বাংলাদেশে সরকারি মিথ্যাচার ও সংসদীয় গণতন্ত্র্র

অ লি উ ল্লা হ নো মা ন « আগের সংবাদ
পরের সংবাদ» ১৭ মে ২০১৩, ২১:০৯ অপরাহ্ন

ব্রিটেনের মন্ত্রিসভার সাবেক এক সদস্য এবং তার সাবেক স্ত্রী গত রোববার কারাগার থেকে মুক্ত হয়েছেন। দুই মাস জেলে থাকার পর একই দিনে দু’জন মুক্তি পেলেন। বর্তমান মন্ত্রিসভার এই সদস্য শুধু একটি মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগে মন্ত্রিত্ব হারান এবং জেলে যান। শর্তসাপেক্ষে এই দু’জনকে গত রোববার (১২ মে ২০১৩) মুক্তি দেয়া হয়েছে। মিথ্যা তথ্য সরবরাহের অভিযোগে তাদের ৮ মাস করে জেল হয়েছিল। এখন তারা বাড়িতে নির্ধারিত কিছু শর্তে থাকতে পারবেন। তাদের ইলেকট্রনিক বেল্ট পরিয়ে দেয়া হয়েছে। শর্ত ভঙ্গ করলে ইলেকট্রনিক যন্ত্র বাজতে থাকবে। একই সঙ্গে বাজবে পুলিশের নির্ধারিত কন্ট্রোলরুমে। এই বেল বাজার ধ্বনি পুলিশের কন্ট্রোলরুমের যন্ত্রে দেখাবে কোথায় অবস্থান। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ এসে তাদের আবার জেলে নিয়ে যাবে।
বর্তমান মন্ত্রিসভার এই সদস্যের মিথ্যা তথ্য সরবরাহের অভিযোগ ওঠার পর পদত্যাগ করতে হয়েছিল। বিচারের মুখোমুখি হলে তার ৮ মাস জেল হয়। একই মেয়াদে জেল দণ্ড হয় সাবেক স্ত্রীরও। কারণ দু’জনই এই মিথ্যা তথ্যের জন্য দায়ী। প্রায় এক দশক আগে এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি চালিয়ে আসছিলেন এই দম্পতি। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন মন্ত্রী নিজে। কিন্তু তিনি গাড়ির গতি নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি স্পিডে চালাচ্ছিলেন। এটি ধরা পড়ে গতি নিয়ন্ত্রণ ক্যামেরায়। যথারীতি বাড়িতে নোটিশ আসে। গাড়িটি কে চালাচ্ছিলেন জানতে চাওয়া হয়। গাড়িটির মালিক ছিলেন ওই রাজনীতিবিদ। তখনও মন্ত্রী হননি তিনি। সঠিক তথ্য দিলে তার ড্রাইভিং লাইসেন্সে ৩ পয়েন্ট মাইনাস হতো এবং কিছু জরিমানা হতো। কিন্তু সামনে নির্বাচন থাকায় তিনি এই ঝুঁকি নিতে চাননি। স্ত্রী গাড়িটি চালাচ্ছিলেন এই তথ্য দিলে তার ড্রাইভিং লাইসেন্সে মাইনাস পয়েন্ট যোগ হবে না। দিতে হবে না তাকে জরিমানা। স্ত্রীর নাম দিয়ে তথ্য সরবরাহ করলে তখন স্ত্রীর ড্রাইভিং লাইসেন্সে মাইনাস পয়েন্ট যোগ হবে। রাজনীতিবিদ স্বামীর জন্য এই ঝুঁকি নিতে স্ত্রীও রাজি হলেন। কিন্তু মন্ত্রী হওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ লাগে। সংসারে ভাঙন দেখা দেয়। তখন ৮ বছর আগে মিথ্যা তথ্যের বিষয়টি স্ত্রী ফাঁস করে দিলেন। অভিযোগ করলেন, গাড়ি ওভার স্পিডে চালানোর বিষয়ে তার স্বামী মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন। আসলে গাড়ি চালাচ্ছিলেন ওই রাজনীতিবিদ নিজে। কিন্তু তথ্য দেয়া হয়েছিল স্ত্রীর নামে। এই মিথ্যা তথ্য দেয়ার বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়াল। মন্ত্রিত্ব গেল। বিচারে দু’জনেরই দণ্ড হলো। কারণ স্বামীর কথায় স্ত্রীও রাজি হয়েছিলেন মিথ্যা তথ্য দিতে। এজন্য দু’জনেরই সমান দণ্ড হয়। জেলে যান দু’জনই। ৮ মাস করে কারাদণ্ড হয়েছিল। দুই মাস কারাগারে থাকার পর দুই জনই নির্ধারিত শর্তে গত রোববার জামিন পেলেন।
উপরের এই বর্ণনাটি দিলাম বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচারের অভিযোগে কত বছর করে কারাদণ্ড হতে পারে সেটা বোঝানোর জন্য। ব্রিটেনের স্টাইলেই আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র। তবে তাদের আর আমাদের আইন ও বিচার ব্যবস্থার ফারাক এই একটি উদাহরণ থেকেই বোঝা যায়। আমাদের রাজনীতিক, আমলা ও পুলিশ, র্যাব এমনকি বিচার বিভাগ পর্যন্ত মিথ্যাচার করে। এমনকি আমাদের সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ বিচার চলাকালীন আসামি পক্ষের তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের প্রসঙ্গে বলেন ‘ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স’। আমার (অলিউল্লাহ নোমান) ও আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে একটি আদালত অবমাননা মামলার শুনানিতে আপিল বিভাগ এই দম্ভোক্তিটি করেছিলেন। ‘চেম্বার মানেই সরকার পক্ষে স্টে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদনের কারণে আমাদের বিরুদ্ধে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ আদালত অবমাননার রুল জারি করেছিলেন। মামলার শুনানির সময় আমার দেশ সম্পাদক নিজেই শুনানি করছিলেন। তিনি আদালতের সামনে আমাদের প্রকাশিত প্রতিবেদনের পক্ষে দলিল উপস্থাপন করেন। তখন আদালত বলেছিলেন ‘ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স’। আরও বলেছিলেন, ‘আমরা এখানে সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের জন্য বসিনি। প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে আদালত অবমাননা হয়েছে কীনা সেটা শুধু দেখব।’ ব্রিটেনে সামান্য একটি মিথ্যার জন্য মন্ত্রিত্ব যায়, জেল দণ্ড হয়। আর আমাদের দেশে সংবাদপত্রে সত্য লেখার কারণে, আদালতের বিচার নিয়ে পক্ষপাতিত্বের উদাহরণ লেখার কারণে সম্পাদক ও প্রতিবেদকের জেলদণ্ড হয়। এখানেই হলো ব্রিটেনের সংসদীয় গণতন্ত্র ও আমাদের গণতন্ত্রের মধ্যে ফারাক। ব্রিটেনের বিচার ব্যবস্থা ও আমাদের বিচার ব্যবস্থার মধ্যে তফাত্।
আমি যে কথাটি বলতে চাচ্ছি সেটি হচ্ছে, আমাদের রাজনীতিবিদরা তো হরহামেশাই মিথ্যা বলছেন। গত ৫ মে হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে রাত ৯টার পর মতিঝিল এলাকার বিদ্যুত্ লাইন বন্ধ করে দেয় সরকার। এলাকাটি অন্ধকারাচ্ছন্ন করা হয় সরকারি উদ্যোগে। গভীর রাতে অবস্থানকারীদের কেউ ঘুমাচ্ছিলেন, কেউ নামাজ পড়ছিলেন এবং কেউ আল্লাহর জিকির করছিলেন। এমন অবস্থায় ১০ হাজার পুলিশ, ব্যাব ও বিজিবি (সাবেক বিডিআর) বাহিনীর যৌথ অপারেশ হলো। সরকারি হিসাবে খরচ হয়েছে এক লাখ ৬৫ হাজার রাউন্ড গুলি। কিন্তু আমাদের সরকারের মন্ত্রী ও সরকার দলীয় রাজনীতিবিদরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে বললেন, কোনো গুলি-বোমা ছাড়াই মতিঝিল অপারেশন শেষ করা হয়েছে। এজন্য তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন।
হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচিতে বিদ্যুতের আলো ছিল, মিডিয়ার উপস্থিতি ছিল বলে প্রচার করছেন সরকারের মন্ত্রী ও সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতারা। খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মনি আল জাজিরা টেলিভিশনকে বললেন, ২৩টির মতো ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া অপারেশনের সময় উপস্থিত ছিল। তারা ভিডিও চিত্র ধারণ করেছে। সবাই মোবাইল ব্যবহার করে। তাদের মোবাইল ক্যামেরায়ও চিত্র ধারণের সুযোগ রয়েছে। এমনকি বিদ্যুত্ ছিল বলেও তিনি দাবি করলেন আল জাজিরায়। এটা মিথ্যাচারের একটি ছোট উদাহরণ। সরকারের মন্ত্রী ও সরকার দলীয় রাজনীতিবিদরা সবাই এমন কথা বলেন। কিন্তু যারা সেই রাতে টেলিভিশনের সংবাদগুলো দেখছিলেন তারা সবাই জানেন বিদ্যুত্ লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়েছে। সেটা টেলিভিশনের সংবাদে সঙ্গে সঙ্গে প্রচারিত হয়েছে দেশে-বিদেশে। অনলাইন পত্রিকাগুলো এই তথ্য প্রকাশ করেছে মুহূর্তের মধ্যে। রাতে মিডিয়ার সাংবাদিকদের মতিঝিল এলাকা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এই তথ্যও দেশে-বিদেশে প্রচারিত হয়েছে তাত্ক্ষণিকভাবে। আমরা কয়েক বন্ধু মিলে লন্ডনের একটি কলেজে এক বন্ধুর অফিসে বসে বাংলাদেশের সংবাদ দেখছিলাম। জাগো বিডি নামের একটি ওয়েব সাইটের কল্যাণে বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলোর অনুষ্ঠান ও সংবাদ সরাসরি দেখা যায়। হেফাজতে ইসলামের সেদিনের ঢাকা অবরোধ ও পরবর্তী সময়ে মতিঝিলের অবস্থান নিয়ে কৌতূহল ছিল সবার মধ্যে। এজন্য সবাই মিলে একসঙ্গে বসে সংবাদ দেখা। বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় লন্ডনে বিকাল ৪টায় বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সংবাদ প্রচারিত হয়। মিডিয়া কর্মীদের সরিয়ে দেয়ার সংবাদ প্রচারিত হয় লন্ডনের সময় বিকাল ৭টা ও বাংলাদেশ সময় রাত ১২টায়। গণহত্যার কিছুক্ষণ আগে দিগন্ত টিভি এবং ইসলামিক টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু সরকার মিথ্যাচার করছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আল জাজিরা টেলিভিশনে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত সংবাদে দেখানো হয় কীভাবে লাশ গাড়িতে ওঠানো হচ্ছে। সরকার সমর্থক মিডিয়াগুলোতেও প্রচার করা হয়েছে কিছু লাশের সংবাদ। রাতের ঘটনায় ঢাকা মেডিকেলে ১১টি লাশ গেছে সেই সংবাদ প্রচারিত হয়েছে সরকার সমর্থক একটি টেলিভিশন চ্যানেলে। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিপু মনি আল জাজিরা টেলিভিশনকে বললেন, কোনো হতাহত ছাড়াই মতিঝিল থেকে হেফাজতে ইসলামকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এরকম জঘন্য মিথ্যাচার দেখলে হিটলারের প্রচার মন্ত্রী গোয়েবলসও হয়তো লজ্জা পেতেন। কারণ গোয়েবলসের মিথ্যাচার পৃথিবীতে উদাহরণ হয়ে আছে। সেই মিথ্যাচারকেও হার মানাচ্ছে আমাদের সরকারের মন্ত্রীদের জলজ্যান্ত মিথ্যাচার। যদি সরকারের এতটাই সত্ সাহস থাকে তাহলে সেই রাতেই দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামিক টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধ করে দেয়া হলো কেন!
অপরদিকে হেফাজতে ইসলাম দাবি করছে তাদের দুই হাজারের বেশি নেতাকর্মী সেই রাতে শাহাদাত্ বরণ করেছেন। ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত ও বহুল প্রচারিত দি ইকনোমিস্ট লিখেছে, ৫০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। হংকংভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন, এশিয়ান হিউম্যান রাইট্্স কমিশন প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতের সংখ্যা আড়াই হাজারের বেশি। বাংলাদেশের খ্যাতনামা মানবাধিকার সংগঠন বলেছে, শত শত লোক সেই রাতে নিহত হয়েছেন। লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একটি নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সরকার এসব বিষয়ে নীরব।
দৈনিক আমার দেশ সম্পাদককে গ্রেফতার করা হলো স্কাইপ স্ক্যান্ডাল প্রকাশের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায়। স্কাইপ স্ক্যান্ডাল একটি স্বীকৃত প্রমাণিত সত্য ঘটনা। স্কাইপে কথোপকথনকারী বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ও তার বন্ধু ড. আহমদ জিয়াউদ্দিন দু’জনই স্বীকার করেছেন। তারা দু’জনই বলছেন, স্কাইপে এই কথাগুলো তারা বলেছেন। এজন্য দায় স্বীকার করে বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। ড. আহমদ জিয়াউদ্দিন বিষয়টি স্বীকার করে পত্রিকায় কলাম লিখেছেন। তাদের কথোপকথনের বিষয়ে গর্ব করে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেছেন। এই প্রমাণিত সত্য প্রকাশের কারণে মাহমুদুর রহমানকে রিমান্ডে নিয়ে চরম নির্যাতন করা হলো। নির্যাতনের যত রকম কৌশল রয়েছে সবই প্রয়োগ করা হলো তার শরীরে। অথচ অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম (রাষ্ট্রীয় বেতনভুক্ত) হাইকোর্টে দাঁড়িয়ে বললেন, মাহমুদুর রহমানের ওপর কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয়নি।
এদিকে গত রোববার আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে এক প্রশ্নের জবাবে বললেন, মাহমুদুর রহমানকে সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। কারণ তিনি শাহবাগি ব্লগারদের ওয়েবসাইটে লেখা ধর্ম নিয়ে বক্তব্যগুলো আমার দেশ-এ প্রকাশ করেছেন। এই লেখাগুলো প্রকাশের কারণে দেশে সাম্প্রদায়িক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। এটা একটা ডাহা মিথ্যাচার। এ বিষয়ে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা নেই। এ সংক্রান্ত কোনো মামলায় তাকে রিমান্ডও চাওয়া হয়নি। অথচ আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পাদকদের কাছে মিথ্যাচার করলেন। বললেন ধর্ম নিয়ে উস্কানি দেয়ার অভিযোগে আমার দেশ বন্ধ করা হয়েছে, সম্পাদককে গ্রেফতার করা হয়েছে। জোর করে আমার দেশ-এর ছাপাখানা বন্ধ করে রেখেছে সরকার। অথচ তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে বললেন, আমার দেশ প্রকাশে কোনো বাধা নেই।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অন্যান্য মন্ত্রী ও সরকার দলীয় রাজনীতিবিদদের মিথ্যাচার নিয়ে উদাহরণ লিখতে থাকলে মহাকাব্য লেখা যাবে। মাত্র কয়েকদিন আগে সিএনএন টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাত্কার দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী নিজে মিথ্যাচার করছিলেন। সিএনএন-এর সাংবাদিক প্রশ্ন করছিলেন—সাভার ভবন ধসের পর তারা বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিল। কিন্তু ভিসা দেয়া হয়নি। প্রধানমন্ত্রী বললেন, সত্য নয়। যখন সিএনএন সাংবাদিক বললেন, তাকে ভিসা দেয়া হয়নি সেই প্রমাণ তার কাছে রয়েছে। তখন প্রধানমন্ত্রী ইতস্তত করতে থাকলেন। মিথ্যাচারে সরাসরি ধরা পড়লেন সিএনএন-এর কাছে।
আমাদের উচ্চ আদালত কথায় কথায় সুয়োমোটো (স্বপ্রণোদিত) রুল জারি করে বিভিন্ন নির্দেশনা দেয়। কোন শিক্ষক ছাত্রীদের পর্দা করতে বলেছেন, তাকে সুপ্রিমকোর্টে ডেকে আনেন। এতে নারী অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে শিক্ষকের দণ্ড হয়। সামাজিক বিচার করে কাউকে দণ্ড দিলে ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সুয়োমোটো রুল দিয়ে ডেকে এনে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। কিন্তু মতিঝিলে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবি গুলি চালিয়ে গণহত্যা করলে আদালতের দৃষ্টিতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় না। একদিনে রাজপথে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে ৭০ জনের বেশি প্রতিবাদী মানুষকে হত্যা করলে গণহত্যা হয় না। আদালতের দৃষ্টিতে এগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়! এসবের প্রতি আদালতের দৃষ্টি যায় না। তখন আদালতের বিবেক অন্ধ! কারণ সুপ্রিমকোর্টের ভাষায় ঘটনা তাদের বিপক্ষে গেলে ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স।
যে কথাটি দিয়ে শুরু করেছিলাম। ব্রিটেনের ওয়েস্ট মিনস্টার স্টাইলে সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে আমাদের দেশেও সংসদীয় পদ্ধতি চালু করা হয়েছে ১৯৯১ সালে। কিন্তু এই দীর্ঘ ২৩ বছরেও ব্রিটেনের গণতান্ত্রিক নিয়মনীতির ধারেকাছে যেতে পারেনি দেশ। ব্রিটেনের পদ্ধতি চালু হলেও আমাদের দেশে চলছে প্রধানমন্ত্রী শাসিত মিথ্যাচারের গণতন্ত্র। যেখানে উচ্চ আদালত থেকে শুরু করে নিম্নে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত পর্যন্ত দলীয় রাজনীতিতে আচ্ছন্ন। প্রশাসনের সব পর্যায়ে দলীয়করণের তলানিতে নেমেছে। সেই দেশে আর যাই হোক গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসন চালু রয়েছে সেটা বলা যায় না। বিচার প্রার্থী ও আইনজীবীর দলীয় পরিচিতির উপর নির্ভর করে বিচার কতটা কার পক্ষে যাবে। আইন ও নীতি দেখে নয়। মিথ্যাচারও ততটাই করা হয় যতটা নিজেদের স্বার্থের প্রয়োজনে মনে করেন নেতা ও মন্ত্রীরা।
লেখক : দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিনিধি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত
nomanoliullah@yahoo.com

সাপ্তাহিকী


উপরে

X