র দায়েরে সেগুলোই বোধহয় এখন মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। পাঠককে আর কৌতূহলের মধ্যে না রেখে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কর্তৃক কথিত উত্তরা ষড়যন্ত্রের পুরনো কাসুন্দি ছাড়া আমার বিরুদ্ধে নতুন করে উত্থাপিত ছয়টি কল্পনাপ্রসূত দুর্নীতির অভিযোগের ফিরিস্তি পেশ করা যাক :
এক. মাহমুদুর রহমান একজন উচ্চাভিলাষী, চতুর ও ধূর্ত প্রকৃতির ব্যক্তি। তিনি তার উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য কর্মজীবনের শুরু থেকেই সক্রিয় রয়েছেন।
দুই. মুন্নু সিরামিকে কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার মাহমুদুর রহমানকে বেসরকারি খাত থেকে এনে প্রথমে বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং পরে জ্বালানি উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেয়া সংক্রান্ত দুর্নীতি।
তিন. বিনিয়োগ বোর্ডের কথিত একটি জরিপ রিপোর্ট পাঁচ মাস বিলম্বে প্রকাশ করায় দুর্নীতি।
চার. ফুলবাড়িয়া কয়লাখনি সংক্রান্ত দুর্নীতি।
পাঁচ. ফিরোজা মাহমুদের মালিকানাধীন ক্ল্যাসিক মেলামাইন ইন্ডাস্ট্রিজের অনুকূলে জনতা ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণের রিশিডিউল করার মাধ্যমে দুর্নীতি।
ছয়. বিনিয়োগ বোর্ডে চেয়ারম্যান থাকাকালীন অবস্থায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়া সংক্রান্ত দুর্নীতি এবং সেই সময়ের কথিত অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ সংক্রান্ত দুর্নীতি।
উপরিল্লিখিত ‘বিশাল দুর্নীতি’র কাহিনী সংবলিত একটি পত্র মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং সংস্থাপন সচিব বরাবরে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পরিচালক-২ পদে কর্মরত জনৈক কবির বিন আনোয়ার। পত্রটি ২২.০৯.১.০.০.২৪.২০০৯ (অংশ-৮)-৩৫ স্মারকে ১৯-১-২০১০ তারিখে প্রেরণ করা হয়েছে। কাকতালীয়ভাবে ওই তারিখেই বর্তমান জ্বালানি উপদেষ্টা জনাব তৌফিক-ই-এলাহী সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক আধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঢাকার সিএমএম আদালতে আমার বিরুদ্ধে একই অভিযোগে ২৫তম মানহানি মামলাটি দায়ের করেছেন এবং বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট সেই মামলা আমলে নিয়ে সমনও জারি করেছেন। বুঝলাম, ওপরের নির্দেশে যে কোনো উপায়ে মাহমুদুর রহমানকে জেলে পোরার জন্যই প্রশাসনের এই প্রকার বালখিল্য আচরণ। আমি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অথবা সংস্থাপন সচিব হলে এই পত্র প্রাপ্তির পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে শুধু পরিচালক-২ নয়, এই পত্র প্রেরন প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যেসব কর্মকর্তা জড়িত তাদের চাকরিচ্যুতি তো বটেই, তার সঙ্গে রাষ্ট্রের খরচে মানসিক চিকিত্সা করানোরও পরামর্শ দিতাম। ডিজিটাল সরকারের সচিবদ্বয় কী করবেন সেটি অবশ্য তাদের বিবেচনা।
এবার জনতার আদালতে আমার জবাব দেয়ার পালা। অভিযোগ যেখানে গুরুতর, জবাবও দীর্ঘ না করে উপায় নেই। পাঠকের ধৈর্যচ্যুতি ঘটানোর অপরাধে আগেভাগেই ক্ষমা চেয়ে রাখছি। প্রথম অভিযোগে আমাকে ধূর্ত, চতুর এবং উচ্চাভিলাষীরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এই অভিযোগের জবাব দিতে আমার রুচিতে বাধে। কুরুচিপূর্ণ গালাগালের জবাব দেয়ার শিক্ষা আমি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, আইবিএ এবং বিদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লাভ করিনি। কেবল প্রথম অভিযোগই নয়, প্রকৃতপক্ষে ‘সম্পূর্ণ গোপনীয়’ প্রতিবেদনটি ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং অশোভন বাক্যে পরিপূর্ণ। অবশ্য, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী, সরকারদলীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ সম্প্রতি যে ভাষায় কথা বলছেন তাতে তাদেরই অধস্তনদের কাছ থেকে এর চেয়ে মার্জিত কোনো আচরণ আশা করাটাই অসঙ্গত।
দ্বিতীয় অভিযোগ দিয়েই বরঞ্চ আমার জবাব শুরু করা যাক। মুন্নু সিরামিকে আমার চাকরি, সেই প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষের পরিবারের সঙ্গে আমার বিবাহজনিত সম্পর্ক নিয়ে ব্যক্তিগত আলোচনা কেবল অবান্তরই নয়, বর্তমান সরকারের কর্তাব্যক্তিদের নোংরা মানসিকতারই প্রকাশ। বিনিয়োগ বোর্ডে নিযুক্তির সময় আমি মুন্নু সিরামিকে নয়, স্বয়ং আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের শাইনপুকুর সিরামিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মরত ছিলাম। প্রধানমন্ত্রীর ছোট ভাই মরহুম শেখ কামালের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সালমান রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপে ১৯৯৩ সাল থেকে সরকারি দায়িত্ব গ্রহণ পর্যন্ত দীর্ঘ আট বছর গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলাম। শাইনপুকুর সিরামিক যে বোন-চায়নার জন্য সারা বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেছে, সেই প্রযুক্তি জাপান থেকে আমিই এনেছিলাম। সালমান রহমানের প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার তিনবার সাক্ষাত্ হয়েছে, যা অবশ্য তার স্মরণে থাকার কথা নয়। প্রথমবার প্রবল বর্ষণের মধ্যে তিনি যখন সাভারে বেক্সিমকো ইন্ডািস্ট্রিয়াল পার্ক উদ্বোধন করেছিলেন, দ্বিতীয়বার ঢাকা বাণিজ্য মেলায় শাইনপুকুর সিরামিকের প্যাভিলিয়নে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী যখন পদধূলি দিয়েছিলেন এবং সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ইংল্যান্ডের সুবিখ্যাত রয়্যাল ডলটন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে শেখ হাসিনা যখন সদয় সাক্ষাত্কার প্রদান করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং এসএসএফের দলিল-দস্তাবেজ ঘাঁটলে এসব তথ্য পেয়ে যাওয়ার কথা। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের যেসব কর্মকর্তা গলদঘর্ম হয়ে আমার বিরুদ্ধে স্বপ্নেপ্রাপ্ত অভিযোগপত্রটি তৈরি করেছেন, তারাও নিশ্চয়ই এসব তথ্য ভালোভাবেই জানেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অনুজপ্রতিম উপদেষ্টার প্রতিষ্ঠান থেকে এনে খালেদা জিয়া আমাকে বিনিয়োগ বোর্ডের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, এটা পরিষ্কার করে উল্লেখ করতে সম্ভবত তারা লজ্জা পেয়েছেন। আমার বিরুদ্ধে প্রণীত প্রতিবেদনের এক স্থানে বলা হয়েছে—১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সালমান রহমানের নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে আমি নাকি ছিলাম। সালমান রহমান ১৯৯১ সালে নয়, ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন এবং সেই নির্বাচনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কই ছিল না। আর ১৯৯১ সালে সালমান রহমানের সঙ্গে আমার পরিচয়ই হয়নি। সেই সময় যুক্তরাজ্যের বহুজাতিক কোম্পানি ডানকান ব্রাদার্সের পরিচালক পদে চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলাম। বর্তমান সরকার মিথ্যাচারের আর কোনো সীমা রাখবে না বলেই মনে হচ্ছে।
যাই হোক, মুন্নু সিরামিক থেকে ১৯৮৯ সালে পদত্যাগ করে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান ডানকান ব্রাদার্সে আমার পরিচালক পদে চাকরির কথা দেশের বেসরকারি খাতের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ মোটামুটি অবগত আছেন। মুন্নু শিল্প গোষ্ঠীতেও ইঞ্জিনিয়ার নয়, মার্কেটিং এবং অপারেশনস্-এর দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক পদেই চাকরি করেছি। আরও একটি কথা। বিনিয়োগ বোর্ড, প্রাইভেটাইজেশন বোর্ড, এসএমই ফাউন্ডেশন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান সুচারুরূপে পরিচালনার স্বার্থে সাবেক আমলা নয়, আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় বেসরকারি খাতে সফলতা পাওয়া পেশাজীবীদেরই শীর্ষ পদে থাকা উচিত। বর্তমান সরকারও এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পদে আমেরিকান চেম্বারের সাবেক সভাপতি আফতাবুল ইসলামকে নিয়োগ দিয়ে সঠিক কাজ করেছে। এছাড়াও সরকারের অন্যান্য পদেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসরকারি খাতের ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। জোট সরকারের আমলে আমার নিয়োগ নিয়ে এখন প্রশ্ন তুললে, একই অপরাধে বর্তমান সরকারপ্রধানকেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
তৃতীয় অভিযোগ অর্থাত্ বিনিয়োগ বোর্ডের কোনো এক জরিপ কাজে বিলম্ব হওয়াকে যদি দুর্নীতি আখ্যা দেয়া হয় তাহলে স্বাধীনতার পর থেকে দায়িত্ব পালনরত রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধেই তদন্ত করতে হবে। বাংলাদেশের একশ’ ভাগ প্রকল্প অথবা তদন্ত রিপোর্ট অথবা জরিপ কার্য সম্পাদনে কোনো না কোনো পর্যায়ে বিলম্ব হয়েই থাকে। পাঠকের আরও অবগত হওয়া দরকার যে, বিনিয়োগ বোর্ডে আমার দায়িত্ব পালনের আগে বিনিয়োগ সংক্রান্ত জরিপের কোনো পদ্ধতি প্রতিষ্ঠানটিতে ছিলই না। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ পরিমাপের জরিপ পদ্ধতি প্রথমবারের মতো সেখানে চালু করায় জাতিসংঘভুক্ত প্রতিষ্ঠান আঙ্কটাড (UNCTAD) বিনিয়োগ বোর্ডের প্রশংসা করে তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিশেষ বক্স রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। ২০০২ এবং ২০০৩ সালের World Investment Report-এ বাংলাদেশ বিনিয়োগ বোর্ডের এই কাজের স্বীকৃতি পাওয়া যাবে। এই জরিপ পদ্ধতি চালু করার ফলেই বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিনিয়োগ বোর্ডের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগের প্রকৃত পরিমাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বিতর্ক অনেকাংশে অবসান হয়েছিল। আমার দায়িত্ব গ্রহণের আগে বিনিয়োগ রেজিস্ট্রেশনকেই প্রকৃত বিনিয়োগ হিসেবে দেখানোর একটি সম্পূর্ণ ভুল পদ্ধতি বিনিয়োগ বোর্ডে চালু ছিল। এ ধরনের জরিপ কাজ আমার সময়ে একাধিকবার সম্পন্ন করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, কোনো একটি জরিপ কাজে কয়েক মাস বিলম্ব যদি হয়েও থাকে তবে তার সঙ্গে দুর্নীতির যে কোনো সম্পর্ক নেই, এই সামান্য বিষয়টি যে কর্মকর্তা বোঝেন না তার প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় তো দূরের কথা, সরকারের কোথাও চাকরি করার ন্যূনতম যোগ্যতা নেই। আরও একটি তথ্য প্রদান করা আবশ্যক বিবেচনা করছি। বর্তমান সরকার যে ই-গভর্নেন্স নিয়ে এত মাতামাতি করেন, তার প্রথম সফল প্রয়োগ বিনিয়োগ বোর্ডে আমার দায়িত্ব পালনকালীন সময়েই হয়েছিল।
তৃতীয় অভিযোগ ফুলবাড়ী কয়লাখনি সংক্রান্ত। প্রথমেই বলে রাখা ভালো, পত্রে বর্ণিত ফুলবাড়ীয়া নামক কোনো কয়লাখনির অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই। অভিযোগকারী কর্মকর্তা সম্ভবত ফুলবাড়ীকে ফুলবাড়ীয়া উল্লেখ করেছেন। এশিয়া এনার্জি নামক অস্ট্রেলীয় প্রতিষ্ঠানকে মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালটির বিনিময়ে অবাধে কয়লা রফতানির সুযোগ দিয়ে চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২ তারিখে; যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সেই সময় বর্তমানে বহুল আলোচিত জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী জ্বালানি সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। জ্বালানি উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে আমিই সর্বপ্রথম মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালটি এবং অবাধ রফতানির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ করি। কেবল তাই নয়, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি সম্পাদনে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত বলেও মন্তব্য করি। এশিয়া এনার্জি এবং তার আগে বিএইচপি’র সঙ্গে সরকারের ফুলবাড়ী কয়লাখনি সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদনের কোনো পর্যায়ে আমি কখনও যুক্ত ছিলাম না। এশিয়া এনার্জির সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের চুক্তিতে কোনো দুর্নীতি হয়ে থাকলে তার সব দায়-দায়িত্ব বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের চুক্তিকালীন মন্ত্রী-সচিবদের ওপর সন্দেহাতীতভাবে বর্তায়। সেই তদন্ত করার সাহস বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর আছে কিনা, সেটি দেখার জন্য অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি।
কেবল ফুলবাড়ী কয়লাখনির তদন্তই বা কেন? আমি তো চাই, মাগুরছড়া অগ্নিকাণ্ডে রাষ্ট্রের বিপুল ক্ষতি হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশি গ্যাস কোম্পানিকে অন্যায়ভাবে যে ছাড় দিয়েছিলেন, তারও তদন্ত হোক। বিনা টেন্ডারে নাইকোকে কেমন করে গ্যাসক্ষেত্র ইজারা দেয়া হয়েছিল, তারও তদন্ত হোক। মাত্র ক’দিন আগে শেভরনকে বিনা দরপত্রে যে ৩৭০ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে, সেটিরও তদন্ত হওয়া আবশ্যক। এই লেখার মাধ্যমে আমি এসব তদন্তের জন্য দলনিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গণতদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানাচ্ছি। সেই তদন্তে সব তথ্য-প্রমাণসহ হাজির হওয়ার প্রতিশ্রুতি এখনই দিচ্ছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং তার জ্বালানি উপদেষ্টার সেখানে উপস্থিত হয়ে জবানবন্দি দেয়ার সত্সাহস আছে তো?
পরবর্তী অভিযোগটি দায়েরের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বিশেষ শক্তিসম্পন্ন মাদক সেবন করে নিয়েছিলেন বলেই আমার নিশ্চিত বিশ্বাস। ফিরোজা মাহমুদ আমার স্ত্রী এবং একসময় তার ক্ল্যাসিক মেলামাইন নামে একটি মেলামাইন কারখানা ছিল, এটুকু সত্য। তবে জনতা ব্যাংক থেকে কস্মিনকালে একটি টাকা ঋণও যে সেই মেলামাইন কারখানাটি গ্রহণ করেনি, তার হলফনামা এই লেখার মাধ্যমেই দেশবাসীকে দিলাম। যেহেতু, কোনো ঋণই গ্রহণ করা হয়নি, কাজেই ঋণ পুনঃতফশিলিকরণের প্রশ্নই ওঠে না। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে নীতিনির্ধারকরা হয়তো ভাবছেন এই ক্ষমতা চিরস্থায়ী। ইতিহাস থেকে ফ্যাসিবাদী শাসকরা কোনো শিক্ষাই সচরাচর গ্রহণ করেন না। তবে, আল্লাহ্ চাইলে এসব নির্লজ্জ মিথ্যা অভিযোগ তুলে হয়রানি করার অপরাধের জবাব একদিন তাদের নিশ্চয়ই দিতে হবে। ভালো কথা, এই মেলামাইন কোম্পানিটি এখন আর আমাদের নেই। দীর্ঘদিন আগে সেটি পুরনো ঢাকার এক ব্যবসায়ী কিনে নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী জেনে আনন্দিত হবেন, ২০০৭ এবং ২০০৮ সালে তারই আন্দোলনের ফসল তত্ত্বাবধায়ক সরকার সৃষ্ট শত বাধা ও নানাবিধ সমস্যা মোকাবিলা করে স্বল্প সময়ের মধ্যে রফতানিতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ বর্তমানে আর্টিজান সিরামিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজা মাহমুদকে সরকার সিআইপি নির্বাচিত করেছে। এই প্রসঙ্গে সরকার-বান্ধব প্রথম আলো পত্রিকার একটি অপসাংবাদিকতার কথাও মনে পড়ে গেল। গত বছর ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে শ্যামল সরকার নামে জনৈক সাংবাদিক সরকারের অতিপ্রিয় তথাকথিত উত্তরা ষড়যন্ত্র নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ করে। আমার পারিবারিক প্রতিষ্ঠান আর্টিজান সিরামিকের প্রধান কার্যালয় উত্তরার একটি ভাড়া করা বাসায় অবস্থিত হলেও সাংবাদিক প্রবর তার উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনায় ওই বাড়িটি আমার স্ত্রীর মালিকানাধীন বর্ণনা করে সর্বৈব মিথ্যা খবর ছাপে। ওই সংবাদের সঙ্গে ফিরোজা মাহমুদের বিন্দুমাত্র সংস্রব না থাকা সত্ত্বেও কেবল আমার স্ত্রী হওয়ার অপরাধে একজন সফল মহিলা উদ্যোক্তাকে জড়িয়ে সর্বৈব মিথ্যা সংবাদ ছাপতে সুশীলত্বের (?) দাবিদার পত্রিকাটির বাধেনি। মামলা করার কথা সক্রিয়ভাবে চিন্তা করেও কাজের চাপে আমার স্ত্রী শেষ পর্যন্ত মিথ্যা সংবাদটিকে উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এক-এগারোর অসাংবিধানিক জরুরি সরকারের সক্রিয় সমর্থন দানকারী এবং সুশীল (?) সম্পাদক মতিউর রহমানের কাছে এই লেখার মাধ্যমেই ওই বাড়িটি আমাদের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানাচ্ছি। বিপুল বিত্তের অধিকারী জনাব রহমানের এতে তো কোনো অসুবিধা হওয়ার কারণ নেই। আমি নিতান্তই মধ্যবিত্ত একজন মানুষ, যদি ফাঁকতালে উত্তরার মতো এলাকায় একটা বাড়ির মালিক হয়ে যেতে পারি, তাহলে মন্দ কী! সরকারের অভিযোগপত্রের সঙ্গে প্রথম আলো পত্রিকার সংবাদের মিল দেখে চমত্কৃত হতে হয়। বোঝাই যাচ্ছে, তারা বেশ মিলেমিশেই কাজ করছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীকে শুধু এটুকু বলতে চাই, জনতার মঞ্চের সুবিধাভোগীদের মুখে উত্তরার কল্পকাহিনী একেবারেই বেমানান।
সর্বশেষ, বিদেশি বিনিয়োগ বিষয়ক বিতর্ক। আমি বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলাম ২০০১ সালের নভেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে। যে কোনো অর্থনীতিবিদই স্বীকার করবেন, বিদেশি বিনিয়োগ আহরণ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তার ওপর সেই বছরই নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার বিধ্বস্ত হওয়ার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি টালমাটাল পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও মহান আল্লাহ্ তায়ালার অশেষ রহমতে আমার দায়িত্বের পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ অব্যাহতভাবে বৃদ্ধির যে নজির তৈরি হয়েছিল, সেটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অদ্বিতীয়। আঙ্কটাডের World Investment Report অনুযায়ী ২০০৩, ’০৪, ’০৫ এবং ’০৬ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) হয়েছিল যথাক্রমে ৩৫০, ৪৬০, ৮৪৫ এবং ৭৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমি নিশ্চিত যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিনিয়োগের পরিমাণ আঙ্কটাডের হিসাবের চেয়ে খানিকটা অধিক হবে, কারণ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব কোনো সময়ই বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশের আগে আঙ্কটাডের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। সব পরিসংখ্যান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করছে যে, আমার দায়িত্ব পালনকালে বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ার অভিযোগ ধোপে টিকছে না। এরপরও আমার দায়িত্ব পালনকালে বিনিয়োগ কমার অভিযোগ যে কর্মকর্তা এনেছেন তার গঞ্জিকা সেবনের অভ্যাস আছে কিনা সেই তথ্য অবশ্য আমার জানা নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে স্বীকার করেছেন যে, এসব তথ্য সুশীল প্রতিষ্ঠান সিপিডি (CPD) থেকেই পাওয়া। আওয়ামী লীগ এবং সিপিডির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের যে প্রচার চারদিকে এতদিন শোনা যেত, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা বিলম্বে হলেও সেই সম্পর্কের স্বীকৃতি দেয়ার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
বিদেশি বিনিয়োগের একটি সাম্প্রতিক তথ্য এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখাটা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিসেম্বর মাসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ৪৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর প্রান্তিকে প্রাপ্ত ৪০২ মিলিয়ন ডলারের বিপরীতে দিনবদলের সরকার মাত্র ২০৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আনতে সক্ষম হয়েছে। এই বছরের ৩১ জানুয়ারি তারিখে এক সংবাদ সম্মেলনে বিনিয়োগের নাজুক অবস্থা স্বীকার করে নিয়ে স্বয়ং অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন যে, বিনিয়োগ ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই ইতিবাচক। দেশের আইন অনুযায়ী বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান পদাধিকারবলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। সুতরাং, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আমার বিরুদ্ধে বায়বীয় অভিযোগ দায়েরের পর বর্তমান সরকারের শাসনামলে বিদেশি বিনিয়োগে ধস নামা সংক্রান্ত ‘দুর্নীতির’ অপরাধে প্রধানমন্ত্রী এবং বিনিয়োগ বোর্ডের বর্তমান নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. এসএ সামাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানালে আমার ওপর শেখ হাসিনা কিংবা ড. সামাদের রুষ্ট হওয়ার সুযোগ আছে কিনা সেটা পাঠকই বিচার করুন। আর অবৈধ লেনদেনের কল্পকাহিনী নিয়ে শুধু এই চ্যালেঞ্জই ছুড়ে দিতে পারি, আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে আমি ব্যক্তিগতভাবেই কেবল দুর্নীতিমুক্ত থাকিনি, আমার সহকর্মীদেরও সাধ্যমত দুর্নীতিমুক্ত রাখার চেষ্টা করেছি। বিনিয়োগ বোর্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনকালে আওয়ামী লীগ, বিএনপি সমর্থক নির্বিশেষে সব ব্যবসায়ী আমার কাছ থেকে দেশের আইন অনুযায়ী প্রাপ্য সবরকম সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিনিয়োগ বোর্ডকে একটি সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলাম, এই দাবি জোরের সঙ্গেই করতে পারি। আর অবৈধ আর্থিক লেনদেনের প্রসঙ্গ উঠলে বর্তমান সরকারের কর্তাব্যক্তিরাই বরঞ্চ বিব্রত হবেন। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নগদে এবং চেকের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ঘুষ নেয়ার স্বীকারোক্তি বিশেষ সংস্থার কাছে দিয়ে বোনকে ফাঁসাতে বড় ভাইয়ের যে বাধেনি, তার প্রমাণস্বরূপ অডিও ক্যাসেট তো এই দেশেই রয়েছে। এসব নিয়ে হাসান মশহুদ চৌধুরীর পরিচালনাধীন দুদকের দায়ের করা মামলা ক্ষমতার জোরে প্রত্যাহার করলেই তো আর দুর্নীতির অপরাধ স্খলন হয় না। চালুনি যদি অপরের ছিদ্রানুসন্ধানের চেষ্টা করে, তাহলে তাকে উপহাস আর করুণা করা ছাড়া উপায় থাকে না।
সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে কিছু কথা বলা ছাড়া আজকের এই মন্তব্য প্রতিবেদন সমাপ্ত করা সঙ্গত হবে না। এমন পাঠক বোধহয় কমই পাওয়া যাবে যিনি পশ্চিমবঙ্গের ভানু বন্দোপাধ্যায়ের অতি জনপ্রিয় ‘দুইটা কথা’ কৌতুক-নকশাটি শোনেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমারও দুটি কথা বলার রয়েছে। আমি আশা করতে চাচ্ছি যে, তার কার্যালয়ের এসব নিম্নরুচি ও বালখিল্য কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি একেবারেই অন্ধকারে। এই ধারণা সত্যি হলে আমার আর কোনো কথা নেই। তবে এসব চিঠিপত্র আদান-প্রদান যদি প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে আমাকে শায়েস্তা করার জন্য হয়ে থাকে, তাহলে আমার আবার দুইটা কথা আছে। প্রথম কথা হলো, অমিত ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী এই নিম্নমানের নাটকের অবতারণা করছেন কেন? জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়ের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগের সংবাদ প্রকাশের অপরাধে এবং ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে আমাকে যদি গ্রেফতারই করতে চান তাহলে ৫৪ ধারা তো হাতের কাছে আছেই। উত্তরার আর্টিজান সিরামিকে, আমার দেশ কার্যালয়ে অথবা আমার বাসগৃহে পুলিশ পাঠালেই বিনা বাক্যব্যয়ে, নির্দ্বিধায় তাদের সঙ্গে কারাগারে চলে যাব।
এক-এগারোর পর দুই দলের শীর্ষ নেত্রীর বিশেষ কারাগারে অন্তরীণ থাকা অবস্থায় তাদের সব বাঘা বাঘা নেতা ভেগে গেলেও, আমি কিন্তু প্রকাশ্যে থেকেই মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের যৌথ অসাংবিধানিক সরকারের বিরুদ্ধে দুই বছর ধরে অব্যাহত লড়াই করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জেনে রাখুন, পলায়নপর মনোবৃত্তি আমার ধাতেই নেই। আমার মতো একজন অতি সাধারণ ব্যক্তির সঙ্গে এই অসম এবং অভব্য লড়াই করে প্রধানমন্ত্রীর অতি উচ্চপদের সম্মান ক্ষুণ্ন করা হোক—বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে সেটি আমার একেবারেই কাম্য নয়। আর দ্বিতীয় কথা হলো, সততার প্রতিযোগিতায় আমার সঙ্গে আপনার সাঙ্গপাঙ্গরা তো দূরের কথা, আপনি নিজেই পেরে উঠবেন না। এই সত্যটি আমি যেমন জানি, গোয়েন্দারা যদি সঠিক তথ্য দিয়ে থাকে তাহলে আপনিও নিশ্চয়ই জানেন। যে তদন্ত প্রতিবেদনটি আপনার কার্যালয় থেকে পাঠানো হয়েছে, সেটি মনোযোগ সহকারে পড়লেই তো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার বোঝার কথা যে অভিযোগগুলো কতখানি হাস্যকর ও ভিত্তিহীন। আপনার কার্যালয় থেকে দুর্নীতির প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলেই নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাকে স্মরণ করিয়ে দিতে হচ্ছে, দিনবদলের সনদে একটি প্রতিশ্রুতি ছিল, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করলে, ক্ষমতা গ্রহণের আগেই প্রধানমন্ত্রীসহ সব মন্ত্রী এবং সংসদ সদস্য তাদের সম্পদের হিসাব সর্বসমক্ষে তো দেবেনই, প্রতিবছর সেই হিসাবের পরিবর্তনও দেশের জনগণকে নিয়মিতভাবে জানানো হবে। মহাজোট সরকারের ১৩ মাস অতিবাহিত হলেও সেই প্রতিশ্রুতি পালনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ডিজিটাল জীবনের স্বপ্নে বিভোর জনগণ যে এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে খুব একটা দুঃখ পেয়েছে তাও অবশ্য নয়। ক্ষমতাসীনদের প্রতিশ্রুতিভঙ্গ তাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। তবে কাচের ঘরে বাস করে আমাদের মতো আমজনতার দিকে ঢিল ছোড়ার মন্দ অভ্যাস পরিত্যাগ করলে আখেরে আপনিই লাভবান হবেন। সুশীলরা (?) বলে থাকেন, ছোটলোকের সঙ্গে লাগতে নেই। আর দার্শনিকরা বলেন, যে ব্যক্তির হারানোর কিছু নেই তাকে উত্ত্যক্ত না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি কিন্তু যাদের শৃঙ্খল ছাড়া হারানোর কিছুই থাকে না, সেই ব্যক্তিদেরই দলে।
admahmudrahman@gmail.com