Amardesh
আজঃঢাকা, শনিবার ১৮ মে ২০১৩, ২০১৩, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, ৭ রজব ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

পদ্মা সেতুর দুর্নীতির প্রভাব এডিপিতেও

হারুন-অর-রশিদ
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
সরকারের উপদেষ্টা-মন্ত্রী-এমপি ও আমলাদের দুর্নীতির কারণে পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতা সংস্থা সরে দাঁড়ানোর পর দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু করতে চাচ্ছে সরকার। এ প্রকল্পের জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিশাল বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। ভোট পাওয়ার আশায় লোক দেখানো এ বড় প্রকল্পে বরাদ্দ দিতে গিয়ে জনস্বাস্থ্য ও স্থানীয় উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ কমাচ্ছে সরকার। বড় প্রকল্পে বড় বরাদ্দ দিতে গিয়ে স্বাস্থ্য ও স্থানীয় উন্নয়ন খাতে সরকারি বরাদ্দ যেমন কমে আসবে তেমনি শিক্ষা, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও এর প্রভাব পড়বে।
অর্থমন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী অর্থবছরের বাজেটের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ৭ জুন জাতীয় সংসদে প্রাথমিক বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাজেটের আকার ২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। এর মধ্যে সরকারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) খাতে বরাদ্দ থাকবে ৬৪ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরের মূল এডিপি ৫৫ হাজার কোটি টাকা। তবে সংশোধিত এডিপিতে তা ৫২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। এ হিসেবে আগামী অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেটের আকার ১১ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা বাড়ছে। এডিপি’র আকার প্রায় ২৩ শতাংশ বাড়ানো হলেও শিক্ষা চিকিত্সা ও সামাজিক নিরাপত্তামূলক খাতগুলোয় বরাদ্দ বাড়ছে না প্রত্যাশিত হারে। বরং উল্টো কিছু কিছু খাতে কমে আসছে। পদ্মা সেতু প্রকল্পে বাড়তি অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উল্লেখ্য, পদ্মা সেতুর জন্য বরাদ্দ ধরা হয় ২৯০ কোটি ডলার। ২০০৯ সালের চুক্তি অনুযায়ী বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলার সাহায্য দেয়ার জন্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এছাড়া জাইকা ৪০ কোটি ডলার, ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ১৪ কোটি ডলার এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) ৪ হাজার ৪৮৯ কোটি ডলার দিতে ঋণচুক্তি করে। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই তত্কালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থউপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর ভাতিজার ছেলে মুজিবুর রহমান নিক্সন চৌধুরী, সেতু বিভাগের সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া নির্দিষ্ট অংশ ঘুষ নিয়ে (পার্সেন্টেজ) অবৈধভাবে কাজ পাইয়ে দিতে কানাডিয়ান কোম্পানি এসএনসি লাভালিনের সঙ্গে চুক্তি করে। পরে বিশ্বব্যাংকের কাছে এসব দুর্নীতির খবর প্রকাশ পেয়ে যায়। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ সরকারকে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। বিশ্বব্যাংকের নির্দেশ মতো মন্ত্রী ও সচিবকে পদ থেকে সরিয়ে দিলেও তাদের নির্দোষ দাবি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু পরে কানাডার আদালত কে, কে কি পরিমাণ ঘুষ চেয়েছিল তা প্রকাশ করে দেয়। এ ঘটনার পর বিশ্বব্যাংক ১০ বছরের জন্য এসএনসি লাভালিনকে নিষিদ্ধ করে। এর আগে ২০১১ সালের ২৯ জুন বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সঙ্গে ঋণচুক্তি বাতিল করে। বিশ্বব্যাংকের পর অন্য দাতা সংস্থাগুলোও তাদের চুক্তি প্রত্যাহার করে নেয়।
কিন্তু ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার নির্বাচনী ওয়াদা পদ্মা সেতু প্রকল্প যে কোনোভাবেই বাস্তবায়ন করবে বলে বরাবর বক্তব্য দিয়ে আসছে। বিদেশি নয় বরং দেশীয় অর্থায়নেই পদ্মা সেতু করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী বারবার বলছেন। নিজেদের কলঙ্ক ঢাকতেই সরকার পদ্মা সেতু করতে মরিয়া বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে সরকারের দুর্নীতির খেসারত জনগণের ঘাড়েই এসে পড়ছে। স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে বরাদ্দ সরিয়ে তা পদ্মা সেতুতে দেয়া হচ্ছে। যেটি জনস্বার্থ পরিপন্থী বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ার প্রভাবে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ ব্যাপারে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে অর্থ বরাদ্দ দরিদ্র মানুষের স্বার্থের সঙ্গে সংশিল্গষ্ট। এ অবস্থায় এসব খাতে বরাদ্দ কমে এলে জনস্বার্থ বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। তিনি অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের পাশাপাশি শিক্ষা, চিকিত্সা ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মধ্যে সমন্বয় সাধনের পরামর্শ দিয়েছেন। বিকল্প উত্স থেকে অর্থায়নের মাধ্যমে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের চেষ্টা অব্যাহত রাখা উচিত বলেও মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ।
সূত্র জানায়, আগামী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এডিপির আকার বাড়বে চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির চেয়ে ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অতিরিক্ত বরাদ্দের বড় অংশই যাবে পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে। পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে সেতু বিভাগের জন্য ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। এ হিসাবে সেতু বিভাগের বরাদ্দ বাড়ছে প্রায় ৪ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
সেতু বিভাগে বরাদ্দের প্রায় সব অর্থই পদ্মা সেতুর জন্য বরাদ্দ দেয়া হবে। চলতি অর্থবছরে পদ্মা সেতুর জন্য মাত্র ৮০৪ কোটি টাকার বরাদ্দ ছিল। পাশাপাশি আগামী অর্থবছরে রেলের উন্নয়নে বিপুলভাবে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। মূলত পদ্মা সেতু, শিল্প ও রেলওয়ের জন্য ব্যাপকভাবে বরাদ্দ বাড়ানোর কারণে অন্য খাতগুলোতে বরাদ্দ তেমন বাড়ছে না।
পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আগামী এডিপিতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে এডিপিতে বরাদ্দ দেয়া হবে ৩ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরের এডিপিতে এ খাতে ৩ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এ হিসাবে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমছে প্রায় ৭৯ কোটি টাকা। ২২ শতাংশ এডিপি বৃদ্ধির বিপরীতে স্বাস্থ্য খাতে ২ শতাংশ বরাদ্দ কমে যাওয়াটাকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে আগামী এডিপিতে স্থানীয় সরকার খাতেও বরাদ্দ কমে আসছে। চলতি অর্থবছরে এ খাতে ১০ হাজার ২২৩ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। নতুন এডিপিতে এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হবে ১০ হাজার ১৫১ কোটি টাকা। সরকারের শেষ বছরে এসে স্থানীয় উন্নয়নে বরাদ্দ কমিয়ে আর প্রভাব আগামী নির্বাচনে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দই পাচ্ছে স্থানীয় সরকার খাত। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে বিদ্যুত্ খাতে। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ বিভাগটিকে মোট বরাদ্দের ১৩ শতাংশেরও বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫৩ কোটি টাকা যাচ্ছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।
পদ্মা সেতুতে বরাদ্দ বেড়ে যাওয়ায় অন্য খাতে বরাদ্দ কমানো হয়েছে বলে জানা গেছে। পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন সংশয়ে পড়ার পর থেকেই দেশীয় অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা বলে আসছে সরকার। এ অবস্থায় দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক এতে অর্থায়ন না করার সিদ্ধান্ত জানালে আবারও দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের তোড়জোড় শুরু হয়। তবে বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করতে চাইছে বলেও বেশ কয়েকবার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। সভরেন বন্ড ছেড়ে বা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় বিদেশ থেকে ঋণ নেয়া হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তবে কোনো কিছুই না করে পদ্মা সেতুর জন্য সরকারি তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ করে অন্যান্য খাতের প্রকল্প বাধাগ্রস্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে অর্থনীতবিদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, পদ্মা সেতু সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে। সরকারের মেয়াদকালের মধ্যেই প্রকল্পটির কাজ শুরু করতে চাইবে। তবে এজন্য স্বাস্থ্য-শিক্ষার মতো খাতে অর্থ বরাদ্দ কমানো ঠিক হবে না। এ অবস্থায় সরকারের উচিত অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অর্থ আয়ের উত্সগুলো সংহত করা। বৈদেশিক উত্স থেকে অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নকে প্রাধান্য দেয়া উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।