Amardesh
আজঃঢাকা, শনিবার ১৮ মে ২০১৩, ২০১৩, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, ৭ রজব ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২.০০টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়া : পানিশূন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের নদ-নদী

ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
পরের সংবাদ»
মরণ বাঁধ ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগোচ্ছে সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। বাঁধের কারণে একদিকে প্রমত্তা পদ্মা যেমন নাব্য হারিয়েছে; তেমনি দেড় যুগ ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা-তীরবর্তী অঞ্চলে ব্যাপক নদীভাঙন চলছে। একসময়ের ভয়াল পদ্মা এখন পানিশূন্য। এসব কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দিন দিন নিচে নামছে। ফারাক্কার ক্ষতির কথা চিন্তা করেই ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ফারাক্কা বাঁধবিরোধী লংমার্চ নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এসেছিলেন মজলুম নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শিবগঞ্জ উপজেলার মনাকষা ইউনিয়নের ঠুঠাপাড়া গ্রাম। এই এলাকা দিয়েই প্রমত্তা পদ্মা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ওপারে ভারতের মালদহ জেলার আড়ঙ্গাবাদ ও শোভাপুর এলাকা। বাংলাদেশের ঠুঠাপাড়া পয়েন্ট থেকে ফারাক্কা বাঁধের দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। সন্ধ্যার পর নদীপাড়ে দাঁড়ালে ফারাক্কা বাঁধের ঝলমলে আলো অনায়াসেই দেখা যায় বলে জানান স্থানীয়রা। কিন্তু ফারাক্কা বাঁধের এত কাছাকাছি এসেও পদ্মা নদীতে তেমন একটা পানি দেখা গেল না। নদীর বিশাল এলাকাজুড়ে জেগে উঠেছে বালুচর। অনেকটা দূরে জীর্ণশীর্ণ পদ্মার স্রোতহীন পানিপ্রবাহ দেখা যায়। সরেজমিন এই এলাকা ঘুরে স্থানীয় এলাকাবাসীর কাছ থেকে শোনা গেল ফারাক্কার সর্বনাশী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা। ঠুঠাপাড়া গ্রামের অধিবাসী কৃষক মকবুল হোসেন জানান, শুষ্ক মৌসুমে এখানে এলে বোঝায় যায় না, এখানে কোনো নদী আছে। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন বছরের ৬টা মাস পদ্মায় কোনো পানি থাকে না। চারিদিকে শুধু ধূধূ বালুচর। তিনি জানান, তার পূর্বপুরুষদের কাছে গল্প শোনা পদ্মার ভয়াল রূপ আর এখন দেখা যায় না। নদীর উজানে ভারত বাঁধ দেয়ায় নদীর এমন করুণ রূপ বলে তিনি জানান। এর প্রভাবে আপনাদের তেমন কী ক্ষতি হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পানির অভাবে নদী পাশে থাকা সত্ত্বেও আমাদের জমিতে সেচ দেয়ার জন্য মাটির নিচ থেকে পানি তুলতে হচ্ছে। তার কথার সত্যতা মেলে নদী-তীরবর্তী বিশাল মাঠ দেখে। বিভিন্ন শাকসবজির আবাদ হচ্ছে এসব মাঠে। কিছু দূর পর পরই ছোট ছোট চাটাইয়ের ঘর। এসব ঘরে নলকূপ বসিয়ে ভূগর্ভ থেকে তোলা পানি দিয়েই আবাদ করা হয় বলে স্থানীয়রা জানান। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচের পানি পেতে কৃষকের দুর্ভোগের শেষ থাকে না। একই এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি হেলাল উদ্দিন বললেন, ফারাক্কা বাঁধের কারণে নদীতে পানি না থাকায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জেলেরা। যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পদ্মা-তীরবর্তী শত শত পরিবার একসময় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করত; অথচ এখন তারা বেকার হয়ে পড়েছে। অনেকেই পেশা পরিবর্তন করে চলে গেছে অন্য পেশায়। তিনি বলেন, পদ্মার রুপালি ইলিশ এখন আর নেই। অন্যান্য মাছও আর তেমন পাওয়া যায় না। গভীর রাতে জেলেদের হৈ-হুল্লোড় আর গানও শোনা যায় না। স্থানীয় অধিবাসী বিনোদপুর ডিগ্রি কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষক হারুনুর রশিদ টুকু বলেন, ফারাক্কার বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় এই এলাকা ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পানির নায্য হিস্যা না পাওয়ায় এসব এলাকায় ভূর্গস্থ পানির স্তর দিন দিন কমছে। শুষ্ক মৌসুমে নলকূপেও পানি ওঠে না। জমিগুলো পানির অভাবে উর্বরতা শক্তি হারিয়ে ফেলছে। এছাড়া পানির অভাবে বর্ষা মৌসুমে নদী-তীরবর্তী এলাকা না ডোবায় জমিতে পলি পড়ছে না। আর এ কারণে ফলন দিন দিন কমছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, বেশি সার ব্যবহার করেও ফলন ভালো পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, সব মিলিয়ে ফারাক্কা বাঁধের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চল ব্যাপক পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
একই এলাকার রাজনৈতিক কর্মী সাইরুল আলম বলেন, কয়েক বছর ধরে পদ্মায় পানি সরবারহ একবারেই কমে গেছে। আর বর্ষা মৌসুমে ভারত পানি ছেড়ে দেয়ায় বাংলাদেশ এলাকায় ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দিচ্ছে।
শুধু ঠুঠাপাড়ায় নয়, ফরাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার চিত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জের অঞ্চলজুড়ে। গত দেড় যুগ ধরে সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে চলছে ভয়াবহ নদীভাঙন। এ দুই উপজেলার নারায়ণপুর, সুন্দরপুর, পাকা ও উজিরপুর—প্রায় এ চার ইউনিয়নই বিলীন হয়ে গেছে নদীতে। এছাড়া দেবীনগর, আলাতুলি, শাহজাহানপুর, ইসলামপুর, চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নেও অব্যাহত রয়েছে নদীভাঙন। এসব ইউনিয়নের কয়েক লাখ মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
ফারাক্কার কারণে পরিবেশের ওপরও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে হস্তচালিত নুলকূপে পানি উঠছে না। স্থানীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের তথ্যমতে, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় ২৫ হাজার হস্তচালিত নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ইনস্টিটিউট চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ সোহেল আবদুল্লাহ জানান, ফারাক্কার কারণে অতিরিক্ত খরাপ্রবণ হয়ে উঠেছে জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল। নদীগুলো শুকিয়ে যাওয়ায় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এতে সবচেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছে কৃষি খাত।
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী কোহিনুর আলম ফারাক্কার কারণে এ এলাকায় ব্যাপক নদীভাঙন দেখা দেয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, ভাঙন প্রতিরোধে এরই মধ্যে নদীর বাম তীরে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।