Amardesh
আজঃঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৬ মে ২০১৩, ০২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২০, ০৪ রজব ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 কার্টুন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

ভাত

হোসেন শওকত
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
—আফা, আব্বা কই? বাবলুর ক্ষীণ কণ্ঠ। কথাগুলো টেনে টেনে বলে। খুব মনোযোগ দিয়ে না শুনলে কানে আসে না। তার আপা, মানে রেহানা, পাশেই শোয়া। তাই শুনতে পায়। কিন্তু জবাব দিতে ইচ্ছে হয় না।
—আফা, আম্মা কই?
— জানি না। রেহানা শব্দগুলো তৈরির জন্য জিহ্বা নাড়ায়। পৃথিবীর বিশাল বায়ুমণ্ডলে তা মোটেও কাঁপন তোলে না।
—কি কইলা? বাবলু তাই ফের জানতে চায়।
—চুপ কর! রেহানা ধমকে ওঠার চেষ্টা করে। তার খটখটে মুখ আর ফাটা ঠোঁটে টান পড়ে। ব্যথা করে গলায়। গলা তো নয়, যেন শুকনো খটখটে বাঁশ। কথা বলার চেষ্টায় শুকনো বাঁশে চিড় ধরে। গলার ভেতরে যেন কেউ ছুরি দিয়ে চিরে দিল।
পেটের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে। গতকাল পর্যন্ত চুকা ঢেকুর উঠেছে। আজ তা-ও নেই। হাত-পায়ে চিনচিন ব্যথা।
—আমার মনে হয় আব্বা ভাত আনতে গেছে। বাবলুর চোখ জ্বলজ্বল করতে চায়। কিন্তু তৈল ফুরানো হারিকেনের মতো মিট মিট করে।
শুনে রেহানার চোখও চকচক করে। হয়তো আশা জাগে মনে। বলে, কেমনে জানস?
—আমি কইছিলাম, আব্বা ভুক লাগছে। ভাত খামু। বাবলু আদুরে গলায় বলে।
—এই কথা তো প্রত্যেক দিনই কস। নতুন কী?
—আইজকা যাওনের আগে আমার পেড দেহাইছি। বলে নিজের পেটের দিকে তাকানোর চেষ্টা করে বাবলু। কিন্তু মাথা তোলার শক্তি পায় না।
—বাজান তো আইজ না, কাইল গেছে। রেহানা ভুল ধরিয়ে দেয়।
—আচ্ছা আফা, কতো ক’দিন অইছে ভাত খাই না?
—কি জানি, মনে নাই। বিশ পর্যন্ত গুনছিলাম। তারপর তো বাদ দিয়া দিলাম। গুইন্যা আর কি অইবো।
—বিশের পরে কত, আফা?
—একুশ।
—তারপর?
—বাইশ।
—একশ কবে? মনে অয় একশ দিন অইয়া গেছে।
রেহানা কিছু বলে না। শূন্যে তাকিয়ে থাকে। দুই ভাইবোন করিমগঞ্জ শরণার্থী শিবিরে শুয়ে। দু’জনের বুকের পাজর বেরোনো। পেট বোঝা যায় না। মনে হয়, অন্ধকার গর্ত। আশপাশে আরও অনেক অনাহারী মানুষ, শিশু ও বৃদ্ধ শুয়ে আছে।
—বাজান কেন এইহানে আইল, দেশে কত ভাত আছিল।
—যুদ্ধ লাগলো, তাই...
—বাজান কইলো এন্ডিয়াতে সুখ অনেক।
—চুপ কর... আল্লাহ আল্লাহ কর...
—দেশে তো ভাত ছাড়া আরও কত খাওন আছিল...
—রেহানার গলায় গড়গড় শব্দ শোনা যায়।
—আফা যুদ্ধ অইলে কি হয়?
—এই পোলা এতো প্যাঁচাল পারস ক্যান? চুপ যা। পাশের এক বৃদ্ধ খেকিয়ে ওঠে।
—যুদ্ধে গেলে কি খাওন দেয়?
রেহানার শরীর ছটফট করে ওঠে।
—আফা উঠবি তুই? উঠতি পারবি? যা দেইখা আয় তাইলে, বাজান কই।
রেহানা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তার শেষ নড়াচড়া ছিল মৃত্যুর আগে ছটফটানি। তার চোখ মুদে আসে।
—আফা ঘুমাইস না। রিলিফ লইয়া আনলে কিন্তু খাইতে পারবি না। আমি কইলাম, দুইজনের খাওন আনতে পারুম না।
—দেশ স্বাধীন করে! মানুষ না খায়া মরে আর তারা দেশ স্বাধীন করে। পাশের বুড়ো খেকিয়ে ওঠে।
—স্বাধীন কি খাওন যায়? বাবলু টেনে টেনে বলে। কথা বলতে কষ্ট হয়। তবুও চুপ থাকতে পারে না। তার মাথা কেমন চক্কর দিয়ে ওঠে। ঝিমঝিম করে। চোখে সাদা সাদা দেখে। মনে হয়, সানকি ভর্তি ভাত। চারপাশে শুধু ভাত। এত ভাত সে কিভাবে খাবে? কখন খাবে? হায় আল্লা, হাতের কাছে এত ভাত থাকতে সে কেন মিছিমিছি এত কষ্ট করল? ভাত পাওয়া এতো সহজ জানলে সে কি এতো কষ্ট করত? চোখ মোদার পর কত সহজেই সে চলে এল ভাতের রাজ্যে। আফাও কি এসেছে? কিন্তু দেখছে না কেন আপাকে?

পরদিন পত্রিকায় হেড লাইন বেরোল, আপনি শুধু সমবেদনা জানাতে পারেন। কোনো সাহায্য করতে পারবেন না ওদের। ভেতরে লিখলো, ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে শরণার্থী শিবিরে কিশোর ভাইবোন পাশাপাশি শুয়ে মারা গেছে। একজনের বয়স সাত। অন্যজনের পাঁচ। মৃত্যুকালে তারা পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে শুয়েছিল।