Amardesh
আজঃঢাকা, বুধবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ১৫ ফাল্গুন ১৪১৯, ১৬ রবিউস সানি ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিকী
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

বেরিয়ে আসছে বিসমিল্লাহ গ্রুপের আরও চাঞ্চল্যকর অর্থ কেলেঙ্কারি : ‘মালের আমদানিকারক অস্ট্রেলিয়ায়, শিপমেন্ট যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে; কিন্তু ডকুমেন্ট গেছে আরব আমিরাতে’

আসাদুল্লাহিল গালিব
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিসমিল্লাহ গ্রুপের প্রায় ১১০০ কোটি টাকা আত্মসাতের পর আরও নতুন নতুন চাঞ্চল্যকর অর্থ কেলেঙ্কারির ঘটনা বেরিয়ে আসছে। এতে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একোমোডেশন বিল সৃষ্টি করে মার্কেন্টাইল, যমুনা, শাহজালাল ইসলামী, প্রাইম, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট, আল-আরাফাহ্, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, এইচএসবিসি এবং এনসিসি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে ফান্ডেড ঋণ নিয়ে অর্থ আত্মসাত্ করা হয়েছে। প্রিমিয়ার ব্যাংকের মতিঝিল শাখা এসব আইবিপি বিলে স্বীকৃতি দিয়েছে। এতে ব্যাংকের আরও ৫১ কোটি ৬১ লাখ টাকা শ্রেণীকরণ করতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিসমিল্লাহ গ্রুপের প্রতিটি রফতানি ডকুমেন্টের কমার্শিয়াল ইনভয়েসে রফতানিকারক হিসেবে মেসার্স আলফা কম্পোজিট টাওয়েলসের নাম রয়েছে। প্রেরিত এসব মালের প্রাপক (কনসাইনি) হিসেবে দেখানো হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার মেসার্স চিনো হাউজ প্রা. লি.। কিন্তু ইনভয়েসটি প্রেরণ করা হচ্ছে মেসার্স বাংলুজ মিডেল ইস্ট এফডেজই; আর প্রাপকের ব্যাংক হিসাবে রয়েছে ইউনাইটেড আরব আমিরাতের আবুধাবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের নাম। অর্থাত্ বিল অব ল্যাডিংয়ে জাহাজীকরণ বা রফতানিকারক হিসেবে আলফা কম্পোজিট, পোর্ট অব ডেলিভারি ইউএসএ দেখানো হলেও নোটিফাই পার্টি হিসেবে মেসার্স বাংলুজ মিডেল ইস্ট এফজেডই, ইউএই দেখানো হয়েছে। এখানে অদ্ভুত ব্যাপার হলো—মালের আমদানিকারক অস্ট্রেলিয়াতে, শিপমেন্ট যাচ্ছে ইউএসে কিন্তু ডকুমেন্ট যাচ্ছে ইউএইতে।
বাংলুজ মিডেল ইস্ট এফজেডই’র ক্রেডিট রিপোর্টে দেখা গেছে, এ প্রতিষ্ঠানের প্রোপ্রাইটর খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী। একটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এর কোনো আর্থিক তথ্য না থাকায় তাদের আর্থিক সচ্ছলতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এদিকে খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী বাংলাদেশের বিসমিল্লাহ টাওয়েলস গ্রুপের প্রত্যেকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এখানে রফতানিকারক ও আমদানিকারক একই ব্যক্তি হওয়ায় মালামাল বিদেশে রফতানি হয়েছে কি-না, এ ব্যাপারে নিশ্চিত নয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে নির্ধারিত ১২০ দিনের সময়সীমা শেষ হলেও রফতানিমূল্য দেশে ফেরত আসেনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত আলফা কম্পোজিটের ড্র করা ৪৩টি বৈদেশিক মুদ্রা বিলে ৪৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকার স্বীকৃতি দিয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংকের মতিঝিল শাখা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ছিল মেসার্স হামীম টেক্সটাইল মিলস, মা এয়ারজেট স্পিনিং মিলসসহ বিভিন্ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একোমোডেশন বিল সৃষ্টি করে মার্কেন্টাইল, যমুনা, শাহজালাল ইসলামী, প্রাইম, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট, আল-আরাফাহ্, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড, এইচএসবিসি এবং এনসিসি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা থেকে ফান্ডেড ঋণ নিয়ে অর্থ আত্মসাত্ করা হয়েছে। স্বীকৃতি দেয়ার সময় সরবরাহকারী প্রকৃত মালামাল ডেলিভারি দিয়েছে কি-না, তা পরিদর্শন করা হয়নি। আর বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও বিসমিল্লাহ টাওয়েলসের অনুকূলে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে বলে নিশ্চিত হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পরিদর্শনে আরও দেখা যায়, বিসমিল্লাহ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হামীম টেক্সটাইল মিলের ৪টি স্থানীয় বিল ক্রয় করে ৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকার আইবিপি ঋণ সুবিধা দেয়া হয়েছে। এসব বিলের স্বীকৃতি দিয়েছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ইস্কাটন শাখা। যার সরবরাহকারী বিসমিল্লাহ টাওয়েলস। এক্ষেত্রে একোমোডেশন বিল সৃষ্টি করে অর্থ আত্মসাত্ করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক হামীম টেক্সটাইল মিলের বকেয়া ৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকা শ্রেণীকৃত এবং ভুয়া ডকুমেন্টের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংকের আইবিপি সৃষ্টি করে আত্মসাত্ করা ৪৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করতে প্রিমিয়ার ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে। এ অর্থ গ্রাহক থেকে আদায় বা ফোর্সড লোন সৃষ্টি করে পরিশোধের ব্যবস্থা এবং সৃষ্ট ফোর্সড লোনগুলো গুণগত ভিত্তিতে যথাযথ মানে শ্রেণীকরণ করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যবস্থা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অবহিত করতে বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পক্ষের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বিসমিল্লাহ টাওয়েলস, মেসার্স আলফা কম্পোজিট ও হিন্দুলওয়ালি টাওয়েলস। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে খাজা সোলায়মান জনতা ব্যাংক থেকে ৩৯২ কোটি ৫৭ লাখ, প্রাইম ব্যাংকের ৩০৬ কোটি ২২ লাখ, যমুনা ব্যাংকের ১৬৩ কোটি ৭৯ লাখ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ১৪৮ কোটি ৭৯ লাখ, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৬২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ বিষয়ে দৈনিক আমার দেশ-এ গত ১৭ জানুয়ারি ‘ব্যাংকিং সেক্টরের আরেক লুটেরা খাজা সোলায়মান’ ও ২৭ জানুয়ারি ‘প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ১৯৩ কোটি টাকা আত্মসাত্’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ পায়। আমার দেশ-এ সংবাদ প্রকাশের পর জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে বিসমিল্লাহ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আলফা কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী, তার স্ত্রী ও আলফা কম্পোজিটের চেয়ারম্যান নওরীন হাসিব এবং আলফা কম্পোজিটের পরিচালক মো. শফিকুল আলম চৌধুরী দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন বলে মতিঝিল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) বিএম ফরমান আলী নিশ্চিত করেছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে আরও দেখা যায়, আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস এবং হামীম টেক্সটাইল মিলসের নামে প্রিমিয়ার ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় যে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, তাতে পরিচয়দানকারীর কোনো বর্ণনা ছিল না। শাখা ব্যবস্থাপক স্বপ্রণোদিত হয়েই দুটি অ্যাকাউন্ট খুলেছেন; যার অল্পদিনের মধ্যে ২০১১ সালের ১৩ নভেম্বর আলফা কম্পোজিটের অনুকূলে ২২ কোটি টাকা ঋণসীমা প্রিমিয়ার ব্যাংকের পর্ষদ অনুমোদন করে। তবে ঋণ প্রস্তাব বিবেচনার সময় বিসমিল্লাহ গ্রুপের প্রাইম ব্যাংকের মতিঝিল শাখা, যমুনা ব্যাংকের দিলকুশা শাখা, শাহজালাল ব্যাংকের ইস্কাটন শাখা, জনতা ব্যাংকের মগবাজার ও জনতা ভবন করপোরেট শাখা হতে বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধা গ্রহণের তথ্যগুলো যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। তাছাড়া ঋণ প্রস্তাবে বিসমিল্লাহ গ্রুপের ২০১০ সালে ৫৪৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা এবং ২০১১ সালে ৬৯৬ কোটি ৪ লাখ টাকা রফতানি পারফরম্যান্স দেখানো হলেও কোম্পানির এত সক্ষমতা রয়েছে কি-না, তা যাচাই-বাছাই করা হয়নি।