Amardesh
আজঃ শনিবার ১৯ জানুয়ারি ২০১৩, ৬ মাঘ ১৪১৯, ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৪    আপডেট সময়ঃ রাত ১২ টা
 
 সাধারণ বিভাগ
 বিশেষ কর্ণার
 শোক ও মৃত্যুবার্ষিকী
 সাপ্তাহিক
 বিশেষ আয়োজন
 
আবহাওয়া
 
 
আর্কাইভ: --
 

কারারুদ্ধ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

ড. মা হ ব ব উ ল্লা হ
« আগের সংবাদ
পরের সংবাদ»
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন হাই সিকিউরিটি প্রিজন কাশিমপুর কারাগারে বন্দী। তার বিরুদ্ধে সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী ৩৭টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে কিংবা ভবিষ্যতে আনা হতে পারে, তার মধ্যে রয়েছে গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও বোমাবাজির অভিযোগ। তার মুক্তি দাবি করে সভা-সমাবেশ, মানবন্ধন এবং বক্তব্য-বিবৃতি দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কোনো কিছুই সরকার কর্ণপাত করছে না। মনে হচ্ছে সরকার তাকে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থাপন করতে চাইছে। প্রতিবাদী রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে এই দৃষ্টান্তের বার্তা হলো ভবিষ্যতে তাদের একইভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাগ্যবরণ করতে হবে। এরই মধ্যে আইন প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলে দিয়েছেন, অন্যদেরও মির্জা ফখরুলের ভাগ্যবরণ করতে হবে। এ ধরনের উক্তির মধ্যে গণতান্ত্রিক মানসিকতার লেশমাত্র নেই। বরং রয়েছে ক্রোধ ও জিঘাংসার মনোবৃত্তি। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, এদেশে জননন্দিত নেতানেত্রীকে ক্রোধ বা প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে নাজেহাল করার প্রয়াস কখনোই ফলপ্রসূ হয়নি। বরং দেখা গেছে, যে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য এই ধরনের মন্দ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে তা শেষ বিচারে অফলপ্রসূ প্রমাণিত হয়েছে। সাময়িকভাবে কোনো প্রতিবাদী নেতার কণ্ঠস্বর কারাগারের পেষণে স্তব্ধ করে রাখা যায় বটে, কিন্তু চিরকালের জন্য তা করা যায় না। সরকার এই সত্যটি উপলব্ধি করলে সরকারের নিজের জন্য মঙ্গলজনক হতো। কিন্তু তা হবার নয়। যারা একবার ভুল করে তারা সেই ভুলকে আরও মারাত্মক ধরনের ভুল দিয়ে চাপা দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু বিলক্ষণ সত্য এই যে, সেরকম চেষ্টা ব্যর্থ প্রমাণিত হয়।
শাসকদল হিসেবে আওয়ামী লীগের কূটবুদ্ধির অভাব নেই। কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে আটক রাখার জন্য এদেশে আইন আছে। বহুলভাবে নিন্দিত এই আইনটির নাম বিশেষ ক্ষমতা আইন। এই আইনটি পাস করা হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের প্রথম সরকারের আমলে। পাকিস্তান আমলেও একই ধরনের নিবর্তনমূলক আইন ছিল। এগুলোর মধ্যে উল্লেখ্য হলো প্রাদেশিক নিরাপত্তা আইন, কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা আইন এবং ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলস। এসব নিবর্তনমূলক আইনে শত শত বিরোধী রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীকে দিনের পর দিন আটক রাখা হতো। সরকারের সুমতি না হলে কারোরই ছাড়া পাওয়ার সুযোগ ছিল না। স্বয়ং শেখ মুজিবুর রহমান নিজেও এসব আইন বলে কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। আশা করা গিয়েছিল, স্বাধীন বাংলাদেশে এ ধরনের আইন থাকবে না এবং এসব আইনের অপব্যবহারও থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা দেখা গেল ভিন্ন। স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানি আমলের নিবর্তনমূলক আইন অনুসরণ করে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করা হলো। এরই নাম বিশেষ ক্ষমতা আইন বা Special Powers Act. এই আইনে অনেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিগ্রহের শিকার হন। বিশেষ করে এরশাদ আমলে এই আইনের ব্যবহার মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে যায়। উচ্চ আদালতে এই আইন প্রয়োগের বিরুদ্ধে একাধিক রিট মামলা হয়। শেষ পর্যন্ত বিচারিক রায়ে এই সত্যাটি প্রতিপন্ন হয় যে, আইনটি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। তাই পরবর্তীকালে কাউকে বিনা বিচারে আটক রাখার জন্য এ আইনটি আর ব্যবহৃত হচ্ছে না। বস্তুত আইনটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। কিন্তু তাতে কী আসে যায়? আওয়ামী লীগ সরকারের কূটকৌশলের অভাব নেই। তারা এখন হরতাল-ধর্মঘটজনিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের টার্গেট অনুযায়ী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ধারায় মামলা রুজু করছে। অধিকাংশ মামলাই এমন সব ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে যারা সুসংগঠক, অথচ মাঠপর্যায়ের কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনার সঙ্গে তাদের দূরবর্তীতম কোনো যোগাযোগ নেই। তারপরও দেখা গেছে, নিম্ন আদালতে জামিন না হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত জামিন মঞ্জুর করে দিচ্ছে। কিছুদিন জেলে আটক থাকার পর নেতাকর্মীরা মুক্ত হয়ে আবার আন্দোলনের কাতারে ফিরে আসছেন। সরকার এখন আইনের এই ফাঁকটিও রুদ্ধ করার কৌশল গ্রহণ করেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর আগেও একটি হরতালের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার দলের অন্যান্য নেতাসহ গ্রেফতার হয়েছিলেন। সপ্তাহ কয়েক কারাগারে থাকার পর হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে তারা মুক্ত হয়ে আসেন। সর্বশেষ দেশব্যাপী অবরোধ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গ্রেফতার করা হয়। এবারও তিনি প্রাথমিকভাবে ২টি মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন লাভ করেন। কিন্তু তিনি মুক্ত হলেন না। তাকে ভিন্ন মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে। এযাত্রা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আরও ২টি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ১০ দিন করে ২০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। রাজধানীর পল্টন ও কলাবাগান থানায় পৃথক দুটি মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে তাকে। গত ১৬ জানুয়ারি ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলী হোসেন কলাবাগান থানার মামলায় রিমান্ড শুনানির জন্য আগামী ২৪ জানুয়ারি ও অপর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রেজাউল করিম পল্টন থানার মামলায় রিমান্ড শুনানির জন্য আগামী ২৭ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন। এভাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে একের পর এক ফৌজদারি মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখিয়ে দীর্ঘদিন আটক রাখার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সরকার বোধ হয় চায় না তার অবশিষ্ট মেয়াদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারামুক্ত হোক। এটি সরকারের একটি অভিনব কৌশল বটে। নিবর্তনমূলক আইন অকার্যকর হয়ে গেলেও যে কোনো রাজবন্দীকে দীর্ঘসময় জুড়ে যে আটক রাখা যায়, এটা তারই দৃষ্টান্ত।
সরকারবিরোধী জোট নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দাবি জানিয়ে আসছে এবং আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। সরকারের পক্ষ থেকে কোনো কোনো মন্ত্রী সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে যুক্তি দেখিয়ে এই দাবি নাকচ করে দিচ্ছেন। কিন্তু তার পাশাপাশি সংলাপেরও আহ্বান জানানো হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো বৃহত্তম বিরোধী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকে হয়রানিমূলক মামলায় লাগাতার আটক রেখে কীভাবে একটি সংলাপ হতে পারে। সরকার যদি সংলাপের প্রশ্নে সত্যিকার অর্থে আন্তরিক হতো তাহলে এ ধরনের অপকৌশলের আশ্রয় নিতে হতো না। তাই সরকারের আন্তরিকতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। ছলে বলে কৌশলে নিজেদের মনমতো একটি নির্বাচন করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করাই সরকারের কৌশল।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন সজ্জন ব্যক্তি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি দলটিকে যথার্থ অর্থেই একটি আধুনিক রাজনৈতিক দলের মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করার নিরবচ্ছিন্ন প্রয়াস নিয়েছিলেন। রাজনীতিবিদ হিসেবে তার সততা ও নিষ্ঠা সব মহলেই প্রশংসিত। কটু কথার আশ্রয় না নিয়েও শালীন ও সভ্য ভাষায় কীভাবে প্রতিপক্ষের তীক্ষষ্ট সমালোচনা করা যায় সে ব্যাপারে তার পারঙ্গমতা এরই মধ্যে সবার দৃষ্টি কেড়েছে। দলের মধ্যে তো বটেই, দলের বাইরেও সাধারণ মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। এটাই শাসক মহলের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যে সঠিক পথেই আছেন, তার প্রমাণ তার আজকের অবস্থা। সরকারের উচিত হবে, পানি আরও ঘোলা না করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে আনীত মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেয়া। বিরোধী দল বিএনপিও একদিকে যেমন তাদের দাবির প্রশ্নে অনড় অবস্থায় রয়েছে, অন্যদিকে যতদূর সম্ভব হিংসাত্মক আন্দোলন পরিহার করার চেষ্টা করছে। কারণ তাদের হিংসাত্মক আন্দোলনের সুযোগে কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি যাতে মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে। শাসক দল আওয়ামী লীগকেও বিএনপির এই মনোভাবকে বুঝতে হবে। এটা বুঝতে দেরি হলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটবে বা ঘটার আশঙ্কা থাকবে, তার দায়-দায়িত্ব সরকারকেই গ্রহণ করতে হবে। ব্যারিস্টার রফিক উল হক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামিনের বিষয়ে একটি আইন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী কোনো কথিত অপরাধমূলক কাজের জন্য উচ্চ আদালত যদি কাউকে জামিন দেয় তাহলে একই ধরনের অপরাধের অভিযোগে অন্য মামলা থেকেও কথিত আসামি জামিন পেয়ে গেছেন ধরে নিতে হবে। ব্যারিস্টার রফিকের এই আইনি ব্যাখ্যার পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বারবার হেনস্থা করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত, সে প্রশ্ন নাগরিকমাত্রই করতে পারে। সরকারের কাছে আবেদন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আপনারা অবিলম্বে মুক্তি দিন। বাতাস বেশ ভারী হয়ে গেছে। বাতাস একটু হাল্কা হোক।
লেখক : অর্থনীতিবিদ
mahbub.ullah@yahoo.com