Amardesh
আজঃঢাকা, শনিবার ১৮ মে ২০১৩, ২০১৩, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, ৭ রজব ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

সরকারের সংলাপ প্রস্তাব ছিল স্রেফ লোকদেখানো : জাতিসংঘ দূতের সফর ও সময় পার করতেই সংলাপের আহ্বান : নিপীড়নের চাপে সংলাপে যাবে না বিরোধী জোট

স্টাফ রিপোর্টার
পরের সংবাদ»
সঙ্কট সমাধানে সংলাপে হঠাত্ ব্যাপক আগ্রহী সরকার এখন পিছু হটেছে। সংলাপের প্রস্তাব দিয়ে বিরোধী দলকে চিঠি পাঠানোর ঘোষণা দিয়েও তারা হার্ডলাইনে ফেরায় জনমনে সন্দেহ-সংশয় দেখা দিয়েছে। সরকারের এ আচরণ বিশ্লেষণে রাজনৈতিক মহল বলছেন, তারের সাম্প্রতিক সংলাপ প্রস্তাব ছিল লোকদেখানো। জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের ঢাকা সফরকে সামনে রেখে এবং সময় পার করতেই সরকার সংলাপে ব্যাপক আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। রাজপথে সরকারবিরোধী কর্মসূচির ঢেউ যখন তুঙ্গে, তখন সংলাপ প্রস্তাব দিয়ে আন্দোলনের অগ্নস্ফুিলিঙ্গ নেভাতে সক্ষম হয়েছে তারা। এরপর নিপীড়ন ও গ্রেফতার-নির্যাতনের পথেই বিরোধী দলকে সংলাপে বসানোর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে নির্যাতন-নিপীড়নের চাপে সংলাপে না যাওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতারা। ১৮ দলীয় জোটের অন্য দলগুলোর নেতারাও বলছেন, নিপীড়ন ও সংলাপ একসঙ্গে চলতে পারে না। সরকারের ছকে কোনো সংলাপে যাবে না তারা।
নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে সর্বত্র চলছে আলোচনা। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে এ সঙ্কট সমাধানে খোদ জাতিসংঘ মহাসচিব উদ্যোগী হন। এর আগেই সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে সংলাপের আহ্বান জানান। গত ২ মে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সঙ্কট সমাধানে আমরা সংসদের ভেতরে-বাইরে যে কোনো জায়গায় আলোচনায় বসতে আগ্রহী।’ ওইদিন বিকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ হোসেন বলেন, ‘দুই একদিনের মধ্যে সংলাপের প্রস্তাব সংবলিত চিঠি দেয়া হবে বিএনপিকে।’
জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর (সহকারী মহাসচিব) নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের ঢাকা সফরের আগে সরকারি দলের এমন উদার আহ্বান রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সর্বত্র ব্যাপক আশার সঞ্চার করে। এমনকি মতিঝিলে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের ওপর নির্বিচারে গুলি
ও গণহত্যার ঘটনাও এ সংলাপের আলোচনা দিয়ে চাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের রাজনৈতিক কর্মসূচি, সরকারের মন্ত্রীদের বক্তৃতা-বিবৃতি আর টকশোর আলোচনায় স্থান পায় তখন বহুল আকাঙ্ক্ষিত সংলাপ।
গত ১০ মে থেকে জাতিসংঘ প্রতিনিধি দলের চারদিনের ঢাকা সফরে সবাই আশাবাদী হয়েই সংলাপের আলোচনা করতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, সুশীল সমাজসহ অনেকের সঙ্গে বৈঠক করে সংলাপের মাধ্যমে সঙ্কট সমাধানের পরামর্শ দেয় প্রতিনিধি দল। দু’পক্ষের কথাই শোনেন তারা এবং নিজেরা আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার পদ্ধতি বের করার আহ্বান জানান। দু’পক্ষই সংলাপে সম্মতির কথা জানায়।
তবে জাতিসংঘ দূতের সফর শেষ হতেই মত পাল্টাতে শুরু করে সরকার। সরকারি দলের নেতারা স্পষ্ট গত তিনদিন ধরে বলছেন, যে কোনো আলোচনার জন্য বিরোধী দলকে সংসদে যেতে হবে। সংসদের বাইরে কোনো সংলাপ নয়। বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সভা ডেকে সংসদের বাইরে কোনো সংলাপ হবে না মর্মে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বুধ ও বৃহস্পতিবার পৃথক সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি প্রত্যাখ্যান করে সংলাপের সম্ভাবনাকে নাকচ করে দেন। বুধবার গণভবনে আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় তিনি বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী গণতান্ত্রিক ধারা মেনেই আগামী সাধারণ নির্বাচন হবে।’ আর সেই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠানের জন্য বিরোধীদলীয় নেতাকে সংসদে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পার্লামেন্টে আসেন, বসেন। যা বলার বলেন।’ সংলাপ প্রস্তাব দিয়ে বিএনপিকে কোনো চিঠি দেয়া হবে না বলে বৃহস্পতিবার স্পষ্ট জানিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। আর নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের আলোচনার চেয়ে আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রতি সপ্তাহে একাধিক জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের ডেকে তিনি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। এমনকি মহাসেনের মতো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের দিনেও বৃহস্পতিবার তিনি নেত্রকোনা জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
১৪ দলের মুখপাত্র ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম শুক্রবার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে আবারও জানালেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আর যাই হোক, সংসদের বাইরে কোনো সংলাপ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সংলাপ যদি হতে হয় পার্লামেন্টের ভেতরে হবে। নাসিম বলেন, প্রধানমন্ত্রী খোলা মনে সংলাপের আহ্বান জানালেন, আর বিরোধী নেতা ‘উপহাস’ ও ‘নাটক’ বলে উড়িয়ে দিলেন। এরপর সংলাপ হয় কিভাবে?
পৃথক আলোচনায় শুক্রবার আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও সংলাপের সম্ভাবনাকে দুর্বল হিসেবে উপস্থাপন করেন। সংবিধানের ধারায় অর্থাত্ সরকারের এজেন্ডা অনুযায়ী সংলাপের সম্ভাবনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবকিছুর পরও আমরা আলোচনায় রাজি। আমরা অতীতেও সংলাপের পক্ষে ছিলাম এখনও আছি। এখন বল তাদের কোর্টে। তাদের বলতে হবে তারা সব চক্রান্ত ষড়যন্ত্র ও নৈরাজ্যের পথ পরিহার করে আলোচনায় রাজি। অবশ্যই সংলাপ হবে এবং তা সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই হবে।’
এদিকে সংলাপের কথা বলে সরকার জনগণকে বিভ্রান্ত করছে বলে মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, সংলাপ ও নিপীড়নের রাজনীতি একসঙ্গে চলতে পারে না। সংলাপ প্রস্তাব তাদের লোকদেখানো কৌশল ছাড়া কিছুই নয়। সরকার একদিকে সংলাপের কথা বলছে, অন্যদিকে নিজেরাই শর্ত জুড়ে দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে মওদুদ বলেন, একদিকে প্রধানমন্ত্রী সংলাপের কথা বলছেন, অন্যদিকে তিনি নিজেই শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন, সংবিধানের অধীনেই আগামী নির্বাচন হবে। এটি তার স্ববিরোধী অবস্থান।
১৯৯৪ সালে নির্বাচন নিয়ে সঙ্কট উত্তরণে কমনওয়েলথের সাবেক মহাসচিব স্যার স্টিফেন নিনিয়ানের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, ওই সময়ে স্যার নিনিয়ান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দুই দলের পাঁচজন করে প্রতিনিধি নিয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা (শেখ হাসিনা) বলেছিলেন, ওই ধরনের প্রস্তাব নির্দলীয় সরকারের নয়, দলীয় সরকারের।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে যাওয়া জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে দেখানোর জন্য সরকার এতদিন সংলাপের কথা বলে আসছিল বলেও মন্তব্য করেন সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমদ।
তিনি বলেন, এখন তারা বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেফতার করছে। সংসদে ডেকে আবার মামলা ছাড়াই সংসদ সদস্য বরকত উল্লাহ বুলুকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এভাবে সরকার এখন সংলাপ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, আমরা সরকারকে বলতে চাই, স্ববিরোধিতার রাজনীতি বর্জন করুন। আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসনু, আমরা সাড়া দেব। নিপীড়ন আর গ্রেফতার-নির্যাতন করে বিএনপিকে সংলাপে বাধ্য করার কোনো চক্রান্ত সফল হবে না বলে তিনি সরকারকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন।
এদিকে নির্দলীয় সরকারে ফিরবে না বলেই সরকার এখন সংলাপ নিয়ে ধানাই-পানাই করছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া। তিনি বলেন, বিএনপি নয়, বরং সংলাপের প্রস্তাব সরকারই দিয়েছে। এখন আলোচনা করলে যদি নির্দলীয় সরকার দিতে হয়, আর সেই সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তাদের পরাজয় হবে—সেই ভয়েই তারা এখন সংলাপ নিয়ে ধানাই-পানাই শুরু করেছে।