Amardesh
আজঃঢাকা, শনিবার ১৮ মে ২০১৩, ২০১৩, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, ৭ রজব ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

কানাডার সিবিসি টিভির অনুসন্ধানী প্রতিবেদন : পরিবারের সদস্যদের ঘুষ নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার প্রধানমন্ত্রীর

ইলিয়াস হোসেন
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারও জড়িত বলে অভিযোগ করেছে কানাডার প্রভাবশালী টেলিভিশন চ্যানেল কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন-সিবিসি। পদ্মা সেতু ও কানাডীয় প্রকৌশল সংস্থা এসএনসি-লাভালিনের ওপর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই অভিযোগ করা হয়েছে। ১৫ মিনিট দীর্ঘ ওই প্রতিবেদনে আশঙ্কা করে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর বোন শেখ রেহানাও দুর্নীতিতে জড়িত থাকতে পারেন। তবে সিবিসি-কে দেয়া একান্ত সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সিবিসির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘দ্য ন্যাশনাল’-এ দীর্ঘ এই প্রতিবেদনটি প্রচার করা হয় বৃহস্পতিবার। প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন টেরেন্স ম্যাককেনা। সিবিসি চ্যানেলটি বিবিসির আদলে কানাডার কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এসএনসি-লাভালিনের ঘুষের তালিকায় প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নাম রয়েছে বলে গুজব রয়েছে।’
এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সিবিসি জানতে চায়, এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনে আপনার নামে মামলা হয়েছিল যে আপনার বোন শেখ রেহানার মাধ্যমে আপনি চাঁদা আদায় করতেন। এসএনসি-লাভালিনের দুর্নীতির সঙ্গেও তিনি জড়িত কিনা?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব সাজানো। আমরা জনগণের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্মা সেতু না হওয়ায় বাংলাদেশের উত্পাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রতিবেদনের শুরুর দিকেই মাওয়ায় ফেরি পারাপারের জন্য অপেক্ষমাণ মো. মোকতার আলী নামে এক ট্রাক ড্রাইভারের বক্তব্য প্রচার করা হয়। তিনি জানান, মাওয়া ফেরি পারাপারের জন্য অনেক সময় তাদের এক সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এতে সময় ও অর্থের অপচয় হয়। পদ্মা সেতু না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি ইংরেজিতে সিবিসি-কে বলেন, ‘বাংলাদেশ মিনিস্টার ইজ নো গুড (বাংলাদেশ’স মিনিস্টার ইজ নট গুড-বাংলাদেশের মন্ত্রী ভালো না)।’
এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিবিসি-কে বলেন, সেতুটি হলে দক্ষিণবঙ্গের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতুর ঋণ বাতিলের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমরা বারবার কানাডা সরকার এবং বিশ্বব্যাংককে বলেছিলাম, আপনারা তথ্যপ্রমাণ দিন; কিন্তু তারা কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দেয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্মা সেতুর তদারকির কাজ পেতে এসএনসি-লাভালিন আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা ও ঊর্ধ্বতন রাজনীতিকদের ঘুষ দিয়েছিল।
দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী আনিসুল হক সিবিসি-কে বলেন, দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা দেখতে পান যে প্রাথমিকভাবে অভিযুক্ত পাঁচজনের বিরুদ্ধে যে প্রমাণ পাওয়া গেছে তা মামলা করার জন্য যথেষ্ট।
প্রতিবেদনে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী ও পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলার প্রধান অভিযুক্ত সৈয়দ আবুল হোসেনকে আওয়ামী লীগের ‘ট্রেজারার ও ক্যাশিয়ার’ বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে সিবিসি জানতে চায়, অলিখিতভাবে আবুল হোসেন আওয়ামী লীগের ক্যাশিয়ার হিসেবে খ্যাত এবং তিনি আওয়ামী লীগের জন্য তহবিল জোগাড় করেন। একথা সত্য কিনা? ‘ক্যাশিয়ার’ শব্দে বিস্ময় প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।
প্রতিবেদনে সৈয়দ আবুল হোসেন সম্পর্কে বলা হয়, দুর্নীতির জন্য তার সুখ্যাতি রয়েছে।
সিবিসি-কে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল অত্যন্ত লজ্জাজনক। তার চেয়েও বেশি যেটা লজ্জাজনক, সেটা হলো—অত্যন্ত কড়াভাবে আওয়ামী লীগ সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করে। অবস্থা এমন যেন কিছুই হয়নি। তিনি বলেন, বাংলাদেশে নিম্নপর্যায়ে, মধ্যমপর্যায়ে এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় দুর্নীতি হচ্ছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বৃহত্তম অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুর তদারকির কাজ পেতে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমানসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী, রাজনীতিক ও প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত কয়েক কর্মকর্তাকে ঘুষ দেয়ার প্রস্তাব দেয় কানাডীয় কোম্পানি এসএনসি-লাভালিন।
এই অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার পর ৩০০ কোটি ডলার ব্যয়সাপেক্ষ পদ্মা সেতু প্রকল্পে ১২০ কোটি ডলার ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানায় বিশ্বব্যাংক। এরপর অন্যান্য দাতা সংস্থা পদ্মা সেতুর ঋণচুক্তি বাতিল করে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরামর্শকের কাজ পাওয়ার জন্য দশ শতাংশ ঘুষের প্রস্তাব দেয় এসএনসি। এর মধ্যে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেনের জন্য ৪ শতাংশ, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরীর জন্য ২ শতাংশ, চিফ হুইপ নূরে আলম চৌধুরীর ভাই মুজিবুর রহমান নিক্সনের জন্য ২ শতাংশ, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমানের জন্য ১ শতাংশ এবং সাবেক সেতু সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার জন্য ১ শতাংশ ঘুষ বরাদ্দ করা হয়েছিল। এসএনসি-লাভালিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ সাহার ডায়রিতে এ হিসাব লেখা ছিল।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতিতে জড়িত থাকায় এসএনসি-লাভালিনের দুই কর্মকর্তা রমেশ সাহা ও মোহাম্মদ ইসমাইলের বিচার চলছে কানাডায়।
আওয়ামী লীগ সরকার প্রথমে পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে আবুল হোসেনসহ কয়েক মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করে এবং দুদক এদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করে।
গত ১৮ এপ্রিল বিশ্বব্যাংক এসএনসি-লাভালিনকে ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছে। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত কোনো প্রকল্পের কাজ করতে পারবে না। একইসঙ্গে এসএনসি-লাভালিনের শতাধিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানকেও কালোতালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এসএনসি-লাভালিন বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছে। নিজেদের প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতি কমিয়ে আনতে বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।