Amardesh
আজঃঢাকা, শুক্রবার ০১ ফেব্রুয়ারী ২০১৩, ১৯ মাঘ ১৪১৯, ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪ হিজরী    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

এবার একুশের বইমেলা শুধুই প্রকাশকদের

আ সা দ সা য়ে ম
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
দীর্ঘ এক বছর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ পর্দা উঠছে বাংলাদেশের বইপ্রেমী মানুষের প্রাণের মেলা অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৩-এর। বইপ্রেমীরা সারাবছর এই মাসটির প্রতীক্ষায় থাকেন। এরই মধ্যে মেলার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। শুধুই প্রকাশকদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের মেলা। জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশনা নিয়ে আড়াই শতাধিক প্রকাশনী এবারের মেলায় অংশগ্রহণ করছে। তারা প্রায় ছয় হাজারেরও বেশি বই প্রকাশ করবে।
প্রতি বছর মেলায় প্রকাশকদের বাইরে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনকে নামে-বেনামে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়ে থাকে। থাকে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের ভাগ। কিন্তু এবার শুধুই সৃজনশীল প্রকাশকদের নিয়ে মেলা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলা একাডেমী চত্বরে আজ শুক্রবার বিকাল তিনটায় মেলার উদ্বোধন করবেন।
এরই মধ্যে মেলা প্রাঙ্গণের সব স্টলসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এবার ২৩৪টি প্রকাশনা সংস্থাকে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১১৩টি এক ইউনিট, ৭৯টি দুই ইউনিট এবং ৪২টি তিন ইউনিটের স্টল। এছাড়া মেলায় ৪২টি লিটল ম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এবারের মেলা বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণের ভেতরেই সীমিত থাকছে। প্রাঙ্গণের বাইরে কোনো স্টল বরাদ্দ এবার দেয়া হয়নি। এতে নিম্নমানের ও পাইরেটেড বইয়ের কবল থেকে মেলা মুক্ত থাকবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে এবার মেলা কর্তৃপক্ষ তার নামে বইমেলা উত্সর্গ করছে।
ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমাদের মনে ভাষার চেতনা জাগ্রত হয়। ফেব্রুয়ারি যেমন একুশের মাস, তেমনি বইমেলার মাসও বলা চলে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনার অন্যতম পথিকৃত্ চিত্তরঞ্জন সাহা বাংলা একাডেমী চত্বরের মাটিতে চটের ওপর বই বিছিয়ে বইমেলার যাত্রা শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমানে এটি বাংলাদেশের সব স্তরের মানুষের প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছে।
একুশের বইমেলা ঘিরে বাংলাদেশে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের সম্মিলন ঘটে। এ মেলাকে ঘিরেই আমাদের সৃজনশীল প্রকাশনার বিস্তার। বাংলা একাডেমী এবং একুশের বইমেলা বর্তমানে প্রায় একই নামে পরিণত হয়েছে। বইমেলার কথা এলে চলে আসে বাংলা একাডেমীর নাম। কারণ বাংলা একাডেমীই এ মেলার মূল আয়োজক। কিন্তু বইমেলার প্রধান আয়োজক বাংলা একাডেমী এখনও অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রতি বছরই স্টল বরাদ্দে দুর্নীতি, পক্ষপাত, দলীয়করণ, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের অভিযোগে তারা অভিযুক্ত হয়। নানা পদ্ধতিগত জটিলতার কারণে অনেক সময় গণমানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা অনেকটা বাধাগ্রস্ত হয়। তবে এবারের মেলায় বাংলা একাডেমী প্রকৃত প্রকাশকদের বাইরে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনকে স্টল বরাদ্দ না দেয়ার যে সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি একটি সঠিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে সব মহলে প্রশংসা পেতে সমর্থ হচ্ছে।
বইমেলাকে বারোয়ারি মেলার চরিত্র থেকে উদ্ধার করে শুধুই বইয়ের মেলা করা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এ বছরই সম্ভবত প্রথম বইমেলাটি কেবল প্রকাশকদের হতে চলেছে। তাই স্টলও বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বেশ যাচাই-বাছাই করে। অন্যদিকে বিশটি বইয়ের বাধ্যবাধকতা থাকলেও এর চেয়ে কম মানসম্পন্ন বই যারা প্রকাশ করেছে, তাদেরও স্টল বরাদ্দের জন্য বিবেচনায় আনা হয়েছে। অন্যদিকে প্রতি বছরই বইমেলায় ক্ষমতাসীন ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর দৌরাত্ম্য থাকে। বাংলা একাডেমী এবার কোনো চাপের কাছে নতিস্বীকার না করে এগুলোকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এসবের পাশাপাশি যদি পাঠকদের জন্য মেলায় প্রবেশ আরও সহজতর করা যায়, তাহলে মেলা আরও সুন্দর হবে। আর প্রতি বছর মেলার প্রথম দিকের একটি ভোগান্তি ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ধুলোবালি। এই ধুলোবালি দূর করতে এবারও বাংলা একাডেমীর কার্যকর কোনো পদক্ষেপ লক্ষ করা যাচ্ছে না। এজন্য মেলার প্রথম সপ্তাহে দর্শনার্থীরা ধুলোবালির কারণে অনেক বিড়ম্বনার শিকার হবেন। মেলার ধূলির আগ্রাসন থেকে যদি দর্শনার্থীরা রক্ষা পান এবং স্বচ্ছন্দে বই সংগ্রহ করতে পারেন, তাহলে মেলা সুন্দর, উপভোগ্য এবং সুশৃঙ্খল রূপ পাবে।
তবে এবার বাংলা একাডেমী মেলা পরিসরের সঙ্কোচন যে করেছে, সে ব্যাপারে বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা উঠছে। মেলা যে শুধু একাডেমী প্রাঙ্গণেই করতে হবে, সেটা বাধ্যতামূলক নয়। এতে পাঠক-দর্শনার্থীদের ভোগান্তি অনেক বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দর্শনার্থীদের কথা চিন্তা করে বইমেলাটিকে বড় জায়গায় নিয়ে যাওয়া দরকার বলে মনে করেন বোদ্ধা মহল। এক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও মেলার আয়োজন করা যেতে পারত।
মেলার সার্বিক অবস্থা ও প্রস্তুতি সম্পর্কে বেশ কয়েকটি নামকরা প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে আমার দেশ প্রতিনিধির কথা হয়। তাদের মতামতের উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।
মেছবাহউদ্দীন আহমদ : আহমদ পাবলিশিং হাউস
ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থা আহমদ পাবলিশিং হাউসের স্বত্বাধিকারী মেছবাহ উদ্দীন আহমদ বললেন, এবার আশা করছি, মেলা অনেক সুন্দর ও সুশৃঙ্খল হবে। এটি মোটামুটিভাবে প্রকাশকদের মেলা। বাংলা একাডেমী এবার শুধু প্রকাশকদের মেলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এটি আমাদের প্রাণের দাবি। এটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করতে পারলে মেলা অন্যবারের তুলনায় অনেক সুন্দর হবে।
প্রকৃত প্রকাশকরা মেলা করলে মেলা প্রাঙ্গণের ভেতরে সুষ্ঠুভাবে মেলা করা সম্ভব। আমরা যারা প্রকাশক, তাদের বইগুলো প্রকাশ করার জন্যই তো মেলা। তাই প্রকৃত প্রকাশকরা মেলা করলে একাডেমী প্রাঙ্গণের ভেতরে মেলা করা সম্ভব।
আমি মেলাকে বাণিজ্যিকভাবে হিসেব করতে চাই না বা করি না। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, পাঠকের কাছে আমাদের বই তুলে ধরা। আর আমাদের বই আমরা সম্পাদনা করেই প্রকাশ করি। সব প্রকাশকের উচিত, সিনিয়র লেখকদের না হোক, জুনিয়র লেখকদের বই অবশ্যই সম্পাদনা করে বের করা।
এবারের মেলায় আহমদ পাবলিশিং হাউস থেকে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে—সদ্যপ্রয়াত প্রফেসর আলমগীর অনূদিত রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম, আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু অনূদিত খুশবন্ত সিংয়ের সর্বশেষ উপন্যাস দি সানসেট ক্লাব, ড. জুবাইদা আক্তারের ‘মুসলিম ঔপন্যাসিকদের উপন্যাস, আউয়াল চৌধুরীর চাঁদের আলোয় একটি মেয়ে প্রভৃতি।
এ কে নাছির আহমেদ সেলিম : কাকলী প্রকাশনী
কাকলী প্রকাশনীর এ কে নাছির আহমেদ সেলিমের প্রত্যাশা, এবারের মেলা অনেক ভালো হবে। বাংলা একাডেমী প্রকাশনা সংস্থার বাইরে এবার কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থাকে স্টল বরাদ্দ দিচ্ছে না। এটি যদি সঠিকভাবে কার্যকর করা যায়, তাহলে মেলার আকর্ষণ বাড়বে ও পরিবেশ সুষ্ঠু, সুন্দর হবে। মেলা প্রাঙ্গণের বাইরে যে স্টলগুলো বরাদ্দ দেয়া হতো, তাতে নিচু মানের পাইরেটেড বই বিক্রি হতো। অথচ বাংলা একাডেমীর অমর একুশে মেলার নিয়মে স্পষ্ট বলা আছে, বাংলাদেশী লেখকের বাংলাদেশী বই ছাড়া মেলায় অন্য কোনো এলাকার অন্য কোনো লেখকের বই প্রকাশ বা বিক্রি করা যাবে না। কিন্তু মেলার বাইরের স্টলগুলো সেটা প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করে। এবার এসব নিচু মানের পাইরেটেড বইয়ের সয়লাব থেকে দর্শনার্থীরা অনেকটা মুক্ত থাকবে বলে আশা করা যায়। আর আমরা চাই না, বাইরের লেখকদের বই আমাদের এই প্রাণের মেলায় বিক্রি হোক। আমাদের লেখকরা তো যথেষ্ট ভালো ও সৃজনশীল বই লেখেন। আমাদের মেধা ও মননের বিকাশে তাদের বই-ই যথেষ্ট। আমাদের দেশে প্রকাশনা জগত্ এখনও সেভাবে শিল্প হয়ে উঠতে পারেনি, তাই ভালো করে বই সম্পাদনা করা বা সম্পাদনা পরিষদ গঠন করা সম্ভব হয় না।

মনিরুল হক : অনন্যা
অনন্যার স্বত্বাধিকারী মনিরুল হক মনে করেন, এবারের বইমেলা অন্যবারের তুলনায় অনেক ভালো হবে। এবার অনেক অনেক নতুন ও সৃজনশীল বই আসবে। এবার শুধু প্রকাশকদের মেলা হওয়াটা অনেক আশাব্যঞ্জক একটি দিক। তবে মেলা শুধু প্রাঙ্গণের ভেতরে করাটা ঠিক নয়। এতে মেলার পরিসর অনেকটা কমে যাবে। সেক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার আয়োজন করা যেতে পারত। আর বাংলাদেশের প্রকাশকরা এখনও একটি মেলা আয়োজন করার মতো ক্ষমতা অর্জন করতে পারেনি। তাই সরকারের সহযোগিতায় বাংলা একাডেমীকে আরও উদ্যোগী হতে হবে।
এবারের মেলায় অনন্যার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের রবীন্দ্রনাথ ও সভ্যতার সঙ্কট, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরের জেল থেকে লেখা বাংলাদেশ, মুনতাসীর মামুনের ইতিহাসভিত্তিক বই ঢাকার তিন পুরুষ, হুমায়ূন আহমেদের বই হিমু সমগ্র-২, হুমায়ূন আহমেদ বিচিত্রা, ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস পাঁচ নায়িকা, শ্রাবণ জ্যোত্স্নায়, সাংবাদিক আবেদ খানের গল্প জীবনের গল্প জীবনযুদ্ধের গল্প প্রভৃতি।

মাজহারুল ইসলাম : অন্যপ্রকাশ
দীর্ঘ একটি বছর পর আবার আমাদের প্রাণের মেলা, অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হয়ে গেছে। আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা, অমর একুশে বইমেলা হবে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণের বাইরে মুক্ত আকাশে। এখানে একাডেমী প্রাঙ্গণের ভেতরে মেলাকে বনসাই বানিয়ে রাখা হয়েছে বা খাঁচার ভেতর বন্দী পাখির মতো করে রাখা হয়েছে। মেলা শুরু হওয়ার পর থেকে এর দর্শক, লেখক, প্রকাশক, পাঠক দিন দিন বাড়ছে; কিন্তু কমছে এর পরিসর। অনেক প্রকাশক আবেগের বশবর্তী হয়ে বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণের বাইরে মেলাকে স্থানান্তরিত করতে চান না। কিন্তু আবেগ দিয়ে তো আবার বাস্তবতা মেলানো যায় না। তাই আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা, অমর একুশে বইমেলাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ বা অন্য কোথাও স্থানান্তর করা যেতে পারে।
বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন, আগামী বছর থেকে বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গণে শুধু উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে, তবে মূল মেলাকে বাইরে স্থানান্তর করা হবে। এ মেলার পরিসর যত বাড়বে, একুশের প্রতি, শহীদদের প্রতি আমাদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা তত বাড়বে।
বর্তমানে আমাদের জন্য যে স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়, তাতে বই প্রদর্শন করাই যায় না। মাত্র ১০০টি বই প্রদর্শন করলে তো আর সার্বিক চিত্র পাওয়া যাবে না। আর দর্শকরা স্বচ্ছন্দে বই দেখতে পারবেন না। তারা তাদের পছন্দের বই নেড়েচেড়ে দেখতে পারবেন না। তাই এর থেকে মুক্তি পেতে আমাদের একমাত্র চাওয়া মেলাকে স্থানান্তর করে এর পরিসর বড় করতে হবে।
অন্য প্রকাশ থেকে এবারের মেলায় প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের আলোচিত উপন্যাস দেয়াল, হাবিজাবি, শিশুতোষ গ্রন্থ কাকতাড়ুয়া, নির্বাচিত মিসির আলী, হিমু-৯। এছাড়া হুমায়ূন আহমেদের ওপর ইমদাদুল হক মিলনের প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ, মুহাম্মদ হান্নান লিখছেন, হুমায়ূন আহমেদের ধর্ম চেতনা ও মৃত্যু ভাবনা ইত্যাদি।

আমিনুল ইসলাম : কাশবন প্রকাশন
কাশবন প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী আমিনুল ইসলাম বলেন, সবকিছুর পরিসর দিন দিন বাড়ে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের বইমেলার পরিসর ছোট করা হচ্ছে। বইমেলা নিয়ে দিন দিন বইপ্রেমী মানুষের উচ্ছ্বাস ও আগ্রহ যেখানে বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে মেলার পরিসর ছোট করা কাম্য হতে পারে না। এবারের মেলা শুধু বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণের ভেতরে করা হচ্ছে। এর মধ্যে আবার বিশাল একটা স্থানজুড়ে বাংলা একাডেমীর অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ থাকে। সবকিছু মিলে সংগ্রামী সাংবাদিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের মতো বইমেলাকে অবরুদ্ধ মনে হচ্ছে। বাংলা একাডেমীর উচিত প্রাঙ্গণের বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে যদি মেলা করতে পারে, তাহলে তা অনেক সুন্দর ও সুষ্ঠু হবে।
আমিনুল ইসলাম মনে করেন, বাংলা একাডেমী যদি মেলা পরিচালনার দায়িত্ব প্রকাশক সমিতির ওপর ছেড়ে দেয়, তবে মেলা আরও প্রাণবন্ত ও সুশৃঙ্খল হবে। তবে মেলার পরিধি হ্রাস পেলেও প্রাণের উচ্ছ্বাস একটু কমলেও সার্বিকভাবে একাডেমীর প্রস্তুতি দেখে মনে হচ্ছে মেলা সুষ্ঠু ও সুন্দর হবে। তাছাড়া মেলার প্রবেশপথে র্যাবের একটি নিরাপত্তা স্টল করা হয়েছে। এতে মেলার শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা অনেকটা বাড়বে বলে আশা করা যায়।
এবারের মেলায় কাশবন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে—আমার দেশ পত্রিকার কারা নির্যাতিত নির্ভীক সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের গুমরাজ্যে প্রত্যাবর্তন, হাসান হাফিজের হুল ফোটানোর ছড়া, ইঞ্জিনিয়ার মোস্তফা হোসেনের জ্বলন্ত ইরাকের ঘুমন্ত কাহিনী, বেবী মওদুদের প্রতিবন্ধীদের বই প্রতিবন্ধীদের আনন্দময় ভুবন, নয়ন রহমানের শিশু-কিশোর গল্প ‘আমার একটা পতাকা চাই’, রওশন আরা আক্তারের উপন্যাস ‘এক চাঁদনীপশর রাতের গল্প’, তপন কুমার দাশের ‘টুঙ্গিপাড়ার সেই ছেলেটি’ ইত্যাদি।

আহমেদ মাহমুদুল হক : মাওলা ব্রাদার্স
মাওলা ব্রাদার্সের আহমেদ মাহমুদুল হক বলেন, প্রতি বছরের মতো এবারও একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর মেলা আমরা পাব আশা করি। তবে এবার মেলা অন্যবারের তুলনায় আরও বেশি সুন্দর, সুশৃঙ্খল এবং উপভোগ্য হবে বলে মনে করি। বর্তমানে দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। আমি মনে করি, মেলার সময় যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকে, তাহলে পাঠক, প্রকাশক, লেখক সবাই একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু মেলা উপভোগ করতে পারবে।
বাংলা একাডেমী এবারের বইমেলা শুধু প্রকাশকদের নিয়ে করার যে সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আশা করি, একাডেমী কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতেও এ সিদ্ধান্তে অটল থেকে শুধু প্রকাশকদের জন্য মেলা চালিয়ে যাবেন। আর এবারের মেলা শুধু একাডেমী প্রাঙ্গণের ভেতরে করার যে সিদ্ধান্ত একাডেমী নিয়েছে, তাকে আমি সাধুবাদ জানাই। এর মাধ্যমে মেলা বারোয়ারি রূপ থেকে প্রকৃত বইমেলায় ফিরে আসবে। যতদূর জানি, শুধু একাডেমী প্রাঙ্গণের ভেতর মেলা করতে গিয়ে প্রকৃত কোনো প্রকাশকই বাদ পড়েননি। যারা নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করেছেন, তারা সবাই স্টল বরাদ্দ পেয়েছেন।
আমাদের দেশে প্রকাশনা শিল্প এখনও ভালোভাবে দাঁড়াতে পারেনি। বেসরকারি প্রকাশক এবং পাঠকদের কল্যাণে আমাদের প্রকাশনা শিল্প এ পর্যন্ত আসতে পেরেছে। এখনও অনেক প্রকাশনীর কোনো সম্পাদনা পরিষদ নেই। আবার অনেক প্রকাশনী বইমেলায় সম্পাদনা ছাড়াই বই প্রকাশ করে। এটা কোনোক্রমেই ঠিক নয়। আমাদের প্রকাশনা শিল্প আরেকটু দাঁড়াতে পারলে তাদেরও সম্পাদনা পরিষদ গঠিত হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
এবারের মেলায় মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে মুহম্মদ জাফর ইকবালের কিশোর উপন্যাস গাব্বু, সেলিম আল দীনের নাটক সমগ্র-১ ও ২, জাতীয় অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিমের স্মৃতিসমগ্র, বিচারপিত মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের আইন বিষয়ক প্রবন্ধাবলী, মুনতাসীর মামুনের বই বঙ্গবন্ধু কিভাবে আমাদের স্বাধীনতা এনেছিলেন, শামসুজ্জামান খানের বাংলাদেশের উত্সব, আনোয়ারা সৈয়দ হকের নারী বিষযক বই নারীর অনেক কথা আছে প্রভৃতি।

আফজাল হোসেন : অনিন্দ্য প্রকাশ
অনিন্দ্য প্রকাশের স্বত্বাধিকারী আফজাল হোসেন বলেন, আশা করি এবারের মেলা অন্যবারের তুলনায় ব্যতিক্রমী এবং সুশৃঙ্খল হবে। এবার বিক্রিও বাড়বে বলে আশা করা যায়। কেননা প্রতি বছর মেলা প্রাঙ্গণের বাইরে যেসব স্টল বরাদ্দ দেয়া হয় এবং এর বাইরে ফুটপাতে মানহীন, অপাঠ্য ও পাইরেটেড বই আর পাওয়া যাবে না। এগুলোর স্থলে সৃজনশীল প্রকাশকদের সৃজনশীল বইয়ের বিক্রি বাড়বে। আর শুধু প্রকাশক এবং একাডেমী প্রাঙ্গণের ভেতরে মেলা হওয়ার কারণে এর শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্যও বাড়বে। এর সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীরা পাইরেটেড বা নিম্নমানের বই যেহেতু পাবে না, তাই এক্ষেত্রে তারা মানসম্মত ও সৃজনশীল বই বেশি বেশি করে দেখা ও কেনার সুযোগ পাবে।
এবারের মেলায় অনিন্দ্য প্রকাশনী থেকে প্রায় ৬৫টি বই প্রকাশিত হবে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে দ্বিজেন শর্মার প্রকৃতি সমগ্র, মোশতাক আহমদের ৩টি সায়েন্স ফিকশন ও একটি রহস্য উপন্যাস, হাসান হাফিজের সম্পাদনায় বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ, বুলবুল চৌধুরীর উপন্যাস ইতু বৌদির ঘর, জাকির তালুকদারের উপন্যাস পরাবাস্তব, মাহবুব রেজার জল বলে ঘোলা হই, এম আর মাহবুবের ভূমিকায় ড. নূরুল ইসলামের ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

মো. জহির দিপ্তী : ইতি প্রকাশন
ইতি প্রকাশনের স্বত্বাধিকারী মো. জহির দিপ্তী বলেন, আশা করি এবারের মেলা অন্যবারের তুলনায় সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও দর্শনার্থীদের উপযোগী হবে। দেশের সার্বিক অবস্থা যদি ভালো থাকে, তাহলে মেলাও সুন্দর হবে। আর দেশের অবস্থা খারাপ হলে তার প্রভাব অবশ্যই মেলার ওপর পড়বে। আর কাগজের দাম কিছুটা বাড়ার কারণে বইয়ের দাম এবারও কিছুটা বাড়বে। তবে বইপ্রেমী মানুষের কাছে বইয়ের মূল্য কোনো ব্যাপার নয় বলে মনে করেন জহির দিপ্তী। কারণ যারা বই পছন্দ করে কেনার জন্য মনস্থির করেন, তারা কখনও দামের কথা চিন্তা করেন না।
২০১৩ সালে ইতি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ‘জয় আসলে ভারতের’, আনিসুল হকের ‘শিশু-কিশোর সমগ্র-৩’, হাসান হাফিজের ‘জাপানের রূপকথা’ ‘দুঃসময়ের চড়াই উতরাই : আওয়ামী লীগের চার বছর’ উল্লেখযোগ্য।

রামশঙ্কর দেবনাথ : বিভাস
বিভাস-এর স্বত্বাধিকারী রামশঙ্কর দেবনাথ বললেন, আমি চাই, পাঠক বা দর্শনার্থী মেলায় এসে যেন ভালো পরিবেশ পায়, যথাযথভাবে মেলা পরিদর্শন করতে পারে, বই কেনার জন্য উত্সাহী হয় এবং বই কেনে। আর মেলার ব্যবস্থাপনা যেন ভালো হয়, একাডেমীর কাছে সেটা প্রত্যাশা করি। এগুলো করতে পারলে অনেক সুন্দর একটি মেলা হবে বলে আশা করি। আর আমরা সব সময় চাই, শুধু প্রকাশকরা যেন মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান। আর আমরা মেলার প্রাঙ্গণে সুষ্ঠু এবং সুন্দরভাবে মেলা সম্পন্ন করার জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত।
এবার বিভাস থেকে প্রকাশিত হচ্ছে প্রায় ৬০টি বই। এর মধ্যে আহমদ রফিকের শিশুতোষ গ্রন্থ ‘স্বাধীনতার লড়াই’, মহাদেব সাহার কবিতার বই ‘সর্বাঙ্গে তোমার গুঞ্জন বাজে’, মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতা ‘যতদূর বাংলা ভাষা ততদূর এই বাংলাদেশ’, আনিসুল হকের ‘বাছাই রম্য’, হাসান হাফিজের ‘প্রিয় সব ছড়া’, আহসান হাবীবের ভ্রমণ সঙ্কলন ‘ট্রাভেল অ্যান্ড ফ্যাশন’, জাকির আবু জাফরের কিশোর সংকলন’, হাসান শান্তনুর ‘গণমাধ্যম নিপীড়ন’, উল্লেখযোগ্য।

মো. মনিরুজ্জামান : মহাকাল
মহাকালের স্বত্বাধিকারী মো. মনিরুজ্জামানের মতে, মেলার মূল প্রাঙ্গণের বাইরে স্টল না দেয়া এবং বিভিন্ন সংগঠনকে স্টল না দেয়া বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষের একটি অসাধারণ সিদ্ধান্ত। মেলার মূল প্রাঙ্গণ আয়তনে ছোট হলেও যতগুলো দোকান রয়েছে, তাতে রয়েছে শুধু নামি-দামি লেখকসহ বিভিন্ন লেখক-লেখিকার লেখা বই আর বই। প্রকৃত বইপ্রেমীদের জন্য এবারের বইমেলা একটি সত্যিকারের মিলনমেলায় পরিণত হবে। তারা তাদের পছন্দের বইগুলো কিনতে পারবেন একটি নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশের মধ্য দিয়ে।
২০১৩ সালের বইমেলা উপলক্ষে গৃহীত এ গণমুখী ও বাস্তববাদী সিদ্ধান্তের তেমন কোনো প্রচার নেই। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এমন সিদ্ধান্ত দেশব্যাপী পাঠক-পাঠিকা, লেখক-লেখিকা তথা সব স্তরের জনগণের জানা উচিত। আর সেজন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচার। বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত বইপ্রেমীরা মেলায় আসতে উত্সাহী হন।
বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ থাকবে, শেষ পর্যন্ত এসব সিদ্ধান্ত যেন বাস্তবায়িত হয় এবং মেলার শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর থাকে।
মহাকাল থেকে এবারের বইমেলায় পাঠক-ক্রেতাদের জন্য উপস্থাপন করা হবে শ’খানেক বই। এর মধ্যে কবি আল মাহমুদের সুবিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিন’, মরু মূষিকের উপত্যকা (রহস্য উপন্যাস), ছায়ার সঙ্গে মায়ার লড়াই ও আমি ধরণীর মেয়ে প্রকাশ করছে মহাকাল। প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীনের সমাজ সংস্কৃতি ও বিশ্বায়ন, নজরুল গবেষক শাহাবুদ্দীন আহ্মদের লক্ষ বছর ঝরণায় ডুবে রস পায় নাকো নুড়ি, হাসান হাফিজের ছড়ার বই গুগল সার্চে ঘোরা, আবদুল হাই শিকদারের সন্ত্রস্ত বাংলাদেশ : লন্ডনে লাবণ্য, সৈয়দ আবদাল আহমদের পড়শী বাড়ির খোঁজ-খবর প্রভৃতি।
২০১৩ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় যে বইগুলো আলোচনা এবং বিক্রির শীর্ষে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু বই হচ্ছে অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের আলোচিত উপন্যাস ‘দেয়াল’, ‘নির্বাচিত মিসির আলী’ ও ‘হিমু-৯’। অকুতোভয় সাংবাদিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের কাশবন প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘গুমরাজ্যে প্রত্যাবর্তন’ এবং ইতি প্রকাশন থেকে ‘প্রকাশিত জয় আসলে ভারতের’, ইউপিএল থেকে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, প্রথমা প্রকাশন থেকে আকবর আলি খানের ‘আজব ও জবর আজব অর্থনীতি’, সময় প্রকাশন থেকে মুনতাসীর মামুনের ‘বাংলাদেশী জেনারেলদের মন’, অনন্যা থেকে হুমায়ূন আহমেদের ‘হিমু সমগ্র-২’ ও ‘বিচিত্রা’, ইমদাদুল হক মিলনের উপন্যাস ‘পাঁচ নায়িকা’, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ থেকে সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাস ‘কেরানিও দৌড়ে ছিল’, হাসান আজিজুল হকের ‘সাবিত্রি উপাখ্যান’, সেলিনা হোসেনের উপন্যাস ‘কাঁটাতারের প্রজাপতি’, মুহম্মদ জাফর ইকবালের শিশুতোষ গ্রন্থ ‘গাব্বু’, মহাকাল থেকে প্রকাশিত আল মাহমুদের ‘গোল্ডেন কাবিন’ প্রভৃতি।
md.asad0143@gmail.com