Amardesh
আজঃঢাকা, সোমবার ২০ মে ২০১৩, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, ৯ রজব ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 কার্টুন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

রিমান্ডের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে : উচ্চআদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন : বাবুনগরীকে ৩১ ও মাহমুদুর রহমানকে ১৩ দিনের রিমান্ড

এমএ নোমান ও সরোজ মেহেদী
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
বিরোধী দল ও মতের নাগরিকদের দমনে রিমান্ডের যথেচ্ছ ব্যবহার করছে সরকার। কোনো ধরনের অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া কিংবা মামলা থাকলেও তদন্ত ও অনুসন্ধানের আগেই দিনের পর দিন রিমান্ডে রেখে নির্যাতন চালানো হচ্ছে বিরোধী মতের লোকদের ওপর। রিমান্ড মঞ্জুর ও জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে আমলেই নিচ্ছে না নিম্নআদালতগুলো। রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও অধস্তন আদালত তা প্রতিনিয়তই লঙ্ঘন করে চলেছে বলে অভিযোগ করেন মানবাধিকার সংগঠক ও বিশিষ্ট আইনজীবীরা। প্রসঙ্গত, হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ আহমেদ বাবুনগরীকে নিম্নআদালত একনাগাড়ে ৩১ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে। প্রথম দফায় ৯ দিন ও দ্বিতীয় দফায় ২২ দিন অর্থাত্ দুই দফায় ৩১ দিন আদালত তার এই রিমান্ড মঞ্জুর করে। এর আগে দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ১৩ দিনের রিমান্ডে পাঠায় নিম্নআদালত। সম্প্রতি বিএনপির আটক ১৫১ নেতাকে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাদের একযোগে ৮ দিনের রিমান্ডে পাঠায়। ৫৪ ধারায় গ্রেফতারের পর কোনো মামলা বা অভিযোগ ছাড়াই ২০ নারীকে রিমান্ডে পাঠায় আদালত। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মোহাম্মদ দেলাওয়ার হোসেনকেও দেড় মাসের বেশি সময়ের জন্য রিমান্ডে দিয়েছে আদালত।
রিমান্ডের প্রার্থনা ও রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে সরকার ও নিম্নআদালত প্রকাশ্যেই উচ্চআদালতের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে চলেছে বলেও মনে করছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা। আইনজীবীরা বলেন, উচ্চআদালতের নির্দেশনা হচ্ছে, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের করা মামলায় নিম্নআদালত জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কোনো ব্যক্তিকে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করতে পারবে।’ বর্তমানে কোনো কোনো ব্যক্তিকে একনাগাড়ে এক মাসেরও বেশি সময়ের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করছে নিম্নআদালত। এটা উচ্চআদালতের নির্দেশনার স্পষ্ট লঙ্ঘন ও অবজ্ঞা প্রদর্শন। রিমান্ড মঞ্জুর ও জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে বক্তব্য দেন দেশবরেণ্য আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুবউদ্দিন খোকন, মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খান ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোরশেদ মিয়া আলম।
রিমান্ড বিষয়ে উচ্চআদালতের নির্দেশনা : ব্লাস্ট বনাম বাংলাদেশ মামলায় বিচারপতি মো. হামিদুল হক ও বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল কাউকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারে নির্দেশনা দেন। এই নির্দেশনাই ঐতিহাসিক ৫৫ ডিএলআর নামে পরিচিত। হাইকোর্টের এ নির্দেশনার বিরুদ্ধে সরকার আপিল করলে আপিল বিভাগ তা খারিজ করে দেয়। আপিল বিভাগেও হাইকোর্টের আদেশ বহাল থাকে।
রায়ে বলা হয়, ১. আটকাদেশ দেয়ার উদ্দেশ্যে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারবে না, ২. কাউকে গ্রেফতারের সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে, ৩. অবিলম্বে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির আত্মীয় বা কাছের কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতারের বিষয়টি অবহিত করতে হবে, ৪. গ্রেফতারের কারণ একটি পৃথক নথিতে পুলিশকে লিখতে হবে, ৫. গ্রেফতারের ৩ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারকৃতকে কারণ জানাতে হবে, ৬. বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যস্থান থেকে গ্রেফতারকৃতরা নিকটাত্মীয়কে এক ঘণ্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহক মারফত বিষয়টি জানাতে হবে, ৭. গ্রেফতারকৃতকে তার পছন্দসই আইনজীবী ও নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে পরামর্শ করতে দিতে হবে, ৮. জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আইনজীবী বা পরিচিত কারও উপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে, ৯. কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদে প্রয়োজনীয় তথ্য না পাওয়া গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে সর্বোচ্চ তিনদিন পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে উপযুক্ত কারণ থাকতে হবে, ১০. জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ডাক্তার দেখাতে হবে। আইনজীবীরা বলেন, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেয়ার ক্ষেত্রে হাইকোর্টের এসব নির্দেশনার একটিও মানা হয়নি। হাইকোর্টের এ নির্দেশনার বিরুদ্ধে সরকার আপিল করলে আপিল বিভাগও তা বহাল রাখে। যা এখনও বলবত্ রয়েছে।
রিমান্ডে নেয়ার রেকর্ড : হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বর্তমানে ২২ দিনের রিমান্ডে আছেন। এর আগে গত তাকে ৯ দিনের রিমান্ডে পাঠায় আদালত। রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করার পর আরও ২২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। একনাগাড়ে ৩১ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন প্রবীণ এ আলেমে দ্বীন।
তিনটি মামলায় আমার দেশ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে ১৩ দিনের রিমান্ড দেয় আদালত। ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন গ্রেফতারের পর থেকে এ পর্যন্ত ৩৬ দিনের রিমান্ড ভোগ করেছেন। বর্তমানে তার আরও ১০ দিনের রিমান্ড চলছে। আইনজীবীরা জানান, ৩৬ দিনের রিমান্ডের নামে ছাত্রশিবির সভাপতিকে ৪২ দিন রিমান্ডে রাখা হয়। তাদের মতে গ্রেফতারের পর মোট ৫২ দিন রিমান্ড ভোগ করছেন তিনি। আইনজীবীদের ভাষ্যে ৩৬ দিনের রিমান্ডের নামে ৪২ দিন রিমান্ড খাটার পর তাকে ১৪ মে চারটি মামলায় আরও ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। তিনি লাগাতার রিমান্ডে রয়েছেন বলে জানান তার আইনজীবীরা। ১১ মার্চ বিএনপির কার্যালয় থেকে আটক বিরোধী দলের ১৫১ জন নেতাকর্মীকে পুলিশের আবেদনক্রমে ঢাকার মুখ্য মহানগর আদালত আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সঙ্গে বিরোধী দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকে রিমান্ডে দেয়ার নজির নেই। এবারই প্রথম দেশে ২০ নারী রাজনৈতিক কর্মীকে কোনো ধরনের অভিযোগ ছাড়াই গ্রেফতার করে পুলিশ। ৫৪ ধারায় গ্রেফতারের পর তাদের দুদিনের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালায় পুলিশ।
শীর্ষ আইনজীবীদের উদ্বেগ : দেশবরেণ্য আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, আসামি গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনও মানা হয়নি। এগুলো অন্যায় হচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মেনে চলা সরকার ও অধস্তন আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক। তিনি বলেন, সরকার একজনকে গ্রেফতার করে নিম্ন আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাইছে আর আদালতও রিমান্ড মঞ্জুর করছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না। এটা উচ্চ আদালতের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন। এতে আইনের শাসন ও মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, রিমান্ড মঞ্জুরের ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত স্পষ্টভাবেই উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে চলেছে। নিম্ন আদালত উচ্চ আদালতের নির্দেশনাকে অবমূল্যায়ন করে মূলত সরকারের জুলুমের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য এটা বড়ই লজ্জার বিষয় এবং জাতির জন্য দুর্ভাগ্যের কারণ। রিমান্ড অস্ত্রটি সরকার এখন বিরোধী দল ও মতের নাগরিকদের দমনে ইচ্ছেমত ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেন খ্যাতিমান এ আইনজ্ঞ।
সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, রিমান্ড গণতন্ত্র, মানবিধাকার ও আইনের শাসনের প্রতি চরম হুমকি। আগে মারাত্মক অপরাধীদেরই কেবল রিমান্ডে নেয়া হতো। এভাবে রাজনৈতিক কর্মীদের রিমান্ডে নেয়ার ঘটনা নজিরবিহীন। এসব রিমান্ডের ঘটনা সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনার পরিপন্থী। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযেগ্য নয়।
তিনি বলেন, সংবিধানে ৩৫ (৪) অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিতে তার বুিরদ্ধে কোনো বক্তব্য বা সাক্ষী প্রদান করতে বলপ্রয়োগ করা যাবে না। এছাড়া হাইকোর্টের একটি জাজমেন্টে রিমান্ড নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। রায়ে বলা আছে, রিমান্ডে নিয়ে কাউকে বলপ্রয়োগ করা যাবে না। শারীরিক নির্যাতন করা তো দূরে থাক, আসামির কাছ থেকে জোর করে কোনো কিছু আদায় করা যাবে না। আপিল বিভাগ হাইকোর্টে রায় অনুমোদন করেছে। এখন রিমান্ডের নামে যা হচ্ছে তা অনভিপ্রেত।
সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, সরকার বিরোধী দল ও মতকে দমনে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে রিমান্ডকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকার জনবিচ্ছিন্ন হয়ে এখন রিমান্ডের ওপর ভর করে দেশ চালাতে চাইছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, নিম্ন আদালত ও সরকার সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে চলেছে। অথচ উচ্চ আদালত চুপ করে বসে রয়েছে। উচ্চ আদালত তার মর্যাদা রক্ষায় এগিয়ে আসছে না। এটিই হচ্ছে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয়।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার’র সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খান বলেন, রিমান্ড মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে নিম্ন আদালত উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, সংবিধান ও রীতিনীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন করে চলেছে। নিম্ন আদালত কাউকে রিমান্ডে দিতে হলে উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখাতে বাধ্য। কিন্তু বর্তমানে নিম্ন আদালত তা পালন করছে না। উচ্চ আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, যুক্তিসঙ্গত কারণে কাউকে সর্বোচ্চ তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করতে পারবে। কিন্তু বর্তমানে উচ্চ আদালতের এসব নির্দেশনার তোয়াক্কা না করে একনাগাড়ে এক মাসেরও বেশি সময়ের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করছে। এটা আইনের শাসন ও মানবাধিকারের জন্য চরম হুমকি। উচ্চ আদালও এ বিষয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছে।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোরশেদ মিয়া আলম বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে উচ্চ আদালত যে নির্দেশনা দিয়েছে, এটা মেনে চলা নিম্ন আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক। উচ্চ আদালতের ওই আদেশ নিম্ন আদালত ও সরকারের প্রতি সমভাবে প্রযোজ্য। বর্তমানে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘনের যে রেওয়াজ শুরু হয়েছে, এর প্রতিকার না হলে পুরো জাতিই চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়বে।